220px-Television_Film_Posterসাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবচে আলোচিত চলচ্চিত্রের নাম 'টেলিভিশন'। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর পরিচালনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্র বাংলাদেশে মুক্তির আগেই বারবার আলোচনায় এসেছে - বিশেষ করে চিত্রনাট্য তৈরী এবং সম্পাদনার জন্য 'এশিয়ান সিনেমা ফান্ড' প্রাপ্তি এবং এশিয়ার সেরা 'পুসান চলচ্চিত্র উৎসব'-এর সমাপনী দিনে 'টেলিভিশন' সিনেমার প্রদর্শনী বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে আবারও তুলে ধরেছে। এছাড়াও মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর নাটক ও বিজ্ঞাপনে অভ্যস্ত দর্শকবৃন্দ এই মুভিটির জন্য প্রতীক্ষা করেছে দীর্ঘদিন। সকল প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে মুক্তি পেল চলচ্চিত্রটি - এখন থেকে সিনেমাহলে চলবে 'টেলিভিশন'।

আনিসুল হক ও মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী'র যৌথ রচনায় 'টেলিভিশন' ছবির ঘটনাস্থল বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার কোন চর অঞ্চল, নাম চর মিঠানূপুর। মিঠানূপুর গ্রামে কোন টেলিভিশন নেই, কারণ গ্রামের চেয়ারম্যান আমিন যিনি একজন ধর্মপ্রাণ বয়স্ক মানুষ, গ্রামের তরুন সমাজের ভালোর জন্য, তারা যেন বিপথে না যায় সে উদ্দেশ্যে গ্রামে টেলিভিশন নিষিদ্ধ করেছেন, কোন বাড়িতেই টেলিভিশন চলে না। হিন্দু ধর্মাবলাম্বী শিক্ষক কুমার টেলিভিশন কিনে আনলে গোপনে সকলে তার বাড়িতে ভিড় জমায়, টেলিভিশন দেখে। গ্রামের মানুষের এই আকাঙ্খাকে শেষ পর্যন্ত কতটা দমিয়ে রাখতে পারবেন আমিন চেয়ারম্যান, আদৌ পারবেন কিনা - সে গল্পই বলা হয়েছে 'টেলিভিশন' চলচ্চিত্রে।

এই গল্পের সবচে বড় চমক হল - এই গল্পের সময়কাল বর্তমান। মিঠানূপুর গ্রামে কম্পিউটার আছে, ভালো স্পিডের ইন্টারনেট আছে, স্কাইপে ব্যবহার করে ভিডিও চ্যাট করা যায় কিন্তু গ্রামে কোন টেলিভিশন নেই। আমিন চেয়ারম্যান এতটাই প্রভাবশালী যে গ্রামে কোন টেলিভিশন প্রবেশ করে না, যুবক ছেলেদের হাতে মোবাইল ফোন থাকে না। টেলিভিশন প্রদর্শনের এই বাঁধা ত্রিশ বছর আগে বর্তমান ছিল যখন একদিকে টেলিভিশন সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ছিল না এবং যখন টেলিভিশন দেখা জায়েজ কি নাজায়েজ তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। অ্যামিশ নামে এক জাতি আমেরিকায় বাস করে, তারা নিজস্ব এলাকার মধ্যে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে না, চলাচলের জন্য এখনো ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করে, বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না। বাংলাদেশে 'অ্যামিশ' জাতির মত কোন এলাকা নেই, বর্তমান সময়ে কোন চেয়ারম্যানের প্রভাবও এতটা হওয়া সম্ভব না যে টেলিভিশনের মত ব্যক্তিগত দৈনন্দিন বিনোদনের বস্তুর ব্যবহার নিয়ন্ত্রন করতে পারেন। তবে কি ছবিতে টেলিভিশন নামের সাথে যে পঙ্খীরাজ ঘোড়া উড়ছে, কাহিনী সেভাবে জোর করে বর্তমানে আসতে চাইছে? টেলিভিশনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রনের জন্য চেয়ারম্যান যে সকল উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন সেটা তার বাস্তবতা নিরূপন প্রশ্নসাপেক্ষ, বিশেষ করে, সিনেমার একদম শুরুতেই বাংলাভিশন চ্যানেলের রিপোর্টার যে রিপোর্ট করেন, তা প্রচারিত হলে চেয়ারম্যানের এ ক্ষমতা খর্ব হতে বাধ্য - যা সিনেমায় ফুটে উঠে নি।

চলচ্চিত্রে আমিন চেয়ারম্যানের (কাজী শাহীর হুদা রুমী) বিপরীতে আছে তার যুবক ছেলে সোলায়মান (চঞ্চল চৌধুরী), তার সহযোগী মজনু (মোশাররফ করিম) এবং মালয়েশিয়া প্রবাসী বাবার সুন্দরী মেয়ে কহিনূর (তিশা)। সোলায়মান এবং কহিনূরের প্রেম ও বিকাশে সহযোগিতা করে কহিনূরের প্রতি অনুরক্ত যুবক মজনু। এই চরিত্রগুলো মূলত ছবিয়াল গ্রুপের প্রচলিত বিভিন্ন রকম হাস্যরস তৈরীতে সাহায্য করলেও শেষ পর্যন্ত কাহিনীর গতিপথ তৈরীতে ভূমিকা রেখেছে।

