বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০০৮

একজন উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত, বিবেকবান, সহানুভুতিশীল, নিচু মানসিকতার ভীতু ... ...


গতরাতে আমার প্রতিবেশী আমার মোবাইলটা আর কিছু টাকা নিয়ে গিয়েছেন। যিনি নিয়েছেন তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত, বিবেকবান, সহানুভুতিশীল, কিন্তু নিচু মানসিকতার ভীতু  মানুষ। এবং চোর।

আশেপাশের চল্লিশ ঘর পর্যন্ত প্রতিবেশী - এই নিয়ম ইসলাম শিক্ষা বই থেকে পেলেও সামাজিক বিগ্গান বই থেকে সঠিক ডেফিনেশনটা পাইনি। যা জেনেছি আমাদের আশে পাশে যারা থাকেন তারাই আমাদের প্রতিবেশী। সেই হিসেবে একটি হলে যতো ছাত্র থাকেন তারা সবাই প্রতিবেশী, তা দশজন হোক কিংবা তিন হাজার। তাছাড়া কাচকি মাছের মত এই আমরা সবাই তো একই ঝাকের বাসিন্দা, অন্ততঃ ঢোকার সময়, খাওয়ার সময়, আন্দোলনে, গেস্টরুমে, চামচামিতে এবং সবশেষে হল থেকে বের হবার সময়। সুতরাং সে আমার যত দূরেই থাকুন না কেন, আমার প্রতিবেশী বটেই। তাছাড়া তিনি যে আমার আশে পাশের চব্বিশ ঘরের মধ্যে থাকেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারনটা পরে বাতলাচ্ছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়, যদিও কেন বলা হয়  তা আমার জানা নেই, তবে বলা যে হয় সে বিষয়ে একশো পার্সেন্ট নিশ্চিত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়েন তারা যে দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের একজন তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে সত্যি কিন্তু ত্রিশ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে যে তারা কজনা মেধবী তাতে সন্দেহ নেই। তাছাড়া দেশের একনম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়ায় তারা উচ্চশিক্ষিত (প্রসেস চলছে) তাও নিঃসন্দেহ। অর্থাৎ, তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যে চোর ছ্যাচোর পরিবারের সন্তানেরা পড়তে আসেনা সে সবাই জানি।  হয়তো এলাকায় তার এবং তার কল্যাণে তার পরিবার বর্তমানে সম্ভ্রান্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সুতরাং তিনি একজন ভদ্র এবং সম্ভ্রান্ত লোক।

তিনি একজন বিবেকবান লোক। কারন টাকা নেয়ার সময় তিনি আমার মানিব্যাগটাও নিয়ে গিয়েছেন। নিতেই পারেন কারন টাকা রাখার জন্য একটি ব্যাগতো দরকার। তিনি বুদ্ধি করে আমার মানিব্যাগের ভেতরের আইডি কার্ড এবং অন্যান্য কাগজপত্র টেবিলে রেখে গেছেন। সুতরাং তিনি বিবেকবান, অন্যথায় কত ঝামেলা করতে হত ভাবুন তো... জিডি, ফাইন, ছবি তোলা.. ....

মোবাইলটা মটোরেলা C113 মডেলের। তিন বছর অাগে কেনা, ভীষন বিশ্বস্ত সেট। হাত থেকে হাজার বার পরে গিয়েও কিছু হয়নি। তাই বলে আমি তার যত্নও করিনি, ব্লেড দিয়ে কি প্যাড চেছে ফেলেছি। এই ধরনের সেট কেউ নিয়ে যাবে ভাবিনি। এখণ নিজেরই লজ্জা লাগছে। তিনি তো তার নিচু মানসিকতার পরিচয় দিয়ে গেলেন।

ভীতু  - কারন তিনি সব নিয়ে গেছেন কিছু না বলে, এমন সময় যখন আমি সারাদিন পরিশ্রম শেষে গভীর ঘুমে মগ্ন। রাত দুটোর পরে।

আমার আশে পাশের চব্বিশ রুমের কোন একটিতে তিনি থাকেন। কারন এই চব্বিশ রুমের জানালা দিয়ে ছাড়া কোন ভাবে জানালার সানসেটে নামা সম্ভব না, তাছাড়া তারা সে রাত্রে আমার রুমের সাথের নারকেল গাছ থেকে তাদের অধিকারের ডাব পেরে খেয়েছেন।

সবশেষে তিনি একজন চোর কারন তিনি আমাকে এই দুরাবস্থায় ফেলে গেছেন আমাকে না জানিয়ে।

[sb]ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই সকল উচ্চশিক্ষিত, ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত, বিবেকবান, সহানুভুতিশীল, কিন্তু নিচু মানসিকতার ভীতু চোর কবে যাবে?[/sb]

শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০০৮

ডাইল বেত্তান্ত

গতকাল দুপুরে এক অফিসে ভাত খেতে হল। 'অামাদের রবিউলের রান্নায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন এবং ভালো আইটেম হল ডাল' - যে ভাইয়ের সাথে গিয়েছিলাম তিনি বললেন। সত্যি কথা। জলপাই দিয়ে রান্না করা ডাল দিয়ে ভাত খেতে গতকাল বেশ ভালোই লেগেছিল। মনে পড়ে যাচ্ছে, ডাল নিয়ে ঘটনার সংখ্যা তো কম নয়, সে নিয়ে একটি পোস্ট (অকাজ) দেয়া যায়।

ছোটবেলার কথা। মামার বাসায় বেড়াতে এসেছি। রাতে খাবার সময় মামা বললেন, 'কি মামু, ডাল নিবানা?' ডালের চেহারা খুব সুন্দর, আকর্ষনীয়। আমি 'হু' বলে সায় দিলাম। মামা বললেন, কোনটা নিবা - 'উপরেরটা না নিচেরটা?' যদিও আমি সবসময় নিচের ঘন অংশটুকুই খাই, সেদিন ডালের বাহ্যিক রূপ আমাকে মোহিত করেছিল, তাই সোৎসাহে বললাম, 'উপরেরটা'। 'চক চক করিলেই সোনা হয় না' এই কথাটার প্রমান সেদিন আরেকবার পেলাম, ডালটা খারাপ ছিল না, তবে চেহারাটা আরও বেশী সুন্দর ছিল, নিচের ডালটা নিশ্চয়ই আরো ভালো ছিল!

ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার আগে এর ডাইলের অনেক নাম শুনেছি - সে 'সু' এবং 'কু' উভয়ই। এই ডাল নাকি পানির মত, খাওয়া যায় না, বাজারের পচা এবং পুরানো ডাল দিয়ে রান্না হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর একদিন হলে উঠলাম এবং তখনই চিনলাম ডাল কি জিনিস!

এত পাতলা ডাল আর কোথাও রান্না হয় কিনা জানি না, কিন্তু সত্যি কথা হল এই ডাল খেতে কিন্তু কেউ মাইন্ড করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাচ/ছ' বছরের জীবনে এই ডাল খেয়েই বহু ছাত্রের স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে। কেন জানি না!

এই আমি বরাবরই খুব শুকনো। গত সাড়ে চার-পাচ বছর ধরে আমার ওজন ৫৩ কেজি, একটুও কম না, বেশীও না। কেন যে ওজন বাড়ে না সে এক বিশাল রহস্য। হলে প্রায় সবাই ভাত খাওয়া শেষে এক বাটি ডাল খায়, তাতে নাকি একমাসে স্বাস্থ্য ভালো হয়। সুতরাং আমিও শুরু করলাম, একমাস গেল, দুমাস গেল, তিনমাসও পার হয়ে গেল, ওজন বাড়লো না, স্বাস্থ্যও ভালো হলনা --- সুতরাং হাল ছাড়লাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আব্বা অনেক আশা করে থাকলেন খুব শীঘ্রই আমার স্বাস্থ্য ভালো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বছর ঘুরে যায়, সাস্থ্য ভালো হয় না। আব্বার আশাও পূরন হয় না। একদিন জানা গেল তিনি নাকি শুনেছেন হলের রান্না করা ভাতের ফ্যান ফেলা হয় না বরং ডালের সাথে মিশিয়ে ডালকে ঘন করা হয়। সুতরাং স্বাস্থ্য ভালো না হয়ে যাবে কোথায়। ... ... কি জানি, হয়তো এখন আর মেশায় না!

