খোজ দ্য সার্চ সিনেমার কথা উঠলেই সিনেমার দর্শকরা হাসেন। হা হা হা হি হি হি হো হো হো ...। খোজ দ্য সার্চ কমেডি সিনেমা নয়, পুরোদস্তুর অ্যাকশন সিনেমা। তাই হাসির পেছনে সিনেমার হাস্যরস নয় বরং এর প্রতি তুচ্ছ তাচ্ছিল্যভাবই প্রকট হয়ে উঠে। কেউ কেউ এধরনের সিনেমা যেনো নির্মান না হয় সে বিষয়ে আশাবাদও ব্যক্ত করেন। যারা হাসেন তাদের সবাই যে সিনেমাটা দেখেছেন তা নয়, অনেকে হাসেন কারণ না হাসলে অন্যরা তাকে নিয়ে হাসতে পারে। আমি হাসি না - খোজ দ্য সার্চ সিনেমাটা আমাকে হাসায় নি, অবিভূত করেছে।

সম্ভবত ২০০৮ সালে প্রথম এই সিনেমার কথা শোনা যায় - বিশেষত শাহবাগে একটি বিলবোর্ড স্থাপন করা হয় যেখানে এই সিনেমার বিশেষ কিছু দৃশ্য এবং বেশ কিছু তথ্য সহকারে - তার মধ্যে বিদেশী অভিনেতা-অভিনেত্রীর কথা গুরুত্বের সার্থে বর্ননা করা হয়েছিল। নায়ক চরিত্রে যে মানুষটি তাকে চেনা যায় নি, তার নাম শোনা যায় নি - এমনকি সিনেমার কোন চরিত্রকেও নয়। সেক্ষেত্রে এই সিনেমা সত্যিই কোন কমার্শিয়াল সিনেমা, নাকি ডিজিটাল কোন সিনেমা যা টিভিতে কিংবা সিডি-ডিভিডিতে প্রকাশিত হবে সেটা নিয়ে সন্দেহ ছিল।



পরবর্তীতে অবশ্য ব্লগ এবং পত্রিকাগুলোর কল্যানে এ নিয়ে একটু জানার সুযোগ হয় - ইউটিউবে এই সিনেমার কিছু গান/ট্রেলার পাওয়া যায় এবং সত্যি কথা ট্রেলার দেখে এই সিনেমা সম্পর্কে সিনেমাহলে না যাওয়া দর্শকের মধ্যে বিশেষত: যুবসমাজের মধ্যে আগ্রহের সৃষ্টি হয়, এবং সিনেমা মুক্তি পাওয়ার পরে অনেকেই সিনেমা দেখতে হলগুলোতে যায় - বন্ধুবান্ধব সহ। সিনেমাটা অনেক দর্শককে হতাশ করেছে সত্যি কিন্তু এই সিনেমাটা যে বাংলাদেশী সিনেমার বাজারে বিশাল এক পরিবর্তনের সূচনা করেছে সে বিষয়টা হয়তো উড়িয়ে দেবার নয়।

খোজ দ্য সার্চ সংক্রান্ত বেশ অনেকগুলো রিভিউ পড়ে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে - এই সকল রিভিউ সতস্ফূর্তভাবে লেখা - রাগ-ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটানোর সময় কেউ তাদেরকে বাধাগ্রস্থ করেনি। এটা ভালো - একটা সিনেমার সাফল্য ব্যর্থতা অনেকক্ষেত্রেই দর্শকদের স্বতস্ফূর্ত মতামতের উপর নির্ভর করে। এটা সত্যি যে দর্শকের আকাঙ্খা এবং প্রাপ্তির মধ্যে পার্থক্য থাকলেই হতাশার তৈরী হবে। কিন্তু এই আশা করার জায়গা থেকে আমরা কি খুব বেশী আশা করেছি? ভেবে দেখা দরকার।

