Poramon 1পরিচিত দুই নর-নারীর ভাব-ভালোবাসার বিনিময় পরিণয়ে রূপ নেয় এবং নানা রকম ঘাত প্রতিঘাতের মোকাবেলা করে সেই পরিণয় পৌছায় কোন এক পরিণতিতে। এই পরিণতি সফলতার হতে পারে, ব্যর্থতারও হতে পারে। পৃথিবীতে প্রেমের ঘটনা অগুনতি, কিন্তু তার মধ্য থেকে গুটিকয়েক স্থান পায় ইতিহাসে-সাহিত্যে-চলচ্চিত্রে। এরকমই দুই তরুণ-তরুণীর দুর্বার প্রেম কাহিনী নিয়ে জাকির হোসেন রাজু নির্মান করেছেন 'পোড়ামন'। প্রেমের আগুনে পোড়া মনের গল্প হলেও এই গল্প আলু-পোড়ার মতই সুস্বাদু, উপভোগ্য।


ছবির ঘটনাস্থল বান্দরবান জেলার রুমা থানা। ঈদের আগের দিন থানা পরিদর্শনে জিআইজি আসলে সেই সুযোগে হাজত থেকে পালিয়ে যায় এক কয়েদী। পলাতক আসামীকে ছুটির মাঝে পুনরায় গ্রেফতার করে কোর্টে হাজির করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামে রুমা থানার ওসি আবিদ। আসামী উদ্ধারের এই ঘটনা গুরুত্ব বহন করলেও মূল ঘটনা আসামী সুজনকে ঘিরে। বাল্যকালের সাথী পরীর সাথে পরিচয়, প্রেম এবং তা থেকে উদ্ভুত ঘটনা পোড়ামন চলচ্চিত্রের প্রধান গল্প।


ছবির কাহিনী ও সংলাপ লিখেছেন ফারজানা, চিত্রনাট্য প্রস্তুত করেছেন পরিচালক জাকির হোসেন রাজু। পুলিশ অফিসার আবিদকে কেন্দ্র করে কাহিনীকে জটিল করে তুলতে পারলেও যৌক্তিক সমাধানে পৌছাতে পারেন নি তিনি। সমাপ্তির দিকে পৌছাতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন নানা ফাঁক ফোকর আর দুর্বলতার। পোড়ামন চলচ্চিত্রের মূল ফোকাস হওয়া উচিত ছিল সুজন-পরীর প্রেম, এবং সমাপ্তিটা তাই ট্রেনের সিকোয়েন্সেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর তখনো অজানা থেকে যায়, ফলে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হঠাৎ করে গল্প তীব্র বাঁক নেয় এবং সিনেমার সাথে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক, এবং কিছুটা অযৌক্তিক, একটি সমাপ্তিতে পৌছায়। কাহিনীকার এবং চিত্রনাট্যকার গল্পে যেভাবে জটিলতা সৃষ্টি করেছিলেন, সেটা প্রশংসনীয়, কিন্তু এই জটিলতা তৈরীতে আরও একটু যত্নবান হয়ে মজবুত ভিত্তি তৈরী করা সম্ভব হলে ত্রুটিগুলো এড়ানো সম্ভব হত। পাঁচ বছর সংসার করার পর স্বামীর সাথে স্ত্রী এবং স্ত্রী'র পরিবারের মধ্যকার সম্পর্কের পরিণতি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি নয় এই পরিণতিতে পৌছার কারণ হিসেবে যা উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষতঃ প্রযুক্তির এই উন্নত যুগে পরিস্থিতি সরলীকরণের সহজতর উপায় মানুষ সাধারণভাবেই অনুসরণ করে। স্ত্রীর সাথে শত্রু-সম্পর্ক ব্যতিক্রম হতে পারে, কিন্তু আবিদ এবং মুক্তির সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক হলে শত্রুতার নয়। কাহিনীর এই দুর্বলতা থেকে দর্শকের মনযোগ সরিয়ে রাখে ছবির সংলাপ এবং ঘটনাপ্রবাহ। ​দারুন রসাত্মক সংলাপ এবং বিভিন্ন ধারার ঘটনাপ্রবাহ দর্শককে ছবির সাথে মিশে যেতে সাহায্য করেছে।


পরিচালক জাকির হোসেন রাজু জানিয়েছিলেন, বান্দরবানের সত্যি ঘটনার উপর নির্ভর করে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। জানতে আগ্রহ হয়, পুরো সিনেমার ঠিক কতটুকু সত্যি ঘটনার উপর নির্ভর করে তৈরী। ট্রেনের সিকোয়েন্সটা অন্য কোন স্থানে তৈরী সম্ভব হলে মনের ভেতর প্রশ্ন নিয়ে দর্শককে ফিরতে হত না। একই ভাবে প্রশ্ন জাগে, ঈদের সময়কে কেন ঘটনা সংঘটনের সময় হিসেবে তুলে ধরা হল যদি পুরো চলচ্চিত্রে ঈদকে কোনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভবপর না হয়।

Poramon 9


এ সকল প্রশ্ন সিনেমা দেখার সময়ে তৈরী হয় না, তার প্রধান কারণ সাইমন সাদিকের চমৎকার, প্রাণবন্ত ও জড়তাহীন অভিনয়। গত বছর এপ্রিলে জাকির হোসেন রাজু-র 'জ্বী হুজুর' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সাইমনের আত্মপ্রকাশ। দ্বিতীয় চলচ্চিত্রে পূর্বের অনেক ত্রুটি কাটিয়ে উঠেছেন তিনি। পুরো চলচ্চিত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিনয় করেছেন সাইমন, তার অশ্রুভেজা লাল চোখ এবং সংলাপ দর্শক মনে দাগ ফেলতে সক্ষম। সাইমনের পাশাপাশি দক্ষ অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন, যদিও তার চরিত্রটি খুব মজবুতভাবে তৈরী হয় নি। দর্শককে হাসানোর দায়িত্বে নিয়োজিত রতন এবং আলীরাজকে তাদের ভূমিকা পালনের জন্য ধন্যবাদ দেয়া উচিত। রতনের অভিনয় কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাত্রা ছাড়ালেও গ্রহণযোগ্যসীমার মধ্যে ছিল বেশীরভাগ সময়।

নারী চরিত্রদের মধ্যে পরী চরিত্রে মাহিয়া মাহি ভালো অভিনয় করেছেন। ভালো অভিনয় করেছেন তার মা চরিত্রে মনিরা মিঠু। সেই তুলনায় মুক্তি চরিত্রে বিপাশা খুব যোগ্যতার পরিচয় দেন নি। কাহিনীর মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার সিকোয়েন্সে তার অভিনয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল কিন্তু সেটা মেকিভাব থেকে মুক্ত ছিল না। আইটেম গানের বাইরে সম্ভবত এই প্রথম বিপাশার উপস্থিতি - অভিজ্ঞতা তাকে আরও মজবুত অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।


চলচ্চিত্রের গানগুলো অসাধারণ। বিধাতা জানে শিরোনামের গানের অবস্থান ঠিক পছন্দসই না হলেও চিত্রায়ন ও সঙ্গীতে মুগ্ধ না হওয়া সম্ভব হয় নি। টাইটেল সং পোড়ামন এবং জাকির হোসেন রাজুর লেখা 'পরীর মুখে খুশির হাসি' গানদুটো মনযোগ কেড়েছে। 'প্রেমেরও কলসী উছলায়' শিরোনামে গানের উপস্থিতি বাণিজ্যিক, চিত্রায়ন দৃষ্টিকটু এবং অপ্রয়োজনীয়।


চলচ্চিত্র বিনোদনের মাধ্যম এবং এজন্যই সিনেমাহলে সিনেমা দেখতে যাওয়া। বহুদিন বাদে বাংলাদেশী ছবি দেখে তৃপ্তি নিয়ে হল থেকে বের হওয়া সম্ভবপর হল। ত্রুটিগুলো চোখে পড়ার মত ছিল না; ছবির গতি, গল্প, লোকেশন - মনযোগ সরাতে দেয় নি। কিন্তু কিছু সময় গত হলে তৃপ্তির পরিমান কমে, ত্রুটি স্পষ্ট হয়। হোক, বাংলাদেশী সিনেমাকে বিশ্ববাজারে পৌছে দেয়ার জন্য আমাদের ত্রুটি আমাদেরই খুজে বের করে নিতে হবে, শুধরে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে পরের ছবিতে।


প্রিয় জাকির হোসেন রাজু এবং সাইমন সাদিক, পোড়ামন চলচ্চিত্র যথাক্রমে পরিচালনা এবং অভিনয়ের জন্য আপনাদের দুজনকে আমি দারাশিকো অ্যাওয়ার্ড ২০১৩-র জন্য নমিনেশন দিলাম। ধারনা করছি, বছর শেষে সেরা ছবি এবং সেরা অভিনেতার পদকটি আপনাদেরকেই দিতে হবে। বেস্ট অব লাক।


রেটিং: ৪.৫/৫