Life In a Metro: শহুরে কাব্য

সিনেমা না দেখেও সিনেমা মনে রাখা যায় – লাইফ ইন আ মেট্রো আমার জীবনে সবচে’ বড় উদাহরণ। এই সিনেমাটা না দেখলেও মনে রাখতাম, একটাই কারণ, প্রিয় গায়ক জেমস এই সিনেমায় হিন্দীতে গান গেয়েছেন, তার সেই চিরাচরিত স্টাইলে ঝাকড়া চুল ঝুলিয়ে মাতাল ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়েছেন, সর্বোপরি এই সিনেমার একটি অংশ হয়েছেন। সিনেমাটা ভুলে যাওয়া আরও কষ্টকর হয়ে গেল দেখার পর। ঢাকা শহরের এত যন্ত্রনা, যানযট, দুর্বিষহ জীবন, নোংড়া জীবন পদ্ধতি ইত্যাদি ইত্যাদি সত্ত্বেও আপনি ঢাকা শহরে কেন বাস করছেন – এই প্রশ্নের জবাবটা বোধহয় পাওয়া যাবে লাইফ ইন আ মেট্রো তে। ঢাকা একটা মেট্রো, এবং মেট্রোর জীবন এমনই যে সবকিছু সত্ত্বেও এখানেই থেকে যাই আমরা। এখানে রঞ্জিত-শিখার মতো দম্পত্তি আছে যারা নিজেদের পারিবারিক জীবনে শান্তি খুজে পায় না, রঞ্জিত খুজে নেয় নেহার মতো কোন সুন্দরী তন্বীকে, শরীরে তৃপ্তিসন্ধান করে আর শিখা নিরাপত্তা-সম্মান খুজে ফেরে আকাশ শর্মার বাহুডোরে। আছে শ্রুতি-মন্টির মতো কসফিউজড জুটি। মন্টি টিপিক্যালপন্থায় জীবনঙ্গিনী খুজছে, শ্রুতি খুজছে আধুনিক মানুষের মতো করে। আছে অমল-শিবানীর মতো জুটি যারা জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে যৌবনের পছন্দের মানুষটির কাছে আশ্রয় খুজে। আর রাহুলের মতো কিছু মানুষ তো সবসময়ই আছে, থাকবে যারা চোখের সামনে পছন্দের মানবীটিকে আরেকজনের শয্যাসঙ্গিনী হতে দেখবে কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারবে না, “তোমাকেই আমার চাই” ।

অনুরাগ বসু সিনেমার পরিচালক। এই ভদ্রলোক নাকি ডার্ক প্যাশন এবং অ্যাডাল্টারী থিম নিয়ে সিনেমা নির্মানের জন্য সুপরিচিত, এর আগে গ্যাঙস্টার, মার্ডার সিনেমা তারই চিহ্ন বহন করে। ভারতীয় সিনেমায় নতুন কিছু প্রয়োগ করেছেন তার এই সিনেমার মাধ্যমে। মেট্রো নামের একটা তিন সদস্যের ব্যান্ড যারা সিনেমার কাহিনীকে টেনে নিয়ে যেতে সাহায্য করে – এই কনসেপ্ট প্রথম অনুরাগ বসুই দেখিয়েছেন। সিনেমার কাহিনীতে নতুনত্ব আছে কিন্তু সেটা কতটা মৌলিক সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কিছু সিনেমার বোদ্ধা। দ্য অ্যাপার্টমেন্ট নামের ৬০ এর দশকের এক সিনেমার সাথে রঞ্জিত-শিখা-আকাশের কাহিনীর মিল পাওয়া যায়। অনুরাগ বসুর আইডিয়াকে বাস্তবতা দান করতে প্রিতমের সঙ্গীত অসাধারণ হয়েছে, গানগুলো তো বটেই।

কিন্তু তার পরেও কিছু কথা থেকে যায়। কাহিনী, উপস্থাপন, সংলাপ, সিনেমাটোগ্রাফী সব দিক দিয়ে নতুনত্ব আর অভিনবত্ব দেখা গেলেও পরিচালক টিপিক্যাল হিন্দী সিনেমা থেকে পুরোটা সরে আসতে পারেন নি। আর তাই বিয়ের ভরা মজলিশে শ্রুতি তার ভালোবাসার কথা জানিয়েছে মন্টিকে আর বিয়ের পোশাকেই ঘোড়া নিয়ে ছুটতে ছুটতে মন্টি পৌছে গেছে রেলস্টেশনে। এই রেলস্টেশনেই এসে জড়ো হয়েছে আকাশ-শিখা-রাহুল-নেহা-অমল। হাস্যকর।

অভিনেতা-অভিনেত্রীরা প্রত্যেকেই অসাধারণ কাজ করেছেন সিনেমায়। শিল্পা শেঠীর উপস্থাপন বেশ মোলায়েম, আপন করে নিতে চায়। নিষ্পাপ মুখের পেছনে কত দু:খ নিয়ে নেহা মরে যেতে চায় তার প্রশংসা অবশ্যই করতে হয়। আর ইরফান খানের গোবেচারা অভিনয় এটাই জানিয়ে দেয়, আরও অনেক কিছু পাওয়ার আছে এই মানুষটির কাছে।

অনেক বছর আগে একটি পুরুষ তার নারীটিকে রেল স্টেশনে বিদায় দিয়ে পাড়ি দিয়েছিল পরবাসে, অনেক বছর বাদে একটি নারী তার ভালোলাগার পুরুষটিকে বলেছিল, “ইউ গো, স্টার্ট আ নিউ লাইফ” – সেও এই রেলস্টেশনেই। রেলস্টেশনেই তো বলবে কারণ এটাই যে মেট্রোর প্রধান দরজা।

পুনশ্চ:
এই পোস্টটা যখন লিখেছিলাম তখন ১৯৬০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দ্য অ্যাপার্টমেন্ট’ সিনেমাটা দেখা হয়নি। কিছুদিন আগে সাদাকালোয় নির্মিত সিনেমাটি দেখার সুযোগ হল। আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম, লাইফ ইন আ মেট্রো নিয়ে একটি রিভিউ লিখেছি বলে। এত নির্লজ্জ অনুসরন সিনেমাটিতে করা হয়েছে যে আমি অনেকগুনে ভালো সিনেমাটা একদমই উপভোগ করতে পারিনি। শুধু কনসেপ্ট নয়, ক্ষেত্রবিশেষে সংলাপ নকল করতেও ছাড়েনি অনুরাগ বসু।
পাঠকদের অনুরোধ, যদি লাইফ ইন আ মেট্রো দেখা না হয়ে থাকে, তবে আগে দ্য অ্যাপার্টমেন্ট দেখে নিন, তারপর লাইফ ইন আ মেট্রো দেখুন।

About দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - [email protected]

View all posts by দারাশিকো →

6 Comments on “Life In a Metro: শহুরে কাব্য”

  1. চলচ্চিত্রটি দেখেছি।আপনার লেখাটি পড়ে আর একবার দেখার ইচ্ছা হল। ভালো লেখার জন্য ধন্যবাদ।

  2. “রেলস্টেশনেই তো বলবে কারণ এটাই যে মেট্রোর প্রধান দরজা।”

    এই লাইনটা ফাটাফািট লাগল।

  3. লেখাটা ভালো লাগলো…আর ছবিটা আমি আগেই দেখেছি …এটা আমার দেখা অন্যতম সেরা হিন্দি ছবি..:)

  4. এটা দেখার ইচ্ছে ছিল আগে থেকেই। গানগুলো দারুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক মন্তব্য