১.

বিশ টাকা দামের টিকিটে সিনেমা দেখার জন্য আমি পনেরো টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে যখন টিএসসি পৌছুলাম তখন মোবাইলের ঘড়িতে ১.৩০পিএম। দেড়টায় সিনেমা শুরু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সে জন্যই রিকশা নিয়ে তাড়াহুড়ো করে আগমন, কিন্তু দেখা গেল, দেড়টায় অপেক্ষামান দর্শককে সারি করে দাড়ানোর নির্দেশ পাওয়া গেল। সারির শেষ মাথায় গিয়ে দাড়ালাম। আমার মানিব্যাগের কোনায় ভাজ করে রাখা আমার ভাষার চলচ্চিত্রের তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় অধিবেশনের একটি টিকিট, সিনেমার নাম 'জাগো'।

গতকালকে এসেছিলাম আবু সাইয়ীদ পরিচালিত 'কীত্তনখোলা' দেখার জন্য। সিনেমা শুরু হবার আগে পরবর্তীতে দেখানো হবে এমন সিনেমাগুলোর ট্রেলার দেখানো হচ্ছিল। 'জাগো' সিনেমার ট্রেলার দেখতে দেখতে চোখে পানি চলে এল - দেখবো সেরকম একটা ইচ্ছা আগেই ছিল, এবার পাকাপোক্ত হল। 'কীত্তনখোলা' দেখার পরেই 'জাগো'র অগ্রিম টিকিট কিনে ঘরে ফিরেছিলাম। আজ সেই টিকিট নিয়ে আমি দর্শক সারিতে।

টিএসসি সিনেমা দেখােনার জন্য ভালো জায়গা নয়। সাদা যে পর্দার উপর প্রজেকশন করা হয় সেটা নিভাঁজ নয়, ৭/৮ সারি পেছনে বসলে পর্দা আর দর্শকের মাঝে ঝুলন্ত ফ্যান জায়গা দখল করে নেয়, সেই সাথে সামনের সারির মানুষের মাথা তো আছেই। গত কয়েকবছরে সিনেমা দেখে এই সব সমস্যা সম্পর্কে আমি অবগত, সুতরাং দেখার জন্য আমি চতুর্থ সারিতে একদম মাঝামাঝি বসলাম। অন্ধকারের মধ্যে ছোট ভাই মুকিত আমাকে কিভাবে যেন খুজে বের করে পাশে এসে বসল। কিন্তু সিনেমা শুরুর আগে পরবর্তী সিনেমাগুলোর ট্রেলার যখন দেখাচ্ছিল তখন এক কাপল এসে ঠিক আমাদের সামনের সারিতে বসল। তাদের মাথা দৃষ্টিকে বাধাগ্রস্থ করছে বলে মুকিত পাশে একসিট সরে বসল। সামনের কাপল জড়াজড়ি করে এক হয়ে গালে গাল মিশিয়ে সিনেমা দেখতে বসল। আমি গালি দিলাম - 'শূয়োরের বাচ্চা', এদের জন্য আজকে সিনেমাটা উপভোগ্য হবে না।

২.

ফেরদৌস কুমিল্লা একাদশের ফুটবল খেলোয়ার, পাড়ার ছেলেদের সাথে তার বেশ ভালো সম্পর্ক, ছোটভাইয়ের মতই। কুমিল্লা একাদশের ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হওয়া ফেরদৌসকে খেলতে হবে ত্রিপুরা একাদশের বিরুদ্ধে। গত দশবছর ধরে প্রতি দুই বছরে একবার এই খেলা হয়, এবং প্রতিবারই কুমিল্লা একাদশ হারে - ফেরদৌসের বিশ্বাস এইবার কুমিল্লা একাদশই জিতবে। ছেলেরাও এই বিশ্বাসই করে। ফেরদৌসের উপর তাদের আস্থা অনেক।

