বিস্মৃত গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জী

ভারতখ্যাত গোয়েন্দা। কোন কেসের সমাধান করতে দেরী লাগে না। গাড়ি চালাতে পারেন খুব দ্রুত। কোমড়ে গুঁজে রাখেন রিভলবার, অন্ধকারে লক্ষ্যভেদ করেন অব্যার্থ। সকালে খালি পেটে কফি না খেলে মাথা খোলে না। ঝুঁকিপূর্ণ কাজেই তার আগ্রহ, মৃত্যুকে উপেক্ষা করে ঝাঁপিয়ে পড়েন রহস্য সমাধানে। ছুটে বেড়ান বাংলা থেকে বার্মা পর্যন্ত। সহকারী একজন থাকলেও তার সহযোহিতা নেন কদাচিৎ। কে তিনি?

পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি বিখ্যাত প্রাইভেট ডিটেকটিভ দীপক চ্যাটার্জীর সাথে। পঞ্চাশের দশকে বাংলার পাঠকদের মাঝে জনপ্রিয় ছিলেন দীপক চ্যাটার্জী। অবশ্য পরবর্তীতে কিরিটি রায়, ব্যোমকেশ বক্সী, ফেলুদার মতো প্রখর মস্তিষ্কের গোয়েন্দাদের কারণে বাজার হারান তিনি, হারিয়ে যান কালের অতলে। সম্প্রতি তার সেইসব দুঃসাহসিক অভিযানগুলোকে আবার সম্মুখে নিয়ে আসা হয়েছে।

দীপক চ্যাটার্জীর স্রষ্টা স্বপনকুমার। এটি লেখকের ছদ্মনাম। আসল নাম সমরেন্দ্র নাথ পান্ডে বা এস এন পান্ডে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে তিনি গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জীকে নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে অদৃশ্য সংকেত উপন্যাসের মাধ্যমে গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জী পাঠকের সামনে প্রথম উপস্থিত হয়েছিলেন। প্রায় তিন দশক পরে আশির দশকে দীপক চ্যাটার্জীর যাত্রার সমাপ্তি ঘটে।

এই তিন দশকে গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জীকে নিয়ে প্রায় হাজারখানেক বই প্রকাশিত হয়েছে। এই উপন্যাসগুলোর মধ্যে যেমন একক বই রয়েছে, তেমনি রয়েছে সিরিজ। প্রায় বিশটি সিরিজ রয়েছে, এর মধ্যে এমন সিরিজও রয়েছে যেখানে একশ'র বেশী বই রয়েছে। এই সিরিজের মধ্যে রয়েছে রহস্য কুহেলিকা সিরিজ, ক্রাইম ওয়ার্ল্ড সিরিজ, ড্রাগন সিরিজ, বাজপাখি সিরিজ, বিশ্বচক্র সিরিজ, কালনাগিনী সিরিজ ইত্যাদি।

স্বপনকুমার বাবু কিভাবে এত সংখ্যক বই লিখেছিলেন? জেনে অবাক হবেন, গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জী ছাড়াও তার আরও অনেক বই রয়েছে, লেখক সম্পর্কে আলোচনায় আমরা সে প্রসঙ্গ উপস্থাপন করবো। দীপক চ্যাটার্জী বিষয়ক বইগুলো পড়লে এত বিশাল সংখ্যক বই লেখার রহস্য কিছুটা উদঘাটন করা সম্ভব। এই গোয়েন্দা গল্পগুলো মূলত কিশোরদের জন্য লেখা হয়েছিল। ফলে, চরিত্র চিত্রণের ব্যাপারে স্বপনকুমার বেশ উদাসীন ছিলেন। শত শত বই থেকেও দীপক চ্যাটার্জীর পূর্ণাঙ্গ কোন চিত্র পাওয়া যায় না। দীপকের চরিত্রই যেখানে পূর্ণাঙ্গ নয় সেখানে বাকীদের সম্পর্কে ন্যূনতম বর্ণনা পাওয়ার আশা বৃথা।

তাছাড়া, এই গল্পগুলোর আকৃতিও খুব বেশী ছিল না। স্বপনকুমার পৃষ্ঠা মেপে গল্পগুলো লিখেছেন। আটচল্লিশ পৃষ্ঠা, চৌষট্টি পৃষ্ঠা ইত্যাদি। বইয়ের আকৃতি ছোট। কভারে রঙ্গিন ছবি, ভেতরে নিম্নমানের কাগজে ছাপা বই। এই ধরনের বইগুলোকে আমরা চটি বই হিসেবে চিনি। বটতলার বই হিসেবে সে সময় পরিচিত ছিল। সারা বিশ্বে এই ধরণের বইগুলো পাল্প ফিকশন হিসেবে পরিচিত।

গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জীর গল্পের চরিত্রগুলোর গভীরতা ছিল না, আগেই বলেছি, গল্পের গভীরতাও ছিল না। ছিল গতি। দীপক চ্যাটার্জী ছুটে চলেন কেবল। গোলাগুলি হচ্ছে, মারামারি হচ্ছে, তারপর আবার পিছু ধাওয়া। কাজকর্মের কোন বিশ্বাসযোগ্যতা আছে কিনা তা যাচাইয়ের ধার ধারতেন না স্বপনকুমার। দেখা যাচ্ছে, সামান্য একটু ছদ্মবেশ ধারণ করে দীপক চ্যাটার্জী ভিড়ে যাচ্ছেন দস্যুদলে, অথচ সেখানে তার দীর্ঘদিনের পুরানো বন্ধু বিন্দুমাত্র সন্দেহও করছে না। অত্যন্ত ক্ষমতাধর শত্রু তার প্রত্যেকটি গতিবিধি সম্পর্কে অবগত থাকলেও অনেক কিছু সম্পর্কে জানতে পারেন না। নানা ধরণের ফাঁকফোকর থাকলেও পাঠকের অগোচরেই থেকে যেতো হয়তো, নাহয় এত জনপ্রিয়তা হলো কিভাবে?

দীপক চ্যাটার্জী বেশ জনপ্রিয় হলেও সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি পাননি সম্ভবত এ কারণেই। পাঠক রুদ্ধশ্বাসে দীপকের গোয়েন্দাগিরি সম্পর্কে পড়েছে, তারপর ভুলে গিয়েছে। তাকে আবার পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছে প্রকাশকরা। কেন? এর উত্তর পরে পাওয়া যাবে।

স্বপনকুমার অথবা সমরেন্দ্র নাথ পান্ডে আসলে সাহিত্য রচনার চেষ্টা করেননি। তিনি পেটের দায়ে লিখেছিলেন। রাজশাহীর মানুষ ছিলেন। পড়াশোনার জন্য কলকাতায় পাড়ি জমান। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু অর্থের অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জীকে নিয়ে জীবিকার্জনে লেগে পড়েন। শোনা যায়, শিয়ালদহ রেলস্টেশনের বিনা খরচায় পাওয়া আলো বাতাসে তিনি লিখতেন। সকাল বেলা প্রকাশকের লোক এলে তার হাতে পান্ডুলিপি দিয়ে আবারও লিখতে বসে যেতেন। এভাবে যিনি লিখেছেন তার পক্ষে চরিত্রের গভীরে যাওয়া কেনো সম্ভব নয়, তা সহজেই বোঝা যায়।

টাকার জন্য লিখতে গিয়ে তিনি কেবল গোয়েন্দা গল্পে আটকে থাকেননি। লিখেছেন জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসা বিজ্ঞান, হোমিওপ্যাথি, মোটর ড্রাইভিং, সবজি চাষ ইত্যাদি বহুবিদ ধরণের বই লিখেছেন তিনি। নিজ নামে লিখেছেন, ছদ্মনামে লিখেছেন। জ্যোতিষ বিষয়ে শ্রীভৃগু নামে লিখে খ্যাতি পেয়েছেন। জ্যোতিষ চর্চাও করেছেন এক সময়ে। এতসব বিষয়ে লিখতে গিয়ে বইয়ের স্বত্ব, রয়্যালিটি ইত্যাদি বিষয়ের ধার ধারেননি। প্রকাশকরা কেনো তার বই পুনঃপ্রকাশে আগ্রহী তার উত্তর রয়েছে এখানেই।

সাহিত্যগুণ থাকুক বা না থাকুক, পুনঃপ্রকাশের মাধ্যমে প্রকাশকরা গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জীকে আবারও সামনে নিয়ে আসায় কল্যাণ রয়েছে। দীপক চ্যাটার্জী নতুন পাঠকদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ পাচ্ছেন। এই পাঠকগণ আবার দর্শকও, যারা পর্দায় কোনো কিছু দেখার সময় যুক্তি-তর্ক এড়িয়ে যান। দীপক চ্যাটার্জীর গল্পগুলোয় আর কিছু না হোক, থ্রিল রয়েছে, সুতরাং স্ট্রিমিং ভিডিওর এই যুগে দীপক চ্যাটার্জীরও অধিকার রয়েছে পর্দায় উপস্থিত হবার। ধারণা করি খুব শীঘ্রই দীপক চ্যাটার্জীকে পর্দায় প্রতিষ্ঠিত করা হবে, এতে হয়তো শ্রী স্বপনকুমার বা সমরেন্দ্র নাথ পান্ডের প্রতিও কিছুটা ন্যায়বিচার করা হবে।

তথ্যসূত্র:

আনন্দবাজার পত্রিকা
উইকিপিডিয়া

লেখাটি দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত
গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জীর কিছু বই এখান থেকে ডাউনলোড করা যাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্য