সিনেমা দেখতে দেখতে যে লোকটা মিলিয়নিয়ার হয়ে গেল

তিনি যখন স্কুলে পড়েন, তখন তার বাসায় প্রথমবারের মত একটি ভিএইচএস প্লেয়ার নিয়ে আসা হয়। তার বন্ধুদের একটা ভিডিও শপ ছিল। সেখান থেকে ভিডিও টেপ ভাড়া পাওয়া যেত, একটা ভিডিও দু’সপ্তাহ রাখার অনুমতি ছিল। সেই শপ থেকে তিনি প্রথম যে টেপটি নিয়ে এলেন তার নাম ‘এলিয়েন’। ১৪ দিনে মোট ১৪ বার সিনেমাটা দেখেছিলেন, প্রত্যেকদিন স্কুল থেকে ফিরে একবার। এই মুভি প্রেমের আরেকটা উদাহরন দেয়া যেতে পারে। ১৯৯০ সালে তিনি এইচপি (হিউলেট প্যাকার্ড) নামের প্রতিষ্ঠানের ফুলটাইম চাকুরীজীবি এবং এই এক বছরে তিনি মোট ১১০০ সিনেমা দেখেছিলেন। নাম বললে এই মানুষটিকে চেনা সম্ভব না, কিন্তু যে কাজের মাধ্যমে তিনি মিলিয়নিয়ার হয়েছেন তা আপনি সহজেই চিনবেন। তার নাম কোল নিডহ্যাম এবং তিনি ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেজ (আইএমডিবি) সাইটের প্রতিষ্ঠাতা।

এক বছরে এগারোশ মুভি দেখা সম্ভব হয়েছিল তার বন্ধুর সেই ভিডিও শপের কারণে। শনিবারের ছুটির দিনগুলো তিনি একের পর এক দশটা সিনেমা সিনেমা দেখেছেন। এত সিনেমা দেখতে গিয়ে নতুন সমস্যা তৈরী হল। কি সিনেমা দেখেছেন আর কি দেখেন নি সেটাই ভুলে যেতে লাগলেন। ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। বছরে যদি এগারোশ সিনেমা দেখতে হয়, তবে দৈনিক গড়ে তিনটে করে সিনেমা দেখতে হয়, এক মাসে নব্বইটা সিনেমা। সুতরাং দেখা সিনেমাগুলো সম্পর্কে তিনি নিজের কম্পিউটারে তথ্য টুকে রাখতে শুরু করলেন। সেই তালিকা প্রিন্ট করে নিয়ে যেতে হত ভিডিও শপে। তালিকার সাথে মিলিয়ে আনতে হত এমন সিনেমা যা তার দেখা হয় নি। ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেজ এর প্রথম ফাইলটি তৈরী হয়েছিল কোল এর নিজের কম্পিউটারেই।

১৯৮৯ সালে কোল নিডহ্যাম ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ওয়াল্ড ওয়াইড ওয়েব তখন খুব সীমিত পরিসরে। কোল তার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মুভি ডিসকাসন গ্রুপে যোগ দিলেন। সেখানে অবশ্য মুভি নিয়ে যা কথা হত তারচে কোন নায়িকা দেখতে কিরকম, কোন নায়ক কি করল ধরনের আলোচনা বেশী হত। কোল-এর বন্ধুরা যাখন তার তৈরী ডাটাবেজ সম্পর্কে জানতে পারল তখন তারাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। ডাটাবেজে যুক্ত হতে থাকল পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, নায়ক-নায়িকা সংক্রান্ত তথ্যাবলী, এমনকি সিনেমার সারসংক্ষেপও।

তারপর ১৯৯৩ সালে কারডিফ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের সহযোগিতায় এই ডাটাবেজ প্রথম ওয়েবে স্থান পায়। অল্প কদিনেই ওয়েবে ট্রাফিক এত বেড়ে গেল যে কোল-কে অন্য আরও কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারে হোস্ট করতে হয়। অন্যান্য এলাকার মধ্যে ছিল জার্মানি, মিসিসিপি, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, সাউথ আফ্রিকা, কোরিয়া, আইসল্যান্ড এবং জাপান। কিন্তু, তাতেও সামাল দেয়া যাচ্ছিল না। ১৯৯৫ সালে দেখা গেল প্রতি সপ্তাহে সাইটের ট্রাফিক দ্বিগুন হচ্ছে। পাশাপাশি, কোলের বন্ধুরা যারা ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করছিল তারা কাজের পাহাড়ে চাপা পড়ল। সুতরাং, ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হল। কোলের ভাষায় – “আমরা একটা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলাম। আমরা কি হাল ছেড়ে দিয়ে বলবো – এই পাচবছর আমরা মজা করেছি। নাকি এখান থেকে ব্যবসা করা যায় কিনা সে সম্পর্কে ভেবে দেখবো? বিষয়টা সহজ ছিল না। এমন একটা সময় যখন ইন্টারনেট বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে এমনটা ভাবাই অস্বস্তিকর ছিল।” 

কোল ও তার বন্ধুরা দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিল। ফলাফল, ১৯৯৬ সালের জানুয়ারী মাসে একটি বানিজ্যিক সাইট হিসেবে আইএমডিবি ডট কম যাত্রা শুরু করল। প্রথম সার্ভারটা কেনা হয়েছিল ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বিজ্ঞাপন দিলেন, সেই টাকায় সার্ভারের দাম শুধু পরিশোধই হল না, আরও নতুন সার্ভার কেনা সম্ভব হল।

মনে রাখতে হবে এতদিন পর্যন্ত সাইট চলেছে স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায়। ১৯৯৬ সালে এই স্বেচ্ছাসেবকরা একে একে চাকরী ছেড়ে দিতে লাগলেন এবং আইএমডিবি-র ফুলটাইম কর্মচারী হিসেবে যোগদান করতে লাগলেন। কোল নিডহ্যাম নিজেও চাকুরী থেকে ইস্তফা দিয়ে নিজের কোম্পানীতে যোগ দিলেন। ১৯৯৮ সালের মধ্যেই আইএমডিবি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটা সাইটের একটি হয়ে গেল। সাইটে প্রতিমাসে ব্যবহারকারীর সংখ্যা প১৮ মিলিয়নের বেশী, ৪ লক্ষেরও বেশী মুভি ও এন্টারটেইনমেন্ট ডাটাবেজ থেকে তারা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য খুজে নিতে পারে। আর কি নেই সেখানে। সিনেমা সম্পর্কে সকল তথ্যের পাশাপাশি আছে ছবি, ভিডিও, ট্রিভিয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

পড়ছেন সেই লোকটির গল্প যে সিনেমা দেখতে দেখতে মিলিয়নিয়ার হয়ে গেল। নিজ প্রতিষ্ঠানে ফুলটাইমার হিসেবে যোগদানের দুই বছর পরে কোল নিডহ্যাম ডাক পেলেন জেফ বেজোস এর কাছ থেকে। এক বছর আগেই এই বেজস টাইম ম্যাগাজিনের ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়েছিল। বেজসের পরিচয় হল – তিনি আমাজন ডট কম এর প্রতিষ্ঠাতা। লন্ডনের এক হোটেলে বসে এই দুই ব্যবসায়ী আলোচনা করলেন, তারপর ২০০৮ এর এপ্রিলে আমাজন কিনে নিল আইএমডিবি-কে। আর এভাবেই কোল নিডহ্যাম হয়ে গেল মিলিনিয়ার। সুখের বিষয়, আমাজন কিনে নিলেও আইএমডিবি এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

মজার ব্যাপার হল, আইএমডিবি কাজ করে যাচ্ছে সারা বিশ্বের সিনেমা সংক্রান্ত তথ্যাবলী নিয়ে, কিন্তু কোথা থেকে কাজ করছে, কিভাবে কাজ করছে, কতজন কাজ করছে, কারা কাজ করছে এই সকল তথ্য বেশ গোপনীয়। কোল নিডহ্যাম বলেন ‘একশ থেকে দুইশ লোক’ আইএমডিবির জন্য কাজ করছে। এরা যে এক জায়গায় বসে কাজ করে তা নয়, বরং আইএমডিবি-র লোকজন সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে আছে বলে ধারনা করা হয়। আইএমডিবি-রই এক হাই অফিসিয়াল সিমানটন জানিয়েছেন, হলিউডেই তাদের কিছু ক্রু আছে যারা তাদের পরিচয় গোপন করে সিনেমা নির্মানের সাথে জড়িত এবং এরা আইএমডিবি’র লাইফবোটের ভূমিকা পালন করছে। এই লোকটি হতে পারে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, হতে পারে সিনেমার স্ক্রিপ্ট রাইটার নিজেই অথবা কোন অভিনেতার আত্মীয়। এরাই গোপন সকল তথ্য সরবরাহ করে চলে আইএমডিবি কর্তৃপক্ষকে।

বর্তমানে আইএমডিবি-তে কত তথ্য আছে? সঠিক তথ্য বলতে পারবো না তবে সেটা দুই মিলিয়নের বেশী এবং টিভি ও সিনেমার ক্রেডিটে নাম আছে সাড়ে চার মিলিয়ন। প্রতিদিনই বাড়ছে এই তথ্যের সংখ্যা। প্রতিদিনই আইএমডিবি তার অব্স্থানকে একটু একটু করে শক্ত করছে।

সরব প্রকাশিত তারুণ্যের ২০ কুঁড়ি বইয়ের জন্য  এই লেখাটি প্রস্তুত হয়েছিল। পরবর্তীতে পরিবর্তিত রূপে দ্য রিপোর্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এই লেখাটি।

সূত্র:

ম্যানমিডিয়া
এল এ উইকলি

About দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - [email protected]

View all posts by দারাশিকো →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক মন্তব্য