[caption id="" align="alignleft" width="273" caption="ভারতীয় সিনেমা আমদানী কি সত্যিই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন ঘটাবে?"][/caption]

দীর্ঘ ৩৮ বছর পর গত ২৩শে ডিসেম্বর থেকে ঢাকা এবং নারায়নগঞ্জের ৯টি সিনেমাহলে 'জোর' নামের ভারতীয় বাংলা সিনেমা 'চলিতেছে'। 'সগৌরবে' চলিতেছে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বিভিন্ন পত্রিকার ভাষ্যমতে দর্শক সমাগম 'আশানুরূপ'  নয়। গত তিন মাস ধরে এই ভারতীয় সিনেমা আমদানীর বিপক্ষে যে পরিমান আন্দোলন এবং প্রতিবাদ চলমান, তাতে প্রথম আমদানীকৃত ভারতীয় সিনেমার নামটি 'জোর' হিসেবে যথার্থ, কারণ জোর জবরদস্তি এবং সরকারের জোর নির্লিপ্ততা ব্যতীত এই সিনেমা বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ ছিল না।


বিতর্কের সূত্রপাত গত ২০১০ সালের ২৩শে এপ্রিল যখন বাণিজ্যমন্ত্রী কর্ণেল (অব:) ভারতীয় সিনেমা আমদানীর উপর নিষেধাজ্ঞা যা স্বাধীনতার পর থেকেই বহাল তা তুলে নেয়ার কথা জানান। এর যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচানোর জন্যই ভারতীয় ছায়াছবি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভারতীয় সিনেমার আমদানী নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ১৯৬৫ সলে পাক ভারত যুদ্ধের সময়। শুধু পূর্ব পাকিস্তান নয়, পশ্চিম পাকিস্তানেও ভারতীয় সিনেমার প্রদর্শন বন্ধ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু প্রদর্শক ভারতীয় সিনেমা আমদানীর অনুমতি প্রার্থনা করলে আবদুল জব্বার খান, খান আতা, ইআর খান, আলমগীর কবির, কাজী জহিরের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনুরোধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্প রক্ষার জন্য ১৯৭২ সালে বিদেশী সিনেমা আমদানী বন্ধ করেছিলেন। পরবর্তীতে ইংরেজী সহ অন্য ভাষার সিনেমা আমদানীর অনুমতি প্রদান করা হলেও ভারতীয় সিনেমা আমদানীর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয় একই কারণে।




[caption id="" align="alignleft" width="330" caption="ভারতীয় সিনেমা আমদানীর বিপক্ষে প্রতিবাদ হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন ফলাফল হয়নি। ছবি: রাজণৈতিক.কম"][/caption]

বানিজ্যমন্ত্রীর ঘোষনার পরে সেই সময় সিনেমার প্রযোজক-পরিচালক সমিতি এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষনা দেন, প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করে আমদানি নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার অনুরোধ করেন। তাদের সাথে সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদে অংশগ্রহন করেন, অবশ্য এই প্রস্তাবের পক্ষে কথা বলেছেন এমন গুনী ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যেমন লেখক-পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ। সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট ২৫,০০০ লোকের কর্মসংস্থান বিলোপের আশংকা অবশ্য শেষ পর্যন্ত দূর হয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে, তিনি বানিজ্যমন্ত্রীকে তিরস্কার করেন এবং প্রস্তাব বাতিলের নির্দেশ দেন। হাইকোর্ট ও এই নির্দেশের সপক্ষে রায় প্রদান করেন। প্রদর্শকরা এই রায়ের বিপক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করেন এবং উচ্চ আদালত তার রায়ে ভারতীয় ছবি আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করার আগে যে ছবিগুলোর জন্য এলসি করা হয়েছিল সেই তিনটি ছবিকে অনাপত্তিপত্র দেওয়ার নির্দেশ দেন। অনাপত্তিপত্র প্রাপ্ত তিনটি সিনেমা হল জোর, বদলা এবং সংগ্রাম। আশংকাজনক সংবাদ হল - থ্রি ইডিয়টস, মাই নেম ইজ খান, তারে জমিন পার, রং দে বাসন্তী, দাবাং, ম্যায় হুঁ না, কাভি আল বিদা না কেহনা, ওম শান্তি সহ মোট ৯টি সিনেমা এই তালিকায় আছে যা শীঘ্রই অনাপত্তিপত্রের জন্য আবেদন করা হবে।


বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বোধহয় বর্তমানে সবচে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দেশে ১৯৯০-৯১ সালে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২৩০টি, ২০১০ সালে এই সংখ্যা নেমে এসে দাড়িয়েছে ৭৪২-এ। ঢাকার ৪৪টি সিনেমা হলের মধ্যে এখন আছে ৩৩টি, এগারোটিকে গুড়িয়ে দিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল অট্টালিকা। গুলিস্তান, শ্যামলী, নাজ, লায়ন, স্টার, শাবিস্তান, তাজমহল সিনেমা হারিয়েছে অনেক আগেই। এই দুরাবস্থা দেখে সিনেমাহলগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতীয সিনেমা আমদানীর পরামর্শ দিচ্ছেন বোদ্ধারা। আবার বিপক্ষেও মতামত পাওয়া যাচ্ছে। ভারতীয় সিনেমা আমদানীল বিপক্ষে আন্দোলন করছেন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সাথে জড়িত কলাকুশলীরা, তাদের সাথে যোগ দিয়েছে বাম মানসিকতার বুদ্ধিজীবিরা এবং ভারতের আগ্রাসন বিরোধীরা। মানববন্ধন সহ অন্যান্য কর্মসূচী পালন হয়েছে। সিনেমার প্রযোজক-পরিচালকরা হুমকী দিয়েছেন যেসকল সিনেমাহল ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন করবে তাদেরকে ভবিষ্যতে বাংলা সিনেমা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়া হবে না। প্রদর্শকরাও পাল্টা হুমকী দিয়ে বলেছেন যে, প্রয়োজনে তারা ইংরেজি সিনেমা আমদানী করে প্রদর্শন করবেন। দুই পক্ষের এই হুমকী যে নিস্ফল আক্রোশ থেকে সৃষ্ট সেটা বোঝা যায়, কারণ যে সকল সিনেমাহল ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন করছে তারাই বাংলাদেশী সিনেমার প্রধান ক্রেতা, সিনেমাহলগুলোর মধ্যে তাদের অবস্থাই অধিকতর ভালো। কাহিনী আর অভিনয়ের দুরাবস্থা নিয়েও বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে বছরে ১০০টি সিনেমা মুক্তির ইতিহাসও আছে। গত এক দশকের তুলনায় ২০১০ সালে নির্মিত সিনেমার সংখ্যা সবচে কম, মাত্র ৬৩টি। ভয়াবহতার এই শেষ নয়, ২০১১ সালের প্রথম ছয় মাসে, জানুয়ারী থেকে জুন মাস পর্যন্ত মুক্তি পেয়েছে মাত্র ১৯টি সিনেমা, বিনিয়োগকৃত টাকার পরিমান মাত্র ৩০ কোটি টাকা।সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদে জানা গেছে এ বছরে মোট মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা দাড়াবে ৪৫-এ এবং আগামী বছরে সম্ভাব্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা মাত্র ৩০টি। সুতরাং, ৯টি সিনেমাহল সিনেমা প্রদর্শন না করলে ক্ষতিগ্রস্থ দুপক্ষই হবে, প্রযোজক তার লগ্নি তুলে আনতে ব্যার্থ হবে, সিনেমাহলগুলোও ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে।


যারা ভারতীয় সিনেমা আমদানীর পক্ষে কথা বলেছেন তারা যে সকল যুক্তি প্রদর্শন করেছেন তার মধ্যে সিনেমাহলগুলোকে বাচিয়ে রাখা এবং উন্নয়ন, সিনেমা পরিচালকদের আরও উন্নতমানের সিনেমা নির্মানে উৎসাহিত করা, দর্শকদের ভালো সিনেমা দেখার সুযোগ তৈরী করে দেয়া ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ন। এই পক্ষ একটি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির সাথে জড়িত সকল পক্ষকে বিবেচনায় রেখে সিনেমার আমদানীল কথা হয়তো বলছেন না। মোটাদাগে একটা সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রির মতোই চারটি অংশ রয়েছে।


১. কারখানা যেখানে সিনেমা নির্মিত হয় - এফডিসি


২. পণ্য - সিনেমা


৩. বিক্রেতা - সিনেমাহলসমূহ


৪. ক্রেতা - সিনেমার দর্শক


প্রত্যেকেটা অংশই একটি ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নে বেশ গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। এদের একটির অভাবে অন্যটি ঠিকমতো চলতে পারে না এটা সত্যি কিন্তু কারখানা ব্যতীত বাকী সকল পক্ষই বেকার অবস্থায় বসে থাকতে বাধ্য। এফডিসি যদি না থাকে তবে সেখান থেকে ভালো মানের সিনেমা নির্মান হওয়ার সম্ভাবনা আরও কমবে, এবং সিনেমা নির্মান না হলে সিনেমাহলের বিক্রেতারা পণ্যের অভাবে বিক্রি বন্ধ রাখবে। বিক্রেতাদের স্বার্থের কথা চিন্তা করলে অন্য দেশ থেকে সিনেমা আমদানী করার যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য মনে হয়, কিন্তু সেক্ষেত্রে দেশীয় কারখানা এফডিসিকে সম্পূর্ন অকার্যকর করে রাখা হবে। লক্ষ্যনীয়, ধরেই নেয়া হচ্ছে যে ভারতীয় সিনেমা আমদানীর ফলে বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মুখ থুবড়ে পড়বে, এবং উৎপাদন নির্ভর নয়, বরং আমাদানী নির্ভর হয়ে পড়বে। নির্মিত সিনেমার সংখ্যা শতাধিক থাকাকালীন সময়ে এফডিসি'র উন্নয়নে খুব বড় কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। উন্নত প্রযুক্তির এই যুগে বাংলা সিনেমা নির্মানের উপকরণসমূহ অনেক পুরোনো, বেশীরভাগই আশির দশক থেকে বহুল ব্যবহৃত। এফডিসি-তে ভালো মানের আধুনিক ক্যামেরার অভাব রয়েছে, সম্পাদনা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে, অভাব রয়েছে আরও কারিগরী উপকরণসমূহের। ফলে এফডিসি থেকে নির্মিত সিনেমাগুলোর ছবি এবং শব্দের গুনগত মান বাইরের দেশের ছবির তুলনায় অনেক খারাপ। বাংলাদেশে যে সকল ভালো সিনেমাগুলো নির্মিত হচ্ছে তাদের নির্মান প্রক্রিয়ার একটা বড় অংশ বিশেষত পোস্ট প্রোডাকশন ভারত কিংবা অন্য কোন তৃতীয় দেশের উপর নির্ভরশীল। ফলে তুলনামূলক ভালো সিনেমা নির্মাতারা একটি ভালো সিনেমা নির্মানের জন্য দেশীয় সহযোগিতা গ্রহন করতে পারছেন না। ভবিষ্যতে যখন এই নির্মিত সিনেমার সংখ্যা কমে গিয়ে ৩০-৪০ এর কোঠায় নেমে আসবে, তখন এফডিসিকে অবশ্যই বেশ বড় অংকের ক্ষতি বহন করতে হবে, সাবসিডি দিয়ে চলতে হবে এবং এ অবস্থায় এফডিসি'র সম্পূর্ন সংস্করনের তুলনায় এর বিলোপকেই সরকার পছন্দ করবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।




[caption id="" align="alignright" width="180" caption="বাংলাদেশে ব্যবহৃত ক্যামেরার একটি, ৮৩ মডেলের ৩৫মিমি ক্যামেরা। ছবি: উজ্জ্বল"][/caption]

স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও সুবিধাপ্রাপ্ত সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি মাথা তুলে দাড়াতে পারে নি, স্বাবলম্বি হতে পারে নি এই অজুহাতে ভারতীয় সিনেমা আমদানীর পক্ষ অবলম্বন করা যায়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে সাবালকত্ব অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমান সহযোগিতা কি করা হয়েছে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে? সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে সহযোগিতা বলতে যদি শুধু এফডিসির নির্দিষ্ট অবকাঠামো এবং পুরোনো যন্ত্রপাতিকে বোঝানো হয়, তবে ইন্ডাস্ট্রি শুধু সাবলাকই হয় নি, যৌবনেও পা দিয়েছে। কারণ এই ইন্ডাস্ট্রির সহযোগিতা না নিয়েও গুটিকতক চলচ্চিত্রনির্মাতা সিনেমা নির্মান করছেন, দেশ বিদেশের সুনাম কুড়িয়ে আনছেন। প্রকৃতপক্ষে, সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন বলতে শুধু পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে সমৃদ্ধ একটি কারখানাকেই শুধু বোঝায় না, এর আধুনিকীকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি প্রতিনিয়ত সরবরাহের ব্যবস্থা করাকে বোঝায়। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও একটি পূর্নাঙ্গ ফিল্ম ইন্সটিটিউট নির্মান করা হয় নি, সিনেমা নির্মানের সাথে সংশ্লিষ্ট জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কোন প্রায়োগিক প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা নেই। প্রায় সবাই নিজ উদ্যোগে কাজ করতে করতে শিখছেন, কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করছেন। প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতার বাহিরে রয়েছে প্রেক্ষাগৃহগুলোর উন্নয়ন। স্বাধীনতার এই ৪০ বছরে কোন সরকারই প্রেক্ষাগৃহগুলোর উন্নয়নে কোনরকম প্রনোদনা দেয়নি। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় প্রদর্শকরা পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে এখন পর্যন্ত দর্শকদের সিনেমা দেখাচ্ছেন। এর আধুনিকীকরনের জন্য যে পরিমান অর্থ প্রয়োজন তা সরবরাহ করার মতো উৎসের অভাব লক্ষ্যনীয়। এক্ষেত্রে সরকারের নিরবতা লক্ষ্যনীয়।


বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহগুলো বোধহয় বর্তমানে সবচে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশে ১৯৯০-৯১ সালে সিনেমা হলের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২৩০টি, ২০১০ সালে এই সংখ্যা নেমে এসে দাড়িয়েছে ৭৪২-এ। ঢাকার ৪৪টি সিনেমা হলের মধ্যে এখন আছে ৩৩টি, এগারোটিকে গুড়িয়ে দিয়ে গড়ে উঠেছে বিশাল অট্টালিকা। গুলিস্তান, শ্যামলী, নাজ, লায়ন, স্টার, শাবিস্তান, তাজমহল সিনেমা হারিয়েছে অনেক আগেই। খুব শীঘ্রই ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমাহল বন্ধ হয়ে যাবে, সেখানে গড়ে উঠবে বহুতল কোন ভবন। দেশের আনাচে কানাচে সিনেমাহল গুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে নানা কারণে। ভারতীয় সিনেমা আমদানী হলে কি সত্যিই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন ঘটবে কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন আসে ঠিক এ জায়গাতেই। ভারতীয় সিনেমা আমদানী হলে সিনেমাহল মালিকরা তাদের সিনেমাহলে দেশীয় সিনেমার পাশাপাশি ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন করবেন, ফলে দর্শক সমাগম হবে, অেধিকতর মুনাফার মুখ দেখবেন তারা। সুতরাং প্রেক্ষাগৃহগুলো বেচে থাকবে, আর প্রেক্ষাগৃহগুলো বেচে থাকলে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিও বেচে থাকবে - এমন একটা বক্তব্য পাওয়া যায়। প্রেক্ষাগৃহগুলো বেচে থাকার সাথে ইন্ডাস্ট্রি বেচে থাকার কোন যোগসূত্র খুজে পাওয়া যায় না। কারণ এদেশে প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা সিনেমায় টাকা বিনিয়োগ করেন না। স্বাধীনতার পূর্ব এবং পরবর্তী সময়ে বলাকা, মধুমিতা প্রভৃতি প্রেক্ষাগৃহসমূহ সিনেমা নির্মানে লগ্নি করলেও গত দু দশকে এর নজির নেই বললেই চলে। সেক্ষেত্রে একজন প্রেক্ষাগৃহের মালিক তার অধিকতর আয় দিয়ে আরেকটি প্রেক্ষাগৃহ নির্মান করবেন হয়তো, কিন্তু তাতে আরো একটি বিদেশী সিনেমাই চালাতে হবে যদি দেশীয় সিনেমা সেই মাত্রায় নির্মান করা না হয়। তাছাড়া বিভাগীয় শহরগুলোতে যে সিনেমাহলগুলো ভেংগে বহুতল মার্কেট বা অফিস নির্মান করা হয়েছে, তার পেছনে সিনেমা ব্যবসার ব্যর্থতাই মূল কারণ নয়। একটি বহুতল ভবন থেকে যদি সিনেমাহলের চেয়ে বেশী আয় হয়, তবে কেন প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা সেদিকে যাবেন না - ব্যবসার উদ্দেশ্যই তো মুনাফা অর্জন করা।


