সারা বিশ্ব করোনা মহামারিতে আক্রান্ত। দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এই মহামারিতে। এখন পর্যন্ত এর কোন চিকিৎসা আবিস্কৃত হয়নি। করোনা মহামারি থেকে মুক্তির জন্য আইসোলেশন বা সেল্ফ কোয়ারেন্টাইন-কেই একমাত্র উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই কোয়ারেন্টাইন-এর সাথে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও চিকিৎসক ইবনে সিনার নাম উচ্চারিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, তিনিই সর্বপ্রথম কোয়ারেন্টাইন বা অসুস্থ্য ব্যক্তিকে সকলের থেকে আলাদা করে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সত্যি মিথ্যা জানি না, ইতিহাসবিদরা সে বিষয়ে গবেষণা ও তর্ক-বিতর্ক করবেন, তবে করোনা মহামারির আবির্ভাবের বেশ আগেই ২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা 'দ্য ফিজিশিয়ান'-এ ইবনে সিনা-কে বলতে দেখা যায়, "নগরের অভ্যন্তরে একজন প্লেগ রোগী মারা গিয়েছে। আমাদের এখনই নগর খালি করে দেয়া উচিত।"


দ্য ফিজিশিয়ান সিনেমার প্রেক্ষাপট মধ্যযুগ, যে সময়টা ইউরোপের অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ হিসেবে চিহ্নিত অথচ ইসলামের স্বর্ণযুগ একই সময়ে বিদ্যমান। জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানরা তখন শীর্ষে, পারস্য তার কেন্দ্রস্থল। ইবনে সিনার অবস্থানও সেখানে। সিনেমার ভাষায়, তিনি সেখানে একটি বিশাল প্যালেস-এ রোগীদের চিকিৎসা করেন, রোগীরা সুস্থ্য হবার আগ পর্যন্ত সেখানেই থাকে। এছাড়া রয়েছে আরেকটি প্যালেস, যাকে বলে মাদ্রাসা, যেখানে তিনি তার ছাত্রদেরকে জ্ঞানদান করেন। সিনেমার প্রধান চরিত্র রব কোল, যে কিনা একজন খ্রীষ্টান যুবক এবং পেশায় হাতুড়ে চিকিৎসক (বার্বার), ইহুদী যুবকের বেশ ধরে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ইস্পাহান (বর্তমান ইরান)-এ গমন করে ইবনে সিনার নিকট হতে চিকিৎসা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য। তার এই চিকিৎসক হবার গল্পই তুলে ধরা হয়েছে দ্য ফিজিশিয়ান সিনেমায়।

এই জার্মান চলচ্চিত্রটি নোয়াহ গর্ডনের বিখ্যাত উপন্যাস দ্য ফিজিশিয়ান অবলম্বনে নির্মিত। উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। বইটি ইউরোপে প্রবল জনপ্রিয়তা পায় এবং বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়। অবশ্য উপন্যাস নির্ভর বেশিরভাগ চলচ্চিত্রের মতই উপন্যাসের কাহিনী চলচ্চিত্রে পুরোটা উপস্থাপন করা হয়নি, আকারে ও বিস্তারে সংক্ষিপ্ত হয়েছে, ঘটনার ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। ইবনে সিনার মত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও সিনেমার কাহিনী ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বা সত্যতা অনুসরণ করতে সক্ষম হয়নি বরং চরম বিকৃত করে একটি কল্পকাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে।

শুধুমাত্র একটি সিনেমা হিসেবে দেখতে গেলে দ্য ফিজিশিয়ান একটি চমৎকার সিনেমা। এই সিনেমায় অন্ধকার যুগের ইউরোপের চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি স্বর্ণযুগের মুসলমান সভ্যতারও পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এই সিনেমায় আছে প্রেম, আছে দ্বন্দ্ব ও বিরহ। আছে সাধনা, ত্যাগ ও তিতিক্ষার বয়ান। কিন্তু ইবনে সিনার মত ব্যক্তি যখন সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, তখন কেবলমাত্র সিনেমা হিসেবে গ্রহণ করা একটু কষ্টকর।

ফিলিপ স্টল পরিচালিত এই সিনেমায় তৎকালীন মুসলমান সমাজের অনেক উদার মানসিকতার উদাহরণ তুলে ধরা হলেও বিজ্ঞানের প্রধান শত্রু হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে ধর্মকেই। ইউরোপে যেমন হাতুড়ে ডাক্তারকে ডাইনীচর্চায় অভিযুক্ত করে খ্রীষ্টান পাদ্রীরা বিজ্ঞান চর্চায় বাধা দেয়, তেমনি পারস্যে গোঁড়া মুসলমানদেরকে বিজ্ঞান চর্চার অন্তরায় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মোল্লাদেরকে দেখানো হয়েছে এমন দল হিসেবে যারা সম্রাটের বিরোধী, বিনা কারণে বিজ্ঞান চর্চার বিরোধী, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থেকে শত্রুপক্ষের সাথে গোপন আঁতাতকারী, অমুসলমানদের উপর অন্যায় আক্রমণকারী হিসেবে। 

আবার ইবনে সিনাকে তৎকালীন সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে জ্ঞানী এবং শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তার পাণ্ডিত্যের রূপ দেখা যায় না, বরং অশিক্ষিত এক ইংরেজ যুবক যে কিনা জীবনেও চিকিৎসা বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান লাভ করেনি, সেই একটি মাত্র শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করে ইবনে সিনাকে জ্ঞানের সীমায় টপকে যায়, ইবনে সিনা পরিণত হন তার ছাত্রে। ইংরেজদের বড় করে দেখানোর জন্য এর থেকে অবাস্তব কোন পরিকল্পনা পরিচালক মহোদয় পাননি। তাছাড়া, যেহেতু ইতিহাসকে অনুসরণ করতেই ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে ইবনে সিনাকে চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করার দরকারই বা কি ছিল? ইবনে সিনার পরিবর্তে অন্য যে কোন শ্রেষ্ট চিকিৎসকের ছাত্র হলেও গল্পের খাতিরে সবকিছু গ্রহণ করে নেয়া যেতো। এই কাহিনীর সবচেয়ে বড় প্লট-হোল হলো রব কোল-এর ইহুদী-বেশ ধারনে - পোশাক এবং আচার-আচরণ যেখানে পরিচয় লুকানোর জন্য যথেষ্ট সেখানে খৎনার কি কারণ থাকতে পারে?

https://www.youtube.com/watch?v=IOj-Pn5WJkw

যাহোক, যারা রিডলি স্কট পরিচালিত কিংডম অব হ্যাভেন দেখে পছন্দ করেছেন, কিংবা তুরস্কের সিনেমা ফেতিহ ১৪৫৩, অথবা যারা বেন কিংসলে-কে পছন্দ করেন, তারা হয়তো দ্য ফিজিশিয়ান দেখে পছন্দ করতে পারেন। তবে, অবশ্যই মনে রাখা উচিত, দ্য ফিজিশিয়ান কেবলই একটি সিনেমা, যেখানে ইবনে সিনাকে অনর্থক একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ইতিহাসের সাথে এই সিনেমায় বর্ণিত ঘটনার খুব সামান্য মিলই রয়েছে। 

যদি সিনেমাটি আপনি দেখেই থাকেন, সেক্ষেত্রে, সিনেমার কাহিনীর সাথে ইতিহাসের যে সকল অমিল রয়েছে তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য An Historian Goes to the Movies ওয়েবসাইটের লেখাগুলো পড়ে দেখার অনুরোধ রইল।