Devdas_posterখুব কম পরিচালকের ভাগ্যে একই ছবি দুবার বানানোর সুযোগ ঘটে। চাষী নজরুল ইসলাম সেদিক থেকে সৌভাগ্যবান। ১৯৮২ সালে বুলবুল আহমেদ, কবরী, আনোয়ারা এবং রহমানকে নিয়ে বানিয়েছিলেন সাদাকালোর দেবদাস। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় এবার বানিয়েছেন রঙিন দেবদাস। বুলবুল আহমেদের স্থানে এসেছেন বর্তমান সময়ের সবচে জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খান, কবরী ও আনোয়ারার জায়গায় অপু বিশ্বাসমৌসুমী এবং রহমানের স্থলে শহীদুজ্জামান সেলিম। সাদা-কালোর জায়গায় শুধু রং-ই আসেনি, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। রং আর অভিনেতা-অভিনেত্রী পাল্টিয়েই ভালো সিনেমা নির্মান সম্ভব নয়, কারণ, ত্রিশ বছরে দর্শক পাল্টে গিয়েছে অনেক। বর্তমান সময়ের বেশীর ভাগ দর্শক দেবদাস বলতে ত্রিশ বছর আগের বুলবুল আহমেদকে বোঝেন না, তারা বোঝেন শতকোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত হিন্দী সিনেমা দেবদাসের শাহরুখ খানকে। সুতরাং, ত্রিশ বছর বাদে হিন্দী দেবদাসকে সামনে রেখে আবারও দেবদাস বানানোর ঝুঁকি মোটেই ছোট নয়, তবে আশার দিকও তো রয়েছে। ত্রিশ বছরে পরিচালকটিও তো বসে নেই, আরও ছবি বানিয়ে পরিপক্ক হয়েছেন , ফলে শুধু সাদাকালো দেবদাস নয়, নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কতটুকু সফল হলেন সে বিবেচনার জন্য সাদাকালো-রঙিন দু দেবদাসেরই প্রয়োজন।


অমর কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রদ্বয় নির্মিত। জমিদার বাড়ির ছেলে দুরন্ত প্রকৃতির দেবদাসকে শোধরানের উদ্দেশ্যে কোলকাতায় পাঠালে তার তার খেলার সাথী পার্বতীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটে। দশ বছর গ্রামে পরে ফিরে এলে পার্বতীর পরিবারের পক্ষ থেকে দেবদাসের সাথে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু দেবদাসের বাবার অমত থাকায় পার্বতীর বিয়ে ঠিক হয় অন্যত্র। পার্বতীর বিয়ে হয়ে গেলে দেবদাসের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়। দেবদাসের কাহিনী এতটাই পরিচিত যে এর বেশী কিছু বলার নেই। বলতে হবে সেই গল্পের দৃশ্যায়ন সম্পর্কে।


সাদাকালো আর রঙিন - দুটো দেবদাসের চিত্রনাট্যই পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম লিখেছেন। অথবা, একই চিত্রনাট্যে দুটো সিনেমা নির্মান করেছেন। দৃশ্যায়ন থেকে শুরু করে সংলাপ প্রায় একই, রং এর সাথে অভিনেতা অভিনেত্রী আর লোকেশন পাল্টেছে শুধু। তবে, সাদাকালোর দেবদাসের গল্প লিনিয়ার - সরল রেখায় এগিয়েছে। আর রঙিন দেবদাসে গল্প শুরু হয়েছে কোলকাতায়, যুবক দেবদাস আর চুনীলালের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। তারপর ট্রেনে চেপে গ্রামে ফিরতে ফিরতে ফ্ল্যাশব্যাকে ছোটবেলার দেবদাস-পার্বতীর ঘটনাবলী উঠে এসেছে। এর পরের অংশটুকু সরলরৈখিক। সাদাকালো দেবদাসের দর্শকরা তবে কেন রঙিন দেবদাস দেখবেন, যদি দেখতে চান, সে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




[caption id="" align="alignright" width="290"]Devdas_Shakib Khan শাকিব খান নায়কোচিত অভিনয় থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসতে পারলেও পুরোটা পারেন নি। দেবদাসের মত সাহিত্য নির্ভর ছবিতে অভিনয়টা বেশী প্রয়োজনীয় ছিল।[/caption]