দেশীয় সিনেমার তুলনায় ভারতীয় সিনেমার মান উন্নত বলে দেশের দর্শকদের কথা মাথায় রেখে এর আমদানী সমর্থন করেন অনেকেই। মনে রাখা উচিত, ভারতের সব সিনেমাই ভালো নয়। বাজারী এবং নিম্নমানের সিনেমার সংখ্যা মোটেও কম নয়। ভারতীয় সিনেমা আমদানীর বিরোধিতা করতে গিয়ে প্রযোজক-পরিচালকরা হুমকী দিয়েছেন প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের, বলেছেন - ভবিষ্যতে তাদেরকে আর কোন বাংলা সিনেমা প্রদর্শন করতে দেয়া হবে না। অন্যদিকে পাল্টা হুমকী দিয়েছেন প্রদর্শকরাও। তারা বলেছেন - যদি তাদেরকে বাংলাদেশী সিনেমা প্রদর্শন করতে দেয়া না হয়, তবে তারা ইংরেজি সিনেমা প্রদর্শন করবেন, প্রয়োজন হলে সরকারকে চিঠি দিয়ে সিনেমা প্রদর্শনই বন্ধ করে দেবেন। ইংরেজি সিনেমার উপর কোন নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও প্রদর্শকরা ইংরেজি সিনেমা প্রদর্শন করছেন না। যারা করছেন তারা বি-গ্রেডের সিনেমাই আমদানী করছেন যার মূল আকর্ষন অ্যাকশন এবং যৌনতা। ভারতীয় সিনেমা 'জোর' সারা দেশের সকল প্রদর্শক হয়তো প্রদর্শন করছেন না সামর্থ্যের অভাবে, হিন্দী ছবি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে। ফলে ভারতের উন্নতমানের বিগ বাজেটের হিন্দী এবং বাংলা চলচ্চিত্রের তুলনায় নিম্নমানের বাজারী সিনেমা আমদানী করা শুরু হওয়ার আশংকা আছে। ফলে দর্শকের উন্নতমানের ছবির চাহিদা মেটানো প্রকৃতপক্ষে সম্ভব হবে না বরং এদেশের সংস্কৃতির উপর আরেকটা আঘাতই হবে। উন্নতমানের সিনেমাগুলো আমদানী করার ক্ষমতা সকল পরিবেশক রাখেন না এবং এইসকল প্রদর্শকের দর্শকও দেশের আমজনতা নন, একটি নির্দিষ্ট শ্রেনীই। সুতরাং, এ আশাও গুড়েবালি।


খুবই নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখলে এদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির পশ্চাদপদতার পেছনে সিনেমার দুর্বল কাহিনী, অভিনয়, কারিগরী অদক্ষতা, প্রদর্শকদের অক্ষমতা ইত্যাদির পাশাপাশি সরকারী দৃষ্টিভঙ্গীও খুবই গুরুত্বপূর্ন। কোন সরকারই এই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। যে সিনেমা প্রদর্শকদের কথা চিন্তা করে সিনেমা আমদানী করার কথা বলা হচ্ছে, তাদের জন্যও সরকার কখনো কোন ব্যবস্থা নেয়নি। অকালপ্রয়াত খ্যতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদের যোগ্য সহধর্মিনী ক্যাথেরিন মাসুদ তার সাম্প্রতিক নিবন্ধে খোদ ভারত সরকারের পদক্ষেপগুলো বেশ স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। দেশীয় সিনেমা প্রদর্শনের জন্য অধিকতর সুযোগ সুবিধা প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহন করলে প্রেক্ষাগৃহের মালিকরা সিনেমা ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন না। অন্যান্য সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার যেন সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে হত্যার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর। ভারতীয় সিনেমা আমদানীর বিরোধিতায় আন্দোলন-প্রতিবাদে কোন রা করেনি সরকার। আমদানী সংক্রান্ত কোন নীতিমালা প্রণয়ন করেনি। বছরে ক'টা চলচ্চিত্র আসবে, তাদের সেন্সর নীতিমালা কি হবে, বাংলাদেশ থেকে কতগুলো চলচ্চিত্র ভারতে প্রবেশের সুযোগ পাবে ইত্যাদি সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ছাড়াই সরকার আমদানীর বৈধতা প্রদান করেছে। গত দেড়বছরে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নে কোন আশ্বাসও দেয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। সীমান্ত সংঘাত, ট্রানজিট, টিপাইমুখ ইত্যাদি ইস্যুর মতো চলচ্চিত্র ইস্যুতেও সরকার জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে এবং নিজের অজান্তেই বিরোধীদলের হাতে তাস ছেড়ে দিচ্ছে। বিরোধীদলগুলো যদি ক্ষমতায় যেতে চায়, তবে তাদেরও উচিত হবে, আগামী নির্বাচনে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়ন সংক্রান্ত কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।


প্রথম ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শন শুরু হয়েছে এবং বাকী সিনেমাগুলো প্রদর্শন শুরু হবার আগেই সরকারের কতগুলো পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এই পদক্ষেপগুলো সিনেমা আমদানীর বিরোধিতা করবে না হয়তো কিন্তু সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নকে নিশ্চিত করবে।


এক, সিনেমা আমদানী রপ্তানি সংক্রান্ত পূর্ন নীতিমালা প্রণয়ন করা।


দুই, অন্তত: পাচ বছর মেয়াদী বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাজেট বরাদ্দকরন নিশ্চিত করা।


তিন, একটি পরিপূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মান ও প্রশিক্ষন কেন্দ্র তৈরী করা এবং এর সাথে এফডিসি-র পূর্ন সংযোগ তৈরী করা।


চার, নতুন এবং তরুন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রয়োজনীয় প্রনোদনা এবং যথেষ্ট পরিমান অনুদান সরবরাহ করা।


পাচ, সিনেমা প্রদর্শনস্থলের উন্নয়ন বিধানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান নিশ্চিত করা।


নিজ দেশের উন্নয়নে নিজ দেশের পণ্যই সেরা - এই বোধ জাগ্রত হলেই বিদেশী সিনেমা আমদানীর বিপক্ষে আন্দোলনের প্রয়োজন তিরোহিত হয়। সরকারসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষের বোধোদয় হোক - এই শুভকামনা।


-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------


এই লেখাটির সম্পাদিত রূপ বার্তা২৪.নেট এ "সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে আমদানী ছাড়াও অন্য যে সব সমস্যার সমাধান দরকার" শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।


ছবি কৃতজ্ঞতা: বিডিনিউজ২৪.কম ব্লগ উজ্ব্লের ব্লগ