আমাদের বাসার সবার মাথায় সামান্য গন্ডগোল আছে। কেউ সুস্থ্য নয়। কিরকম? ধরা যাক, আমার বড় বোন জলি আপুর কথা। তার বিয়ে হয়েছে ছ'মাস মাত্র। দুলাভাই কুয়েত থাকেন। এই লোকটার জন্য আপু প্রেমে গদগদ অবস্থা। দৈনিক একটি করে চিঠি লিখে আর জমা করে রাখে। আমি বুঝিনা বর্তমানের এই যুগে মানুয় কিভাবে চিঠি লিখে! জিমেইল না ইমেইল বলে কি যেন আছে - ফুরুৎ করে চিঠি চলে যায় যে কোন জায়গায়। (অবশ্য কম্পিউটার লাগে এর জন্য) তা না করে সে কাগজ কলমে চিঠি লিখছে। আর প্রতিদিন দুপুর বারোটা দশ থেকে বারোটা পচিশ পর্যন্ত দরোজার ছোট ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে থাকেন ----কারণ পোস্টম্যান সাধারণত এই সময়টাতেই আসেন। পোস্টম্যান বক্সে চিঠি ফেলে যাওয়ামাত্রই জলি আপু দরোজা খুলে চিঠিটি নিয়ে আসে, তারপর খুশিতে আটখানা হয়ে মুচকি হাসতে হাসতে নিজের রুমে চলে যায়। হয়তো হাওয়ায় শাড়ির আচল ঘুরিয়ে দু এক পাক ঘুরে নেচেও নেয়। তারপর বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে চিঠিখানা পড়ে এবং পড়া শেষ হওয়া মাত্রই উত্তর লিখতে বসে যায়। চিন্তা করুন তো, আমার জলিআপু কি পরিমান পাগল! অবশ্য এ সকল কাজে কোন প্রবলেম নেই, সমস্যা হল তার লেখা এই চিঠিগুলো নিয়ে আমাকেই পোস্টাপিসে যেতে হয় দুলাভাইয়ের কাছে পাঠানোর জন্য। প্রতিবার পাঠানোর খরচ ৫২৩ টাকা। অবশ্য আমি একা পোস্টাপিসে যাই না, আমাদের কাজের ছেলে ভোলাও যায় আমার সাথে।

এই যে ভোলা, তার মাথায়ও প্রবলেম আছে। কি প্রবলেম সেটা খুব খোলসা করে বলা যাবে না - নিষেধ আছে। তবে একটু বলি। ভোলার বড় সমস্যা হল সে নিজেকে ছাড়া সবাইকে পাগল মনে করে। যেমন ধরুন, আমাকে। তার কথা হল চিঠি ডাকে ফেলতে যায় সে, আর আমি নাক তার সাথে যাই। এই কথা শুনে কার ভালো লাগে বলুন। আমি অবশ্য আগে খুব রাগ করতাম এই কথার জন্য, এখন আর রাগ করি না কারণ আমার দাদাজান বলেছেন, 'পাগল খেপিয়ে লাভ নেই।'

আমার দাদাজানও একটু পাগলা গোছের। আমাদের ড্রইংরুমের সাথেই বারান্দা। বারান্দার দরোজা দিয়ে সরাসরি ড্রইংরুমে প্রবেশ করা যায়। দাদাজান সেখানে তার সিংহাসনে বসে থাকেন (হি হি হি) সিংহাসন মানে বেতের তৈরী বিশেষ সোফা। তার কাছে সারাদিনই লোকজন আসতে থাকে - বিশেষ করে পাড়ার বুড়োরা। কেউ আসলেই দাদাজান তার সোফার পাশে লাগানো কলবেল চিপে ধরেন, তারপর আদেশ করেন - 'এই কে আছিস! মিজান সাহেব এসেছেন, চা নাস্তা দে!' প্রতিদিন অন্ততঃ বিশবার এরকম আপ্যায়ন করতে হয় - পাগলামি ছাড়া আর কি?

দাদাজানের কাছে যে বুড়োরা আসেন তারাও পাগল, আর নয়তো মাথা খারাপ। যেমন মিজান দাদুর কথাই ধরা যাক - সে সারাদিন বিড়ি খায়, আর এখানে আসলেই আমাকে বলেন - 'এই বাবু যাওতো তামাক সাজিয়ে আনো তো!' আমি অবশ্য পাত্তা দিই না। পাগলকে পাত্তা দিয়ে মা'র হাতে মার খাবো নাকি?

আমার মা'ও কেমন জানি! একটু পাগলাটে তো বটেই বোধহয় হাতে পায়েও সমস্যা আছে। আমার কাকু বলেন মাকে দৈনিক বক্সিং প্রাকটিসের মত থাপ্পড় মারা প্রাকটিস করতে হয়, তা না হলে নাকি হাতে পায়ে যন্ত্রনা করে। আর তাই দিনে বেশ কবার মা আমার উপর প্রাকটিস করে নেন। আমি অবশ্য মাকে অনেক ভালোবাসি আর তাই কিছু বলি না কিন্তু মা যখন ওয়ার্নিং ছাড়াই প্রাকটিস শুরু করে দেন তখন একটু দুঃখ লাগে। মনে করুন আমার ভাত খেতে কিংবা গোসল করতে ইচ্ছা করছে না অমনি মা তার প্রাকটিস শুরু করে দিলেন। ব্যাথা পেয়ে যদি আমি একটু কেদেঁ ফেলি তাহলেই মার প্রাকটিসের পরিমান বেড়ে যায়। মা তখন হাপাতেঁ থাকেন। চোখ মুখ লাল করে ফেলেন। হাপাতে হাপাতে বলেন, 'চুপ! চুপ কাদবি না, কোন কথা বলবি না, চুপ, একদম চুপ!' কিন্তু আপনারাই বলুন এভাবে দুমাদুম মার খেলে কার না ব্যাথা লাগে, আর ব্যাথা লাগলে কার না কান্না পায়!

যখন আমার কান্না শুরু হয় তখনই বুয়াকে আসতে হয়। বুয়ার নাম 'মিনুর মা' - বুযারও মাথা খারাপ। তা না হলে কেউ নিজের নাম 'মিনুর মা' বলে? মিনুর মা'র যে মাথা খারাপ তার আরেকটা প্রমাণ হল সে সারাদিন রান্না করে আর আমাকে খাইয়ে দেয়। অবশ্য শুধু আমার জন্য না, বাসার সবার জন্যই রান্না করে তবে শুধু আমাকেই খাইয়ে দেয়। ভাবুনতো, আমি কত্ত বড়ো ছেলে, আর তাকে কিনা হাতে তুলে খাইয়ে দেয়। আমার অনেক লজ্জা লাগে, কিন্তু উপায় নেই। আমাকে হাতে খাইয়ে দিতে না পারলে বুয়া আবার কাজকর্ম বন্ধ করে কাদঁতে বসবে। বুয়া কাদঁতে শুরু করলে আবার বাবা তাকে চাকরি থেকে 'নট' করে দিবে! চাকরি 'নট' করে দিলে বুয়া কাকে হাতে তুলে খাইয়ে দেবে?

আমার বাবারও একটু বুদ্ধি কম! যেমন বুয়া প্রত্যেকবার খাওয়া শেষে যে ওষুধটা খেয়ে নিতে বলে বাবা সেগুলোকে ওষুধ বলে না, বলেন 'টফি'। কি বোকা তাই না - ওষুধ কি আর টফি হতে পারে আর টফি কি কখনোও পানি দিয়ে গিলে খায়? তারপরও বাবা কিছুদিন পরপর আমার জন্য গিফট কিনে আনেন - এই হয়তো একটা টেনিস বল, একটা খেলা পিস্তল কিংবা কয়েকটা কমিক্স বই আর এই ওষুধ। টেনিসবল আমার কিছুদিন পর পরই লাগে। কারন আমার বলগুলো প্রায়ই পকেট থেকে টয়লেটের কমোডে পড়ে যায়। তারপর আবশ্য ভোলা সেটা তুলে আনে কিন্তু মা তখন নাক চোখ কুচকে বলেন - 'ফেলে দে ওটা, ফেলে দে! আরেকটা এনে দেয়া যাবে। ফেলে দে।'  ব্যাস ক'দিন পরেই আমি নতুন আরেকটা বল পেয়ে যাই।  আর কমিক্সের বইগুলোর ছবি দেখার পর আমি কলম দিয়ে আকিঁ, কারও চোখ কানা করে দিই, কারও গোফ একেঁ দিই, কিংবা দাড়ি - সেই দাড়িও বিভিন্ন রকম - দাদাজানের মত গালভরা দাড়ি কিংবা মিজান দাদুর মত ছাগুলে দাড়ি (হা হা হা )জলি আপু অবশ্য বলে আকাঁআকি করা নাকি ভালো, অনেক কিছু শেখা যায়। আমার হাসি পায়, জলি আপুটা একটু পাগলাটে হলেও মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুত কথাও বলে ফেলে।

তাহলে চিন্তা করুন আমার কি খারাপ অবস্থা! এত্তগুলো পাগল আর মাথা খারাপ মানুষের মধ্যে একমাত্র আমিই সুস্থ্য। এদের সবাইকে সামলে রাখতে হয় আমাকে। আমার অবশ্য ভালোই লাগে। শুধু যখন অসুখ হয় তখন বাদে।

মাঝে মাঝে আমার খুব অসুখ হয় - জ্বর, সর্দি, কেমন কেমন যেন। কিছু ভালো লাগে না। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। মজার ব্যাপার হল, যে কটা দিন আমি শুয়ে থাকি তখন সবাই সুস্থ্য হয়ে যায়। ভোলা আমাকে পাগল মনে করে না, বলে সে নিজেই বদ্ধ পাগল। দাদাজান তার সিংহাসন বাদ দিয়ে সারাদিন আমার পাশে বসে থাকেন। জলিআপু চিঠি নিয়ে মাতামাতি করে না, মা'ও তার প্রাকটিস বন্ধ করে দেন, বুয়া রান্না বান্না বাদ দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন - সবাই সুস্থ্য। তবে বাবা আর কাকু তখনও একটু পাগলামী করে।

বাবা আর কাকু দুজনে মিলে ট্যাক্সি ক্যাবে চড়িয়ে আমাকে হাসপাতাল নিয়ে যায়। এই হাসপাতালটা আমার একদম ভালো লাগেনা। তারা আমাকে 'মানসিক প্রতিবন্ধী' নামের একটা জায়গায় নিয়ে যায় - সেখানে শুধু পাগল আর পাগল - ডাক্তার পাগল, নার্স পাগল রোগীরাও পাগল। বাবা আর কাকু পাগল না হলে এইরকম হাসপাতালে নিয়ে আসে? আমি অবশ্য কিছু বলি না -কারন তখন আমার অনেক কষ্ট। ডাক্তার আমাকে ইন্জেকশন দেয়, আরও কত কি করে! আমার অনেক ঘুম পায়। অনেক ঘুম। বোধহয় দশ বিশ দিন ঘুমিয়ে থাকি। আরেকটু কমও হতে পারে, আরেকটু বেশীও হতে পারে। আসলে ঘুমিয়ে থাকি তো তাই বলতে পারি না। ঘুম থেকে উঠলে বাবা, কাকু, দাদাজান, জলি আপু আর মা - সবাই মিলে আমাকে বাসায় নিয়ে আসে। তখন আমার অসুখ ভালো হয়ে যায়।

ভালো হলেই আর লাভ কি - বাসার সবাই যে তখন আবার আগের মত পাগলামি শুরু করে দেয়!