বছর আষ্টেক আগের কথা।
মনের মাঝে তুমি নামে মতিউর রহমান পানু পরিচালিত এক সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সবার মুখে মুখে সেই সিনেমা। পত্রিকার পাতায় কলাম লেখা হচ্ছে সিনেমার প্রশংসা করে। লেখক আনিসুল হক পর্যন্ত একদিন প্রথম আলোর প্রথম পাতায় একটা কলাম লিখে ফেললেন। পত্রিকা মারফত বিভিন্ন ধরনের লেখার মাধ্যমে জানা গেল - মনের মাঝে তুমি সিনেমাটি সিনেমাস্কোপে নির্মিত। সেই সময়ে সিনেমা এবং এর নির্মান প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। কম্পিউটার আর ইটিভির পর্দায় মিউজিক ভিডিও দেখি, সেই ভিডিওতে উৎসাহিত হয়ে কয়েকটা গানের ভিডিও মনের কারখানায় তৈরী করেছি, এবং মনের পর্দায় নিয়মিত সেই মিউজিক ভিডিওর কয়েকটা করে শো দেখি। সিনেমাস্কোপ খায় না মাথায় দেয় সেই বিষয়ে কোন জ্ঞান আহরন না করেই সিদ্ধান্ত নিলাম - ওরে নীল দরিয়া গানটার একটা মিউজিক ভিডিও বানাবো এবং সেটা বানানো হবে সিনেমাস্কোপে।
আজ থেকে আট বছর আগে আমি যে অবস্থায় ছিলাম সে অবস্থায় বর্তমানে যারা আছেন তাদের জন্য এই পোস্ট। সিনেমাস্কোপ বলতে আসলে কি বোঝায়?সিনেমাস্কোপ হলো ১৯৫৩ সালে টুইনটিথ সেঞ্চুরী ফক্স এর প্রেসিডেন্ট কতৃক আবিস্কৃত ওয়াইড স্ক্রিনে চিত্রায়নের জন্য অ্যানামরফিক লেন্স এর ব্যবহার। ১৯৫৩ সাল থেকে শুরু করে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত সিনেমাস্কোপ শব্দটি প্যানভিশনের কপিরাইটেড ছিল। অ্যানামরফিক লেন্স বলতে কি বোঝায় সে ব্যাপারে আমার ধারণা নেই - বিজ্ঞানের ব্যাকগ্রাউন্ড বেশ দুর্বল হওয়ায় এ বিষয়ে ধারণা নেয়াটাও খুব কষ্টকর আমার জন্য। সিনেমাস্কোপে চিত্রায়ন করা হয় সাধারনের থেকে আরও প্রসারিত আকৃতিতে। সাধারণত চিত্রায়নের জন্য ৩৫ মিমি ফিল্ম ব্যবহার করা হয়। এই একই ফিল্মে বিভিন্ন অনুপাতের ছবি চিত্রায়ন করা হয় বিভিন্ন প্রকার লেন্সের সাহায্যে। সিনেমাস্কোপের সাথে তাই ছবির দৈর্ঘ্য প্রস্থ্য বেশ ভালোভাবে সম্পর্কযুক্ত।


সিনেমায় ছবির দৈর্ঘ্যের সাথে প্রস্থ্যের অনুপাতকে আসপেক্ট রেশিও বলা হয়। সাধারণভাবে ৫ ধরনের আসপেক্ট রেশিও দেখা যায়। এগুলো হলো - ৪:৩, ৩:২, ১৬:৯, ১.৮৫:১ এবং ২.৩৫:১। প্রথম দিকে সিনেমাস্কোপে ২.৬৬:১ রেশিও-তেও সিনেমার চিত্রায়ন করা হয়েছে। তবে বর্তমানের স্টান্ডার্ড হলো ২.৩৫:১ অথবা ২.৩৯:১। এই সকল রেশিওর মধ্যে ৪:৩ বা ১.৩৩:১ রেশিও-তে নির্মিত ইমেজ আমাদের বেশ পরিচিত। টেলিভিশনে আমরা যে ইমেজ দেখি তার সবই এই আসপেক্ট রেশিও-তে নির্মিত। এর একটা পোষাকী নাম আছে - অ্যাকাডেমি রেশিও। ভিডিওগ্রাফিতে আরেকটি রেশিও ব্যবহার করা হয় - ১৬:৯। ফিল্মের ক্ষেত্রে সাধারণত ১.৮৫:১ রেশিও বেশী ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে যে সকল সিনেমা নির্মিত হয় তার সবগুলোই এই রেশিও ব্যবহার করে নির্মিত। হলিউডে নির্মিত সিনেমাগুলো দুটো রেশিও অনুসরন করে। একটা হলো ১.৮৫:১, অন্যটা ২.৩৫:১ বা সিনেমাস্কোপ। বলিউডের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।


স্বাভাবিক চৌকানা দৃশ্য একটা ফিল্মে শ্যুট করলে উপরে নিচে অপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু চলে আসে, আবার ওয়াইড করতে গেলে ফিল্মের উপরে নিচে কিছূ অংশ ব্ল্যাকআউট হয়ে যায়। সিনেমাস্কোপে আ্যানামরফিক লেন্স কি করে? এটা দৃশ্য ধারন করে দৃশ্যটাকে ফিল্মের পুরো জায়গায় বসায় কিন্তু চৌকানা করে দৃশ্য ধারন করে নয় বরং ওয়াইড করে ধারন করে স্প্রেড করে দেয়। তাতে দৃশ্যের কোয়ালিটিও বাড়ে। সেটাই প্রযেক্টরে আরেকটা আ্যানমরফিক লেন্স ব্যবহার করে রিভার্স করে পুরো পর্দায় (হলের পর্দা চৌকানা হয় না, ওয়াইড হয়) ছড়িয়ে দেয়। তাতে করে কি হয়? ওয়াইড যে দৃশ্যকে ফিল্মের মধ্যে টেনে ছড়িয়ে জায়গা ভরিয়ে দেয়া হয়েছিল তা আবার ওয়াইড হয়ে উপর নিচের জায়গা ছাড়াই বসে পড়ে তখন কোয়ালিটি আরো্ বাড়ে, দৃশ্য আরও ওয়াইড লাগে। এ্‌ই বিষয়টা সহজে বোঝা যাবে পিসিতে ডেস্কটপ ওয়ালপেপার নিয়ে বসানোর সময়ও টাইল, ফিল স্ট্রেচ এগুলো লক্ষ্য করলে।


একটা চার্ট দেই ফিল্মের কোনটা কোন রেশিও তে তৈরি
Munich 2:35:1
War of the Worlds 1:85:1
The Terminal 1:85:1
Catch Me if you Can 1:85:1
Minority Report 2:35:1
AI 1:85:1
Private Ryan 1:85:1
Amistad 1:85:1
Lost World 1:85:1
Schindler's List 1:85:1
Jurassic Park 1:85:1
Hook 2:35:1
Always 1:85:1
Indiana Jones and the Last Crusade 2:35:1
Empire of the Sun 1:85:1
The Color Purple 1:85:1
Temple of Doom 2:35:1
E.T. 1:85:1

বাংলাদেশে কেন সিনেমাস্কোপে সিনেমা নির্মিত হচ্ছে না সেটা বোঝার জন্য সিনেমাস্কোপ কিভাবে কাজ করে সেটা বোঝা দরকার। সিনেমাস্কোপে লেন্সের সামনে একটি অ্যানামরফোস্কোপ লেন্স ব্যবহার করা হয়, ফলে সে দৃশ্যের চিত্রায়ন করা হচ্ছে তা কিছুটা সংকুচিত অবস্থায় ফিল্মের উপর অঙ্কিত হয়। আবার সকল প্রসেসিং শেষে এই ছবি যখন প্রদর্শন করা হয় তখন প্রজেক্টরের সামনে আরেকটি অ্যানামরফোস্কোপ লেন্স ব্যবহার করা হয় যা সেই ইমেজকে আবার প্রসারিত করে পর্দায় উপস্থাপন করে।


যেহেতু সিনেমায় ইমেজের আকৃতি স্বাভাবিকের চেয়ে বড়, তাই পর্দার আকৃতিও বড় হতে হয়। সিনেমাস্কোপের পর্দা সামান্য বাকানো হলে অপেক্ষাকৃত  জীবন্ত ছবি পা্ওয়া যায়। সিনেমাস্কোপে আরও একটি উপকরণ বিশেষ প্রয়োজন - সেটা হলো সাউন্ড। অপেক্ষাকৃত চওড়া পর্দা হওয়ায় এর সাউন্ডের জন্য বিশেষ মনযোগ দিতে হয়। চিত্রায়নের সময় অতিরিক্ত দুটো মাইক্রোফোনের ব্যবহার এবং প্রদর্শনের সময় অতিরিক্ত সাউন্ডবক্স দরকার হয়। বাংলাদেশের প্রোডাকশন হাউজ বা এফডিসি-তে সিনেমাস্কোপ ক্যামেরা নেই এবং হলগুলোতে সিনেমাস্কোপ প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে গত এক দশকে নির্মিত সিনেমার মধ্যে মনের মাঝে তুমি ছাড়াও তৌকির আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র 'জয়যাত্রা' সিনেমাস্কোপে নির্মিত। জয়যাত্রা নির্মানের জন্য তৌকির আহমেদ ভারত থেকে সিনেমাস্কোপ ক্যামেরা আমদানী করেছিলেন। আবার, মতিউর রহমান পানু তার মনের মাঝে তুমি সিনেমা প্রদর্শনের জন্য প্রতিটি প্রিন্টের সাথে একটি করে সিনেমাস্কোপ লেন্স সরবরাহ করেছিলেন প্রদর্শকদের মাঝে। বর্তমান সময়ে সিনেমা শিল্পে খুবই দুরাবস্থা চলছে। সিনেমা নির্মিত হচ্ছে না, সিনেমার অভাবে সিনেমাহল গুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সিনেমাস্কোপে সিনেমা নির্মান যে কোন পরিচালকের জন্যই অনেক সাহসী একটি সিদ্ধান্ত - ব্যবসার কথা মাথায় রাখলে সিনেমাস্কোপে সিনেমা নির্মান তাই সহজসাধ্য নয়। (সূত্র) মনে রাখা দরকার, সিনেমাস্কোপ কোন ক্যামেরা নয়, ক্যামেরার সামনে একটা লেন্স মাত্র যা পর্দার সামনের দৃশ্যকে কিছুটা সংকুচিত করে ফিল্মে ধারন করে এবং পরবর্তীতে আরেকটা লেন্সের মাধ্যমে প্রসারিত করে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়। সম্ভবত আমাদের দেশের ক্যামেরাগুলো অনেক পুরোনো এবং লেন্স ইন্টারচেঞ্জেবল না হওয়ায় ক্যামেরা আমদানী করতে হয়। শুধু ক্যামেরাই নয়, সিনেমাস্কোপের সাথে পর্দার সম্পর্কও গভীর। আমাদের দেশের সিনেমাহলগুলোর পর্দা সিনেমাস্কোপের জন্য যথোপযুক্ত নয়।


সিনেমাস্কোপ নিয়ে একটা হাসির ভিডিও দেখুন

তবে, এই কঠিন কাজটিকে সহজ করেছিলেন বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একজন শ্রেষ্ঠ নির্মাতা জহির রায়হান। ১৯৫৩ সালে যে সিনেমাস্কোপের নির্মান, সেই সিনেমাস্কোপে পাকিস্তানের প্রথম সিনেমা নির্মান করেন জহির রায়হান ১৯৬৫ সালের এপ্রিলে, নাম বাহানা। সাদা-কালোয় নির্মিত এই সিনেমাটি সম্ভবত খুব বেশী ব্যবসাসফল হয়নি। হয়নি একই বছর ডিসেম্বরে নির্মিত প্রথম রঙ্গীন এবং সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র 'মালা'। পশ্চিম পাকিস্তানে সিনেমাস্কোপে সিনেমা নির্মানের ছয় বছর আগে ১৯৫৯ সালে ভারতে সিনেমাস্কোপে সিনেমা নির্মান করেছেন গুরু দত্ত, সিনেমার নাম 'কাগজ কি ফুল'। এই সিনেমাটিও ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য লাভ করে নি, কিন্তু ভারতের সিনেমা নিয়ে অধ্যয়ন করতে গেলে এই সিনেমাটিকে জানতে হবে বেশ ভালো ভাবে, কারণ শৈল্পিক দৃষ্টিতে এই সিনেমার গুরুত্ব এবং ভূমিকা অনেক। এই সিনেমাটা গুরু দত্তের সবচে ভালো ফিল্ম হিসেবে গন্য করা হয় এবং সিনেমার ব্যর্থতার জন্যই কিনা জানি না গুরু দত্ত আর কোন সিনেমা নির্মান করেন নি।


সিনেমাস্কোপে নির্মিত সিনেমা ভালো হয়, মন্দও হতে পারে যদি সিনেমাস্কোপ সম্পর্কে ধারণা না থাকে। সিনেমাস্কোপ শব্দটি-ই যে ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে তার উদাহরণ মুনসুন ফিল্মস এর ব্যানারে নির্মিতব্য সিনেমা 'মোস্ট ওয়েলকাম' যার প্রযোজক এবং প্রধান অভিনেতা হলেন খোজ-দ্য সার্চ খ্যাত অনন্ত এবং পরিচালক অনন্য মামুন। সিনেমাটিকে দেশের প্রথম সিনেমাস্কোপ সিনেমা দাবী করার পেছনে তাদের অজ্ঞতা কাজ করছে এমনি বিশ্বাস করতে রাজী নই, ব্যবসাপ্রবণতাই প্রধান উদ্দেশ্য।


কৃতজ্ঞতা: ব্লগার রন্টি চৌধুরী। এই মানুষটি এই পোস্ট লেখার ব্যাপারে এতটাই সহায়তা করেছেন যার অভাবে এটি একটি অসম্পূর্ন পোস্ট থেকে যেতো। সিনেমার ক্যামেরা সম্পর্কে তার জ্ঞান তিনি আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন, এই কামনা।