খোজ - দ্যা সার্চ সিনেমার গ্রহনযোগ্যতা অনেক দর্শকের কাছে প্রচন্ড কমেডি - সিনেমার নাম শোনা মাত্র হাসিতে ফেটে পড়েন কেউ কেউ। কিন্তু সত্যিই এই সিনেমাতে হাসার মতো এত উপাদান আছে কিনা সেটা বিশ্লেষনযোগ্য। সিনেমার জেনার হিসেবে খোজ-দ্য সার্চ অবশ্যই কমেডি সিনেমা নয়, বরং পুরোদস্তুর অ্যাকশন সিনেমা। এই সিনেমায় এমন অনেকগুলো বিষয় আছে যা বাংলাদেশী সিনেমায় প্রথম বললে অত্যুক্তি করা হবে না। একটু পেছন ঘুরে দেখা যাক।

বিদেশে কোন একটা অপারেশনে কর্মরত মেজর মাহমুদকে বাংলাদেশ সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান জরুরী ভিত্তিতে ডেকে পাঠান দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায়ে জড়িত একটি গ্রুপকে ধ্বংস করার জন্য। সাথে সহযোগিতা করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয় ক্যাপ্টেন ববিকে। দেশে ফিরে একটি দলকে ধাওয়া করার সময় মেজর মাহমুদ আক্রান্ত হন এবং শত্রুশিবির তার মগজ ধোলাই করে তাকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নেয়, নতুন নাম দেয়া হয় অনন্ত। যদিও পূর্ব স্মৃতির কিছু কিছু মেজর মাহমুদের চোখে ভেসে উঠে কিন্তু তা যথেষ্ট নয় - শত্রদলের প্রথম মিশনে মেজর মাহমুদ ব্যর্থ হয়, নাবালিকা একটি শিশুকে হত্যায় অপারগতা প্রকাশে। শত্রুদল তাকে হত্যা প্রচেষ্টা চালায়, এবং মেজর মাহমুদ নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে। নদী থেকে কুড়িয়ে পাবার তিনমাস পড়ে জ্ঞান ফেরার পরে ঘটনাচক্রে মেজর মাহমুদের সাথে দেশীয় গডফাদার এর কন্যার সাথে পরিচয় এবং তাকে রক্ষা করতে গিয়ে একে একে শত্রুদলের সবার পরিচয় উদ্ধার, নিজের পূর্ব ইতিহাস ফিরে পাওয়া এবং শত্রুদলের দমন - এই হলো সিনেমার কাহিনী।

মোটাদাগে কাহিনী হিসেবে এর অভিনবত্ব নেই হলিউড সিনেমায় অভ্যস্ত দর্শকদের কাছে, যদিও এধরনের কাহিনী এদেশে খুব বেশী নেই। সিনেমার কাহিনীর চেয়ে দুর্বলতা ফুটে উঠেছে এর সংলাপে, গল্প বলার গতিতে। কাহিনীতে অনাবশ্যক গতি এবং স্থিরতা- উভয়ই বিদ্যমান। এই গতি এবং স্থিরতার পেছনে হয়তো প্রযোজক অনন্তই দায়ী। সংলাপের দিক থেকে গতানুগতিক বাংলা সিনেমার সাথে এর তফাৎ অনেক। সিনেমায় ইংরেজি ডায়লগের পরিমান নিতান্ত কম নয় - এর অনেকটা সিনেমার প্রয়োজনে, অনেকটা বাড়াবাড়ি। ঘাটতি আছে সিনেমার লোকেশন বাছাইয়েও। দেশীয় অংশের লোকেশন খুব বিবেচনা করে বাছাই করা হয়নি বরং হাতের নাগালেই পাওয়া যায় এমন কোন অংশে কাজ করার সম্ভাবনা বেশী বলে মনে হয়েছে।

