কয়েকদিন আগের ঘটনা, কাটাবন থেকে নিজের পায়ে হেটে হাতিরপুলের দিকে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর যেতেই রাস্তার পাশে দেয়ালে লাগানো একটি সিনেমার পোস্টার দেখে দৃষ্টি আটকে গেলো। বাংলা সিনেমার পোস্টার এর সাথে কোনও পার্থক্য নেই। বরাবরের মত নায়ক হুংকার ছেড়ে তেড়ে আসছে, ভিলেন এর হাতে সদ্য ধার দেয়া চকচকে একটা চা-পাতি, আর পাশে মূল আকর্ষণ নায়িকার অর্ধনগ্ন ছবি। সব মিলিয়ে যা লাউ তাই কদু। এখন প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে দৃষ্টি আটকালো কেন? উত্তর একদম সোজা, কারণ সেখানে নায়ক সাকিব খান (কিং খান) ছিলেন না, ছিলেন কোলকাতার নায়ক জিত। আমি কোলকাতার সিনেমা 'জোর' এর কথা বলছি। সুতরাং, অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম, ঘাত-প্রতিঘাত, সভা-সমাবেশ আর বিতর্কের পরে ভারতীয় ছবি দেশের মাটিতে বসে বড় পর্দায় দেখার দূর্লভ সুযোগ পেল এদেশের মানুষ। এই দূর্লভ সুযোগ করে দেবার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু নাকি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের কথা চিন্তা করে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনী নিষিদ্ধ করেন কিন্তু স্বয়ং বঙ্গবন্ধু-কন্যা আবার সেটি চালু করলেন। নিঃসন্দেহে সময়ের সাহসী সিদ্ধান্ত।

আসল কথায় আসি, ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি নিয়ে দেশ স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত। উভয় পক্ষ যার যার অবস্থানের পক্ষে জোড়ালো মতামত তুলে ধরেছেন। এক পক্ষ বলছেন, এটি দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য হুমকি। এটা দেশের এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে ধ্বংস করবে, ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আরো বাড়িয়ে দেবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অপর পক্ষ বলছেন, চলচ্চিত্রের নামে এই নোংরামি আর কতদিন? একজন নায়ক দিয়ে এফডিসি আর কতদিন? তাদের মতে, ভারতীয় চলচ্চিত্র একটি প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করবে। ফলে এই সুযোগে দেশীয় চলচ্চিত্রে একটা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে। আমি উভয় মতকেই শ্রদ্ধা জানাই। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, উভয় পক্ষই একটি বিষয়ে একমত আর তা হল উভয়ই বাংলা চলচ্চিত্রের উন্নয়ন চায়। এখন দেখার বিষয়, চলচ্চিত্র আমদানি করে বা না করে কিভাবে এই আমাদের দেশের প্রায়-বিলুপ্ত প্রজাতির এই শিল্পটাকে টিকিয়ে রাখা যায়।

ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি কিভাবে আমাদের এই শিল্পের উন্নয়নে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে, সে হিসেব মেলাতে গিয়ে আমি এখনো কোন উপসংহার এ আসতে পারি নি। আমাদের একটি বিষয় বুঝতে হবে, ‘প্রতিযোগিতা’ বিশেষত চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি নয়। যেটি হয়ত আমরা বারবার বুঝতে ভুল করছি। কথা হল, প্রতিযোগিতা কাদের মধ্যে সম্ভব? এক কথায় বললে, যাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করার মত ক্ষমতা আছে। অর্থাৎ, অর্থ এবং অবকাঠামো উভয় দিকে দিয়ে যারা একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আছে। তাহলে প্রশ্ন হল, বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে কি এই অসম প্রতিযোগিতা আদৌ সম্ভব? যে দেশে একটি মাত্র নায়ক দিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি চলে, সেই দেশ কি ভারতের মত শক্তিশালী চলচ্চিত্রের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে? যে দেশে একটা মুমূর্ষু ইন্ডাস্ট্রি খুড়িয়ে খুড়িয়ে বছরের পর বছর চলে, যে দেশে স্বাধীনতা অবধি আজ পর্যন্ত একটি ফিল্ম ইনস্টিটিউট গড়ে উঠতে পারল না, যেখানে দক্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রির যথেষ্ট অভাব, সেই দেশ করবে প্রতিযোগিতা?