হয়তো শাকিব খানের জন্য। একই চিত্রনাট্য হওয়ার কারণে শাকিব খান এখন বুলবুল আহমেদের প্রতিদ্বন্দ্বী। কবরী (পার্বতী) আর আনোয়ারা (চন্দ্রমুখী)র প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন অপু বিশ্বাস ও মৌসুমী। শাকিব খানের চরিত্র ও অভিনয় নিয়ে বলতে গেলে প্রশ্ন আসবেএই ধরনের চরিত্রের জন্য শাকিব খান-ই উপযুক্ত ছিলেন কিনা। আমি বলবো, না। চিত্রনাট্যে দেবদাসের বয়স কুড়ির এদিক-ওদিক। সেই তুলনায় শাকিব খান বেশ বয়স্ক। সদ্য যুবার যে রূপ দেবদাস চরিত্র থেকে আশা করা যায় তা শাকিব খানের মধ্যে নেই। একই সাথে তার ঢুলু ঢুলু চোখ দ্বিতীয়াংশে আর ফোলা ফোলা গাল প্রথম অংশে প্রয়োজনীয় হলেও বাকী অংশে অপ্রয়োজনীয় এবং বাহুল্য যা চরিত্রের সাথে বেমানান। কিন্তু অভিনয়ের দিকে গুরুত্ব দিলে শাকিব খান তার অন্যান্য যে কোন সিনেমার চরিত্রের চেয়ে ভালো অভিনয় করেছেন। স্বয়ং পরিচালক শাকিব খানের এই অভিনয় সম্পর্কে বলেছিলেন -




শাকিব খান এ সময়ের এক নম্বর নায়ক, কাজেই সাংঘাতিক ব্যস্ত। কিন্তু দেবদাসের শুটিংয়ে সময় দিতে মোটেও কার্পণ্য ছিল না তার। আমি তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য হয়তো দ্রুত শট ওকে করছি। কিন্তু শাকিব বলছে, না চাষী ভাই এই শটটা ভালো হয়নি। এই শটটার আরেকটা টেক নিন। আমার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক ভালো অভিনয় করেছেন শাকিব।



মিথ্যে নয়। শাকিব খান সত্যিই নিজেকে ছাড়িয়েছেন - এই ছবির জন্য তার মনযোগ চোখে পড়ে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাদা কালোর দেবদাসকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি শাকিব খান। এর প্রধান কারণ সম্ভবত বর্তমান সময়ে তার অবস্থান। দেবদাস চরিত্রের জন্য নায়কের চেয়ে অভিনেতার বেশী প্রয়োজন ছিল যা শাকিব খান পুরোটা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি তার আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও।


সাদাকালোর দেবদাস বুলবুল আহমেদকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি শাকিব খান, পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম একই সাক্ষাতকারে বলেছিলেন,




অনেকের মতে এ পর্যন্ত যতোগুলো দেবদাস তৈরি হয়েছে তার মধ্যে সেরা পার্বতী ছিলেন কবরী। অপু বিশ্বাসকে পার্বতী চরিত্রে কাস্ট করার সময় আমার নিজের ভিতরই দ্বিধা ছিল। অপু তো এখন পর্যন্ত সাহিত্যনির্ভর ছবিতে তেমন কোনো সিরিয়াস চরিত্র করেননি। তাই সন্দেহ ছিল সে কতটুকু পার্বতী হতে পারবে। অপু পেরেছে এবং ভালোভাবেই পেরেছে। অনেক ক্ষেত্রে তার অভিনয় কবরীকে ছাড়িয়ে গেছে বলে আমার মনে হয়েছে।


আসলে কি তাই? পার্বতী চরিত্রে কবরী যতটা মানানসই, অপু ততটা ছিলেন না - তাকে একটু বয়স্ক বলে মনে হয় এবং কবরীর সরলতা তার মধ্যে অনুপস্থিত। তবে, অপু বিশ্বাস প্রত্যাশার চেয়েও ভালো অভিনয় করেছেন বলে মেনে নিচ্ছি। এই ছবির মাধ্যমে অপু বিশ্বাস তার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন - এই যোগ্যতাকে কাজে লাগানো সম্ভব হলে অপু বিশ্বাস হয়তো সত্যিই কবরীকে ছাড়িয়ে যেতে পারবেন। তবে এ জন্য অপু বিশ্বাসকেও মনযোগী হওয়া দরকার - বিশেষত তার স্বাস্থ্য সব ধরনের চরিত্রে অভিনয় করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাড়াবে।




[caption id="attachment_1781" align="aligncenter" width="384"]Devdas_Mousumi শুধু নাচের মুদ্রাই নয়, অভিনয়েও নজর কেড়ে নিয়েছেন মৌসুমী[/caption]

সাদা কালোর দেবদাসের কোন কিছু যদি ছাড়িয়ে যেতেই হয় তাহলে বলতে হবে চন্দ্রমুখী চরিত্রে মৌসুমীর কথা। অভিনয় বলুন আর এক্সপ্রেশন - আনোয়ারার চেয়ে অবশ্যই ভালো করেছেন মৌসুমী। বাঈজী চরিত্রে তার নাচ অনেক বেশী আকর্ষনীয়, কোমলমতি প্রেমিকার চরিত্রেও।


চলচ্চিত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র চুনীলাল। সাদাকালো দেবদাসে অভিনয় করেছিলেন রহমান, রঙিনে শহীদুজ্জামান সেলিম। মূল উপন্যাস চুনীলালকে যেভাবে উপস্থাপন করেছে, সাদাকালো দেবদাসে খুড়িয়ে হাটা রহমান তার অনেকটাই তুলে ধরতে পেরেছেন, কিন্তু রঙিন দেবদাসে চুনীলালের চরিত্রটি সেই তুলনায় অনেকটা গৌন। শহীদুজ্জামান সেলিম ভালো অভিনয় করেছেন কিন্তু তার চরিত্র আরেকটু বিকশিত হলে আরও ভালো হত।

গত ত্রিশ বছরে দেবদাস রঙিন হয়েছে, সেই সাথে বেড়েছে জৌলুস। রঙিন দেবদাসে বিশালাকৃতির মুখার্জী বাড়ি রঙিন টাইলস দিয়ে মোড়ানো, জানালাগুলো থাই অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরী, ভেতরে আধুনিক ডিজাইনে বার্ণিশ করা আসবাব। বর্তমানের দেবদাস পড়েন আধুনিক বাধাইয়ের শেক্সপিয়র। একটু কি বেখাপ্পা লাগছে না? শিল্প নির্দেশনার দিক থেকে রঙিন দেবদাস এভাবেই পার্থক্য তৈরী করেছে সাদাকালো দেবদাসের সাথে। সাদাকালো দেবদাসে এই জৌলুস ছিল না, কিন্তু সেটা অপেক্ষাকৃত বাস্তবধর্মী - সময়টাকে তুলে আনতে অনেক বেশী সক্ষম হয়েছিল।

সাদাকালো দেবদাসের দুটো গানগুলো লিখেছিলেন রফিকুজ্জামান, রঙিন দেবদাসেও লিখেছেন। পিরিয়ড সিনেমায় আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারের ত্রুটিটুকু এড়িয়ে যেতে পারলে সবগুলো গানই শ্রুতিমধুর। সৈয়দ শামসুল হকের লেখা এবং ইমন সাহার সুরে সুবীর নন্দীর কন্ঠে দেবদাসের মৃত্যুদৃশ্যের গানটি একদম মনের গভীরে পৌছে যায়।


গুণী পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম কেন একই চিত্রনাট্যে দুটি চলচ্চিত্র নির্মান করতে চেয়েছেন তার জবাবে বলেছিলেন,




স্যাটেলাইট প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগটা কম। বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডার যে কতটা সমৃদ্ধ তা তারা জানে না। দ্বিতীয়বার দেবদাস নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছি আমি আসলে তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের জন্যই।

তার এ উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু একই চিত্রনাট্যে একই পরিচালক কর্তৃক দুটো চলচ্চিত্র নির্মান করা হলে পরস্পরের তুলনা হবেই। সেই তুলনায় সাদাকালো দেবদাস এগিয়ে থাকবে রঙিন দেবদাসের তুলনায় এবং এ কারণে এই পরিচালক সেই পরিচালকের তুলনায় কম নাম্বার পেতে পারেন। আবার, শাকিব খান, অপু বিশ্বাস এবং মৌসুমী-কে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য বাহবা-ও পাবেন তিনি। রঙিন দেবদাস সত্যিই এ যুগের দর্শকের জন্য যারা সাদাকালো দেবদাস দেখে নি - সাদাকালোর দর্শকদের তৃপ্ত করার জন্য রঙিন দেবদাস নয়।


রেটিং: ৪/৫

তথ্যসূত্র ও ছবি
বাংলানিউজ ২৪
কালেরকন্ঠ
ফেসবুক