পরিচালক-চিত্রগ্রাহক-সম্পাদকের স্থানে ইফতেখার চৌধুরীর নাম রয়েছে। এই সিনেমার চিত্রগ্রহন এবং সম্পাদনায় কোয়ালিটির পার্থক্য এত বেশী যে সন্দেহ জাগে। যদি সত্যিই ইফতেখার চৌধুরী এর চিত্রগ্রহন এবং সম্পাদনার দায়িত্বে থাকেন তবে বলতে হবে এই ভদ্রলোক প্রতিভাবান। কিছু কিছু অংশে বিশেষত: বিদেশী দৃশ্যায়ন এবং সম্পাদনা মোটেও সাধারণ নয় এবং এর গুনগত মান দারুন। বাংলাদেশী সিনেমায় সম্পাদনার ক্ষেত্রে এই গতি নতুন। তাছাড়া, প্রযোজক-নায়ক অনন্ত এই সিনেমায় যে সকল আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছেন তার অনেকগুলো বাস্তবসম্মত - উদ্ভট ডিজাইনের নয়। সম্ভবত এই প্রথম বাংলাদেশী সিনেমায় উজি সাবমেশিনগান টাইপের অস্ত্রের ব্যবহার দেখানো হয়েছে। ভিন্নতা আছে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে - প্রত্যেকটা অ্যাকশন দৃশ্য বেশ পরিশ্রমের সাথে নেয়া হয়েছে - খেয়াল করলেই বোঝা যায়। গোলাগুলির দৃশ্যের পুরোটাই সম্পাদনার টেবিলে করা হয়েছে সে স্পষ্ট - এটা আগ্রহ সৃষ্টিকারী। গতানুগতিক বাংলা সিনেমার মতো পিস্তল থেকে কামানের মতো ধোয়া বের হয়নি বরং হলিউডি সিনেমার আমেজ সামান্য হলেও পাওয়া যায়। এর বাইরে যে কারণে এই সিনেমার প্রশংসা করা যায় তা হলো এর সাউন্ড ট্র্যাক। আমি জানি না, এই সাউন্ডট্র্যাক অরিজিনাল কিনা - যদি হয় তবে এর জন্য বাহবা দিতেই হয়। বেশ ভালোভাবেই বোঝা যায়, প্রযোজক অনন্ত সিনেমার নির্মানে বলিউডকে নয়, হলিউডকে অনুসরন করার চেষ্টা করেছেন।জনকন্ঠের একটা রিপোর্ট কপি-পেস্ট করছি -
যেসব প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে হলিউড বলিউডের ছবি বিশ্ববাজার দখলে রেখেছে, সেসব প্রযুক্তির সংস্পর্শেই নির্মিত হয়েছে 'খোঁজ-দ্য সার্চ।' বাংলাদেশের কোন ছবির বেলায় এমন ঘটনা এটিই প্রথম। এর সাউন্ড সিস্টেম, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং এ্যাকশন ইফেক্ট অন্য বাংলা চলচ্চিত্রগুলোর থেকে আলাদা। ছবিটি এইচডিভি ক্যানন এ-১ ক্যামেরায় ২৪ এফপিএসে ধারণ করা। পটভূমির গভীরতা ধারণের জন্য ক্যামেরাতে ৩৫ মি.মি. এসএলআর এ্যাডাপ্টর এবং নাইকোন ল্যান্স যোগ করা হয়েছে। শূ্যটিং ক্যামেরায় ধারণের পর মূল এইচডিভি ফাইলকে ৪-কে সিনেফর্ম ফাইলে রূপানত্মর করে এডব সিএস-৪-এর মাধ্যমে মাস্টারিং করা হয়। আর সাউন্ড ইফেক্টের ক্ষেত্রে অডিশন ৩.০ ব্যবহার করা হয়েছে। ভিজু্যয়াল ইফেক্টের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে আপ্টার ইফেক্টস, সিনেমা ৪-ডি এবং ইমাজিনার সিস্টেম মকি-মনেট-মচা। এছাড়াও এ্যাকশন লাইব্রেরী থেকে অন্য ইফেক্টসমূহ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ছবির কলার কারেকশনের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের আধুনিকতম প্রযুক্তি। কাহিনীর প্রয়োজনে ছবিতে হেলিকপ্টার, স্পীডবোট, হর্স রাইড, মোটরবাইকসহ নানা ধরনের বাহন ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও এ ছবির শূ্যটিং হয়েছে আমেরিকা ও নেপালে।

এই সিনেমার সবচে বড় দুর্বলতা অভিনয়ে। নায়ক নায়িকা সম্পূর্ন নতুন এবং তাদের অভিনয় যোগ্যতা পরিমাপযোগ্য নয়। তাদের কাচা অভিনয়, সংলাপ উপস্থাপনে অনভিজ্ঞতা-অপরিপক্কতা সিনেমা দর্শককে বিরক্ত করবে স্বাভাবিক। সম্ভবত এর প্রধান কারণ হলো প্রযোজক অনন্ত। আমি জানি না এই সিনেমার কাস্টিং ডিরেক্টর কে ছিলেন - বোধকরি অনন্ত। তিনি চেহারার দিকে যতটা মনযোগ দিয়েছেন তার সিকিভাগও যদি অভিনয় যোগ্যতার দিকে দিতেন তবে সেটা অনেক সাফল্য বয়ে আনতো। অবশ্য অনন্তের পক্ষে সাফাই গাওয়া যায় এভাবে - এ ধরনের সিনেমা নির্মানে প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রযোজক অনন্ত যে পরিমান ব্যয় করেছেন তার পাশাপাশি ভালো অভিনেতার ব্যয় বহন করা সহজ ছিল না। কারণ সিনেমা নির্মান পদ্ধতিই বলে দেয় - অনেক সময় নিয়ে সিনেমার শ্যুটিং পর্ব চলেছে। বাংলাদেশের ভালো অভিনেতারা যেরকম শিডিউল স্বল্পতায় ভোগেন, তাতে তাদের দিয়ে কাজ করাটা কঠিন ছিল। তাছাড়া, প্রধান চরিত্রে রূপদানকারী অনন্ত নিজেই খুব কাচা অদক্ষ অভিনেতা। হয়তো সিনেমার প্রযোজক বলেই তিনি এই সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

আশার দিকে অনেক। প্রযোজক অনন্ত এই সিনেমায় বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন একটি ধারা তৈরী করার চেষ্টা করেছেন। সামাজিক-অ্যাকশন সিনেমার ধারা থেকে বেরিয়ে শুধু অ্যাকশন সিনেমার এই পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে পরবর্তীতে কমেডি, ড্রামা, হরর ইত্যাদি সিনেমার পথ খুলে দেবে। টেকনিক্যাল বিষয়গুলো প্রযোজক অনন্ত'র কাছেই আছে - প্রয়োজন হলো তাকে ভালো সংলাপসমৃদ্ধ কাহিনী সরবরাহ করা এবং অনন্তকে রাজী করানো যে তিনি প্রযোজক হিসেবেই বেশী সফল হবেন, নায়ক হিসেবে নন। সিনেমার ব্যর্খতাগুলো স্বাভাবিকভাবে নেয়া যায় - এতদিনে সিনেমার যে ধারা তৈরী হয়েছে সেখান থেকে বেরিয়ে হঠাৎই হলিউড পর্যায়ের সিনেমা নির্মান সম্ভব নয়, এ আকাশ কুসুম স্বপ্ন এবং আশা করাও উচিত নয়। কিন্তু এ ধরনের সিনেমা নিয়ে হাস্যরস করা পরোক্ষভাবে এই ইন্ডাস্ট্রিরই প্রসারে এবং উন্নয়নে বাধাগ্রস্থ করবে - যে আগ্রহ এবং আশা নিয়ে সিনেমার দর্শকরা সিনেমা হলে গিয়েছিলেন তা পূরন তখনই হবে যখন এ ধরনের সিনেমা আরও নির্মান হবে, ধীরে ধীরে উন্নতি হবে, নির্মান বন্ধ হয়ে গেলে অ্যাকশন ধর্মী সিনেমা দেখে হাসার সুযোগটাও হারাতে হবে - দেশীয় সিনেমা বিশ্বজয় করবে সেই স্বপ্ন দেখার সাধ্যটিও হারিয়ে যেতে বাধ্য থাকবে তখন।