চট্টগ্রাম ভার্সিটিতে গেলাম পাহাড় ধ্বসের ঘটনায় প্রামাণ্যচিত্র তৈরীর জন্য তথ্য সংগ্রহে। দুপুরে খেতে গেলাম শাহ আমানত হলে। প্লেট ধুয়ে পানি নিয়ে বসে আছি, ফেলার পাত্র পাচ্ছি না। বোকা হয়ে গেলাম যখন দেখলাম এক ছাত্র তার প্লেট ধোয়া পানিটুকু ডালের পাত্রে ঢেলে দিল! পরে আবিস্কার করলাম, আমরা যাকে ডালের পাত্র ভেবেছি তাই পানি ফেলার পাত্র বরং কোন ছাত্রের অতিরিক্ত ঝোল ফেলে দেয়ার জন্য তা ডালের চেহারা ধারন করেছে।

উল্টো ঘটনাটা বেশী ঘটে। হলের ডালের পাত্রে প্লেট ধোয়া পানিটুকু ফেলে দিয়েছেন এমন ঘটনাটা প্রতি মাসেই একবার দুবার করে ঘটে। আমাদের ইকনোমিকস স্যার বাজেট নিয়ে পড়াতে গিয়ে বলতেন, 'সরকারের পক্ষ থেকে হাত ধোয়ার জন্য ডাল দেয়া হয়!' শুনলে হাসি পায়, কিন্তু এই ডাল খেয়েই কত ছাত্র মন্ত্রী মিনিষ্টার আর জজ ব্যারিস্টার হয়ে গেল, সুতরাং ডালের আর দোষ কি? তবে কিনা এই ডাল খেয়েই যদি এত কিছু হওয়া যায় তবে ভালো ডাল খেলে এদের অবস্থাটা কি হবে ভাবুন তো!!!
'তবে?'

একটা গল্প বলি। ছাত্র হোস্টেলে একদিন ডাল খাওয়ার পর সবাই বুঝতে পারলো ডালে কোন একটা সমস্যা হয়েছে। সমস্যাটা ঠিক কি ধরতে না পেরে সবাই গেলো হোস্টেল সুপারের কাছে। তিনিও ডাল খেয়ে দেখলে স্বাদে গণ্ডগোল! ডাকলেন বাবুর্চিকে।

'আজকের ডাল তুমি রান্না করেছো?'
'জ্বি স্যার।'
'ডালে তো মনে হয় কোন উপকরণ কম বেশি হয়ে গেছে।'
'কি বলেন স্যার!'
'হলুদ দিয়েছিলে?'
'জ্বি স্যার।'
'লবন?'
'জ্বি স্যার।'
'তাহলে বাদ পড়ল কি?
এবার পাচক এক হাতা ডাল খেয়ে নেয়!

'ওওওও স্যার... হে হে স্যার .. .. বুঝতে পেরেছি!'
'কি ব্যাপার?'
'হে হে স্যার, ডাল রান্নার সময় ডাল দিতেই ভুলে গিয়েছিলাম .. হে হে'

জগতের সকল প্রানী ডাল খেয়ে সুখে শান্তিতে বাস করুক!!

শনিবার, ১১ অক্টোবর, ২০০৮

রাজকন্যার সাদা রুমাল


এক
এই গল্পের সব কিছুই একটু ব্যতিক্রম, গতানুগতিক নয়। যেমন ধরা যাক,

অনেক দিন আগে এই পৃথিবীতে এক দেশ ছিল, অন্যান্য সব গল্পের মত এই দেশ বা রাজ্যটি অনেক বড় ছিল না বরং সবচেয়ে ছোট রাজ্য ছিল এই দেশটি, নাম 'মাইক্রোকান্ট্রি'। অন্যান্য গল্পের মত এই রাজ্যটি খুব ধনী ছিল না, ছিল না অনেক জৌলুস। খুবই দরিদ্র রাজ্য ছিল সেটি, সেই রাজ্যের রাজা আর প্রজার সাথে কোন তফাৎ ছিল না। রাজা ছিল খুবই গরীব, তার কোন রাজপ্রসাদ ছিল না, ছিল না কোন লোক লস্কর। রাজা নিজের জীবিকা নিজেই উপার্জন করত, এমনকি বাগান পরিস্কারের কাজটিও তাকে নিজ হাতেই করতে হত। একই রকম ছিল রানীর জীবন, সে নিজেই রান্না বান্নার কাজ করত, তার কোন আয়া ছিল না। অন্যান্য লোকদের সাথে তাদের তফাৎ ছিল এই যে, পুরো দেশে একজন মাত্র রাজা এবং একজন মাত্র রানী ছিল।

নিয়মানুযায়ী সেই রাজ্যে একজন মন্ত্রীও ছিল, তার অবস্থা রাজার অবস্থা থেকে কোন অংশে কম নয়, বেশী তো নয়ই। সেও নিজেই নিজের কাজ করতো, রাজাকে দেশ চালানোর জন্য বুদ্ধি পরামর্শ দিত, অবশ্য এজন্য যে সে খুব টাকা কামাতো তা কিন্তু নয়।

সেই রাজ্যে একজন কৃষকও ছিল। সত্যিকার অর্থে একজন নয় বরং অনেক কৃষক থেকে আমরা একজনকেই বেছে নিয়েছি। সেও সারাদিন কৃষিকাজ করত, যা ফসল ফলাতো তা দিয়ে তার পরিবারের ভরন পোষন হয়ে যেত।

মাইক্রোকান্ট্রিতে অর্থ ছিল না কিন্তু সবার মনে শান্তি ছিল, সুখ ছিল। ছোট্ট এ রাজ্যে সবাই নিজে নিজে কষ্ট করে জীবন যাপন করতো, সবাই ছিল গরীব আর তাই কারও মনে কোন ভেদাভেদ ছিল না। আর গরীব রাষ্ট্র ছিল বলে অন্য কোন রাজ্য জয় করার ব্যাপারে তাদের কোন আগ্রহ ও চেষ্টা ছিল না, আর সে কারণেই তাদের কোন সেনাবাহিনীও ছিল না। অন্যদিকে এত ছোট রাজ্য জয় করে কোন কিছুই লাভ করা যাবে না জেনে অন্য রাজারাও এদিকে নজর দিত না - ফলে সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল।

রাজা , মন্ত্রী আর কৃষক - প্রত্যেকেরই একটি করে পুত্র সন্তান ছিল। তাদের নাম যথাক্রমে রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র এবং কৃষকপুত্র! তারা তিনজনেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত! সকলেরই চিন্তা ছিল কিভাবে এই দেশের উন্নতি করা যায়। উন্নতির প্রধাণ শর্ত ছিল অর্থ। তাদের অভাব সেটাই। তাই তারা ভাবছিল কিভাবে এই অর্থ উপার্জন করা যায় যা দিয়ে তাদের দরিদ্র রাজ্যের উন্নতি সম্ভব!

এমন একদিন মাইক্রোকান্ট্রির রাজা তার সকল রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে একটি সংবাদ প্রেরণ করলেন। "অনেক দূরে ম্যাক্রোকান্ট্রি নামে বিশাল এবং ধনী যে রাজ্য আছে তার রূপবতী ও গুনবতী একমাত্র কন্যার জন্য পাত্র খোজা হচ্ছে। যে কেউ এতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। রাজকন্যা যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করবে। তবে শর্ত হল রাজকন্যা যদি তাকে পছন্দ না করে তবে রাজকন্যার ইচ্ছে অনুযায়ী সেই পুরুষকে পাত্রী বেছে নিতে হবে! অর্থাৎ রাজকন্যা যাকে বিয়ে করতে বলবে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হেরে যাওয়া প্রতিযোগী!"

রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র এবং কৃষকপুত্র এই ঘোষনা শুনল। প্রত্যেকের মনেই যে চিন্তা আসল তা হল - এই রাজকন্যাকে যদি বিয়ে করা যায় তবে ভবিষ্যতে একটি বড় রাজ্যের রাজা হওয়া সম্ভব, আর তবেই হাতে আসবে অনেক টাকা যা দিয়ে মাইক্রোকান্ট্রির উন্নতি করা সম্ভব। তিনজনেই দৃঢ় প্রতিগ্গ হল তারা এই প্রতিযোগিতায় নাম লেখাবে। অবশেষে একদিন তাদের মা-বাবাকে বিদায় দিয়ে তারা ম্যাক্রোকান্ট্রির পথ ধরল। তাদের বাবা- মা আর দেশবাসী অশ্রুসজল চোখে তাদের বিদায় দিল। আর প্রাণভরে দোয়া করতে লাগল যেন তারা জয়ী হয়ে ফিরে আসে।

দুই
তারপর রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র আর কৃষকপুত্র একসঙ্গে চলতে লাগল। যেহেতু তারা সবাই ছিল খুব গরীব তাই তাদের কোন বাহন ছিল না। হেটে রওনা হল দূর দেশ 'ম্যাক্রোকান্ট্রি'র উদ্দেশ্যে। পথে অনেক ঘটনা ঘটল, অনেক মজা হল, কষ্টও কম হল না। কিন্তু দেশের সেবা করা আর রাজকন্যাকে বিয়ে করার সুখ স্বপ্ন তাদের সকল কষ্টকে দূর করে দিল।
কিন্তু পথ যে আর ফুরায় না, তারা চলতেই লাগল, চলতেই লাগল, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। অবশেষে একদিন পথ শেষ হল, তারা এসে উপস্থিত হল ম্যাক্রোকান্ট্রির দোরগোড়ায়। এসেই তারা পড়ল মহা সঙ্কটে, এত দূরের যাত্রায় তাদের যে হাল হয়েছে তাতে কেউ তাদের রাজপুত্র কিংবা মন্ত্রীপুত্র বলে বিশ্বাস করবে না, কৃষকপুত্রের অবশ্য সে সমস্যা নেই, কিন্তু তাই বলে সেতো তার বাকী দুই বন্ধুকে বাদ দিয়ে যেতে পারে না।

সমস্যার সমাধান হয়ে পড়ল হঠাৎই! রাজ্যে নতুন দেখে এক লোক তাদের দিকে এগিয়ে এল। জানতে চাইল কি উদ্দেশে এ রাজ্যে আগমন। রাজপুত্র একটু দোনামোনা করছিল, কিন্তু মন্ত্রীপুত্র বলেই ফেলল, 'আমরা এসেছি রাজকন্যাকে বিয়ে করতে!"
"বেশ তো, তা এখানে দাড়িয়ে থাকলে কি আর বিয়ে করা হবে, না রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত যেতে হবে" - এই কথা বলে সে একজন কর্মচারীকে দেখিয়ে দিল। "কোন ভয় নেই, যেহেতু প্রতিযোগিতা, তাই ধনী গরীব সবাইকেই সম্মান দেখানো হচ্ছে!"
তো আর কি! সেই কর্মচারী তাদেরকে নিয়ে এল রাজপ্রাসাদে। বিশাল এক দালানের এক বিশাল ঘরে তাদের তিনজনের থাকার ব্যবস্থা হল। এই দালানে অন্যান্য প্রতিযোগীরাও অবস্থান করছে। তাদেরকে নতুন কাপড় চোপড় দেয়া হল, এত সুন্দর সে জামাগুলো যে পড়ার পড় বোঝা গেল না কে রাজপুত্র আর কে কৃষকপুত্র! আরও দেয়া হল বড় আকারের তিনঠি ঘোড়া। প্রত্যেকের সুবিধা আর দেখাশোনার জন্য দেয়া হল একজন করে খানসামা। তাদেরকে দেয়া হল রাজকীয় আর সুস্বাদু মজাদার সব খাবার আর ফলের রসের তৈরী পানীয়!

এত সমাদর আর যত্ন পেয়ে দুদিনেই তারা সকল ক্লান্তি আর দুর্বলতা কাটিয়ে উঠল। আর প্রত্যেকে নিজে নিজে ঠিক করতে লাগল কি করলে রাজকন্যা অন্য সবাইকে বাদ দিয়ে তাকেই বিয়ের জন্য পছন্দ করবে!

এভাবে সাত দিন কেটে গেল! প্রতিদিনই কোন না কোন প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছে, যদিও রাজকন্যা কাউকেই পছন্দ করছে না। তিন বন্ধু এতে আশাবাদী হয়ে উঠে, নিশ্চয়ই তাদের যেকোন একজনকে পছন্দ করবে রাজকন্যা!

অবশেষে একদিন রাজকন্যার দূত আসল। রাজকন্যার নাম স্যক্রেড। দূত এসে জানালো তারা তিনজনই শেষ প্রতিযোগী। তারপরেই রাজকন্যা স্যাক্রেড তার পছন্দের মানুষটিকে বেছে নিবেন। এখন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে হবে সবার আগে কে যাবে - রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র নাকি কৃষকপুত্র। প্রত্যেকেরই যাবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু রাজপুত্রের প্রতি সম্মান জানিয়ে সিদ্ধান্ত হল , প্রথমে যাবে রাজপুত্র, তারপর যাবে মন্ত্রীপুত্র এবং সবশেষে যাবে কৃষকপুত্র! দূত তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিল।

অতঃপর, রাজপুত্র মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল - কখন রাত পোহাবে, আর সে পারবে রাজকন্যার মন জয় করতে!

তিন
অবশেষে রাত পোহাল।
সকাল বেলায় রাজপুত্র একটু শীতলতা বোধ করল, এ আর কিছু না, উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ।  রাজকন্যা স্যাক্রেডকে অাজ সে জয়ী করতে পারবে নিশ্চয়ই!

খুব সকালেই রাজকন্যার দূত আসল। তার সাথে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরনাদি, রাজপুত্র যা খুশি বেছে নিতে পারবে। তাকে দেয়া হল একুট জরীদার সুন্দর জামা, চুমকি আর কাচ বসানো মূল্যবান এক পাগরী, কারুকার্য করা বিশাল এক তরবারী। আর একটি সাদা রুমাল। রুমালটি রাজকন্যার তরফ থেকে, যার এককোণে   সুতো দিয়ে 'স্যাক্রড' লেখা। এই রুমাল দেখেই রাজকন্যা তাকে চিনে নিতে পারবে। সুতরাং কোনভাবেই এই রুমাল হারানো যাবে না।

রাজপুত্র সুন্দর পোশাক পড়ল, এতদিনে তাকে সত্যিকারের রাজপুত্র বলে মনে হচ্ছিল।  মন্ত্রীপুত্র আর কৃষকপুত্রের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে চলল রাজকন্যার মন জয় করতে।

রাজপুত্র প্রথমে একটি রাজপ্রসাদে ঢুকল। সকালে রাজকন্যা স্যাক্রেড রোদ পোহাতে আসেন, তবে সে কোন কক্ষে থাকে, সেটা খুজে বের করতে একটু সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানের জন্য রাজপুত্র দেখা পেয়ে গেল একজন সুন্দরী পরিচারিকার।  রূপ দেখে রাজপুত্র অবাক, তার চোখে ঘন করে কাজল দেয়া, কি গভীর সে দৃষ্টি। তার নাম সুনয়না! সুনয়না রাজপুত্রকে দেখে গালভরা হাসি উপহার দিল, তারপর বলল, "এতবড়  প্রাসাদে রাজকন্যা স্যাক্রেড কোথায় যে আছে তা তো কেউ জানে না, আর তুমি যদি তাকে খুজে বের করতে যাও তবে সারাদিনেও খুজে পাবে না। তারচে' বরং আমার এক কর্মচারীকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তার একঘন্টা লাগবে মাত্র। রাজকন্যাকে খুজে পেলে সে তোমাকে নিয়ে যাবে'খন।" রাজপুত্র ভাবল সত্যিই তো! এত সুন্দরী সুনয়নার সাথে কিছু সময়ও কাটানো যাবে! রাজকন্যাকে খুজে বের করার জন্য সারাদিন তো পরেই রয়েছে - তাই সে রয়ে গেল আর কর্মচারী খুজতে বেরোল।

সুনয়না রাজপুত্রকে নিয়ে তার ঘরে বসালো, জানতে চাইল তার বিস্তারিত। রাজপুত্র তাদের রাজ্যের কথা বলল, তাদের দারিদ্রের কথা বলল, আর বলল তার র্দঢ় সংকল্পের কথা। রাজপুত্রের দুঃখের কাহিনী শুনে সুনয়নার চোখে জল এর, সে রাজপুত্রের কাধেঁ মাথা রেখে কাদল আর বলল নিশ্চয়ই রাজপুত্র জয়ী হবে।
একঘন্টা পরে সেই কর্মচারী এসে জানালো, রাজকন্যা স্যাক্রেড সকালের রোদ পোহানো শেষ করে অন্য প্রাসাদে চলে গেছেন। কি আর করা, রাজপুত্রকে এবার অন্য প্রাসাদে যেতে হবে। কিন্তু সুনয়নাকে বিদায় দিতে গিয়ে রাজপুত্র দেখল তার চোখের কাজল পানিতে ধুয়ে গিয়ে খুব বিশ্রী দেখাচ্ছে। রাজপুত্র তার রুমাল দিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া কাজল মুছে দিল। খুশী হয়ে সুনয়না তাকে গভীর এক চুমু উপহার দিল।

রাজপুত্র এবার গেল দ্বিতীয় প্রাসাদে। এখানে রাজকন্যা স্যাক্রেড স্নান করে।  কিন্তু প্রাসাদে ঢুকতেই একজন পরিচারিকা তাকে সাদর আমন্ত্রন জানালো। টকটকে লাল তার ঠোট। আর কি মিস্টি হাসি! নাম তার সুহাসিনী। সে রাজপুত্রকে বলল, রাজকন্যা এখন গোসল করছে, এ অবস্থায় ভেতরে যাবার অনুমতি নেই। সে বরং ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করতে পারে, গোসল শেষে রাজকন্যার সাথে দেখা করবে। রাজপুত্র অপেক্ষা করল, লাল ঠোটের রূপবতী মেয়ের সাথে গল্পে মশগুল হয়ে রইল। মনে মনে কামনা করছিল রাজকন্যা স্যাক্রেড যদি এরকম সুন্দর করে হাসতে আর গল্প করতে পারে তবেই না সুখ। কিন্তু গল্পে গল্পে সময় পার হয়ে গেল, যখন হুশ হল তখন দেরী হয়ে গেছে। রাজকন্যা দুপুরের খাবার জন্য আরেকটি প্রাসাদে চলে গেছে। তাই রাজপুত্র বিদায় নিল। বিদায় বেলায় সুহাসিনী তার লাল ঠোট দিয়ে ভালোবাসার চিহ্ন একে দিল রাজপুত্রের গালে। ঠোটের লাল লেগে গেল গালে, রাজপুত্র রুমালে মুছে নিল।

তৃতীয় প্রাসাদে তাকে বরন করল অনিন্দ্য সুন্দরী এক রমনী। তার নাম সুরাধুনী। সুরাধুনী তাকে বলল নিশ্চয়ই তার অনেক ক্ষুধা লেগেছে! সুতরাং তার উচিত তার হাতের রান্না খেয়ে তবেই রাজকন্যার সাথে দেখা করতে যাওয়া। রাজপুত্র রাজী হল। সুরাধুনী হাতে তুলে তাকে খাইয়ে দিল।  খাওয়া শেষে রাজপুত্র রুমালে মুখ মুছে দিল। যেহেতু তৃতীয় প্রাসাদেও রাজকন্যা স্যাক্রেড ছিল না, সে ততক্ষনে অন্য প্রাসাদে বিশ্রামের জন্য চলে গেছে, তাই রাজপুত্র সেই প্রাসাদ ত্যাগ করল।

চতুর্থ প্রাসাদে যে পরিচারিকা তাকে বরন করল তার শরীরে আতরের মাদকতা মিশে রয়েছে। সেও তাকে কিছু সময় থাকতে বলল, কিন্তু রাজপুত্র রাজী হলনা, এভাবে যদি শেষ পর্যন্ত রাজকন্যার সাথেই দেখা না হয়।  কিন্তু নিজেকে আতরের সুগন্ধে সাজিয়ে নিতে ভুলল না। পরিচারিকা তাকে সাজিয়ে দিল। রাজপুত্র এবার আগেই পঞ্চম প্রাসাদে গিয়ে বসে রইল। রাজকন্যা স্যাক্রেড বিকেলে এখানে আসে সখীদের নিয়ে।

বিকেলে রাজকন্যা স্যাক্রেড এসেছিল, রাজপুত্র আর রাজকন্যা কথাও বলেছিল, কিন্তু কি কথা হয়েছিল তা কেউ জানে না, সবাই শুধু জানে রাজকন্যা স্যাক্রেড রাজপুত্রকে পছন্দ করেনি। আর তার ইচ্ছে অনুযায়ী রাজপুত্র বিয়ে করল সকাল থেকে দেখা হওয়া পরিচারিকাদের একজনকে।

পরদিন মন্ত্রীপুত্রের পালা!

চার
সকাল বেলায় মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যা স্যাক্রেডের পাঠানো পোষাক এবং নামাঙ্কিত সাদা রুমাল নিয়ে রওয়ানা হল। কৃষকপুত্র শুভকামনা করল। মন্ত্রীপুত্রও খুব আত্মবিশ্বাসী, তার জয় হবেই!

যথারীতি প্রথমেই সুনয়নার সাথে দেখা। সে পরামর্শ দিল কর্মচারী খুজে বেরাক রাজকন্যাকে, ততক্ষন দুজনে একটু গল্পগুজব করি। মন্ত্রীপুত্র বুদ্ধিমান, সে বলল, "তারচেয়ে আমরা দুজনেই খুজে বেরাই, তুমি তো চেনই, একই সাথে গল্প করা যাবে।" দুজনে চলল, মন্ত্রীপুত্র মজার মজার সব কথা আর চুটকি বলতে লাগল, সুনয়না তো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, মন্ত্রীপুত্র তাকে ঘরে সামলায়। শেষ কৗতুকটা ছিল এত হাসির যে তার চোখে পানি চলে এল। সেই পানিতে কাজল ধুয়ে একাকার। কিন্তু রাজকন্যা স্যাক্রেডকে খুজে পাওয়া গেল না। বিদায় বেলায় রুমালে সুনয়নার কাজল মুছে দিল তারপর, থুতনিতে একটু আদর করে বিদায় নিল।

দ্বিতীয় প্রাসাদে টকটকে লাল ঠোট নিয়ে সুহাসিনী তাকে আমন্ত্রন জানালো। মন্ত্রীপুত্র সুহাসিনীর অনুরোধ রক্ষা না করে স্নান ঘরের দিকে রওয়ানা হল। কিন্তু স্নান ঘরে রাজকন্যা স্যাক্রেডকে পাওয়া গেল না। তিনি আজ স্নান করতে আসবেন না। তাই মন্ত্রীপুত্র ফিরে চলল। কিন্তু বিদায় বেলায় সুহাসিনীর লাল ঠোটের আবেদন ফেরানো তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। লাল রং টুকু সে তার রুমালে মুছে নিল।

সুরাধুনীর কাছেও রাজকন্যাকে পাওয়া গেল না। তবে মন্ত্রীপুত্রের যত্নের কোন অভাব হল না। এবারও সুরাধুনী তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিল, রুমালে মুখ মুছিয়ে দিল। তারপর দেখিয়ে দিল কোন প্রাসাদে যেতে হবে। বিদায় বেলায় সুরাধুনী মন্ত্রীপুত্রের কানে কানে বলল, রাজকন্যাকে বাদ দিয়ে যদি আমাকে বিয়ে করো তবে সবসময় এভাবেই আদর করে খাওয়াবো। মন্ত্রীপুত্র আশ্বাস দিয়ে চলল অন্য প্রাসাদের দিকে!

চতুর্থ প্রাসাদে এবার আর সুগন্ধি মাখা রমনীকে পাওয়া গেল না, তার পরিবর্তে রয়েছে আকর্ষণীয় এক তন্বী মেয়ে, সুগঠিত তার দেহ, রূপ যেন ঝরে ঝরে পড়ছে। নাম তার রূপীনি। মন্ত্রীপুত্রের কোমর জড়িয়ে সে নিয়ে গেল বিশ্রাম কক্ষে। দুপুরের রোদে বেরানোর জন্য কিছু অনুযোগও করল, তারপর চুলে বিলি কাটতে কাটতে মন্ত্রীপুত্রকে ঘুম পারিয়ে দিল।
ঘুম ভেঙ্গে মন্ত্রীপুত্র দেখল রূপিনী অঘোরে ঘুমোচ্ছে, বিকেল পর হয়ে গেল বলে। মন্ত্রীপুত্র ঝুকে তাকে আলতো করে চুমু খেল...তবে রে... ঠোটে কি লাগল! এত রং!সাদা গুড়ো! তবে কি রূপীনী সত্যিকারের রূপবতী নয়? রুমাল দিয়ে একটু ঘষে দিল মন্ত্রীপুত্র। কিছু রং উঠে এল। মনটাই খারাপ হয়ে গেল তার। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, তাই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল।

শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যা স্যাক্রেডের দেখা পেয়েছিল, কিন্তু স্যাক্রেড তাকেও পছন্ধ করে নি। কি হয়েছিল কেউ জানে না, শুধু জানে মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যা স্যাক্রেডের ইচ্ছেনুযায়ী তার এক পরিচারিকাকে বিয়ে করেছে।

সবশেষে কৃষকপুত্রের পালা। সেও পরদিন সকাল বেলা রাজকন্যা স্যাক্রডের সাদা রুমাল আর সুসজ্জিত রাজপেষাক পড়ে রওয়ানা হল। তাকে বিদায় দেয়ার মত কেউ ছিল না, কিন্তু তাই বলে তার আত্মবিশ্সাসে ঘাটতিও ছিল না।

সুনয়না তাকেও একই বুদ্ধি দিল। কিন্তু কৃষক পুত্র রাজী হল না। সে বলল, "এটা একটা পরীক্ষা নিশ্চয়ই। আমি তোমার কিংবা অন্য কারও সাহায্য নিলে তবে রাজকন্যা নিশ্চয়ই খুশি হবেন না। তারচে' তুমি এখানে দাড়াও, আমি একটু কষ্ট করে খুজে আসি।" কৃষক পুত্র সুনয়নাকে ছাড়াই ঘুরতে লাগল। অর্ধেক প্রাসাদ ঘোরার পরই তার মনে হল, 'আরে রোদ চড়ে গেছে। রাজকন্যা নিশ্চয়ই এখন রোদ পোহাবেন না।' সুতরাং সে সুনয়নাকে বিদায় দিয়ে অন্য প্রাসাদে রওয়ানা হল। পেছনে সুনয়না কত কাদল, চোখের কাজল পানিতে ধুয়ে গেল, কৃষক পুত্রের মন গলল না।

টকটকে লাল ঠোটের সুহাসিনী তাকে স্নান ঘরে যেতে নিষেধ করল, "কৃষকপুত্র রাজী হল, তবে সে বলল, রাজকন্যা যখন গোসল করছে তখন এখানে অপেক্ষা করার কোন মানে নেই। আমি বরং পরের প্রাসাদে গিয়ে অপেক্ষা করি।" সুতরাং কৃষকপুত্র বিদায় নিল।

সুরাধুনীর কাছে যখন সে উপস্থিত হল তখনও দুপুর হয়নি। সুতরাং সুরাধুনির অনুরোধ সহজেই উপেক্ষা করতে পারল। রূপিনীর প্রাসাদে কৃষকপুত্র পৌছানোর পর রূপিনী তাকে বিশ্রাম নিতে বলল। কিন্তু কৃষক পুত্র জানালো সে এখনো ক্লাস্ত হয়নি। বরং রাজকন্যা স্যাক্রেডকে বিয়ে করেই সে বিশ্রাম নেবে। তাই সে তখনই বিদায় নিল।

এবার সে পৌছুল নতুন এক প্রাসাদে। এখানে রাজকন্যা স্যাক্রেড দুপুরে বিশ্রাম নেয়। এখানে তাকে অভ্যর্থনা জানালো অনিন্দ্য সুন্দরী এক রমনী। সে তাকে অপেক্ষা করতে বলল।  কিন্তু কৃষক পুত্র রাজী হল না, সে তাকে বলল, যাও রাজকন্যাকে গিয়ে বল, কৃষক পুত্র এসছে দেখা করতে। পরিচারিকা দোনামোনা করল কিন্তু কৃষকপুত্রে অনমনীয় ভাবের কাছে নতি স্বীকার করতে হল।

কিছুক্ষন পরেই রাজকন্যা স্যাক্রেডের পক্ষ থেকে ডাক এল। কৃষকপুত্র ভেতরে গেল। সেখানে রাজকন্যা সখীদেরকে নিয়ে বসে আছে, সখীরা কেউ তার পুলে বিলি কাটছে, কেউ পায়ে মালিশ করে দিচ্ছে, কেউ বা বাতাস করছে।
"স্বাগতম হে কৃষকপুত্র" রাজকন্যা স্যাক্রেড বলল।
"ধন্যবাদ রাজকন্যা, এই অসময়ে িবরক্ত করার জন্য আমি দুঃখিত।"
"আমার দেয়া রুমালটা দেখি"
"অবশ্যই রাজকন্যা,তবে তার আগে যদি আপনি সবাইকে যেতে বলেন তবে খুশী হই।"
"কেন?"
আপনি জানেন আমি খুব গরীব রাজ্য মাইক্রোকান্ট্রি থেকে এসেছি। আপনি সেখানকার রানী হলে এত সুখ ভোগ করতে পারবেন না, তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া ভালো।"
রাজকন্যা স্যাক্রেড হাত নড়ে সবাইকে বিদায় করে দিলেন। তারপর কৃষকপুত্রের কাছ থেকে রুমালটা নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, "সুনয়না, সুহাসিনী কিংবা সুরাধুনরি সাথে দেখা হয়নি?"
"হয়েছিল, তারা সবাই আমাকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম তারা সবাইকেই এভাবে স্বাগত জানায়। আমি একজন ভালো মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, তাই তাদেরকে এড়াতে সমস্যা হয়নি" কৃষক পুত্র বলল হাসিমুখে।

রাজকন্যা স্যাক্রেড হাসিমুখে উঠে দাড়ালো। "ধন্যবাদ হে কৃষকপুত্র! তুমিই প্রথম প্রতিযোগিতায় এত দ্রুত আমার কাছে এসেছ। তোমার রুমাল সম্পুর্ণ সাদা, যেরকমটা আমি তোমাকে দিয়েছিলাম। বাকীদের রুমালে ছিল নানা রকম ময়লা, যার শাস্তি  তারা ভোগ করছে। তারা তাদের মত চরিত্রের মেয়েকেই স্ত্রী হিসেবে পেয়েছে। আর তোমার জন্য রয়েছি আমি। আমি তোমাকে সুন্দর হাসি উপহার দেব, তোমার হাসিতে হাসব কিংবা কাদবো, তোমাকে খাইয়ে দেবো, তুমি দেবে আমাকে, তোমাকে ঘুম পারিয়ে দেবো, অনেক সুখের সংসার হবে আমাদের, তুমি হবে আমার রাজা, আমি হবো তোমার রানী!"

রাজকন্যা স্যাক্রেডকে জরিয়ে ধরল কৃষকপুত্র। "উহু... ... তুমি হবে আমার স্ত্রী আর ... ...সকল প্রজার রানী!"

অতঃপর কি হল সে গল্প হবে আরেকদিন!

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

দুহাতের বাধঁনে বন্দী ভালোবাসা


খুব যত্ন আর গাঢ় মনযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে আমার টাইয়ের নট বেঁধে দিচ্ছে স্বপ্না। টাই বাঁধাটা আমিই শিখিয়েছিলাম। তারপর থেকে প্রতিদিনই সে যত্ন করে বেঁধে দেয়। নট্টা নেড়ে চেড়ে জায়গামত বসিয়ে দিল স্বপ্না। চোখে চোখ রাখল। মুখে গাঢ় অন্ধকার, নিচের ঠোট আলতো করে কামড়ে ধরে রেখেছে। তারপর প্রচন্ড আবেগ, ভালোবাসা আর মমত্ব নিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে, পিষে ফেলবে যেন! অনেকদিন যা করিনি, আজ শিশুর মত কেঁদে ফেললাম। স্বপ্না ছাড়ল না, কিছু বলল না, সান্তনাও দিলনা। শুধু বাঁধন আরেকটু শক্ত হল।

গত সাড়ে তিন বছরের কিছুটা বেশী সময় এভাবেই বেঁধে রেখেছে স্বপ্না আমাকে, তার জোড়া হাত, গভীর অন্ধকার চোখ, আর অন্তহীন ভালোবাসা দিয়ে। প্রত্যেকটি দুঃসময়ে পাশে থেকেছে স্বপ্না, আমার ছোট্ট খুটিটি হয়ে দাড়িয়েছে। গত চারমাস যাবৎ এই খুটিটি নড়চড় হয়নি একবিন্দুও, বরং প্রতিনিয়তই মজবুত হচ্ছে। শুধূ দুর্বল হয়ে যাচ্ছি আমি, ভাঙতে পারছি না নিজেকে, স্বপ্নার জন্য!

আমাদের সাংসারিক জীবনের সবচেয়ে বাজে সময় যাচ্ছে গত চারমাস ধরে। প্রথম আঘাতটা অবশ্য স্বপ্নার ওপরই আসে। ছোট্ট একটা দুর্ঘটনা থেকে পেটে সাড়ে সাতমাস বয়সের বাচ্চাটা মরে গেল। দুদিন বেঁহুশ হয়ে নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে থাকল স্বপ্না। বাকী ছয়দিন কাদঁল। তারপর চুপ মেরে গেল। হাসিটা কমে গেল। কিন্তু সমস্যা বেড়ে গেল।

স্বপ্নার অসুস্থ্যতাকে কেন্দ্র করে সাতান্ন হাজার টাকা বেড়িয়ে গেল। ধার করলাম ষোল হাজার টাকা। অস্বাভাবিক প্রয়োজন ছাড়া কখনো ধার করি না বলে এই ষোল হাজার টাকা পাথর হয়ে চেপে বসেছে। কাটিয়ে উঠব ভেবেছিলাম। পারতামও যদি আমার অফিসে নতুন ঝামেলায় না জড়াতাম। আমার সই করা কিছু ফাইলে বড় অংকের টাকার গোলমালে কোম্পানির বড় দুটি প্রজেক্ট হাতছাড়া গেল। এখন তার তদন্ত চলছে। শাস্তি হিসেবে আমি সহ আরও তিনজন সাসপেন্ডেড। বেতন বন্ধ হয়ে আছে দুমাস যাবত। আমাদের জড়িত থাকা প্রমাণিত হলে চাকরি চলে যাবে। স্বপ্নাকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়ে যাব আমি। প্রতিদিন অফিসে যাই, খোঁজখবর আর চেষ্টা করি যদি কিছু উন্নতি করা যায়।

আম্মা গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়ে রয়েছে মেজো ভাইয়ের বাসায়। আমাদের দেখতে চেয়েছে। যেতে পারছি না এ সকল সমস্যার কারনে। স্বপ্নাকে বলেছি চলে যেতে। স্বপ্না রাজী হচ্ছে না। বলেছে আমাকে ফেলে যাবে না। অথচ মাকে দেখার জন্য ছটফট করছি। ঢাকায় এসে থাকছি বছর খানেক ধরে। প্রত্যেকমাসে অন্তত একবার করে গিয়েছি মা’র ওখানে। গত চার মাস সেটাও বন্ধ। মা প্রতিদিন একবার করে ফোন করে।

এত সমস্যা আর সইতে পারছি না। হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছা করছে। সহজে হারি না আমি। আগে ভেঙ্গে পড়িনি কখনো। কিন্তু এবার আর পারছি না। স্বপ্নার শক্ত বাধন আমাকে প্রতিবার শক্তি যোগায়। কাটিয়ে তোলে সকল বাধা বিপত্তি। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি,করতে চেষ্টা করি- এবারও পারব, আর সামান্য কটা দিন। অবশ্যই সমস্যা কেটে যাবে। আমাদের ছোট্ট বাবু হবে। আমার চাকুরীর সমস্যার সমাধান হবে, মা সুস্থ্য হয়ে যাবেন, আমরা মোটামুটি স্বচ্ছল জীবন যাপন করব। শুধু ক'টা দিন সহ্য করতে হবে। এই গভীর ভালোবাসা, প্রগাঢ় মমত্ব আর দু’বাহুর শক্ত বাঁধনের কাছে কোন সমস্যাই সমস্যা নয়।

আমি স্বপ্নার কপালে একটি গভীর চুমু আকঁলাম।

মঙ্গলবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

পাগল সমাচার

আমাদের বাসার সবার মাথায় সামান্য গন্ডগোল আছে। কেউ সুস্থ্য নয়। কিরকম? ধরা যাক, আমার বড় বোন জলি আপুর কথা। তার বিয়ে হয়েছে ছ'মাস মাত্র। দুলাভাই কুয়েত থাকেন। এই লোকটার জন্য আপু প্রেমে গদগদ অবস্থা। দৈনিক একটি করে চিঠি লিখে আর জমা করে রাখে। আমি বুঝিনা বর্তমানের এই যুগে মানুয় কিভাবে চিঠি লিখে! জিমেইল না ইমেইল বলে কি যেন আছে - ফুরুৎ করে চিঠি চলে যায় যে কোন জায়গায়। (অবশ্য কম্পিউটার লাগে এর জন্য) তা না করে সে কাগজ কলমে চিঠি লিখছে। আর প্রতিদিন দুপুর বারোটা দশ থেকে বারোটা পচিশ পর্যন্ত দরোজার ছোট ছিদ্র দিয়ে তাকিয়ে থাকেন ----কারণ পোস্টম্যান সাধারণত এই সময়টাতেই আসেন। পোস্টম্যান বক্সে চিঠি ফেলে যাওয়ামাত্রই জলি আপু দরোজা খুলে চিঠিটি নিয়ে আসে, তারপর খুশিতে আটখানা হয়ে মুচকি হাসতে হাসতে নিজের রুমে চলে যায়। হয়তো হাওয়ায় শাড়ির আচল ঘুরিয়ে দু এক পাক ঘুরে নেচেও নেয়। তারপর বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে চিঠিখানা পড়ে এবং পড়া শেষ হওয়া মাত্রই উত্তর লিখতে বসে যায়। চিন্তা করুন তো, আমার জলিআপু কি পরিমান পাগল! অবশ্য এ সকল কাজে কোন প্রবলেম নেই, সমস্যা হল তার লেখা এই চিঠিগুলো নিয়ে আমাকেই পোস্টাপিসে যেতে হয় দুলাভাইয়ের কাছে পাঠানোর জন্য। প্রতিবার পাঠানোর খরচ ৫২৩ টাকা। অবশ্য আমি একা পোস্টাপিসে যাই না, আমাদের কাজের ছেলে ভোলাও যায় আমার সাথে।

এই যে ভোলা, তার মাথায়ও প্রবলেম আছে। কি প্রবলেম সেটা খুব খোলসা করে বলা যাবে না - নিষেধ আছে। তবে একটু বলি। ভোলার বড় সমস্যা হল সে নিজেকে ছাড়া সবাইকে পাগল মনে করে। যেমন ধরুন, আমাকে। তার কথা হল চিঠি ডাকে ফেলতে যায় সে, আর আমি নাক তার সাথে যাই। এই কথা শুনে কার ভালো লাগে বলুন। আমি অবশ্য আগে খুব রাগ করতাম এই কথার জন্য, এখন আর রাগ করি না কারণ আমার দাদাজান বলেছেন, 'পাগল খেপিয়ে লাভ নেই।'

আমার দাদাজানও একটু পাগলা গোছের। আমাদের ড্রইংরুমের সাথেই বারান্দা। বারান্দার দরোজা দিয়ে সরাসরি ড্রইংরুমে প্রবেশ করা যায়। দাদাজান সেখানে তার সিংহাসনে বসে থাকেন (হি হি হি) সিংহাসন মানে বেতের তৈরী বিশেষ সোফা। তার কাছে সারাদিনই লোকজন আসতে থাকে - বিশেষ করে পাড়ার বুড়োরা। কেউ আসলেই দাদাজান তার সোফার পাশে লাগানো কলবেল চিপে ধরেন, তারপর আদেশ করেন - 'এই কে আছিস! মিজান সাহেব এসেছেন, চা নাস্তা দে!' প্রতিদিন অন্ততঃ বিশবার এরকম আপ্যায়ন করতে হয় - পাগলামি ছাড়া আর কি?

দাদাজানের কাছে যে বুড়োরা আসেন তারাও পাগল, আর নয়তো মাথা খারাপ। যেমন মিজান দাদুর কথাই ধরা যাক - সে সারাদিন বিড়ি খায়, আর এখানে আসলেই আমাকে বলেন - 'এই বাবু যাওতো তামাক সাজিয়ে আনো তো!' আমি অবশ্য পাত্তা দিই না। পাগলকে পাত্তা দিয়ে মা'র হাতে মার খাবো নাকি?

আমার মা'ও কেমন জানি! একটু পাগলাটে তো বটেই বোধহয় হাতে পায়েও সমস্যা আছে। আমার কাকু বলেন মাকে দৈনিক বক্সিং প্রাকটিসের মত থাপ্পড় মারা প্রাকটিস করতে হয়, তা না হলে নাকি হাতে পায়ে যন্ত্রনা করে। আর তাই দিনে বেশ কবার মা আমার উপর প্রাকটিস করে নেন। আমি অবশ্য মাকে অনেক ভালোবাসি আর তাই কিছু বলি না কিন্তু মা যখন ওয়ার্নিং ছাড়াই প্রাকটিস শুরু করে দেন তখন একটু দুঃখ লাগে। মনে করুন আমার ভাত খেতে কিংবা গোসল করতে ইচ্ছা করছে না অমনি মা তার প্রাকটিস শুরু করে দিলেন। ব্যাথা পেয়ে যদি আমি একটু কেদেঁ ফেলি তাহলেই মার প্রাকটিসের পরিমান বেড়ে যায়। মা তখন হাপাতেঁ থাকেন। চোখ মুখ লাল করে ফেলেন। হাপাতে হাপাতে বলেন, 'চুপ! চুপ কাদবি না, কোন কথা বলবি না, চুপ, একদম চুপ!' কিন্তু আপনারাই বলুন এভাবে দুমাদুম মার খেলে কার না ব্যাথা লাগে, আর ব্যাথা লাগলে কার না কান্না পায়!

যখন আমার কান্না শুরু হয় তখনই বুয়াকে আসতে হয়। বুয়ার নাম 'মিনুর মা' - বুযারও মাথা খারাপ। তা না হলে কেউ নিজের নাম 'মিনুর মা' বলে? মিনুর মা'র যে মাথা খারাপ তার আরেকটা প্রমাণ হল সে সারাদিন রান্না করে আর আমাকে খাইয়ে দেয়। অবশ্য শুধু আমার জন্য না, বাসার সবার জন্যই রান্না করে তবে শুধু আমাকেই খাইয়ে দেয়। ভাবুনতো, আমি কত্ত বড়ো ছেলে, আর তাকে কিনা হাতে তুলে খাইয়ে দেয়। আমার অনেক লজ্জা লাগে, কিন্তু উপায় নেই। আমাকে হাতে খাইয়ে দিতে না পারলে বুয়া আবার কাজকর্ম বন্ধ করে কাদঁতে বসবে। বুয়া কাদঁতে শুরু করলে আবার বাবা তাকে চাকরি থেকে 'নট' করে দিবে! চাকরি 'নট' করে দিলে বুয়া কাকে হাতে তুলে খাইয়ে দেবে?

আমার বাবারও একটু বুদ্ধি কম! যেমন বুয়া প্রত্যেকবার খাওয়া শেষে যে ওষুধটা খেয়ে নিতে বলে বাবা সেগুলোকে ওষুধ বলে না, বলেন 'টফি'। কি বোকা তাই না - ওষুধ কি আর টফি হতে পারে আর টফি কি কখনোও পানি দিয়ে গিলে খায়? তারপরও বাবা কিছুদিন পরপর আমার জন্য গিফট কিনে আনেন - এই হয়তো একটা টেনিস বল, একটা খেলা পিস্তল কিংবা কয়েকটা কমিক্স বই আর এই ওষুধ। টেনিসবল আমার কিছুদিন পর পরই লাগে। কারন আমার বলগুলো প্রায়ই পকেট থেকে টয়লেটের কমোডে পড়ে যায়। তারপর আবশ্য ভোলা সেটা তুলে আনে কিন্তু মা তখন নাক চোখ কুচকে বলেন - 'ফেলে দে ওটা, ফেলে দে! আরেকটা এনে দেয়া যাবে। ফেলে দে।'  ব্যাস ক'দিন পরেই আমি নতুন আরেকটা বল পেয়ে যাই।  আর কমিক্সের বইগুলোর ছবি দেখার পর আমি কলম দিয়ে আকিঁ, কারও চোখ কানা করে দিই, কারও গোফ একেঁ দিই, কিংবা দাড়ি - সেই দাড়িও বিভিন্ন রকম - দাদাজানের মত গালভরা দাড়ি কিংবা মিজান দাদুর মত ছাগুলে দাড়ি (হা হা হা )জলি আপু অবশ্য বলে আকাঁআকি করা নাকি ভালো, অনেক কিছু শেখা যায়। আমার হাসি পায়, জলি আপুটা একটু পাগলাটে হলেও মাঝে মাঝে কিছু অদ্ভুত কথাও বলে ফেলে।

তাহলে চিন্তা করুন আমার কি খারাপ অবস্থা! এত্তগুলো পাগল আর মাথা খারাপ মানুষের মধ্যে একমাত্র আমিই সুস্থ্য। এদের সবাইকে সামলে রাখতে হয় আমাকে। আমার অবশ্য ভালোই লাগে। শুধু যখন অসুখ হয় তখন বাদে।

মাঝে মাঝে আমার খুব অসুখ হয় - জ্বর, সর্দি, কেমন কেমন যেন। কিছু ভালো লাগে না। সারাদিন বিছানায় শুয়ে থাকতে হয়। মজার ব্যাপার হল, যে কটা দিন আমি শুয়ে থাকি তখন সবাই সুস্থ্য হয়ে যায়। ভোলা আমাকে পাগল মনে করে না, বলে সে নিজেই বদ্ধ পাগল। দাদাজান তার সিংহাসন বাদ দিয়ে সারাদিন আমার পাশে বসে থাকেন। জলিআপু চিঠি নিয়ে মাতামাতি করে না, মা'ও তার প্রাকটিস বন্ধ করে দেন, বুয়া রান্না বান্না বাদ দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন - সবাই সুস্থ্য। তবে বাবা আর কাকু তখনও একটু পাগলামী করে।

বাবা আর কাকু দুজনে মিলে ট্যাক্সি ক্যাবে চড়িয়ে আমাকে হাসপাতাল নিয়ে যায়। এই হাসপাতালটা আমার একদম ভালো লাগেনা। তারা আমাকে 'মানসিক প্রতিবন্ধী' নামের একটা জায়গায় নিয়ে যায় - সেখানে শুধু পাগল আর পাগল - ডাক্তার পাগল, নার্স পাগল রোগীরাও পাগল। বাবা আর কাকু পাগল না হলে এইরকম হাসপাতালে নিয়ে আসে? আমি অবশ্য কিছু বলি না -কারন তখন আমার অনেক কষ্ট। ডাক্তার আমাকে ইন্জেকশন দেয়, আরও কত কি করে! আমার অনেক ঘুম পায়। অনেক ঘুম। বোধহয় দশ বিশ দিন ঘুমিয়ে থাকি। আরেকটু কমও হতে পারে, আরেকটু বেশীও হতে পারে। আসলে ঘুমিয়ে থাকি তো তাই বলতে পারি না। ঘুম থেকে উঠলে বাবা, কাকু, দাদাজান, জলি আপু আর মা - সবাই মিলে আমাকে বাসায় নিয়ে আসে। তখন আমার অসুখ ভালো হয়ে যায়।

ভালো হলেই আর লাভ কি - বাসার সবাই যে তখন আবার আগের মত পাগলামি শুরু করে দেয়!

সোমবার, ২৫ আগস্ট, ২০০৮

ইত্তেফাকের শিরোনাম এবং আমার জাদুঘর ভ্রমন ভাবনা

আজকের নিউজপেপার হাতে নিয়েই হতভম্ব হয়ে  গেলাম।
অবিশ্বাস্য! এও কি সম্ভব?
হতেই পারে না, নিশ্চয়ই কোন ভুল হয়ে গেসে। দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক। প্রথম পৃষ্ঠায় এরকম একটি খবর ছাপানোর জন্য তাদের জরিমানা হওয়া উচিত, কিংবা ফাঁসি!
উহু, নিশ্চয়ই এখানে কোন কিন্তু আছে, হয়তো রিপোর্টার মেজর কোন ভুল করেছেন, কিংবা হয়তো এটা কোন পক্ষপাতমূলক খবর!
যাই হোক না কেন, এ ধরনের মিথ্যা, ভুয়া, বানোয়াট খবর প্রথম পৃষ্ঠায় দেয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই। তাছাড়া দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকাতো অবশ্যই কোন সম্পাদক আছে, তিনি কি রিপোর্টটি পরে দেখেননি! জানি না বাবা, আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে, হতাশ লাগছে,..... তবে কি আমার ভাগ্নিটাকে নিয়ে কোনদিন জাদুঘরে যাওয়া হবে না ?

আমার ছ' বছরের ভাগ্নিটা গত কয়েকমাস ধরে আমার পেছনে পেছনে ঘুরছে, সে একবার জাদুঘরে যেতে চায়, তার বান্ধবী কিছুদিন আগে গিয়ে ঘুরে এসেছে, গল্প শুনে তারও ইচ্ছে হয়েছে। আমি বারবার কাটিয়ে যাই, বলি, আর কয়েকটা দিন সবুর কর, তোকে ঠিক নিয়ে যাবো ! তবে এখন না, আর ক'টা দিন পরে! কেন? ক'টা দিন পরেই জাদুঘরে নতুন একটা জিনিস আনা হবে, পৃথিবীর কোন জাদুঘরে নেই, বাংলাদেশেরই এক কৃতি সন্তান তা জাদুঘরে পাঠিয়ে দেবেন, তখন গিয়ে দেখা যাবেখন। এখন গেলে তখন আরেকবার যাওয়া লাগবে, দুবার গিয়ে লাভ আচে বল? আমার ভাগ্নি আমার উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্হাপন করে, হু মামা ঠিক বলেছে, ক'দিন পরেই যাওয়া যাক!

কিন্তু এখন কি হবে? ইত্তেফাকের রিপোর্টটা যদি সত্যি হয়, তবে সেই বস্তুটি কখনো জাদুঘরে যাবে না ! তবে কি হবে!! আমি জানিনা, আমার ক্ষুদ্র মাথায় এত বিশাল চিন্তা আসে না। আমার হতাশ লাগে - নচিকেতার একটা গান মনে পড়ে যায়,
বাদরের মত নাচি আমরাও এই কলিকালে
অজানা মাদারীর অদৃশ্য ডুগির তালে...
যে খবরটা বলার জন্য এত আতঁলামি সেটা না বলে লেখাটা শেষ করতে পারছি না, প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম কলামে বড় বড় অক্ষরে ছাপা হয়েছে--------বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে!

শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০০৮

ট্রান্স সিলভার মজবুত টিকিট!

গতকালের ঘটনা।

অফিস থেকে বেরোলাম যখন তখন সন্ধ্যা হয়ে গেসে। সাড়ে সাতটা বাজে। যাবো কলাবাগান, সো পল্টন থেকে হাটতে হাটতে প্রেস ক্লাব পর্যন্ত এলাম। ট্রান্স সিলভার একটি বাস দাড়িয়ে ছিল।আমি পৌছাতেই চলতে শুরু করল। তাড়াহুড়ো করে একটি টিকিট কিনলাম।

১০ টাকার নোট, ৮ টাকা রেখে ২টাকার একটি চকচকে নোট ফেরত দিলেন কাউন্টার ম্যান। একহাতে টিকিট অন্যহাতে টাকা নিয়ে দৌড়োলাম, বাসের হ্যান্ডেল ধরে উঠে অন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম টিকিট চেকারের হাতে। সেও দক্ষতার সাথে টিকিট ছিড়ে নিতে চাইল।

কিন্তু একি! টিকিট ছিড়ছে না ! আমিও শক্ত করে ধরে রাখলাম, কন্ডাকটর ও টেনে ধরল। উহু ছিড়ল না ! বাস চলছে, আমি আর চেকার টিকিট নিয়ে টানাটানি করছি! এরা টিকিট এত শক্ত করে বানিয়েছে কবে থেকে?

অবশেষে ছিড়ল!! আমি টিকিটের অবশিষ্ট টুকরো চোখের সামনে এনে দেখি --- দুই টাকার নোটটির বাকী অংশ আমার হাতে! অন্য হাতে অক্ষত টিকিট !!!

আমি হতভম্ব, শোকাহত!!

বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০০৮

পানি খরচ!

ছোটবেলার ঘটনা।
আমাদের মধ্যে শাওন একটু বেকুব গোছের, সহজে কোন কথা ধরতে পারে না। তাকে নিয়েই মজার ঘটনা।

আমরা সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছলাম, আমাদের এক বন্ধু টয়লেটে ঢুকে পড়েছিল ভিতরে কেউ আছে কিনা সেটা পরীক্ষা না করেই। তার ভায়ায়, 'ঢুইকা দেখি ব্যাটা খারাইয়া খারাইয়া ঢিলা করতাছে, টের পায়নায়, আমিও আস্তে দরজা বন্ধ কইরা দূরে আইসা কাশি দিলাম।' বর্ণনা ভঙ্গি খুব ইন্টারেস্টিং ছিল, তাই আমরা সবাই খুব হাসছিলাম, একমাত্র শাওন ছাড়া।
ঢিলা মানে জানা না থাকায় সে ঘটনাটা বুঝতে পারে নাই! তার কাছে ঢিলা মানে লুজ মানে ঢোলা মানে বুদ্ধি কম, কিন্তু সেটা কিভাবে করা হয়, তাও আবার টয়লেটে সেটা মাথায় ঢুকছিল না। তাই সে প্রশ্ন করে ফেলল, ঢিলা মানে কি?

আমরা তাকে বোঝাতে শুরু করলাম, তুই প্রশ্রাব করার পর পানি নেস?
হু নেই।
কিভাবে নেস?
কেন বদনায় নেই!
আরে গাধা তুই পানি খরচ করসনা?
করি তো, তাতে কি হইছে?
এইটাই ঢিলা করা।
বুঝিনাই...
তুই পানি খরচ কিভাবে করস?
কেন, বদনায় পানি নিয়া ঢাইলা দিই.....

আমরা বোঝানো বাদ দিয়ে হাসিতে গড়াগড়ি খাই! হা হা হা

মঙ্গলবার, ৮ জুলাই, ২০০৮

ভালোবাসার গল্প!


গিয়েছিলাম চট্রগ্রামে।
সীতাকুন্ডের পাহাড়ের চূড়া ঢেকে ছিল সাদা মেঘে। পেজা তুলোর মত সাদা, বড় পবিত্র সে মেঘ। অামি অবিভূত। 
অামি কল্পনায় ডুবে যাই। স্বপ্নের পৃথিবী তৈরী করি। 
মনে পড়ে যায় কাঞ্চনজংঘার কথা। মেঘে ঢাকা পাহাড় দেখতে সবাই যায় সেখানে।
একাকি অামার মন হাহাকার করে উঠে। অামি প্রিয় মানুষদের সেলে এসএমএস পাঠাই, পৌছে কিনা জানি না। কাউকে ডেকে দেখানোর ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠে। আমি কারে দেখাবো এই রূপ। কারে বলব, আমাদের এখানও পাহাড়  ঢেকে যায় সাদা মেঘে। আমাদেরও আছে কাঞ্চন!
একটু ভালো করে বাচবো বলে, আর একটু বেশী রোজগার.......ছাড়লাম ঘর আমি, ছাড়লাম ভালোবাসা.......
(ছবি কৃতজ্ঞতা: amarshopnoduar.blogspot.com)