সারা বিশ্বে আজ যখন ডিজিটাল চলচ্চিত্রের জয়জয়কার অবস্থা, তখন এদেশে ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রচারের অনুমতি মেলে না। তারেক মাসুদের মত পরিচালকদের সিনেমা ফেরি করা লাগে। সেই দেশ করবে প্রতিযোগিতা?

আমার কাছে একটি বিষয় রহস্যময় বলে মনে হয়, ভারত আমাদের থেকে তাদের দেশে কোন সিনেমা আমদানি করবে না। কিন্তু তারা আমাদের দেশে ঠিকই সিনেমা রপ্তানি করবে। এটা কি এক তরফা চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত নয়? আমার জানা মতে, আমাদের দেশে ভারতের প্রায় ৫০টির মত টিভি চ্যানেল চলে। কিন্তু ভারতে আমাদের কয়টি চলে? একটিও না। এখন আপনারাই বলেন, এভাবে কি প্রতিযোগিতা হয়? আমাদের মত একটি স্বাধীন মর্যাদাশীল রাষ্ট্রের কী এই নমনীয়তা শোভা পায়?

আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, ধরুন বলাকা-১ এ আমির আর কারিনার “3 idiots” চলছে। আর বলাকা-২ এ চলছে সাকিব খান এর “প্রিয়া আমার প্রিয়া”। আপনি কোনটি দেখবেন? “3 idiots”  নয়? শুধু আপনি নন, আমি হলেও এটিই করতাম। কারণ কেউ কি কারিনার ‘জিরো ফিগার’ বাদ দিয়ে বাংলা সিনেমার সেই চির চেনা ‘চৌধুরী সাহেবের আদরের দুলালীকে’ দেখতে যাবে?

হল মালিকদের কে বলছি, স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে ১৪৩৫ টি প্রেক্ষাগৃহ ছিল। এখন সেটি কমে দাঁড়িয়েছে ৬০৮টি তে। সিনেমা হলগুলোর অবস্থা ভয়াবহ। ছারপোকার কারণে বসে সিনেমা দেখা যায় না। চেয়ারগুলো ভাঙ্গা, সিগারেটের গন্ধ, টয়লেটগুলো অপরিস্কার, এসব অভিযোগগুলো কি হল মালিকরা অস্বীকার করতে পারবেন? টিকিট ব্লাক এ বিক্রি এখন নিয়মিত  ঘটনা। কার এমন দায় পড়েছে এত ঝক্কি ঝামেলা মাথায় নিয়ে হলে গিয়ে সিনেমা দেখবে। এসব দায় কি পরিবেশকরা এড়াতে পারে?

তাছাড়া গ্লামার, বাজেট, সংখ্যা সব দিক দিয়েই ভারত আমাদের থেকে কমপক্ষে ২০ বছর এগিয়ে। আমরা কি পারবো এই দৌড়ে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে?

তাহলে শেষ পর্যন্ত যে প্রশ্নটি দাঁড়ায় তা হল, বাংলা চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে আমাদের কি করণীয়। এক্ষেত্রে আমি কিছু প্রস্তাব রাখতে চায়। আমি বিশ্বাস করি যে কোন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য এই পদক্ষেপগুলো জরুরী।

১। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরী হল, সরকারিভাবে একটি কমিটি দাড় করানো, যাদের মূল কাজ হবে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাগৃহগুলোকে রক্ষণাবেক্ষন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিকরণ এবং বন্ধ হলগুলোকে পুণরায় চালু করার ব্যাবস্থা করা।

২। দেশে অতিসত্ত্বর ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রচারের ক্ষেত্রে যাবতীয় বিধি নিষেধ তুলে নেয়া এবং প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে ডিজিটাল সিনেমা প্রদর্শনের ব্যাবস্থা করা। এক্ষেত্রে, হলগুলোতে প্রজেক্টর স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। কারণ যে সিনেমাটি ফিল্ম ফরম্যাটে তৈরী করতে ১ কোটি টাকা লাগে, সেই একি সিনেমা ডিজিটাল ফরম্যাটে লাগে খুব বেশি হলে ৩০ লক্ষ টাকা। ফলে, চলচ্চিত্র নির্মাণ খরচ কমবে। আয়ও বাড়বে।

৩। আমি মনে করি, যারা মূলধারার (এফডিসি) চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে জড়িত, তারা যথেষ্ট দক্ষ। শুধু এখন প্রয়োজন আমাদের চিরাচরিত গল্পের ধারা থেকে বেড়িয়ে আসা। গল্পে একটু ভিন্নতা আনতে পারলেই কেল্লা ফতে। নিশ্চিত ব্যবসা সফল। মনপুরা সিনেমাটি এক্ষেত্রে একটা ভাল উদাহরণ হতে পারে। কেননা এই ছবি নিয়ে প্রদর্শকদের কান্না কাটি করতে হয়নি।

৪। দেশের প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সে সব বিধিনিষেধ আছে, তা বাতিল অথবা শিথীল করতে হবে। আমার জানা মতে, এফডিসি’র পরিচালক সমিতির সদস্য হও, পরিবেশক সমিতির সদস্য হও ইত্যাদি ইত্যাদি। ইদানীং শুনছি কিং খানের কাছ থেকেও নাকি কি সব অনুমতি লাগে। আমি চায়, সকলেই তার নিজ ছবি প্রচারের জন্য সমান সুযোগ পাক। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা হবে, তবে সেটি আমাদের মধ্যে। এতে করে চলচ্চিত্রের প্রকৃত উন্নয়ন বলতে যা বোঝায় তা অর্জন সম্ভব হবে।

৫। যারা তরূণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, তাদেরকে মূলধারার চলচ্চিত্রে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। এতে করে সিনেমাতে প্রফেশন্যালিজম বলতে যা বুঝায়, তা অর্জন করা সহজ হবে।

৬। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও, আমরা একটি আন্তর্জাতিক মানের ফিল্ম ইন্সটিটিউট তৈরী করতে পারিনি। চলচ্চিত্রের জন্য এর চেয়ে দুঃখজনক কথা আর কি হতে পারে। কিন্তু ভারতে পূনে, সত্যজিত রায় ফিল্ম ইন্সটিটিউট এর মত অনেকগুলো আন্তর্জাতিকমানের ফিল্ম ইন্সটিটিউট তৈরী হয়েছে। এগুলো বাদ দিয়ে যারা ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানি করে আমাদের চলচ্চিত্রের উন্নয়নের দিবা স্বপ্ন দেখেন, তাদের মস্তিষ্ক নিয়ে আমার প্রশ্ন জাগে।

৭। রূপ থাকলেই যে অভিনেতা হওয়া যায়, বাংলাদেশের চেয়ে ভাল উদাহরণ দুনিয়াতে আর বোধ হয় নেই। এখানে প্রতিদিন টিভি খুললেই নানা রঙ্গের, নানা ঢঙ্গের অভিনেতা মেলে। অভিনয় জানুক বা না জানুক তারা অভিনেতা। ক্যামেরার সামনে আসার জন্য অভিনয় জানা লাগে না, হয়ত পরিচালক বা প্রযোজক এর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরেই অভিনয়ের টিকিট মেলে। এই ধরনের বাজে অভিনেতাদের জন্য যে চলচ্চিত্র মার খাচ্ছে তা অনেকেই বুঝতে চান না। তাই অভিনয় শেখার জন্য আরো ভাল মানের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

একবার ভাবুনতো, আজ যদি দেশের সিনেমা হলগুলোতে ডিজিটাল সিনেমা প্রদর্শনের ব্যাবস্থা থাকত, তাহলে কি তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেল আর মোরশেদুল ইসলামের মত পরিচালকদের ফেড়িওয়ালা হতে হত? আর হল মালিকদের কি মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে হত। আমিতো কখনও স্টার সিনাপ্লেক্স কে দর্শক এর অভাবে কান্না কাটি করতে শুনিনি।

সবশেষে একটি অনুরোধ, আমার লেখার শক্তি সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। আমি জানি আমার লেখা ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই আগ্রাসীভাব ঠেকাতে পারবে না। আমি শুধু লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছি। তবে অনুরোধ, দয়া করে কেউ কখনো হলে গিয়ে ভারতীয় ছবি দেখবেন না।

অতিথি লেখক শোয়াইব সৈনিক একজন নবীন  ব্লগার। বাংলাদেশী সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নে একজন ভাগীদার হবার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী।