নিজেকে অ্যাকশন হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টারত এম এ জলিল অনন্তর তৃতীয় সিনেমা দ্য স্পিড আজই সারা দেশে মুক্তি পেল। অনন্তর প্রথম সিনেমা 'খোজ -দ্য সার্চ' মুক্তির সময় থেকেই এই সিনেমার কথা শোনা যাচ্ছিল। খোঁজ-দ্য সার্চ সিনেমায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও অ্যাকশন দৃশ্যে নতুনত্ব বেশ ভালো লেগেছিল। প্রথম সিনেমার ভিলেন নিনো দ্য স্পিড সিনেমায়ও ভিলেন হিসেবে অভিনয় করবেন বলে ধারনা হয়েছিল - দ্য স্পিড বোধহয় সিক্যুয়েল। তা নয়। সিনেমার ট্রেলার ও গানগুলো শুনতে ও দেখতে ভালো। প্রথিতযশা অভিনেতা আলমগীর এই সিনেমায় ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কাহিনী ও সংলাপের রচয়িতা অনন্য মামুন যার পরিচালিত সিনেমা 'মোস্ট ওয়েলকাম' আগামী মাসেই মুক্তি পাবার কথা রয়েছে। এবং সিনেমাটি চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় আছে 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' খ্যাত পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। এই সবগুলো কারণ 'দ্য স্পিড-ডু অর ডাই' সিনেমাটি দেখার জন্য আমাকে উৎসাহ জুিগয়েছে, আজ তার সমাপ্তি হল। পরিচালক-কাহিনীকার-নায়িকা-ভিলেন-লোকেশন ইত্যাদির পরিবর্তনে দ্য স্পিড অনন্তর প্রথম সিনেমা 'খোজ-দ্য সার্চ'কে ছাড়িয়ে গেলেও বেশীদূর যেতে পারে নি। আরও ভালো করার অসীম সম্ভাবনাকে নষ্ট করেছে গতানুগতিক বাংলা সিনেমার চিন্তাধারার গন্ডি পেরোতে ব্যর্থ হয়েছে দ্য স্পিড।



সিনেমার গল্প এজিআই গ্রুপের কর্ণধার অনন্যকে ঘিরে। তরুন এই ব্যবসায়ী সৎ ও নীতিনিষ্ঠ, পরিবারে আছে পিতৃমাতৃহীন ভাইয়ের ৮-১০ বছরের মেয়ে দৃষ্টি। অনন্যর সততা ও নিষ্ঠা একদিকে যেমন তাকে প্রত্রিকার প্রথম পাতায় স্থান দেয়ার মত সফলতা এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি অসৎ ব্যবসায়ী কিবরিয়া খান সহ অন্যান্য ব্যবসায়ীদের জন্য হুমকী হয়ে দাড়িয়েছে। কিবরিয়া খান তাই অনন্যকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য নানা প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু প্রতিদিনি বিভিন্ন রকম ব্যায়াম ও প্রশিক্ষনে অভ্যস্ত এই ব্যবসায়ীকে পরাস্ত করা সহজ নয়। কিবরিয়া তাই সাহায্য নেয় তার ব্যবসায়িক পার্টনার মাফিয়া সন্ত্রাসী অ্যান্ড্রু'র। অ্যান্ড্র্র্রুর সত্যিকারের পরিচয় সে একজন বাংলাদেশী শ্যুটার। পঁচিশ বছর আগে কোন এক গেমসে অংশগ্রহনের সুযোগে পালিয়ে যায় এবং নিজেকে মাফিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নাম-চেহারা ইত্যাদি পাল্টে নেয়। অন্যদিকে, অনন্যর কোম্পানির জিএম এর ছোট বোন সন্ধ্যা (পারভিন) ইংল্যান্ড থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিঙ এ পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে একই কোম্পানীতে চাকরী নেয়। দৃষ্টি সন্ধ্যাকে খুবই পছন্দ করে এবং অনন্য সন্ধ্যাকে বিয়ে করে। কিন্তু সুখের সংসারে অ্যান্ড্রু হামলা চালায়, তছনছ করে এবং দৃষ্টিকে হত্যা করে। এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্ব শেষ করে কিবরিয়া খানের তৈরী করা যুদ্ধের ময়দানে লড়াই করতে সস্ত্রীক মালয়েশিয়ায় আসে অনন্য - শুরু হয় মালয়েশিয়ান অধ্যায়।

সিনেমার এ পর্যন্ত কাহিনীতে কোন নতুনত্ব নেই। নতুনত্ব রয়েছে এর নির্মানে। ইলিয়াস কোবরা অনন্যকে হত্যার জন্য আক্রমন চালায়, অস্ত্র হিসেবে সে ব্যবহার করে বাজুকা। রাস্তার মাঝখানে দুই পাশে চলন্ত গাড়ির ফাঁক-ফোকরে খালি হাতে লড়াই করে অনন্ত ও ইলিয়াস কোবরা। অনন্য'র বাসা-অফিস-ইন্ডাস্ট্রি বাস্তবসম্মত ভাবে উপস্থাপন গতানুগতিক বাংলাদেশী সিনেমার চেয়ে অনেক উন্নত। বিশেষ করে এফডিসির সেটে তৈরী চিরপরিচিত স্বল্প আসবাবপত্রে সজ্জিত ডুপ্লেক্স বাড়িকে নায়কের বাড়ি আর কারখানার গোডাউনকে অফিস-কারখানা হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে নি পরিচালক। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন লোকেশনে চিত্রায়িত 'আমি রোমিও তুমি জুলিয়েট' গানের চিত্রায়নের জন্যও বাহবা পাওয়া উচিত।

অনন্যকে মালয়েশিয়ায় হত্যার জন্য রীতিমত কম্পিউটারের সাহায্য নিয়ে পরিকল্পনা করে কিবরিয়া খান-অ্যান্ড্রু। তাদের আক্রমনে বুকে গুলিবিদ্ধ হয় অনন্য, অপহৃত হয় স্ত্রী সন্ধ্যা। কিবরিয়া খান-অ্যান্ড্রু তার স্ত্রীকে এমন একটি কাচ-সদৃশ ঘরে আবদ্ধ করে যেখানে মাত্র পাঁচ দিনের অক্সিজেন রয়েছে এবং যা প্রতিনিয়তই কমছে। পাঁচজনের আইকন্টাক্টেই এই ঘর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কিবরিয়া গঙ তাই একটি হাতঘড়ি পাঠায় অনন্যকে যেন অনন্য শেষ চেষ্টা অন্তত করতে পারে। সিনেমার এ পর্যায়ে অনন্য সহায়তা পায় মালয়েশিয়ান তরুনী ক্রিস্টিনার এবং স্ত্রীকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে চলে।

অ্যাকশন সিনেমার বৈশিষ্ট্য অনুসারে এই অধ্যায়েও বেশ কিছু অ্যাকশন দৃশ্য রয়েছে যার প্রায় সবগুলোতেই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার গুরুত্ব পেয়েছে। ভিলেনের তালিকায় মালয়েশিয়ান, আফ্রিকান বডিবিল্ডাররা যুক্ত হয়েছে, কিবরিয়া গঙ এর আমোদ-প্রমোদে এসেছে বেলী ড্যান্সার। ছবির মত শহর মালয়েশিয়ার বিভিন্ন লোকেশনে আরও একটি গান বেশ উপভোগ্য এখানে।

সব মিলিয়ে দ্য স্পিড খুব নতুন কিছু যোগ করতে পারে নি। সিনেমার প্রাণ গল্প আর অভিনয়ের ফাঁক-ফোকর অ্যাকশন দৃশ্য আর গাড়ি-স্পিডবোট উড়িয়ে দিয়ে পূরণ করা যায় না। বাংলাদেশী বাণিজ্যিক সিনেমার পুরানো রূপই নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে এই সিনেমায়। ব্যবসায়িক কর্মকান্ড, প্রতিদ্বন্দ্বীতা, পরিবার ও সংসার ইত্যাদি যথাযথ গুরুত্বেবে অভাবে ভারসাম্যহীনভাবে এগিয়েছে। অনন্ত তার তৃতীয় সিনেমায় প্রথম সিনেমার তুলনায় খুব বেশী উন্নতি করতে পারে নি। শুধু আকর্ষনীয় চেহারা নয়, সিনেমায় সংলাপ সফলভাবে বলাটাও সিনেমায় সাফল্যের অন্যতম উপকরণ। পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান এই সব দিক থেকেই বেশ হতাশ করেছেন। গতানুগতিক বাংলা সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি তিনি। গানগুলোর প্রতিস্থাপন যথাযোগ্য নয় যদিও চিত্রায়ন বেশ আকর্ষনীয়। গল্প ও অভিনয়ের বিশাল খানা-খন্দের জন্য দ্য স্পিড সিনেমার সাধারণ মানের সিনেমা থেকে ভালো কিছু হতে পারে নি। বাংলাদেশী সিনেমাকে পাল্টে দেয়ার যে উদ্যোগ অনন্ত নিয়েছেন তার জন্য তাকে সাধুবাদ, একই সাথে প্রত্যাশা এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শুধু কারিগরী প্রযুক্তিই প্রয়োজন নয়, মানসম্মত গল্প ও অভিনয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়েও এগিয়ে আসা উচিত।

অভিনেতা অনন্ত'র জন্য কিছু পরামর্শ:

১. স্বাস্থ্যের প্রতি যত্ন নিন। অ্যাকশন হিরোদের পেশীবহুল শরীর হতে হয়, চর্বিবহুল নয়। পেশীবহুল শরীর তৈরীর পূর্ব পর্যন্ত টাইট টি-শার্ট আপনার জন্য নয়।

২. অভিনয়ের দিকে মনযোগ দিন। বিশেষ করে এক্সপ্রেশনের দক্ষতা অর্জন করুন। যদি দু:খী এক্সপ্রেশন ডেলিভারী দিতে না পারেন, তবে গল্প থেকে এই ধরনের দৃশ্য ছাটাই করুন।

৩. ডায়লগ ডেলিভারী দেয়ার ব্যাপারে আপনাকে আরও দক্ষ হতে হবে। আপনার সংলাপ আপনাকে অ্যাকশন হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বাধা দিচ্ছে বারংবার।

৪. সংলাপে ইংরেজি শব্দ রাখবেন না। যদি রাখতেই হয়, তবে এমন শব্দ রাখুন যা উচ্চারনে আপনার ভুল হয় না। অ্যাকশন সিনেমার হিরো-র সফলতার জন্য এটা খুবই জরূরী।

৫. আপনার সিনেমায় আপনার পাশাপাশি অন্য নায়কদেরও উঠে আসার সুযোগ করে দিন। ইন্ডাস্ট্রি আপনাকে মনে রাখবে অনেক দিন।

ধন্যবাদ।

দৈনিক সমকাল ১৭ মে তারিখে সম্পাদিতরূপে এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে।