184405_308139955962535_1939020046_n

১৯৭৩ সালে রাজ্জাক অভিনীত 'রংবাজ' সিনেমার মাধ্যমে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রে সামাজিক অ্যাকশন সিনেমার যাত্রা শুরু হয় এবং ক্রমান্বয়ে দেশীয় চলচ্চিত্রে প্রধান ধারা হিসেবে জায়গা করে নেয়। গত এক থেকে দেড় দশকের সামাজিক অ্যাকশন সিনেমাগুলোর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছক লক্ষ্য করা যায়। গতানুগতিক কাহিনি, গৎবাধা সংলাপ আর সামঞ্জস্যহীন দৃশ্যের সমন্বয়ে যে সামাজিক অ্যাকশন সিনেমা নির্মিত হয় তা একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর দর্শক ছাড়া অন্যদের চাহিদা মেটাতে অক্ষম এবং তা বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের মধ্যেকার চোরাবালিকেই ইঙ্গিত করে। টিভি নাটকের জনপ্রিয় নির্মাতা রেদোয়ান রনি নির্মিত সিনেমা 'চোরাবালি' সামাজিক অ্যাকশন সিনেমার বিদ্যমান চোরাবালি থেকে বেরিয়ে আসবে এই প্রত্যাশা থেকে বঞ্চিত দর্শকশ্রেণীর আগ্রহভরে অপেক্ষা করেছে। 'চোরাবালি'র মুক্তি সেই অপেক্ষা থেকে মুক্তি দিল।



বর্তমান সময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী গডফাদার ওসমান (শহীদুজ্জামান সেলিম) মডেল কন্যা সুজানার (পিয়া) হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত এমন সংবাদ দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় রাজ্যের সাংবাদিক একত্রিত হয়েছে ওসমানের প্রাসাদসম দালানের চত্বরে। ওসমানসহ সাগরেদরা মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে ওসমানের ডানহাত, পালকপুত্র সুমনের (ইন্দ্রনীল সেন) সাথে যাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দৈনিক পত্রিকার ক্রাইম রিপোর্টার নবনী আফরোজকে (জয়া আহসান) হত্যা করার, কিন্তু সুমন ফোন ধরছে না। নবনীকে হত্যা করা না হলে ওসমানের অন্যান্য অপকর্ম প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে যা তার আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণকে অনিশ্চিত করে তুলবে। কিন্তু সুমন ফোন ধরছে না কেন?

রেদোয়ান রনির কাহিনী, সংলাপ ও চিত্রনাট্যে এই গল্প উপস্থাপিত হয়েছে নন-ন্যারেটিভ পদ্ধতিতে। আড়াই ঘন্টার সিনেমায় বিশ বছরের কাহিনী উঠে আসলেও বর্তমান সময়ের প্রতি গুরুত্ব সর্বাধিক। ঘটনাপরম্পরা বজায় রেখে নিচ্ছিদ্র কাহিনী তৈরীর আন্তরিক প্রচেষ্টা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে সিনেমায়। সিনেমার ট্রেলার, পোস্টার এবং শুরুর দৃশ্যাবলী দেখে দর্শকের পক্ষে আঁচ করে নেয়া সম্ভব কাহিনীর গতিপথ কোনদিকে যাবে। ফলে, ওসমানের সাথে সুমনের বিরোধের একটি মজবুত কারণ প্রয়োজন ছিল। বিশ বছরের পিতৃস্নেহে লালন-পালন, ক্ষমতার অংশিদারী এবং আনুগত্য যে ঘটনায় মুখ থুবড়ে পড়ে তা অপেক্ষাকৃত দুর্বল, দর্শক হিসেবে মেনে নিতে মন রাজী হয় না। এই মন-ই প্রশ্ন তোলে সাংবাদিক নবনীর সাথে সন্ত্রাসী কিলার সুমনের সম্পর্কের বাস্তবতা নিয়ে, সামঞ্জস্যহীনতা নিয়ে। চোরাবালি রোমান্টিক সিনেমা নয়, এই সিনেমায় সুমন ও নবনীর প্রেমময় সম্পর্ক অহেতুক, অযৌক্তিক, দর্শকের মনোরঞ্জনের উপকরণ।

সুমন-নবনীর রোমান্টিকতার প্রভাব পড়েছে এর গতিময়তায়। ইন্টারমিশন পর্যন্ত সিনেমায় প্রচন্ড গতি। সেই গতিকে খুজে পাওয়া যায় না দ্বিতীয়ার্ধে। চরিত্র বিচারে ওসমানের একক দাপট লক্ষ্যনীয় সিনেমায়। চোরাবালি ওসমানের গল্প নয়, সুমনের গল্প - তার অন্ধকার জীবনের চোরাবালি থেকে মুক্তির গল্প। কিন্তু ওসমান চরিত্রের কারণে সুমন চরিত্রটি যথাযথভাবে ফুটে উঠতে পারে নি। অপেক্ষাকৃত বিলম্বে তৈরীকৃত বিশ বছর আগের সুমন চরিত্রটি অনেক বেশী মজবুত ও স্বাধীন, কিন্তু বর্তমান সময়ের সুমন নিছক খুনিতে পরিণত হয়েছে - একে আরও পরিণত করার সুযোগ ছিল। নবনী চরিত্রটির স্বতন্ত্রতা আগ্রহোদ্দীপক। ব্যঞ্জনাময় সংলাপের জন্য পরিচালক ধন্যবাদ পাবেন।

[caption id="attachment_1721" align="alignright" width="960"]শহীদুজ্জামান সেলিমের দুর্দান্ত অভিনয় একাই সিনেমাকে টেনে নিয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত শহীদুজ্জামান সেলিমের দুর্দান্ত অভিনয় একাই সিনেমাকে টেনে নিয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত[/caption]

কাহিনীর এই সামান্য ত্রুটি দর্শকের চোখ এড়িয়ে যেতে বাধ্য ওসমান চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিমের অসাধারণ অভিনয়ের কারণে। তার গাম্ভীর্য, চাটুকারিতা, চলাফেরা ও মুখভঙ্গী - এক বহুরূপী গডফাদার চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলেছে। ইন্দ্রনীল সেন তার চরিত্রে পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন, তার সুঠাম দেহ, আকর্ষনীয় চেহারা হৃদয়গ্রাহী। কিন্তু শহীদুজ্জামান সেলিমের এই অভিনয়ের কাছে ম্লান হয়ে যায় ইন্দ্রনীল সেনের অভিনয়। জয়া আহসান ভালো অভিনয় করেছেন। মডেল কন্যা সুজানা চরিত্রে পিয়ার অভিনয় খুব আশাব্যঞ্জক নয়, ওসমানের সহযোগী রাসেল চরিত্রে কিছু কিছু অতিঅভিনয় লক্ষ্যনীয়। এটিএম শামসুজ্জামান ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ন চরিত্রে দারুন অভিনয় করেছেন।

চোরাবালি সিনেমার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক এর সিনেমাটোগ্রাফি। টিভি কমার্শিয়ালের সিনেমাটোগ্রাফিতে পরিপক্ক খায়ের খন্দকার সিনেমার প্রায় প্রতিটি দৃশ্যে তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। সকালের দৃশ্যে ওসমানের দালানে এক চিলতে রোদ কিংবা অন্ধকার ঘরে সুমন ও নবনীর দৃশ্যে আলো আঁধারির খেলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ছবিতে বেশ কটি গান থাকলেও আইয়ূব বাচ্চুর 'কেয়ারফুলি কেয়ারলেস' ছাড়া আর কোন গান মনযোগ টানতে সক্ষম হয় নি। বিশেষ করে ভারত থেকে আমদানীকৃত 'আইটেম সং' তার চরিত্রানুযায়ী কাহিনীর সাথে সামঞ্জস্যহীন, শ্রুতিকটু। গানের তুলনায় চোরাবালির আবহ সংগীত অনেক বেশী উদ্দীপক, দর্শককে সিনেমার সাথে একাত্ম হতে বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছে।

এদেশে বানিজ্যিক সিনেমার তালিকায় 'চোরাবালি' তার গুণে-মানে একটি 'ওয়েলমেড' সিনেমা হিসেবে স্থান করে নেয়ার মত সিনেমা। পরিচালকের মতে, চোরাবালি থেকে কেউ একাকী বেড়িয়ে আসে না, কিন্তু পাশে কেউ থাকলে চোরাবালি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। বাংলাদেশী সামাজিক অ্যাকশন সিনেমা চোরাবালির যে আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, রেদোয়ান রনির মত নির্মাতারা হয়তো সেই চোরাবালি থেকে বের করে নিয়ে আসতে পারবেন। কিন্তু চোরাবালিতে উদ্ধারের জন্য নেমে নিজেই নিমজ্জিত হবার আশংকাও কম নয়। সিনেমায় প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টের নামে কুল বডি স্প্রে, রেডিও টুডে এবং মাছরাঙা টেলিভিশনের উৎকট উপস্থিতি, সিনেমার শুরুতেই 'ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর' বাণীর পর সিনেমাজুড়ে অ্যালকোহলের অবাধ ব্যবহার ও প্রদর্শন, বানিজ্যিক উদ্দেশ্য আইটেম সং এর ব্যবহার ইত্যাদি শঙ্কিত করে তোলে। চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার নয়, 'চোরাবালি' হোক চোরাবালি থেকে মুক্তির সিনেমা।

রেটিং: ৪/৫

ছবি কৃতজ্ঞতা: চোরাবালি ফেসবুক পেজ

[তথ্যগত যে কোন সংশোধনী কাম্য। ধন্যবাদ - দারাশিকো]