মিরপুর ১০ এর গোলচক্কর পার হয়ে এগারোর দিকে যেতে বামদিকে 'বে লিফ' নামে একটা রেস্টুরেন্ট আছে। মিরপুরের প্রথম 'বুফে' রেস্টুরেন্ট - এমন দাবী সম্বলিত সাইনবোর্ড আছে রেস্টুরেন্টের গায়ে - সত্যি মিথ্যা মিরপুরবাসী জানেন। হোটেলের সাথেই একটা মাঝারি সাইজের নায়াগ্রা ড্রেন - বিপুল স্রোত বয়ে যাচ্ছে সেই ড্রেন দিয়ে। রেস্টুরেন্টের সামনের দিকে ফুটপাথে তিন চারটে ভ্যানগাড়িতে চা বিক্রি হয় - বিভিন্ন ধরনের চা। ধরন এবং দাম দোকানের গায়ে লাগানো আছে।

আদা চা - ৬ টাকা
কফি চা - ১০ টাকা
তুলসী চা - ৮ টাকা
গ্রীন চা - ১০ টাকা
জেসমিন চা - ১০ টাকা
জিনজার চা - ৮ টাকা


সাড়ে চারটের অ্যাপয়েন্টমেন্ট যেন মিস না হয়ে যায়, তাই আমি বড় ভাইয়ের সাথে চারটেয় চলে এসেছি। পথে আসতে আসতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট টাইম পাল্টে গেছে - সুতরাং দশ নম্বরের ফুটপাতের টাইলস গোনা ছাড়া সময় কাটানোর কোন উপায় নেই আমাদের। দোকানের চার্ট দেখে একটু আলাপ জুড়ে দেয়ার চেষ্টা করলাম।

'আদা চা আর জিনজার চা'র মধ্যে পার্থক্য কি ভাই?'
'পার্থক্য তো অবশ্যই আছে' - দোকানদার এমন ঝাড়ির সাথে উত্তর দিল যে বুঝে গেলাম এই উত্তর দিতে দিতে তার মুখস্ত হয়ে গেছে। ঝাড়ি শুনে আমি চুপসে গেলাম - দিনের শুরুটাই গোলমেলে ছিল, এখন চা'র দোকানদারেরও ঝাড়ি খাচ্ছি!

আমার চুপসে যাওয়া দেখেই বোধহয় করুণা হল তার - অপেক্ষাকৃত মোলায়েম ভাষায় ব্যাখ্যা করল সে -'একটা ভেজা আদা, আরেকটা শুকনা'।

সময় কাটানো দরকার। ভাইয়ের মোবাইলে ফোন এসে গেছে - সে হাসিমুখে সিরিয়াস আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে গেছে। আমি দুটো চায়ের অর্ডার দিয়ে দোকানের কোনায় ঠেস দিয়ে দাড়ালাম।

দোকানদার (নাম সম্ভবত রুবেল) শিল্পী মানুষ! দুটো কাপে অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় চা বানানোর আয়োজন শুরু করল সে। ডান হাত উড়ে উড়ে গিয়ে ছোট্ট দোকানের বিভিন্ন প্রান্তে রাখা বিভিন্ন রকম উপাদান তুলে আনছে, বাম হাতের সাথে মিলে সেই সকল উপাদান মাত্রানুযায়ী কাপের মাঝে পড়ছে। কালো কালো দানাদার কিছু একটা দেয়া হল - কালিজিরা হতে পারে, সবুজ গাছের তিনটা পাতা দেয়া হল - তুলসী নাকি পুদিনা বুঝতে পারি নি, হালকা হলুদ রং এর কি যেন একটু গুড়া দেয়া হল - চিনতে পারি নি, চিনি দেড় চামচ করে, আরও দুয়েকটা আইটেম - নজর করার আগেই কাপের মাঝে পড়ল। তারপর পাশের ফ্লাক্সে রাখা গরম পানি দুটো কাপে ঢেলে একটি চা চামচ দিয়ে রাম-ঘুটা। ঘূর্ণি থামার আগেই দুটো টি-ব্যাগ নিয়ে দুই কাপে ঘূর্ণির মাঝে ডুবিয়ে দিল চা-শিল্পী - 'নেন'।

ভাইয়ের হাতে একটা কাপ ধরিয়ে দিয়ে তারপর নায়াগ্রা ড্রেনের পাশে দাড়িয়ে নিজের চায়ে চুমুক দিলাম। অসাধারণ! আমার খাওয়া সেরা তিন কাপ রং চা'র মধ্যে অবশ্যই এই চা থাকবে। বাকী দুই কাপের এক কাপের শিল্পী পাশেই - আদা চা হাতে নিয়ে মোবাইলে কথোপকথনে ব্যস্ত বড় ভাই। তৃতীয় কাপের শিল্পীর কথা এখানে অপ্রাসঙ্গিক!

পরপর দুই কাপ চা খেয়েছিলাম সেদিন - দশের গোলচক্করে আবার কবে যাওয়া হবে জানি না, গেলে আবারও খাওয়ার ইচ্ছে। নিমন্ত্রণ রইল!