রাজনৈতিক সম্পাদিত-প্রকাশিত: http://goo.gl/3yAgw

গভর্নর ওডিয়াস, যিনি নানা কারণে কুখ্যাত।  যেমন তিনি পাঁচজন তরুনের জীবনে দুর্ঘটনার কারণ। এই দুর্ভাগা পাঁচ কারা?

ওটা বেংগা, জন্ম থেকেই গভর্নর ওডিয়াসের দাস। আখ ক্ষেতে প্রাণপন পরিশ্রম করে ভাইয়ের সাথে মিলে। কিন্তু অত্যাধিক পরিশ্রমে ভাই মারা গেলে ওটা বেংগা ক্ষিপ্ত হয়ে সবাইকে মুক্ত করে দেয় এবং প্রতিজ্ঞা করে –  গর্ভনর ওডিয়াসকে হত্যা করবে।

ইন্ডিয়ান এক যোদ্ধা –  একজন সিং, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হলে তার ভ্রু ঘামে, বিয়ে করেছিল সবচে’ সুন্দরী এক মেয়েকে। কিন্তু গভর্নর ওডিয়াস কুষ্ঠ রোগীর বেশে দেখতে এলো তার স্ত্রীকে।  যোদ্ধা সিং তার ঘরের পাহারায় থাকলো, জানলো না তার স্ত্রীকে চুরি করে গভর্নর ওডিয়াস নিয়ে গেছে আগেই।  মুক্তির একটাই রাস্তা ছিল এক’র স্ত্রীর সামনে – অনেক উচুঁ দেয়াল থেকে লাফিয়ে মরলো সে।  রক্তপণ করলো যোদ্ধা – ওডিয়াসকে মারবে সে।লুজি একজন বোমা বিশেষজ্ঞ। নতুন বোমাটা আবিস্কারের পরে গভর্ণর ওডিয়াস তাকে একঘরে করে রেখেছে–  সুতরাং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো লুজি–  ওডিয়াসের মৃত্যু তার হাতেই হবে।

তরুন চার্লস ডারউইনের আগ্রহ পৃথিবীর জীবজগতের ওপর–  আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায় সে, সাথে তার পোষা বানর ওয়ালেস। আমেরিকানা অ্যাক্সেটিকা নামের এক প্রজাপতির খোঁজে ব্যস্ত সে। কিন্তু গভর্নর ওডিয়াস একদিন তাকে পাঠালো একটি প্রজাপতি–  মৃত। প্রতিজ্ঞা করলো ডারউইন–  গভর্নরের মৃত্যু চাই।

আর আছে এক দস্যু, কালো দস্যু–  তার চোখ মুখোশে ঢাকা।  গভর্নর ওডিয়াসও তারা কি করতে চায়।  তাদের বন্দী করে রাখে বাটারফ্লাই রিপে–  চারদিকে সমুদ্র ঘেরা প্রজাপতি আকৃতির একটি ছোট্ট সৈকতে।  অথচ কালো দস্যুর ভাই নীল দস্যু ধরা পড়েছে গভর্নর ওডিয়াসের হাতে–  তাকে হত্যা করা হবে শীঘ্রই।  বাচাঁতে হলে পার হতে হবে সমুদ্র,  কিন্তু কালো দস্যু যে সাতাঁর জানে না !  এখন কি হবে?

পাঠক, এই যদি হয় গল্পের শুরু ভাবছেন এর শেষ হবে গভর্নর ওডিয়াসকে হত্যার মধ্য দিয়ে।  মাঝে থাকবে প্রেম আর প্রতিশোধের এক মহাকাব্য।  কিন্তু চলচ্চিত্র ‘দি ফল’ মোটেও অমনধারা নয়।  পুরো সিনেমার গল্পটা যেন একতাল কাদা, যখন তখন যে কোন মুহুর্তে পাল্টে যেতে পারে পুরোটাই।  পাইরেটরা হয়ে যেতে পারে প্রতিশোধাকাঙ্খী, স্বপ্নের নায়িকা মুহূর্তে হতে পারে গভর্নরের প্রেমিকা।

এই মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রের পরিচালক তারসেম সিং, তারসেম নামেই বেশী পরিচিত, একজন ইনডিয়ান।  ছাত্রজীবন শেষে পাড়ি জমিয়েছিলেন  ইউএসএ’তে,  হাতে ‘গাইড টু ফিল্ম স্কুলস ইন আমেরিকা’–  সময়টা ৮০র দশক।  একটা কঠিন সময় পাড়ি দিয়ে একসময় ঢুকে পড়তে পারলেন প্রদর্শন শিল্পে–  অবশ্য ঠিক চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে নয়, বিজ্ঞাপন নির্মাতা হিসাবে। বানিজ্যিক বিজ্ঞাপনচিত্র আর সংগীত চলচ্চিত্র বানিয়েই পরিচিতি পেয়েছেন–  বিশেষ করে নাইকি, কোকাকোলা এবং জঊগ এর মিউজিক ভিডিও ‘লুজিং মাই রিলিজিয়ন’ এর জন্য।

