রকিবুল ইসলাম ভাই সিনেমাখোর গ্রুপে একটা পোস্ট দিয়েছেন - যার উদ্দেশ্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কেন উন্নত হতে পারছে না সেটা আলোচনার মাধ্যমে বের করা। উনি কিছু প্রশ্ন করেছেন সবার উদ্দেশ্যে, সবাই সে প্রশ্নের উত্তরও দেয়ার চেষ্টা করেছেন। এই পোস্টটি মূলত আমার আগে করা অন্যদের মন্তব্যের উপর ভিত্তি করে প্রশ্নের জবাব খোজার চেষ্টা করা। বেশ বড় মন্তব্য লিখেছিলাম, সংরক্ষন করে রাখার প্রয়োজন বোধ থেকে লিখছি।

রকিবুল ইসলাম ভাই প্রশ্ন রেখেছেন -
মাঝেমধ্যেই আমাদের মধ্যে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হলে প্রসঙ্গতই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা-নির্ভর চলচ্চিত্র, নির্মাতা, কারিগরী দিকের কথাও চলে আসে। বিগত ৫-৬ বছরে কলকাতার সিনেমা বেশ অভাবনীয় উন্নতি করেছে। তা কাহিনীর দিক দিয়েই বলেন, অভিনয় প্রসঙ্গেই বলেন, কিংবা সাউন্ডট্র্যাক/ক্যামেরার প্রসঙ্গেই বলুন না কেন। অনস্বীকার্য যে প্রতিভাবান কিছু পরিচালক তারা পেয়েছেন; সাথে দারুণ কিছু কলাকুশলী কিন্তু সেই দিক থেকে এপার বাংলায় এফডিসি কিংবা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম নির্ভর আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের পরিবর্তন কিছুটা হলেও শ্লথ। 

আমার প্রশ্নগুলো হলোঃ
১) কোয়ালিটির বিচারে একটা সময় আমরা কলকাতার সমান বা(হয়তো কিছু কিছু সময়ে এগিয়ে থাকলেও) বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যবধানটা এত বেশি কেন? আমাদের অভাবটা কোথায়- ভালো পরিচালক? অভিনয় শিল্পী? চিত্রনাট্যকার? কারিগরী দক্ষতা? বিনিয়োগ?

২) নানা ক্ষেত্রেই কলকাতায় আর্ট ফিল্মের বেশ ছড়াছড়ি চোখে পড়েছি। আবার ক্ষেত্র বিশেষে সাহসী প্লটে-সাহসী দৃশ্যের (যা পাশ্চাত্যে অহরহ হলেও উপমহাদেশিয় সিনেমায় কিছুটা রক্ষণশীলতা থাকার কারণে হয়তো অতটা দেখা যায়নি অতীতে)- অবতারণাও দেখে যাচ্ছে। আমাদের দেশে এমনটা এখনও আসেনি।
সাধারণ ভাবেই, আমাদের দর্শক শ্রেণির মেজরিটি কি এখনই প্রস্তুত গতানুগতিক প্লট বা চিত্রায়নের বাইরের সিনেমা নিতে?

৩) বিনিয়োগ কম হবার কারণ কী? দর্শকদের হলমুখী করার উপায় কী? হলিউডের সিনেমাও পাইরেটেড হয়, তারপরও ঠিকই পয়সা উসুল করে। তাহলে কি দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী সিনেমা আসছে না? নাকী একই ধরনের প্লটের কারণে দর্শক কিছুটা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে?

 

আমি যা বলবো সেইটাই শেষ কথা না - তারপরও কথা থাকতে পারে, তবে একটু স্পেসিফিকভাবে প্রবলেমগুলা আইডেন্টিফাই করা দরকার।

উপরে যারা যারা বলেছেন - তাদের কথার সারাংশে প্রবলেম অল্প কয়েকটা।
১. সিনেমা হলের মান-পরিবেশ ভালো না
২. ভালো প্রোডিউসার-ডিরেক্টরের অভাব। এদের সাথে ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রীর সমস্যাও যোগ করা যায়।
৩. কারিগরি ইকুইপমেন্টস এর অভাব

সমস্যা আসলে নির্দিষ্ট একটা না যে ওটার সমাধান করলেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যাবে। প্রত্যেকটা সমস্যাই একে অন্যের সাথে মিলেমিশে আছে, ফলে একত্রে সবগুলার সমাধান প্রয়োজন। 
প্রোডিউসাররা কোটি টাকার মত ইনভেস্ট করে প্রতি ছবিতে। সিনেমার ব্যবসা এমনই, যদি ধরা খায় তাহলে সেটা মিলিয়ন টাকায় গোনা লাগে। যদি ভালোভাবে ধরা খায়, তাহলে কোটি টাকাই পানিতে যেতে পারে। ফলে প্রোডিউসার ব্যবসা করার সময় চিন্তা করে এমনভাবে বিনিয়োগ করতে যেন টাকা লস গেলেও যেন বেশীরভাগ টাকা উঠে আসে। বেশীরভাগ টাকা উঠে আসার জন্য নতুন পরিচালককে দিয়ে সিনেমা বানানোর রিস্ক বেশ বড়, একই ভাবে নতুন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়েও। ফলে ঘুরে ফিরে সেই পরিচালকরাই ছবি বানায় যাদেরকে আমরা একটু উচু শ্রেণীর দর্শকরা বস্তাপচা হিসেবে গণ্য করি। 

এই পরিচালকদের সমস্যা আছে - এদের কেউ-ই কোনরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়ে সিনেমা বানাতে আসে নাই (অল্প হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া, যাদের সিনেমা ব্যবসা করতে পারে না)। এটা আসলে বড় সমস্যা না, বড় সমস্যা হল - এরা বিশ্বাসও করে না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ভালো পরিচালক-অভিনেতা তৈরী করতে পারে। 

এই প্রযোজক-পরিচালকরা আবার একটা বিষয়ে খুব একাট্টা। যারা বাংলা সিনেমা নিয়ে নাক উচু মনোভাব পোষন করে তাদেরকে তারা ঠেকায়া রাখতে চায় - নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে ভুগে হয়তো। ফলে, যেসকল পরিচালকের নাম আগের মন্তব্যগুলোয় পাওয়া গেছে - তারা এফডিসির লোক হতে পারে না। এই সিন্ডিকেট অবশ্যই একটা বাজে ব্যাপার - কিন্তু এখানে কিছু করার সুযোগও কম। কারণ যাদেরকে ঠেকায়ে রাখার জন্য এই সিন্ডিকেট - তারা তিন বছরে একটা ছবি বানায় - চাইলেও ইন্ডাস্ট্রিতে এরা দখল নিতে পারবে না।
কারিগরি সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলার নাই - কারিগরি দিকটা সরকারের দেখার কথা। সরকার সেটা দেখে নাই। কোন সরকারই দেখে নাই। এখন ডিজিটাল ফিল্ম নিয়া মাতামাতি, কিন্তু এটা আরও ছয় বছর আগে হতে পারতো। একটু টেকনিক্যাল বিষয় বলি - ধরেন আপনি শ্যুট করলেন ফিল্ম ফরম্যাটে - এই ফিল্মকে ভিডিওতে কনভার্ট করা হয় টেলিসিনে মেশিনের মাধ্যমে। ভিডিওতে কনভার্ট করা মানে হল আপনি কম্পিউটারে বসে ডিজিটালি এডিট করবেন, কালার কারেকশন ইত্যাদি করবেন। সব করার পর আপনাকে আবার ফিল্মে নিয়ে আসতে হবে রিভার্স টেলিসিনে নামক মেশিনের মাধ্যমে। এতে করে সুবিধা হল - আপনি ডিজিটালি নানারকম ইফেক্ট তৈরী করে সেটাকে প্রায় হুবহু ফিল্মে ট্রান্সফার করতে পারবেন। সরকার এফডিসি-তে একটা টেলিসিনে মেশিন কিনে দিয়েছে বছর পাচেক আগে, কিন্তু রিভার্স টেলিসিনে মেশিন কিনে দেয় নি। ফলে, রিভার্স টেলিসিনে করতে হলে আপনাকে ভারতে যেতে হবে, অথবা, ডিজিটালি এডিট করা ফিল্মকে নানা কসরত করে ফিল্মে নিয়ে আসতে হবে। ডিজিটাল ফরম্যাট আসার আগে এভাবেই কাজ চলেছে এফডিসি-তে। আমি আপডেটেড না, সম্ভবত এফডিসি-তে এখনো কোন ডিজিটাল ক্যামেরা নেই। 
ফলে ঘুরে ফিরে সব একজায়গাতেই আবর্তিত হচ্ছে। শর্টকাটে কাহিনী তৈরী হচ্ছে, শর্টকাটে সেই কাহিনীর উপর নির্ভর করে সিনেমা তৈরী হচ্ছে, সেই সিনেমা টাকা তুলে আনতে পারছে - তাহলে কষ্ট করে আপনি আরও বড় বাজেটে আরও ভালো গল্পের সিনেমা বানাবেন কেন?

এর বাইরে একটা ভালো দোষ আছে দর্শকদের - আমরা যার এইসব গ্রুপে আলাপ আলোচনা করি তাদের। সিনেমাহলের পরিবেশ ভালো না - সত্যি কথা - ঢাকা শহরে অন্তত দুইটা হল ভালো, চট্টগ্রাম শহরে অন্তত একটা। সাড়ে সাতশ হলের মধ্যে এই তিনটা হলে আমাদের দৃষ্টিতে ভালো নির্মাতাদের ভালো ছবিগুলো প্রদর্শিত হয়। আমরা যারা হলের পরিবেশ আর নির্মাতাদের নিয়ে কথা বলি - তারা কি এইসকল নির্মাতার সকল ছবি এই হলগুলোয় গিয়ে দেখি? আর এইসব ভালো নির্মাতা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি টিকে থাকে না - উনারা হচ্ছেন বিরিয়ানি-র বাবুর্চি, প্রত্যেক বেলায় খাওয়া যায় না। প্রত্যেক বেলায় খাওয়া যায় ভাত, আর তার জন্য বানিজ্যিক বাবুর্চি দরকার - কই কোন বিরিয়ানির বাবুর্চি তো বানিজ্যিক বাবুর্চি হয় না। কাজী হায়াত প্রথম ছবি বানিয়েছিলেন বিরিয়ানি - দি ফাদার, ফ্লপ করার পর বানিজ্যিক বাবুর্চি হয়ে গেছেন - সিনেমা বানিয়ে তাকেও তো টিকে থাকতে হবে, নাকি? এতবছর পরে একটা পরচালককে পাওয়া গেল - যে বিরিয়ানীর বাবুর্চী হয়েও সুগন্ধী বানিজ্যিক ভাত রেধেছে - সেটা হলেন রেদওয়ান রনি। ফলাফলও পেয়েছে হাতে হাতে। 

আর যারা মনে করছেন - সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নতির জন্য সব সিনেমাকে আসতে দেয়া উচিত - তারা শুধু হল মালিকের স্বার্থ দেখেন, ইন্ডাস্ট্রির না। সব সিনেমা বিশেষ করে ভারতীয় সিনেমা আসলে ইন্ডাস্ট্রির অবশ্যই উন্নতি হবে - তবে সেটা ঢাকায় না, মাদ্রাজ আর কোলকাতায়। চল্লিশ বছর অনেক বড় সময়, সেটা মানি - সময় পার হলে শিশু থেকে যৌবনে পৌছানো যায় বটে, তবে এই চল্লিশ বছরের অপুষ্টি নিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে ফাইট করা যায় না, কারণ চল্লিশ বছরের যুবক তখনো শিশু-কিশোররের যোগ্যতা নিয়াই থাকে।