হেমলক-সোসাইটি-পোস্টার

সৃজিত মুখার্জীর প্রথম সিনেমা 'অটোগ্রাফ' নিয়ে লিখেছিলাম, 'রাজনৈতিক' নামে বর্তমানে বিলুপ্ত এক অনলাইন পত্রিকায় সেটা প্রকাশিত হয়েছিল, তার শেষ কথায় বলেছিলাম - সে যা-হোক, এই সামথিং ইজ মিসিং কাহিনীর মধ্যেই অটোগ্রাফ মাধ্যমে কলকাতার সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে সফল পরিচালক হিসেবে শ্রীজিতের যাত্রা শুরু হয়ে গেল। এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক এই শুভকামনা। আমার শুভকামনাকে সত্যি করে সৃজিত তার তৃতীয় সিনেমা 'হেমলক সোসাইটি' মুক্তি দিয়েছে এবং তার বাকী দুটো সিনেমার মতই এই সিনেমাটিও বেশ আলোড়ন তুলে ইন্ডাস্ট্রিতে তার শেকড় আরও একটু গভীরে প্রোথিত করেছে।

সক্রেটিসের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল হেমলক পানের মাধ্যমে। হেমলক সোসাইটির কাজও আত্মহত্যায় আগ্রহী লোকদেরকে সফলভাবে আত্মহত্যার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান দান করে প্রশিক্ষিত করে তোলা। তিনদিনের ক্রাশ কোর্সে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় আত্মহত্যার বিভিন্ন পদ্ধতির সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা হয় যেন আত্মহত্যার চেষ্টা ব্যার্থতায় পর্যবসিত না হয়। ভারত হল সেই দেশ যেখানে বছরে প্রায় পনেরো হাজার (সূত্র: বিডিটুডেনিউজ) কৃষক দারিদ্র্যের যাতনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে এবং ২০১০ সালের এক হিসেবে ষোল বছরে আত্মহত্যার মোট সংখ্যা আড়াই লাখ (সূত্র: রেডিও তেহরান)। আত্মহত্যার সংখ্যা থেকে আত্মহত্যায় ব্যর্থ লোকের সংখ্যা সম্পর্কে ধারনা করা যায়। সুতরাং, এমন একটি দেশে হেমলক সোসাইটির মত প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি প্রয়োজনের তাড়না। কিন্তু ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হেমলক সোসাইটি সিনেমার প্রতিষ্ঠানের ক্লায়েন্ট দরিদ্র কৃষক নয়, বরং তার একদম বিপরীত প্রান্তে বসবাসকারী উচ্চবিত্ত পরিবারের হতাশাগ্রস্থ চাকুরীজীবী মেয়ে মেঘলা (কোয়েল মল্লিক)। বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেক-আপের রাত্রেই আত্মহত্যার চেষ্টায় সে যখন ঘুমের অষুধ খাবে তখনই হেমলক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আনন্দ কর (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়) তাকে বাঁচিয়ে তার কোর্সে ভর্তি করে নেন।

সৃজিতের এই সিনেমায় স্টোরীটেলিং দুর্দান্ত, অন্তত শুরুর দিকে। মূল গল্পে পৌছুতে কাহিনীকার সৃজিত একটুও দেরী করেন নি। হয়তো এই বেচে যাওয়া সময়ই সিনেমার শেষে গল্পকে অনর্থক দীর্ঘায়িত করেছে - দৈর্ঘ্যে প্রায় পনেরো মিনিট। মেঘলার কোর্স শেষ হবার মধ্যেই যেখানে সিনেমার সমাপ্তি হতে পারতো, সেখানে আনন্দ করের শারীরিক অসুস্থ্যতা গল্পকে আরেকটু দীর্ঘ করেছে, দর্শককে হঠাৎ কোন বাঁক এর প্রত্যাশী করে তুলেছে। দর্শক হিসেবে আমার মনে প্রশ্ন উঠেছে - আনন্দ করের প্রেমে মেঘলার পতন কতটা যৌক্তিক? আনন্দ করকে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত করার প্রয়োজনীয়তাই বা কতটুকু? ব্রেক-আপ হয়ে যাওয়ার তিনদিনের মধ্যেই নতুন একজনের প্রেমে পড়া কি গ্রহনযোগ্য? সর্বোপরি, এই প্রেমের আদৌ কোন প্রয়োজন ছিল কি? সিনেমার শুরুতে আনন্দ কর যে গার্লফ্রেন্ডের কথা উল্লেখ করেছিল, সে গার্লফ্রেন্ড কোথায়? যদি কল্পিতই হয়, তবে জন্মনিরোধক কেনার জন্য ডিসপেন্সারিতে কেন গিয়েছিল আনন্দ কর?

[caption id="" align="aligncenter" width="525"] কোয়েল মল্লিক তার চরিত্রে যতটা সাবলীল ও যোগ্য, কান্নাকাটির দৃশ্যে সে ততটাই অপরিপক্ক। আর পরমব্রতকে তার দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য নির্দ্বিধায় দশে দশ দেয়া যায়।[/caption]

মেঘলা চরিত্রে কোয়েল মল্লিক বেশ ভালো অভিনয় করেছে, কিন্তু শতভাগ নয়। ইমশোনাল (কান্নাকাটি) অংশে তার অভিনয় দৃষ্টিকটু লেগেছে, আরোপিত মনে হয়েছে। শতভাগ উজার করে দিয়ে প্রাণবন্ত অভিনয় করেছে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। দিনকে দিন পরমব্রত নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন। সব্যসাচী চক্রবর্তী যথাযোগ্য অভিনয় করেছেন বটে কিন্তু হেমলক সোসাইটির স্কুলের তাবৎ চিত্রায়ন একে যতটা না স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে তার চেয়ে অনেক বেশী মানসিক রোগীদের আশ্রম হিসেবে ফুটে উঠেছে এবং এর জন্য স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অভিনয়ই দায়ী। মেঘলার বাবা-মা চরিত্রে দীপঙ্কর দে ও রূপা গাঙ্গুলি চমৎকার অভিনয় করেছেন।


সৌমিক হালদারের ফটোগ্রাফিকে ভালো বলবো না মন্দ - সে জ্ঞান এখনো হয় নি। তবে, সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফি গতানুগতিকের বাইরে আলাদা। অবশ্য এই 'আলাদা' সৃজিতের পূর্বের মুভিগুলোর তুলনায় সত্যিই আলাদা, ওটা তার নিজস্ব স্টাইল বলে মনে হয় নি। হয়তো তিনি এখনো এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যাচ্ছেন। ক্লাসরুমের দেয়াল তার সেই চেষ্টাকেই প্রতিফলিত করে।

অবশ্যই বলতে হবে - সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর এবং গানের কথা। 'অটোগ্রাফ', 'বাইশে শ্রাবন' এবং 'হেমলক সোসাইটি' - তিনটি সিনেমারই লিরিক এবং সুর শ্রুতিমধুর - হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। আরও বলতে হবে চিত্রনাট্যের সংলাপের কথা। শব্দচয়ন ও ছন্দ অন্যরকম দ্যোতনা তৈরী করে।

সব মিলিয়ে হেমলক সোসাইটি কেমন? বেশ ভালো। উপভোগ্য। যে বক্তব্য নিয়ে সিনেমাটি নির্মিত তা পুরোপুরি দর্শকের উপলব্ধিতে পৌছে যায়। তুলনামূলক বিচারে 'হেমলক সোসাইটি' অনেক বেশী সফল। 'বাইশে শ্রাবন'-এর গল্পে যে গলদ ছিল তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন সৃজিত, 'হেমলক সোসাইটি'র সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে সৃজিত মুখার্জি-ই কোলকাতার বাংলা সিনেমা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে পারবেন। ইতোমধ্যেই তিনি তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। শুভকামনা তার জন্য।

আমার রেটিং: ৪/৫