তার চলচ্চিত্র ‘দি ফল’ দর্শককে টেনে নিয়ে যায় সুদূর শৈশবে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে চলচ্চিত্রের একজন স্টান্টম্যান রয় (লি পাসে)  চার বছরের ছোট্ট মেয়ে আলেকজান্দ্রিয়া’কে (কাটিনকা উনতারু) শোনায় একটি গল্প–  কিন্তু গল্পের সারেং হলো ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে আলেকজান্দ্রিয়া–  আর আমরা গল্পটা দেখি তারই চোখ দিয়ে। ছোট্ট কিংবা বড়বেলা যাই হোক না কেন–  একটি গল্প শুনলে বা পড়লে আমরা অন্তরের যে চোখ দিয়ে তাকে দেখতে পাই, উপলব্ধি করি ঠিক তাই তুলে ধরা হয়েছে দি ফল-এ।


আলেকজান্দ্রিয়ার চোখে আমরা দেখি দুর্দান্ত এক মহাকাব্যিক কাহিনী,  প্রতিশোধস্পৃহার এক অদম্য গল্প,  গভর্নর ওডিয়াস (ডেনিয়াল কালটাগিরনি) যার একমাত্র খলনায়ক।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা ‘রয়’ সিনেমা জগতে প্রবেশের চেষ্টারত একজন–  ভাগ্য তাকে এতটুকু সহায়তা করেছিল যে স্টান্টম্যান এর কাজটুকু যোগাড় করার সৌভাগ্য তার হয়েছিল।

স্টান্টম্যানরাও নায়িকার প্রেমে পড়তে পারে, পড়েছিল রয়–  দু:সাহসিক অভিনয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল রেলসেতু থেকে নিচের নদীতে–  তাতেই বিপত্তি–  হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাটাতে হচ্ছে তাকে।  সামনে অনিশ্চয়তা–  আদৌ কোনদিন ফিরতে পারবে কিনা সেই রূপালি পর্দার জগতে।  রয়ের জীবনের এই হতাশা গল্পের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে, মাঝে মাঝেই গতিপথ পাল্টে গিয়ে উঁকি দেয়।

চিত্রনাট্যের অভিনবত্ব চোখে পড়ার মতো।  গল্পের শ্রোতা একজন শিশু,  আর বক্তা পঙ্গু স্টান্টম্যান।  গল্প বলার উদ্দেশ্য শিশুটিকে প্ররোচিত করে মরফিনের শিশিটি হস্তগত করা।  তিনি তার হতাশ জীবনের সমাপ্তি ঘটাবেন।  একজন শিশুর দৃষ্টিতে চিত্রায়ন বলে সে চেনা মানুষকে দিয়ে ভাবার চেষ্টা করে।  সেখানে স্টান্টম্যানের এক পায়ের বন্ধু হয়ে যায় কালো দস্যুর সঙ্গী লুজি।  হাসপাতালের বরফ সরবারহকারী হয়ে যায় গভর্নরের দাস ওটা বেংগে।  যে অভিনেতার স্টান্ট করতে গিয়ে শয্যাশায়ী সে হয়ে যায় গভর্নর ওডিয়াস।  সেবিকা হয়ে যায় ওডিয়াসের প্রেমিকা।  গল্প কথক রয়’ই তো কালো দস্যু, যার সঙ্গী হিসাবে সে গল্পে প্রয়োজনে ঢুকে পড়তে পারে শ্রোতা আলেক্সান্দ্রিয়া।  আর তাই, প্রায় প্রত্যেক অভিনেতাকেই আমরা দুটো করে চরিত্রে দেখতে পাই।

তারসেমের প্রথম চলচ্চিত্র ‘দি সেল’ সমালোচকদের সুনাম কুড়িয়েছিল বেশ।  চলচ্চিত্রের সমালোচনায় প্রথম পুলিৎজার পুরষ্কার জয়ী আমেরিকান চিত্রনাট্য রচয়িতা ‘রজার এবার্ট’ দি সেলকে চারে চার দিয়েছিলেন।  এখন বানালেন  ‘দি ফল’।  কিন্তু কাহিনীর রয় কিম্বা সেই কালো দস্যুর মতো পুরো অভিযানটি মোটেও সহজ ছিল না।  বিজ্ঞাপনচিত্র আর সংগীত চলচ্চিত্র নির্মান করে যে টাকা জমিয়েছিলেন তার প্রায় পুরোটা খরচ করেছেন এই চলচ্চিত্রের পেছনে।  চার বছর সময় নিয়ে পৃথিবীর ২৮ টা দেশ ঘুরে চমৎকার সব স্থানে দৃশ্যধারণ করে নির্মান করেছেন ‘দি ফল’।