বিবাহিত ফেরদৌসের বউ বিন্দু খেলাধুলা তেমন পছন্দ করে না, তাই বলে স্বামীর খেলাধূলায় খুব বাধও সাধে না। দুজনের প্রেমময় সম্পর্ক। সেই সম্পর্ক বোঝা যায় সকাল বেলার খুনশুটিতে। বিন্দু আর ফেরদৌসকে মিলে শুরু হয় গান - রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টি, কি অনাসৃষ্টি .. । আমার সামনের কাপল এর মাঝে বেশ কবার ভাদ্র মাসের কুত্তার মতো সবার সামনেই লীলাখেলা শুরু করেছে - গালে গাল ঘষাঘষি শেষে চুমাচুমিতে যাওয়ার পর আমার আর সহ্য হল না। রাগে গা জ্বলছে, ইচ্ছে করছে দুজনের মাথা দুটো নারকেলের মতো ঠুকে দিয়ে ফাটায়া দিই। 'এক্সকিউজ মি, আপনারা সরেন এইখান থেকে - আপনাদের জন্য ডিস্টার্ব হচ্ছে। পাব্লিক প্লেসে এসে এইসব যা করতেছেন তা কিছুতেই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না' - দুজনেই সরে বসল। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম ছেলেটা যেন প্রতিবাদ করে। করলেই আমি তার মুখে একটা ঘুষি লাগাবো এবং আমার বাশের মত গলায় চিৎকার করে সিনেমা বন্ধ করে এই দুইটা হারামজাদাকে এইখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করবো। বোঝাই যাচ্ছে এইগুলা ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রী না, সুতরাং প্রতিবাদ করবে সেই সাহস এদের থাকার কথা না। বান্ধবীর পেছন থেকে হাত সরিয়ে ভদ্র ছেলের মতো বসল ছেলেটা। আমি আবার সিনেমায় মনযোগ দিলাম।

৩.

ছেলেদের মধ্যে জয় হল কিছুটা মেয়েঘেষা। পাড়ার সব মেয়েরাই তার প্রেমিকা - এই নিয়ে বন্ধুদের রসিকতাও কম না। এরকমই একদিন হঠাৎ জানা গেল কুমিল্লা একাদশ প্র্যাকটিসে যাওয়ার সময় এক্সিডেন্ট করেছে। ফেরদৌসের বাড়ির সামনে খাটিয়ায় লাশ সাজানো, ভেতর বাড়িতে মায়ের আহাজারি, স্ত্রী বিন্দুর স্থবিরতা, ভক্ত ছেলেগুলা কান্নাকাটি করছে, লাশ নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলে ফেরদৌসের মা ছুটে এসে ফেরাতে চাইলেন, অন্যান্য মহিলারা তাকে বাধা দিল, পাড়ার ছেলেরা লাশ কাধে নিয়ে কাদতে কাদতে রওয়ানা হল - তাদের সাথে যোগ দিয়ে আমিও কাদতে লাগলাম। কত কত সিনেমা দেখেছি, চোখে পানি চলে এসেছে এমন সিনেমাও আছে, কিন্তু এমন পরিস্থিতি কখনো হয়নি।

৪.

কুমিল্লা একাদশ দুর্ঘটনায় পড়ায় ম্যাচ বাতিল হল। ত্রিপুরা একাদশের অধিনায়ক অপমানজনক কথা বললেন পত্রিকার সাক্ষাতকারে। ছেলেরা সিদ্ধান্ত নিল কুমিল্লা একাদশের হয়ে তারা খেলবে। ম্যানেজারকে রাজী করানো হল। তিনি বললেন কোচ হিসেবে সাফু ভাইকে নেয়ার কথা। কিন্তু সাফু ভাই গত ৪ বছর ধরে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে মুদি দোকানদারী করছেন। ম্যানেজার তাকে রাজী করানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। সাফু ভাই ফেরদৌসকে দেখতে গেলেন - তার মনে পড়ে গেল ৩৭ বছর আগের কথা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের একজন সদস্য ছিলেন তিনি। দেশের হয়ে খেলেছেন। পরেরদিন মাঠে এসে ম্যানেজারকে বললেন - আমার একটা স্টপ ওয়াচ লাগবে। বুকের ভেতর থেকে একদলা কান্না আমার চোখে চলে এল। মনে হচ্ছে আমিই যেন একজন কোচ পেয়ে গেলাম। এইবার ত্রিপুরা একাদশকে দেখায়ে দিবো, আমাদের সাথে আছেন সাফু ভাই।

আমি রুমাল দিয়ে আড়ালে চোখ মুছে ফেললাম।

৫.

ট্রেনিং চলছে। সাফু ভাই আমাদের বললেন, কুমিল্লার সম্মান রক্ষার্থে আমরা খেলতে নেমেছি, কিন্তু এ খেলা শুধু কুমিল্লার জন্য নয়। এ খেলা দেশের। দেশের জন্য ছোট ছোট বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে দেশের জন্য লড়তে হবে। সাফু ভাইয়ের কথায় আমার বুকের ভেতর দামামা বাজতে লাগল। এই দেশটা তো আমারই, এই দেশটাকে ভালো না বেসে কাকে ভালোবাসবো। আমার সামনের কাপলটা উঠে গেছে কিছু সময় আগে। দেশকে ভালোবাসার চেয়ে অপরকে ভালোবাসার তাড়নায় তারা দুজন উঠে গেছে, আমরা যাই নি, আমরা বসে আছি, আমাদের ছেলেরা খেলবে ত্রিপুরার সাথে, আমরা আমাদের ছেলেদের সমর্থন করবো। এটাই আমার দেশপ্রেম, এর কাছে ব্যক্তিপ্রেম খুবই তুচ্ছ। আমি মনে মনে গর্বিত বোধ করলাম।

৬.

দুটো ম্যাচ খেলবে কুমিল্লা একাদশ এবং ত্রিপুরা একাদশ। মাঠে নামল দুই দল। আমাদের ছেলেরা মাত্র এক মাসের প্রশিক্ষন নিয়েছে কক্সবাজার সি-বিচে। আজ তার পরীক্ষা। মাঠভর্তি দর্শক। ত্রিপুরা একাদশ যেন ত্রিপুরা একাদশ নয়, ত্রিপুরা হল ভারত। কুমিল্লা একাদশ শুধু কুমিল্লা নয়, কুমিল্লা একাদশ মানে বাংলাদেশ। ত্রিপুরার সম্মানে জাতীয় সংগীত বাজানো হল। তারা বুকে হাত দিয়ে সম্মান জানালো। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত শুরু হতে না হতেই উঠে দাড়ালাম - আমি একা নই, টিএসসির অডিটোরিয়াম ভর্তি শত শত দর্শক দাড়িয়ে পড়ল। আমাদের জাতীয় সংগীত। আমাদের পতাকা। আমি বোকার মত সোজা দাড়িয়ে থেকে ভ্যা করে কাঁদতে থাকলাম।

৭.

দুটো ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ ত্রিপুরার সাথে। প্রথম ম্যাচে ৫-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে দর্শক নেই গ্যালারীতে। খোদাবক্স মৃধা তার ধারাভাষ্য দিয়ে যাচ্ছেন বিরামহীনভাবে। নতুনভাবে উজ্জীবিত ছেলেরা আজ মাঠে নেমেছে। খেলা শুরু হতে না হতেই বাংলােদশ বলের দখল নিয়ে নিল। তারপর দেখতে দেখতে সেই বল পাঠিয়ে দিল ভারতের জালে। আমি গলাফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলাম - গোওওওল, গোল গোল। সর্বশক্তি দিয়ে দুই হাতে তালি দিচ্ছি - একা নই। আরও দর্শক আছে আমার সাথে। তারাও চেচাচ্ছে। এই গোলটা সিনেমার না, এই গোলটা বাংলাদেশের এই গোলটা আমাদের। আনন্দে আমার বুক ধরফর করতে লাগল।

৮.

বাজারে এক মাছওয়ালা মাছ নিয়ে বসে আছে। তিনশো টাকার মাছ আড়াইশো টাকা দরে সে বেচে দিল। পাশের মাছওয়ালা বলল - এত সস্তায় দিলি? মাছওয়ালা বলল - আজকে খেলা আছে না? মাছ জীবনে অনেক বেচতে পারবো, কিন্তু এই খেলা বারবার আসবে না। অামার গলা দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে এল - সাব্বাশ!

৯.

ট্রাইবেকার চলছে। বাংলাদেশ ১, ভারত ৩। আমাদের গোলকিপার ছেলেটা কুচকুচে কালো, সামনে উচু দাত। এই খেলায় জিততে হলে তাকে এই গোলটা ঠেকাতেই হবে। আমি জানি সে ঠেকিয়ে দেবে, সিনেমার নিয়মই এটা। কিন্তু মন মানে না। আমি বিরবির করে বললাম - ঠেকায়ে দে শালা! ত্রিপুরার খেলোয়ার কিক নিল। আমাদের গোলকিপার ছেলেটা উড়ে গিয়ে সেই বলটাকে ঠেকিয়ে দিল। আমি আনন্দে অডিটোরিয়াম ফাটিয়ে চিৎকার দিলাম - ওওওওও .....

১০.

সর্বশেষ কিক। এই কিকেই নির্ধারিত হয়ে যাবে জয় পরাজয়। একটা জয় আমাদের দরকার। এই জয়টা শুধু ফুটবলে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে কুমিল্লা একাদশের বিরুদ্ধে জয় নয়। এই জয়টা ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, এই জয়টা কাটাতাের ঝুলন্ত ফেলানীর জন্য, এই জয়টা ফারাক্কা বাধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মরূভূমি করার পদক্ষেপের বিরুদ্ধে, এই জয় তিস্তা বাধ, টিপাইমুখ বাধের বিরুদ্ধে, এই জয় ভারতের সমগ্র আগ্রাসী থাবার বিরুদ্ধে। খোদাবক্স মৃধা তার চিরপরিচিত কন্ঠে ধারাভাষ্য বর্ণনা করে যাচ্ছেন, খেলায় টানটান উত্তেজনা। রেফারীর বাশি সেই উত্তেজনাকে শতগুনে বাড়িয়ে দিল - আমাদের ছেলেটা দৌড়ে এসে বলে কিক করলো - আর সেই বলটা সমগ্র বাংলাদেশের চৌদ্দকোটি জনতার আবেগ, শক্তি আর প্রত্যাশা নিয়ে আগুনগোলা হয়ে বিশালাকৃিতর ভারতকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়ে গোলপোস্টে ঢুকে পড়ল। আমি আবারও আমার সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করলাম - গোওল .......। খোদাবক্স মৃধা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে একটা দলের বিজয়গাথা বর্ননা করে যাচ্ছেন, আমাদের ছেলেরা মাঠে দৌড়াচ্ছে, তাদের হাতে পতাকা। একটা জয় - অনেকদিন বাদে আমাদের একটা জয়। এই জয় প্রমাণ করে দিচ্ছে - আমরাও পারি, আমরাই পারি। দরকার শুধু একটি দলবোধ, দরকার নিষ্ঠা, দরকার ব্যক্তিপ্রেমকে ছাপিয়ে দেশপ্রেমের উদয়। যে এগারোটা ছেলে মাঠ দাপিয়ে আমাদের একটি জয় এনে দিয়েছে সে আর কেউ নয় - সে আমিই, আমরাই।

বুকভরা আনন্দ আর তৃিপ্ত নিয়ে রুমালটা মুখে চেপে ধরে অডিটোরিয়ামের গাঢ় অন্ধকারে আমি শিশুদের মতো বুকের গভীর থেকে তুলে এনে ডুকরে ডুকরে কাদঁতে থাকলাম।