খুবই গুরুত্বপূর্ন এক মিটিং বসেছে উপরে। জর্জ বেইলি নামে এক ভদ্রলোক বিপদে আছেন, এমনই সে বিপদ যে মুক্তির জন্য আত্মহত্যা ছাড়া আর কোন উপায় নেই, তাকে বাচাতে হবে। সময় আছে মাত্র এক ঘন্টা। দায়িত্ব পরলো ক্লারেন্স অডবডি নামের দ্বিতীয় শ্রেনীর এক ফেরেস্তার উপর, দুইশ বছর পার করার পরেও যার একজোড়া পাখা হয়নি, তার অবসর কাটে মার্ক টোয়েনের 'দ্যা অ্যাডভেঞ্চার অব টম সয়্যার' পড়ে। সফলতার পুরস্কার হলো একজোড়া পাখাপ্রাপ্তি, কিন্তু জর্জ সম্পর্কে জানতে তো হবে, তা নাহলে চিনবে কি করে? সুতরাং, জর্জের ডোশিয়্যারটা দেখানো হলো, সেটা আবার সিনেমার পর্দার মতোই, ইচ্ছেমতো স্টপ করে দেয়া যায়। প্রশ্ন হলো, কত মানুষ মরে কতখানে, সবাইকে বাদ দিয়ে এই লোকটিকে, এই জর্জ বেইলিকে বাচাতে হবে কেন? 

১৯৪৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কিংবদন্তী পরিচালক ফ্রাঙ্ক কাপরা পরিচালিত তার 'বক্স অফিস ফ্লপ' সিনেমা ইট'স আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ - এর শুরুটা এভাবেই দেখিয়েছেন। ১৯২২ সালে ডিরেক্টরিয়াল ডেব্যুর মাধ্যমে শুরু করে ফ্রাঙ্ক কাপরা ততদিনে 'স্বর্ণছোয়া'র অধিকারী - ইট হ্যাপেন্ড ওয়ান নাইট, মি. ডিডস গোজ টু টাউন, লস্ট হোরাইজন, ইউ ক্যান্ট টেক ইট উইদ ইউ, মি. স্মিথ গোজ টু ওয়াশিংটন, মিট জন ডো - ইত্যাদি সিনেমার মাধ্যমে তার প্রতিভা বারংবার প্রকাশ করেছেন। এই সিনেমাগুলো অস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে, দুএকটি বাদে পুরস্কার জিতে নিয়েছে প্রায় সবগুলো সিনেমাই। এরকম এক পরিচালকের কাছ থেকে 'ফ্লপ' সিনেমা পাওয়ার পরে মন্তব্যটা এরকমই ছিল - ফ্রাঙ্ক কাপরার সেই সুদিন শেষ হয়েছে, হারিয়েছে সেই 'স্বর্ণছোয়া' ক্ষমতা। বাস্তবিকই সিনেমাটির ব্রেক ইভেন পয়েন্ট ছিল ৬.৩ মিলিয়ন ডলার যা তার নির্মান ব্যায়ের দ্বিগুন।

ফ্রাঙ্ক কাপরা কি 'ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ' সিনেমার হিরো জর্জ বেইলির মতো কেউ - যার ভালোত্বের গুরুত্ব বুঝে উঠতে একটু সময় লাগে? জর্জ বেইলি ভালো মানুষ - আগাগোড়া। বাল্যে ছোটভাই হ্যারিকে বাচাতে গিয়ে নিজের একটি কান খুইয়েছেন, যৌবনে সেই হ্যারির পড়াশোনার জন্যই বিদেশ যাওয়ার শখটি অপূর্ন রেখেছেন, পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব হাতে নিয়েছেন। মন্দ না থাকলে ভালোর গুরুত্ব অনুভূত হয় না, তাই মন্দের এজেন্সি হেনরী পটারের কাছে। সে একজন শাইলক, টাকা চাই তার, সে জন্য আশেপাশের সব মানুষ যদি না খেয়েও মরে তো কি?

ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে মানুষের মনে শান্তি ছিল না, 'আমেরিকানদের'ও না। মহামন্দার পরপরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হ্যারী যুদ্ধে গিয়েছিল, বেইলি পারে নি। যুদ্ধ শেষে শান্তি আসার কথা - কিন্তু ঝাক বেধে এল দু:খ আর হতাশা। আংকেল বিলির হারানো ৮০০০ ডলার ক্ষতিপূরনের জন্য তাই শেষ পর্যন্ত সেই পটারের কাছেই যেতে হলো যাকে এক দশক আগে বার্ষিক ২০,০০০ ডলারের চাকরীর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল। বেইলির পতন সবসময়ই কাম্য মন্দ লোকদের রাজা পটারের, তাই দেউলিয়া বেইলিকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়া পটারের কর্তব্য মনে হয়েছিল। স্বর্গীয় সাহায্য ঠিক তখনই এলো।

সমাজে ভালো মানুষের দরকার আছে, তারা মেয়েদের চুলের কাটা/ক্লিপের মতো, যাদের অবর্তমানে সবাই এলোমেলো, অবাধ্য আর উশৃংখল হয়ে পড়ে। জর্জ বেইলী-হীন বের্ডফোর্ড ফলস হয়ে যায় শাইলক পটারের নামানুসারে 'পটারভিলস', শহরজুড়ে শুধু নাইটক্লাব আর শাইলকিয় কারখানা। একটা ভালোর অবর্তমানে যদি হয় এই অবস্থা, তবে বিভিন্ন প্রান্তের ভালো মানুষেরা কি অবদান রেখে যাচ্ছেন তা কি অনুভবযোগ্য? পাচটি সন্তানের জনক জর্জ বেইলী হয়তো তার ভালোবাসার মানুষ স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফিরে আসে, শহরের সব লোক হয়তো বিপদের দিনে ভালোমানুষটির জন্য সামান্য হলেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে - কিন্তু পটাররূপী মন্দ মানুষটির কি হবে? ভালো মানুষটি তো বিপদে স্বর্গীয় সহযোগিতায় সিক্ত হয়, কিন্তু মন্দ মানুষটিও তো তার অপরাধের জন্য শাস্তি থেকে বঞ্চিত থাকে। ওই পার থেকে যদি সাহায্য আসে, তারমানে কি মন্দত্বের শাস্তিও কি সেই পারেই পেতে হবে? যারা 'ওইপারে' বিশ্বাসী নয় তাদের কি হবে তবে? ফ্রাঙ্ক কাপরা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি বোধহয়, তাই জর্জ বেইলী বিপদ থেকে মুক্তি পেলেও হেনরী পটার থেকে যায় বহাল তবিয়্যতে।

ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ একটি ফ্যান্টাসী সিনেমা, সুতরাং  এখানে বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভালত্বের যে পরিচয় ফ্রাঙ্ক কাপরা দেখিয়েছেন তা তো ফ্যান্টাসীও নয়, 'সেযুগের জন্য'ও প্রযোজ্য নয়। নাইটক্লাব আর জামানতের বিরুদ্ধে ঋনপ্রদান এখনো চালু আছে - এবং যুগের সাথে সামঞ্জস্য রাখার বরং বেশ প্রয়োজনীয়ই হয়ে যাচ্ছে ! মূ্ল্যবোধ আর সততার সংজ্ঞা বোধহয় পাল্টেনি এখনো। সততার পুরস্কার আছে, আছে বন্ধুত্বের পুরস্কারও। এই সহজ সরল সত্যটিই ফ্রাঙ্ক কাপরা তুলে ধরতে চেয়েছেন, হয়তো ফ্যান্টাসীর আশ্রয় তার কাছে সবচে' গ্রহনযোগ্য পন্থা বর্তমান ছিল।

ফ্রাঙ্ক কাপরার এই আপাত 'ফ্লপ' সিনেমাটিই কিন্তু এখন শ্রেষ্ঠত্বের আসনে। আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউটের সেরা ১০০ সিনেমার তালিকায় তার অবস্থান প্রথম বিশে, ফ্যান্টাসীতে প্রথম পাচে, আইএমডিবির সেরা ২৫০ এর মধ্যে ২৮। জর্জ বেইলীর রূপে জেমস্ স্টুয়ার্ট আর মেরী বেইলীর রূপে ডোনা রিড অসাধারণ। তাদের প্রেম 'লাইফ ইজ বিউটিফুল' সিনেমার গুইডো আর ডোরা কথা মনে করিয়ে দেয়।

ভালো হোন, ভালো থাকুন, নিশ্চিত থাকুন বিপদে অন্তত: দ্বিতীয় শ্রেনীর কোন ফেরেস্তা আপনার সাহায্যার্থে প্রেরিত হবে।