এমন একটা চিত্রনাট্য যা লিখছে চার বছরের একটি মেয়ে–  তার দর্শক হবে কারা সেটা নির্ণয়ে বেগ পেতে হয়েছে পরিবেশকদের,  আর তাই টরেন্টো ফিল্ম ফেস্টিভালে ২০০৬ সালে প্রদর্শন করা হলেও সারা বিশ্বে মুক্তি দিতে হয়েছে ২০০৮ সালে–  কারণ পরিবেশক পাওয়া যাচ্ছিল না।  অবশ্য টরেন্টো ফেস্টিভালের পরে সমালোচকদের নেতিবাচক মন্তব্যও এর পেছনে যথেষ্ট প্রভাব রেখেছিল।  হাল ছাড়েন নি তারসেম, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা রয়, কিংবা রয়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা তারসেম–  শেষ পর্যন্ত এগিয়ে গেছেন এবং সফল হয়েছেন।

বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতাদের সিনেমার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে ‘দি ফল’-এ গল্পের তুলনায় এর লোকেশন বাছাই এবং চিত্রায়ন বেশী গুরুত্ব পেয়েছে। রোমানিয়ার ছোট্ট আলেক্সান্দ্রিয়াকে খুজে পাবার পরে দক্ষিন আফ্রিকার কোন এক হাসপাতালে শ্যুটিং শুরু করেন তারসেম। ইংরেজি না জানা আলেক্সান্দ্রিয়াকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে হয়েছে – সংলাপ বলার সময় সমস্যা হলে পাল্টে দিয়েছেন শব্দটিও।  হাসপাতালে রয় এবং আলেক্সান্দ্রিয়ার অংশগুলো ক্যামেরায় ধারণ করার পরে চার বছর সময় ব্যয় করেছেন পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।  ইউএসএ, পেরু থেকে শুরু করে ইনডিয়া পযর্ন্ত।
সিনেমার লোকেশনগুলো সম্পর্কে জানতে দেখুন

আর এই সব হয়েছে আলেক্সান্দ্রিয়ার চোখে গল্পটি যেভাবে ফুটে উঠেছে তার চিত্রায়নে। মজার ব্যাপার হলো–  দৃশ্যধারণের এর পুরোটা সময় অখ্যাত অভিনেতা লি পাসে (রয়) হুইল চেয়ার আর বিছানায় কাটিয়েছেন–  তিনি যে সত্যিকারের পঙ্গু নন, সেটা জানা ছিল পরিচালক বাদে আরেকজনের, যে নার্সটি তাকে বাথরুমে নিয়ে যেতো, তার। পুরো ইউনিটের কাজে যেনো একাগ্রতা আর মৌলিকত্ব থাকে,  তাই এই প্রচেষ্টা।

দৃশ্যধারণের স্থান বাছাইয়ের কাজে তারসেম যে পরিশ্রম করেছেন তা সত্যিই বিস্ময়কর। প্রযুক্তির এই জয়জয়কারের জমানায় তিনি এমন সব জায়গা খুজে বের করেছেন যা দেখলে কম্পিউটার গ্রাফিক্স ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না–  বিস্ময়কর হলেও সত্য, চলচ্চিত্রটির দৃশ্যধারণের সব স্থানই দুনিয়ায় অস্তিত্বমান, কোনোটিই প্রযুক্তি নির্মিত নয়। চিত্রায়নের অসাধারনত্বে নতুন রূপে ফুটে উঠেছে সব কিছু। আরো চমৎকারিত্ব হলো এর শুরুটা হয় বিটোফনের ক্লাসিক সেভেনথ সিমফোনির বাজনা দিয়ে।


প্রথমদিকে নেতিবাচক সমালোচনার মুখে পড়লেও পরে তারসেমের এই কাজটি সবার দৃষ্টি আকর্ষন করেছে।  গুনী চলচ্চিত্র পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চার সহায়তা করেছেন  চলচ্চিত্রের নির্মানে,  প্রশংসা করেছেন তারসেমের নান্দনিক বোধের।  রজার এবার্ট এই চলচ্চিত্রটিকেও চারে চার দিয়েছেন এবং তার তৈরী তালিকা- ২০০৮ সালের সেরা সিনেমার মধ্যে একে স্থান দিয়েছেন।  সাফল্য-যাত্রা শুরু হয়েছে এবার তার পথ ধরে আগামি ১১-১১-১১ তারিখে মুক্তি পেতে যাচ্ছে গ্রিক উপাখ্যান অবলম্বনে নির্মিত তারসেমের নতুন  চলচ্চিত্র–  ‘ইমমরট্যাল’।

দেখুন - দ্যা ফল নিয়ে তারসেমের ইন্টারভিউ: