বিশ্ববিখ্যাত ফিল্মমেকার স্ট্যানলি কুব্রিক  যখন তার ২০০১: এ স্পেস ওডিসি নামক মুভিটির মুক্তি দিলেন, তখনই সিনেমাবোদ্ধারা বুঝতে পেরেছিলেন, অবশ্যই এই সিনেমা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিবে। ৪০ বছর পরে আজকের এই সময়ে তাদের ধারনার সত্যতা প্রমান পাওয়া যায়, সিনেমার পাতায় স্থান করে নিয়েছে ২০০১: এ স্পেস ওডিসি। কি ছিল এই সিনেমায়? পুরো মুভিটিকে চারটি ভাগে ভাগ করে দেখিয়েছিলেন কুব্রিক – এর প্রথম ভাগে ছিল বিবর্তনপূর্ব মানুষের বানর রূপ এবঙ পরবর্তী অংশগুলোতে দেখিয়েছেন ভবিষ্যত পৃথিবীর সকল ঘটনা, যেখানে রয়েছে স্পেসশিপ, ভিন্নগ্রহে যাতায়াত ইত্যাদি। ২০০৬ সালে জনপ্রিয় অভিনেতা মেল গিবসনের পরিচালনায় অ্যাপোকেলিপ্টো সিনেমা মুক্তির পরেও এ ধরনের গুঞ্জন শুরু হয়েছিল, কারণ সভ্যতা বিবর্জিত এক মানবসমাজের কাহিনী তুলে ধরেছিলেন তিনি। একই বছর ৩০০ নামে একটি মুভি মুক্তি পায় যেখানে খ্রীষ্টপূর্ব ৪৮০ সালের এক যুদ্ধের ঘটনা বিবৃত হয়েছে। এ সকল সিনেমা ছাড়াও আরও যে সকল ইতিহাস নির্ভর সিনেমা মুক্তি পেয়েছে তার প্রায় সব কটিই ব্যবসা সফল এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ সকল  মুভিই জনপ্রিয়তা অর্জনের  পেছনে প্রযুক্তির ব্যবহার  ছাড়াও যে কারনটি রয়েছে তা হলো ইতিহাসকে তুলে ধরা – ভুল এবং সঠিকভাবে। পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব সম্পর্কেও মুভি তৈরী হয়েছে। অ্যাপোক্যালিপ্টো সিনেমার পরিচালক মেল গিবসনই দ্য প্যাশন অব দ্য ক্রাইস্ট নামক সিনেমায় অভিনয় করে খ্রীষ্টান ধর্মাবলাম্বীদের ভালোবাসা ও নিন্দা কুড়িয়েছিলেন, মুভিটি অস্কারের জন্যও মনোনীত হয়েছিল। নুহ নবীর প্লাবন সংক্রান্ত সিনেমাও নির্মিত হয়েছে। এ সকল সিনেমার মাধ্যমে ততকালীন সমাজের দুরাবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এবং মহান ব্যক্তিদের ভূমিকা বর্ননা করা হয়েছে।

আমাদের  প্রিয় নবীজি হযরত মুহাম্মদ (স) কে নিয়ে এরকম একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭৬ সালে,পরিচালক ছিলেন সিরীয় বংশোদ্ভূত মুস্তাফা আক্কাদ, নাম মুহাম্মদ: দ্য মেজেঞ্জার অব গড । আরবি ভার্সনের নাম আল রিসালাহ হলেও মুভিটি দ্য মেসেঞ্জার নামেই বেশী পরিচিত। মুক্তির আগে থেকেই সিনেমাটি প্রচন্ড আলোচনার জন্ম দেয় এবং মুক্তি পরবর্তী সময়ে  আলোচনা-সমালোচনাকে পাশ কাটিয়ে সবার মন জয় করে নেয়। হযরত মুহাম্মদ (স) কে নিয়ে এ পর্যন্ত ৮-১২ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে এবং দ্য মেসেঞ্জার এদের মধ্যে একমাত্র ফিচার ফিল্ম। বাকী সিনেমাগুলোর প্রায় সবকটিই ডকুমেন্টারী এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেল কতৃক নির্মিত, বিবিসি এদের মধ্যে সর্বাগ্রে।

মুহাম্মদ: দ্য মেসেঞ্জার অব গড মুভিতে নবীজি হযরত মুহাম্মদ (স) এর ইসলাম প্রচারের খন্ড খন্ড চিত্র বর্নিত হয়েছে। নবুয়্যত  লাভের পর মক্কার প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইসলাম প্রচার, অত্যাচারিত হওয়া, পরবর্তীতে  মদীনায় হিজরত এবং মক্কা  বিজয় – এ সকল বিষয় ফুটে উঠেছে সিনেমাটিতে। এ ছাড়াও ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত বদরের যুদ্ধ এবং ওহুদের যুদ্ধ দেখানো হয়েছে মুভিতে। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠে – এ মুভিতে হযরত মুহাম্মদ (স) কে কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, কিংবা কাহিনী কিভাবে বিবৃত হয়েছে। পরিচালক তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন এখানেই। সিনেমার কাহিনী এগিয়েছে ঐতিহাসিক চরিত্র হযরত হামযা (রা) যিনি নবীজি (স) এর চাচা ছিলেন, মক্কার কুরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ান এবং হামযার কলিজা ভক্ষনকারী হিন্দার বর্ননা অনুসারে। হামজা চরিত্রে অ্যান্হনি কুইন যিনি এর পূর্বে সেরা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য দুবার অস্কার পুরস্কার জিতে নিয়েছেন। এই তিন চরিত্র ছাড়াও ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল (রা), হযরত জায়েদ (রা), খালিদ বিন ওয়ালিদ, চাচা আবু তালিব এবং আবু লাহাবের চরিত্র উঠে এসেছে।

পুরো  সিনেমায় হযরত মুহাম্মদ (স) কিংবা খিলাফাতে রাশেদার  চার খলিফাকে জনগনের সামনে প্রকাশ করা হয় নি। বস্তুত: ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এমনটি করা হয়েছে। তাদের চরিত্র অন্য কোন মানুষ উপস্থাপন করতে পারেন না, তাদের গুনাবলী অন্যান্য সাধারন মানুষদের পক্ষে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে তাদেরকে উপেক্ষা করে তো আর কাহিনী এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়, তাই বুদ্ধিমত্তার সাথে তুলে ধরা হয়েছে তাদের কার্যাবলী। নবীজি (স) এর বাকানো লাঠি আর কোথাও কোথাও উটনীর মাধ্যমে তাকে প্রকাশ করা হয়েছে, কখনোও ক্যামেরাকেই নবীজি (স) হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে তবে তার কন্ঠ কিংবা শরীরের কোন অংশ প্রকাশ করা হয় নি। বদর কিংবা ওহুদ যুদ্ধে মূল নেতৃত্ব নবীজি (স) দিলেও সিনেমায় তার পালিত পুত্র হযরত যায়েদ (আ) কে নেতৃত্বের আসনে দেখানো হয়েছে, যিনি নবীজি (স) এর নির্দেশানুসারে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আবার হযরত আলী (রা) কে প্রকাশ করার জন্য তার দুমাথার তরবারী যুলফিকারকে দেখানো হয়েছে।

সিনেমার নির্মান সময় থেকেই নানা ঘটনা এবং আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই মুভিটি। মুহাম্মদ (স) কে চরিত্রকে রূপ দেয়া হয়েছে  – এরূপ আশংকায় আন্দোলন চলে এবং পরিচালক মুস্তাফা আক্কাদ বিভিন্ন ইসলামী চিন্তাবিদদের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেন। আবার মুক্তিপূর্ব সময়ে জিম্মির ঘটনাও ঘটেছে। সিনেমাটি মরক্কো এবং লিবিয়ায় নির্মিত হয়েছিল, সাড়ে চারমাস সময় নিয়ে মক্কা এবং মদীনাকে তৈরী করা হয়েছে এর জন্য।  মুক্তির পর মুভিটি সংগীতে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।

দ্য মেসেঞ্জার  সম্পর্কে সবচে নতুন তথ্যটি হলো অস্কার জোভি নামের  পরিচালক মুভিটি রিমেক করবার পরিকল্পনা করছেন। নতুন ভাবে নির্মিত হলে মুভিটি নতুন এক মাত্রা যোগ করবে এমনটি আশা করা যায়!

২০০২  সালে মুক্তি পাওয়া লিগ্যাসি অব প্রফেট বহুল আলোচিত এবং জনপ্রিয় একটি ডকুমেন্টারী যা প্রিয় নবীজি হযরত মুহাম্মদ (স) এর জীবনকে পুরোটা তুলে আনার চেষ্টা করেছে। দুঘন্টার এই ডকুমেন্টারীতে নবীজি (স) আগমনের পূর্ব অবস্থা, এবং আগমন পরবর্তী অবস্থার পরিবর্তন গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। ছবিটির পরিচালক উমর আল কাত্তান, ফিলিস্তিনী পরিবারের সন্তান। অবশ্য তিনি জর্দানে কাটিয়েছেন শৈশব এবং লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় লন্ডনে চলে আসেন এবং সেখানেই বড় হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে তিনি তার অতীত আরব জাতীয়তার প্রতি অনুরক্ত হন। ফিলিস্তিনিদের দুর্দশাগ্রস্থ জীবন দুনিয়ার কাছে তুলে ধরার জন্য তিনি সিনেমাকেই বেছে নেন এবং ইসলামের প্রতি তীব্র অনুরাগ তাকে লিগ্যাসি অব প্রফেট নির্মানে আগ্রহী করে তোলে। নি:সন্দেহে মুভিটি ইসলাম প্রিয় মানুষের কাছে ইসলামের ইতিহাস তুলে ধরতে সার্থক হয়েছে।

মুহাম্মদ: দ্য লাস্ট প্রফেট নামে একটি এনিমেশন মুভি হলিউড  থেকে মুক্তি পেয়েছে ২০০৪ সালে।  এ মুভিতেও হযরত মুহাম্মদ (স) এর পূর্ব সময় এবং জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। মুভিটির পরিচালক রিচার্ড রিচ। অবশ্য অন্তর্জালে এ মুভিটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের অভাব রয়েছে।

নবী করীম (স) কে নিয়ে চলচ্চিত্র বলতে মোটামুটি এসবই রয়েছে। এছাড়াও আরব নিয়ে নির্মিত হিস্টরী  চ্যানেল কিংবা বিবিসি কিছু ডকুমেন্টারী তৈরী করেছে  যেখানে হযরত মুহাম্মদ (স) এর কথা উঠে এসেছে। সিনেমা একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়েছে তাও একশ বছর পূর্ন  হলো। কিন্তু ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌছে দেয়ার এই চেষ্টাটুকু বাকী রয়ে গেছে। অবশ্য এ ব্যাপারে আশার সংবাদও রয়েছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক দৈনিকগুলোতে এ ধরনের একটি খবর পাওয়া যায়। হযরত মুহাম্মদ (স) কে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হতে যাচ্ছে হলিউডে – এমন একটি খবরে জানা যায়, ব্যারি ওসবোর্ন নামের হলিউডের অস্কার জয়ী প্রযোজক নবীজি (স) কে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মান করতে যাচ্ছেন। ব্যারি ওসবোর্ন একজন বিখ্যাত সিনেমা প্রযোজক – ম্যাট্রিকস, লর্ড অব দ্য রিংস নামের বিখ্যাত মুভিগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে তার নাম। বাজেট ধরা হয়েছে ১৫০ মিলিয়ন ডলার। এই বিগ বাজেটের মুভি খুব আকর্ষনীয় হবে এ আশা করা যায়। তবে হলিউডে নির্মিত হতে যাচ্ছে বলে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। কারণ এতে উপদেষ্টা হিসেবে মুসলিম স্কলার ইউসুফ আল কারযাভী থাকবেন বলে জানিয়েছে ইউরোপের গার্ডিয়ান পত্রিকা।

হলিউড মুহাম্মদ (স) কে নিয়ে মুভি বানাবে – এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারন ইসলামের প্রতি ভালোবাসার জন্য এ ধরনের মুভি তৈরীর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এমনটা ভাবা বোকামী। বরং এই ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আগামী একশো বছরের জন্য হয়তো ব্যবসা নিশ্চিত করবে। কিন্তু প্রশ্ন সেখানেও নয়, প্রশ্ন হলো – মুসলমানরা আর কতদিন এভাবে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকবে?