[caption id="attachment_3177" align="aligncenter" width="336"]ji-hujur-fim-by-zakir-hossain-raju-with-saimon-sadik জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত জ্বী হুজুর সিনেমার পোস্টারে সাইমন সাদিক (ছবি: বিএমডিবি)[/caption]

জ্বী হুজুর সিনেমা দেখার আগ্রহ তৈরী হয়েছে এর পোস্টার দেখে। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা, মাথায় টুপি আর মুখে সুন্দর শশ্রুমন্ডিত এক সুদর্শন যুবকের অ্যাকশন দৃশ্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল সপ্তাহ দুয়েক আগে। একই সিনেমার আরেকটি পোস্টারেও এই যুবকের ছবি প্রাধান্য পেয়েছে যেখানে কালো রং এর কাবলী, মাথায় কালো পাগড়ী পরিহিত তরুনের হাতে একটি একে-৪৭ বন্দুক। একে অপরিচিত, তার উপর শাকিব খানের আধিপত্যের সময়ে এরকম সুশ্রী নায়ক সিনেমার পোস্টারে দেখে আগ্রহ তৈরী হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রথম আলোর বিনোদন পাতায় সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া কাহিনীকার-চলচ্চিত্রকার জাকির হোসেন রাজুর সাক্ষাতকার থেকে জানা গেল 'জ্বী হুজুর' তারই পরিচালিত সিনেমা এবং এ সিনেমায় তিনি বেশ পরিকল্পনা করে নতুন ধরনের গল্পে নতুন এক ঝাক মুখ হাজির করার চেষ্টা করেছেন।

আগ্রহ থেকেই সন্ধ্যা সাড়ে ছ'টার শো-তে 'জ্বী হুজুর' দেখা হল। জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত এই সিনেমার চিত্রনাট্যকারও তিনি। গল্পের প্রধান চরিত্র মাদ্রাসা থেকে দাখিল-আলীম-ফাজিল পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে পাস করা আবদুর রহমান। তার বাবা সারাজীবন একজন সৎ মানুষ হিসেবে সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। বাবার মৃত্যুর পরে আবদুর রহমান জীবিকার সন্ধানে সে ঢাকা শহরে এসে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, বাবার বাল্য বন্ধুর বাড়িতে থাকার সুযোগ পায়। এই বাড়ির-ই দুই মেয়ে বান্টি আর বাবলি, পোষাকে আশাকে আধুনিক, আচার-ব্যবহারে ধনীর দুলালী। তাদের বিদ্রুপ আর দুষ্টামীর শিকার হয় আবদুর রহমান, মেয়েদের পোশাকে হয় বিব্রত।

ভিন্ন এক গল্পে সৎ পুলিশ অফিসার এসপি সুজনের পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেয় আরেক সৎ ও দেশপ্রেমিক যুবক এসআই ফারুক। কানা সেলিম নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার এবং ক্রসফায়ারে হত্যার ফলে সন্ত্রাসী বাহিনীর আক্রমনে দিনে দুপুরে খুন হয়ে যায় এই যুবক। ঘটনাচক্রে এই হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যতম প্রধান সাক্ষী হয়ে যায় আবদুর রহমান। সাক্ষীকে পৃথিবীকে সরিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায় একের পর এক আক্রমন হতে থাকে আবদুর রহমানের উপর। সাধ্যমত প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে আবদুর রহমান।

[caption id="" align="aligncenter" width="320"] বন্দুক হাতে আবদুর রহমানের এই দৃশ্য শুধু পোস্টারেই দেখা যাবে, সিনেমায় নয়[/caption]

এ ধরনের একটি গল্পে শেষটা সম্পূর্ণই ভিন্নরকম। আবদুর রহমানকে সমাজের জন্য একটি আদর্শ ও অনুসরনীয় চরিত্র হিসেবে তৈরী করেছেন জাকির হোসেন রাজু। এই চরিত্র নির্মানে তাই তিনি বেশ সচেতনতার সাথে সকল নেতিবাচক দিক এড়িয়ে গিয়েছেন। দেশপ্রেম এবং সততার উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করে সিনেমার কাহিনীকে এগিয়ে নিয়েছেন পরিচালক। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এদেশের সিনেমার দর্শক হলেও সিনেমার গল্পে তারা সবসময়ই উপেক্ষিত ছিল। সম্ভবত এই প্রথম দেশের জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদেরকে সিনেমার প্রধান চরিত্রে ভালোভাবে উপস্থাপন করা হল। এছাড়া, ঐতিহ্যগতভাবেই দাড়ি-টুপি পরিহিত চরিত্রগুলো সাধারণত কমেডি নির্ভর কিংবা অপরাধপ্রবণ হয়। ফলে, ঘটক কিংবা মুখোশধারী শয়তানের ভূমিকায় চরিত্রায়নের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মপ্রাণ মানুষের প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরী করতেও সহায়তা করেছে। 'জ্বী হুজুর' এই দিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি সিনেমা। এবং নিজ নিজ ধর্ম যথাযথভাবে পালনের অনুপ্রেরণা এই সিনেমা থেকে গ্রহণ করা সম্ভব বলে মনে হয়েছে। তবে, আবদুর রহমান চরিত্রে সাইমন সাদিক-কে খুজে বের করার জন্য পরিচালক বিশেষ ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। প্রথম সিনেমা হিসেবে সাইমন সাদিক বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। অবশ্য তার চরিত্রকে আরোও একটু জড়তামুক্ত করার সুযোগ ছিল এবং করা হলে আরও বেশী গ্রহনযোগ্য হত। এসআই ফারুক চরিত্রে জেমি বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। তার স্মার্ট প্রাঞ্জল অভিনয় সিনেমায় তার স্বল্প সময়ের উপস্থিতিকে স্মরনীয় করেছে।

বান্টি চরিত্রে নবাগত নায়িকা সারা জেরিন মোটামুটি অভিনয় করেছে। তার চরিত্রটি আবদুর রহমান চরিত্রের কারণে খুব বেশী বিকশিত হবার সুযোগ পায়নি। গল্প গঠনের জন্য বরাদ্দকৃত সময়ের তুলনায় সমাধান বেশ ভারসাম্যহীন এবং অপরিকল্পিত। প্রধান ভিলেন চরিত্রটি গঠন এবং অভিনয় আরও রসদ দাবী করে। কিন্তু এই সব দুর্বলতাকে ছাপিয়ে উঠেছে সিনেমার মজবুত সংলাপ এবং প্রধান চরিত্র আবদুর রহমানের উপস্থিতি, তার অভিনয় এবং পাজামা-পাঞ্জাবী-টুপিতে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো। আবদুর রহমান চরিত্রটি এখানে মেদহীন বাস্তব।

সব মিলিয়ে 'জ্বী হুজুর' গতানুগতিকের বাইরে বেশ ভালো উপভোগ্য সিনেমা। শিল্পী সংকটের এই সময়ে জাকির হোসেন রাজু যে সাহসিকতার সাথে এক ঝাক নতুন মুখ নিয়ে 'জ্বী হুজুর' তৈরী করেছেন তার জন্য তিনি ধন্যবাদ প্রাপ্য। দর্শকরা কেমন ভাবে গ্রহণ করেছে তা জানার আগ্রহে কথা বলেছিলাম কয়েকজনের সাথে। কেউই বিরূপ মন্তব্য করেনি। শাকিব খানের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে কি সাইমন সাদিক? একজন সরলমনে বললেন - শাকিব খান তার প্রথম সিনেমায় এত ভালো কাজ করে নি। শুনে আশার সঞ্চার হল অন্তরে। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নে নতুন নতুন অভিনেতারা এগিয়ে এলে উন্নতি ত্বরান্বিত হবে। জাকির হোসেন রাজুর আবিস্কার সাইমন সাদিক যেন খুব শীঘ্রই বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে সফল এবং পরিচিত মুখ হিসেবে জায়গা করে নিতে পারেন সেই শুভকামনা।