Poster 1মাইয়া মানুষ যদি দেখাইতে চায় তাইলে পুরুষ মানুষ কি না তাকাইয়া পারে?

হেফাজতে ইসলামের তের দফার এক দফা নিয়ে দেশে যখন আলোচনা-সমালোচনার ঝড় চলছে, তখন এরকম সংলাপের কারণে ক্রসফায়ারে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তীব্র, তাই শুরুতেই স্বীকার করে নেয়া ভালো - এই সংলাপটি ইফতেখার চৌধুরী পরিচালিত দ্বিতীয় সিনেমা 'দেহরক্ষী' থেকে নেয়া। সিনেমার একমাত্র সংলাপ যা দেয়ার সাথে হলভর্তি দর্শক উল্লাস করেছেন, আনন্দে সিটি বাজিয়েছেন। এই সংলাপকে মূলমন্ত্র ধরেই যে ছবিটি ব্যবসা করতে চায় তার ছাপ ছবির পোস্টার থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ ছবিতে স্পষ্ট। সবগুলো পোস্টারেই নায়িকার দেহসর্বস্ব ছবি, ঢাকা পড়ে গেছে ছবির প্রধাণ দুই নায়ক, তাদের একজন সিনেমায় অপেক্ষাকৃত নতুন - ফলে পোস্টারে আরেকটু গুরুত্ব পাওয়ার দাবীদার। অন্যদিকে পুরো ছবি জুড়েই কারণে অকারণে নায়িকার দেহ গুরুত্বপূর্ণভাবে উপস্থিত হয়েছে। 'দেহরক্ষী' ছবির নামকরণ এদিক থেকে স্বার্থক।


ইফতেখার চৌধুরীর প্রথম ছবি এম এ জলিল অনন্ত অভিনীত প্রথম ছবি 'খোঁজ - দ্য সার্চ'। এর আগে তিনি এক পর্বের নাটক, টেলিফিল্ম নির্মান করেছেন - সবগুলোই অ্যাকশন নির্ভর। 'দেহরক্ষী' ছবির কাহিনীও অ্যাকশন নির্ভর হতে পারতো, তবে শেষ পর্যন্ত অন্যসব ঢাকাই ছবির মতই ত্রিভুজ প্রেমের রোমান্টিক-অ্যাকশন ছবিতে পরিণত হয়েছে। ছবির কাহিনী ও সংলাপ লিখেছেন আবদুল্লাহ জহির বাবু।


ঢাকা শহরের বড় মাস্তান আসলাম সিদ্দিকী (মিলন)। তার চিরশত্রু  সিজার (সিবা শানু), আসলামকে মারার জন্য বিদেশ থেকে দক্ষ কিলার ছোট ভাইকে দেশে নিয়ে আসামাত্র আসলাম সিদ্দিকী তাকে হত্যা করে গুম করে। প্রতিশোধের নেশায় সিজার চায় আসলামের জান রাতের পাখি 'সোহানা'কে হত্যা করতে। অথচ, সোহানা (ববি) আসলামকে ভালোই বাসে না। ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আসলাম সোহানার বাবাকে জিম্মি করে, সোহানাকেও তুলে নিয়ে আসে। ব্যবসায়িক কাজে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়লে আসলাম সিদ্দিকী নিয়োগ করে একজন দেহরক্ষী-কে, যে সিজারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে সোহানাকে। আসলাম সিদ্দিকী বিদায় নেয়, পর্দায় আসে দেহরক্ষী তীব্র (মারুফ)।


পাঠক, আপনাকে যদি এখন কাহিনীর বাকিটা বলতে বলা হয়, আমি জানি আপনি ছবিটি না দেখেও কাহিনীর বাকি অংশ বলতে পারবেন - কারণ এই কাহিনী যুগ যুগ ধরে চলছে বাংলাদেশে এবং অন্যান্য দেশেও। সমাপ্তিতে গিয়ে ফিফটি ফিফটি চান্স - আপনি তিনজকেই বাচিয়ে রাখতে পারেন, মেরেও ফেলতে পারেন - আবদুল্লাহ জহির বাবু কি করেছেন সেটা দেখার জন্য ছবির শেষ পর্যন্ত আপনাকে দেখতে হবে। বিস্তর ফাঁক ফোকর আর অগভীরতা নিয়ে ছবির কাহিনী তৈরী হয়েছে। আসলামের ব্যবসা কি জানা নেই, সিজারের সাথে তার দ্বন্দ্ব কি জন্য তার উত্তর নেই, পয়সার জন্য নাইটক্লাবে শরীর দেখিয়ে নেচে গেয়ে বেড়ায় যে মেয়ে সেই মেয়ে ভালোবাসার দোহাই দিয়ে আসলাম সিদ্দিকীর বিত্ত বৈভবকে উপেক্ষা আদৌ করতে পারে কিনা, সোহানাকে আমেরিকা নিয়ে যাওয়া সম্ভব না কারণ ভিসা পাওয়া সহজ নয় অথচ ঘন্টা কয়েকের ব্যবধানে সোহানা সার্কভুক্ত দেশের ভিসা কিভাবে পায় ইত্যাদিসহ আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজতে গেলে বেকাদায় পড়তে হবে দর্শককে।




