Trilogy of Death: Babel

স্থান মরক্কোর এক দুর্গম অঞ্চল, মরুভূমি। চরিত্র দুটো কিশোর ছেলে, ইউসুফ ও আহমেদ। ছাগল পাল চড়ায়। শেয়ালের আক্রমন প্রতিরোধ করতে তার বাবা তাদের একটি বন্দুক কিনে দেন। বন্দুক বিক্রেতা বলেছিল, প্রায় তিন কিলোমিটার পর্যন্ত দুরত্বে গুলি করা সম্ভব এই বন্দুক দিয়ে। সত্যি বলেছিল তো? একটা পরীক্ষা করলেই প্রমাণ হয়ে যাবে। দূরে রাস্তায় যে বাসটি দেখা যাচ্ছে সেখানে গুলি করে লাগানো যায় কিনা ট্রাই করা যেতে পারে। বয়সে ছোট হলেও অপেক্ষাকৃত বুদ্ধিমান আহমেদ বন্দুক কাধে ঠেকায়, তারপর নিশানা করে গুলিটা ছোড়ে। ধুস! লাগে নাই, তারমানে বিক্রেতা ঠকিয়েছে। সিদ্ধান্তে উপনীত হতে দেরী হয় না কিশোরদ্বয়ের। কিন্তু একি, বাসটা গতি কমিয়ে দাড়িয়ে যাচ্ছে কেন?সুসান এবং রিচার্ড জোনস স্বামী স্ত্রী। ঘুরতে বেরিয়েছে তারা। কোন একটা ব্যাপার নিয়ে মন কষাকষি। তাই তাদের মধ্যে কোন কথা হচ্ছিল না। মন খারাপ সুসান জানালায় মাথা দিয়ে ভাবছিল বিভিন্ন কথা। হঠাৎ কোথা থেকে একটা বুলেট এসে একদম সুসানের ঘাড়ে বিধে গেল। রক্ত বেরোতে লাগল গল গল করে। কি হবে এখন? এই দুর্গম মরুভূমির মধ্যে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করলে সুসান বেচে থাকবে আর অল্প কিছুক্ষন।

স্থান জাপানের এক শহর। চরিত্র একটি কিশোরী মেয়ে, নাম চিকো ওয়াটাওয়া, শ্রবন এবং বাক প্রতিবন্ধী। সুন্দরী কিন্তু প্রতিবন্ধীত্ব তাকে একজন বয়ফ্রেন্ড জোগাড় করতে বাধা দেয়। সদ্য মাতৃহারা এই মেয়েটির একাকিত্বই তাকে উগ্র যৌনতার দিকে আহবান জানায়। সিদ্ধান্ত নেয়, আজই কিছু একটা হবে। নিজের দিকে আকর্ষন করতে প্রয়োজনে তার শরীরকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে সে।

অ্যামেলিয়া যদিও মেক্সিকোর বাসিন্দা, বহু বছর ধরে আমেরিকায় অবৈধ ভাবে বসবাস করে আসছে। ছোট ছোট দুটো জমজ বাচ্চার আন্টি সে, দেখা শোনা করে তাদের। তার ছেলের বিয়ে, কিন্তু তার মেক্সিকো যাওয়া অনিশ্চিত, কারণ বাচ্চাদের বাবা-মা বাড়িতে নেই। কিন্তু তার ভাগ্নে বাচ্চাদের সহই মেক্সিকোতে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে, অবশ্যই অবৈধভাবে। সব ঠিকই আছে, কিন্তু ফেরার সময় বর্ডারে পুলিশ তাদের গাড়িটা থামালো। বাচ্চারা বলল, অ্যামিলিয়া তাদের আন্টি নয়। তবে? অ্যামিলিয়া কি শিশু অপহরনকারী?

ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের বিচ্ছিন্ন কিছু কাহিনী একই সাথে দেখানোর মাধ্যমে যে টেনশনটা তৈরী হয় সেটা সামলানো মোটেও সহজ না। টেনশন তৈরীর এই কঠিন কাজটাই বেশ অবলীলায় করেছেন পরিচালক আলেসান্দ্রো গনজালেস ইনারতুতু তার বাবেল সিনেমায়। ২০০৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটি দেখেন নি এমন দর্শক হয়তো দুর্লভ হবে। ছবিটি বেশ আলোচিত হয়েছিল কারণ অস্কারে সেরা ছবির তালিকায় এটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে দ্য ডিপার্টেড সিনেমার সাথে। পরিচিত ব্যাক্তিদের মধ্যে অভিনয় করেছে রিচার্ড চরিত্রে ব্রাড পিট এবং সুসান চরিত্রে কেট ব্ল্যাঙ্কেট।

[sb]সব মিলিয়ে ট্রিলজি অব ডেথ[/sb]
তিনটি পর্ব দেখার পরে ডেথ ট্রিলজি এবং আলেসান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু নিয়ে একটা উপসংহার টানার চেষ্টা করা যায়। সাবজেক্ট হিসেবে ডেথ বা মৃত্যু একটা ভালো বিষয়। কিন্তু ইনারিতুর মুন্সিয়ানা গল্প বাছাইয়ে এবং পরিচালনায়। তার তিনটি সিনেমারই কাহিনী লিখেছেন গুলিয়ানো অ্যারিগা। এ জন্য তাকে বাহবা দিতেই হয়। তিনটি সিনেমার মধ্যে ২১ গ্রামোস বা ২১ গ্রাম সিনেমাটা তুলনামূলকভাবে জটিল বিশেষ করে পলের সাথে ক্রিস্টিনার সম্পর্ক নিয়ে বেশ দ্বন্দ্বে পড়তে হয়। আমার কাছে এই সিনেমাটা আবেদন হারিয়েছে এ কারনে, তবে এর পেছনে পলের মৃত্যু সম্ভাবনা নিয়ে যে গতিহীনতা সেটাও একটা কারণ। বাবেল সিনেমায় টেনশন পুরো সিনেমা জুড়ে বিদ্যমান থাকে গল্প বলার ঢংয়ে। অ্যামোরেস পেরস সিনেমার অক্টোভিয়া এবং তার কুকুরের লড়াই এবং হিটম্যান এল চিভো কাহিনীর গতিশীলতা তৈরীতে বেশ সাহায্য করে।
তিনটি সিনেমায়ই একটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয়। মৃত্যু আসে বেশ হঠাৎ করে এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই সুখের জীবনে বাগড়া দেয়ার জন্যই এর আগমন। তবে মৃত্যুকে ছাপিয়ে যে ব্যাপারটা উঠে এসেছে সেটাকে আমরা নিয়তি বলতে পারি। প্রত্যেকটি ঘটনাই বারবার প্রমাণ করেছে যে আমাদের প্রচেষ্টাই সব নয়, নিয়তির অনুমতি সাপেক্ষেই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবতার মুখ দেখতে পারে।
ট্রিলজির তিনটি সিনেমাতে গল্প বলার যে স্টাইল একে অ্যান্থলজি ফিল্ম কিংবা হাইপারটেক্সট ফিল্ম নামে অভিহিত করা হচ্ছে। বৈশিষ্ট্য হলো আলাদাভাবে প্রত্যেকটি কাহিনীই স্বাধীন কিন্তু সামান্য একটি সুতো কাহিনীগুলোর মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে দেয়।
তিনটি সিনেমায়ই মিউজিক, বিশেষ করে বাবেল সিনেমায় বেশ দারুণ। সিনেমাটোগ্রাফি ভালো লাগবে বাবেল সিনেমায়, বোধহয় মরূভূমির বিবর্ন প্রান্তরগুলোর কারণেই। সব মিলিয়ে ডেথ অব ট্রিলজির জন্য আলেসান্দ্রো গনজালেস ইনারিতুকে আমরা ‘হ্যাটস অফ’ দিতে পারি, বিনে খরচায় এর থেকে বড় পুরস্কার কিছু কি আছে?

About দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - [email protected]

View all posts by দারাশিকো →

4 Comments on “Trilogy of Death: Babel”

  1. ইনারতুতু এর আগে প্রোডিউসার ছিলেন আমোরেস পেরোস এর।এই ধরনের মুভিতে তার হাত আসলেই ভাল।আমোরেস পেরোস,ক্র্যাশ(২০০৪)বাবেল এই ধরনের আরো কিছু মুভির নাম দিতে পারেন কী;যেগুলোর ঘটনা প্রবাহ বিভিন্ন বিন্দু থেকে শুরু হয়ে এক পয়েন্টে এসে ইন্টারস্যাক্ট করে?

    1. http://en.wikipedia.org/wiki/Hyperlink_cinema

      প্রিয় নীলপদ্ম, এই লিংকটা দেখতে পারেন, এই ধরনের সিনেমাগুলোকে হাইপারলিংক সিনেমা বলা হচ্ছে – একটা তালিকা পাবেন এখানে।
      অনেক ধন্যবাদ, আবারও আসবেন আশা করি 🙂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক মন্তব্য