[caption id="attachment_1858" align="alignleft" width="960"]Poster 3 সাইকো ভিলেন চরিত্রে মিলন ভালো অভিনয় করেছেন। ভবিষ্যতে নির্মাতারা একজন বুদ্ধিমান-কৌশলী-ঠান্ডা মাথার ভিলেন চরিত্রের জন্য মিলনের উপর নির্ভর করতে পারেন।[/caption]

দুর্বল কাহিনীকে সবল পরিচালনায় দর্শক উপযোগী করে নেয়া সম্ভব, কিন্তু পরিচালক এদিক থেকেও খুব সফল হন নি। ইফতেখারের নিজস্ব পরিচালনার ঢং-এ এই ছবিতে সন্ত্রাসী বাহিনী সুট-টাই পড়া, তাদের হাতে অত্যাধুনিক অটোমেটিক অস্ত্র, অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য অপেক্ষাকৃত কম গ্ল্যামারাস জায়গাকে বেছে নেয়া ইত্যাদি এই ছবিতেও আছে। কিন্তু তারপরও গতানুগতিক চিত্রায়ন থেকে পুরোটা বের হয়ে আসতে পারেন নি পরিচালক। একজন ভিলেন কেন সবসময় চোখ-মুখ খিঁচে রেখে সংলাপ বলবে সেটা বুঝে আসে না। বুকের দুই পাশে গুলি লাগার পরও কিভাবে একজন মানুষ কয়েক ঘন্টা বেচে থাকে এবং অপারেশনের পর পরই সুস্থ্য হয়ে পড়ে সেটা পরিচালকই ভালো জানবেন।


ছবিতে ভাড়ামী করার জন্য দুজন কাজের মানুষ চরিত্রকে নেয়া হয়েছে এবং তারা সাফল্যের সাথে ভাড়ামি করেছেন। তবে, কৌতুকের জন্য সমকামিতামূলক ইঙ্গিতকে বেছে নেয়ার কি যুক্তি থাকতে পারে জানি না। ঢালিউডের ছবি কি স্মার্ট হচ্ছে?




[caption id="attachment_1859" align="alignright" width="395"]poster 2 অ্যাকশন দৃশ্যে মারুফ সাবলীল। কিন্তু সংলাপ প্রদানে মারুফকে আরও দক্ষ হতে হবে।[/caption]

আসলাম সিদ্দিকী চরিত্রে মিলন অভিনয় ভালো করেছেন। তবে, তার চরিত্রটা সত্যিকারভাবে কি সেটা খুব স্পষ্ট নয়। আসলাম সিদ্দিকীর কিছু আচরণ দেখলে তাকে একজন সাইকো হিসেবে মনে হয়, আবার কিছু সময় তাকে গতানুগতিক ভিলেনের ভূমিকায় পাওয়া যায়। সাইকো ভিলেন চরিত্রে মিলন ভালোভাবে খাপ খেয়ে গেলেও গতানুগতিক ভিলেনের চরিত্রে মিলন খুবই বেমানান। সেক্ষেত্রে তার চরিত্রটা আরও সুন্দরভাবে মিলনের উপযোগী করে চিত্রায়ন করা উচিত ছিল। তবে, বুদ্ধিমান ভিলেন চরিত্রে মিলন যে ভালো করবেন সেটা এই ছবি থেকে বোঝা যায়। পরিচালকরা এ ধরনের চরিত্রে মিলনকে কাস্ট করতে পারেন।

অন্যদিকে দেহরক্ষী চরিত্রে মারুফ অনেক ভালো অভিনয় করেছেন। তার চরিত্রটি একটি গম্ভীর, দায়িত্বশীল অভিনয় দাবী করেছিল এবং মারুফ তা দেয়ার চেষ্টা করেছে। মারুফের সংলাপ ডেলিভারীর মধ্যে প্রাণ খুজে পাওয়া যায় না, ভাগ্যক্রমে এই ছবিতে সেটা অনেক জায়গায় কাজে লেগে গেছে, বাকী জায়গাগুলোয় দর্শককে উপেক্ষা করতে হবে।


ছবির নায়িকা এবং একমাত্র অবলম্বন যার দেহকে রক্ষা করার জন্যই 'দেহরক্ষী'র প্রয়োজন এবং দেহের উপর নির্ভর করে এই ছবি নির্মিত, সেই ববি দায়িত্ব পালন করেছেন সুচারুভাবে, অভিনয়ে উতরে গিয়েছেন সাফল্যের সাথে। তবে সংলাপ প্রদানে, বিশেষত ইমোশনাল দৃশ্যে, ববি খুবই অপটু। ঢালিউড ইন্ডাস্ট্রিতে সোহানা টিকে যাবে সেটা 'দেহরক্ষী' ছবির মাধ্যমে স্পষ্ট, তবে ভালোভাবে টিকে থাকতে হলে ববিকে আরও ভালো অভিনয়ে পারদর্শী হতে হবে। একমাত্র অভিনয়ই ববিকে স্থায়ী আসন দিতে পারে, অন্য কিছু নয়।


অন্যান্য চরিত্রের মধ্যে সোহানার বাবা চরিত্রে কাজী হায়াৎ উপযুক্ত লোক নন, তিনি ভালো অভিনয় করেন, কিন্তু অভিনয়ে ইমোশনের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। আসলাম সিদ্দিকীর বাড়ির কেয়ারটেকার চরিত্রে প্রবীর মিত্রের পোশাক সম্পূর্ন বেমানান, অভিনয় চলনসই।


'দেহরক্ষী'র চিত্রগ্রহণ এবং সম্পাদনা পরিচালক নিজেই করেছেন। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে যে ধরনের ট্রিটমেন্ট দরকার ছিল তা ঠিক পাওয়া যায় নি, ফলে পরিচালক অনেকগুলো শট দেখিয়েছেন, কিন্তু আকর্ষনীয়ভাবে উপস্থাপন করতে পারেন নি। নির্মানাধীন দালানের দৃশ্যটি আরও আকর্ষনীয় করা যেতে পারতো। সম্পাদক ইফতেখার চৌধুরী 'খোঁজ -দ্য সার্চ'র তুলনায় ভালো করেছেন, তবে ইফেক্টগুলো পলকা হয়ে গেছে। বন্দুকের গুলি গায়ে লাগলে বিদ্যুৎ ঝলকানির ইফেক্ট বর্তমান দুনিয়ায় অচল, এর চেয়ে বরং ঢালিউডের গতানুগতিক ধোঁয়া ওঠা বন্দুক ভালো। মিউজিক করেছেন অদিত। শ্রুতিমধুর এবং উপযোগী।


তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে যাদের দিকে আশা নিয়ে তাকিয়ে আছি ইফতেখার চৌধুরী তাদের একজন। ঢাকাই চলচ্চিত্রের গন্ডি থেকে কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসতে পেরেছেন তিনি, তার এই চেষ্টাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু, এও মনে করিয়ে দিতে চাই - ঢাকাই সিনেমার ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যত কিন্তু হুমকীর মুখে। তথ্যমন্ত্রী ইনু কোলকাতার ছবি বাংলাদেশে প্রবেশের প্রায় সকল ব্যবস্থাই পাকা করে ফেলেছেন - এখন শুধু প্রবেশ বাকী। ইন্ডাস্ট্রির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে বর্তমানে অবস্থান করছেন দিল্লীতে। আমাদের চলচ্চিত্র নির্মাতারা প্রতিবাদ করছেন, আন্দোলন করছেন। আন্দোলন করে সফল হওয়া গেলে কোলকাতার সিনেমা আমদানী কিছুকাল ঠেকানো যেতে পারে হয়তো, কিন্তু সারাজীবন ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, আমরা দর্শকরাই একসময় আপনাদের বিরুদ্ধে দাড়াতে বাধ্য হবো একসময়। ছবির পরিচালনা, কাস্টিং, চিত্রগ্রহণ, এডিটিং এ আপনি এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, কাহিনীর ক্ষেত্রে এই গুরুত্ব নেই কেন? দুর্বল কাহিনীর উপর নির্ভর করে ভালো সিনেমা বানানো সম্ভব নয়, সম্ভব নয় কোলকাতার বিশাল বাজেটের বিভিন্নমুখী গল্প অবলম্বনে সিনেমার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে টিকে থাকা। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে রক্ষার যুদ্ধের সৈনিক আপনি, আপনারা - আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে আমাদের মত আমজনতা - যুদ্ধটা ভালোভাবে না করতে পারলে জয় আসবে কোত্থেকে?


সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি দখলের এই যুদ্ধে আরও যোগ্যতা এবং দক্ষতার পরিচয় দিবেন, জয়ী করে আমাদের মুখে হাসি ফোটাবেন সেই দাবী এবং শুভকামনা থাকল।

দেহরক্ষী
চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: ইফতেখার চৌধুরী
কাহিনী ও সংলাপ: আবদুল্লাহ জহির বাবু
অভিনয়: মারুফ, মিলন, ববি, কাজী হায়াৎ, প্রবীর মিত্র
সঙ্গীত: অদিত
রেটিং: ৩/৫