'টেলিভিশন' সিনেমার অন্যতম ভালো দিক এর ভাষা। ছবিয়াল গ্রুপের ভাষা থেকে বের হয়ে এসে এফডিসি নির্মিত আঞ্চলিক ভাষা নয় বরং নোয়াখালী অঞ্চলের ভাষাই মূল ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর আগে মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান পরিচালিত 'পোকা মাকড়ের ঘরবসতি' ছবিতে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা উল্লেখযোগ্যভাবে তুলে ধরা হয়েছিল বলে মনে পড়ে। সেদিক থেকে মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তারপর বলতে হয়, সিনেমার গান। যদিও পূর্ণাঙ্গভাবে কোন গানই সিনেমায় পাওয়া যায় নি, 'কানামাছি মিথ্যা, কানামাছি সত্য' গানটির অংশবিশেষ খুবই দারুনভাবে কাহিনীর সাথে মিলে ফুটে উঠেছে। ছবির সিনেমাটোগ্রাফারও ধন্যবাদ পাবেন, অর্থবহ দারুন কিছু ফ্রেম তৈরীর জন্য। কহিনূরের ছোট ভাইয়ের প্লাস্টিক গাড়ির ব্যবহার নিয়ে ছোট যে কটা দৃশ্য পাওয়া যায় তা পরিচালক ফারুকীর ডিটেইলস সম্পর্কে মনযোগিতাকে প্রকাশ করে।

অভিনয়ের জন্য বলতে হবে কাজী শাহীর হুদা রুমী'র অভিনয়। গ্রামের প্রভাবশালী মুরুব্বী চরিত্রে তার অভিনয়ের পাশাপাশি মুখভঙ্গি প্রশংসনীয়। তার চরিত্রটি ভালো-মন্দ মিলিয়ে তৈরী একজন মানুষের। তিনি হয়তো সবার চাওয়ার বিপক্ষে গিয়ে তার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু তিনি যে অন্যায়ভাবে কোন সুযোগ নেয়ার জন্য এ কাজ করছেন না বরং সবার ভালোর দিকে নজর রাখতে গিয়েই তার এ কাজ - তা দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তিনি। চেয়ারম্যান চরিত্রটি ভালো না মন্দ তা বিচার করবে দর্শক - পরিচালক বা অভিনেতা এই সিদ্ধান্ত গ্রহনে কোনই প্রভাব বিস্তার করে না - এটা 'টেলিভিশন' এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয়। অন্যান্য অভিনেতাদের মধ্যে মোশাররফ করিম এবং চঞ্চল চৌধুরী তাদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। তবে, সোলায়মান চরিত্রটির বয়স ও পেশা সম্পর্কে সন্দিহান হতে হয় একই সাথে ব্যবসা পরিচালনা এবং রাতে পড়ার টেবিলে দৃশ্যে। তার চরিত্র চিত্রায়নে পরিচালক আরেকটু যত্নবান হতে পারতেন। চপলা তরুনীর চরিত্রে তিশা বরাবরের মতই ভালো অভিনয় করেছেন।

সিনেমার সাথে অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলতে হবে সিনেমাহলের পরিবেশ ও অবস্থার কথা। গত এক বছরে সকাল দশটার শো-তে এত পরিমান দর্শক দেখা যায় নি। একই ভাবে, সিনেমা চলার সময় দর্শকদের চিৎকার, উল্লাস-ধ্বনিও অপেক্ষাকৃত নতুন। বলাকা সিনেমাহলের প্রজেক্টরকে পরিবর্তন করতে হবে যেন সিনেমা চলার সময় পর্দার ছবি একবার অন্ধকার এবং একবার আলোকিত না হয়। বলা বাহুল্য, এই সমস্যার কারনে কোনটা সিনেমাটোগ্রাফারের কেরামতি, কোনটা প্রজেক্টর অপারেটরের - সেটা বোঝা দুঃসাধ্য। পাশাপাশি, সাউন্ড সিস্টেমকে উন্নত করে সব ডায়লগ যেন কান পর্যন্ত পৌছায় সে ব্যবস্থাও করা উচিত।

টেলিভিশন যন্ত্রের ভালো মন্দ দুই প্রভাবই আছে। একজন ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি ভালোকে গ্রহন করার উদ্দেশ্যে টেলিভিশনকে বৈধতা দেবেন নাকি মন্দকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে অবৈধ করবেন সেটা তার ধর্মীয় বিবেচনাবোধের উপর নির্ভরশীল। চেয়ারম্যান যে সকল কারণে টেলিভিশন ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন, সেগুলো বিভিন্ন দৃশ্যাবলীর মাধ্যমে চলচ্চিত্রেই প্রকাশিত। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে যদি কেউ এ কারনে টেলিভিশনের বিরোধিতা করে তবে তা যেমন তার ব্যক্তিগত সংকীর্ণতাকে পরিচয় করে না, তেমনি ধর্মকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে না। টেলিভিশন চলচ্চিত্রটির দর্শকরা এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে পারেন।

আমি জানি না, বাংলাদেশ ছাড়া অন্যান্য দেশের দর্শকরা, যারা বাংলাদেশ সম্পর্কে সামান্যই জানেন, তারা 'টেলিভিশন' দেখার পর বাংলাদেশকে ধর্মীয় গোড়াঁমির দেশ হিসেবে ভাববেন কিনা, তবে আশংকা দূর করতেও পারছি না। চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে চেয়ারম্যানের পুত্র সোলায়মান তার বাবার কাছে ঢাকা গিয়ে ব্যবসা করে বাবার মুখ উজ্জল করার উদ্দেশ্যে ঢাকা যাওয়ার অনুমতি চায়। জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, 'আমার মুখ কি কালিমাখা নাকি যে ঢাকা গিয়ে ঘষে ঘষে কালি দূর করে উজ্জ্বল করতে হবে?' খুবই অর্থপূর্ণ বক্তব্য। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে তার মুখ যেন কল্পিত কালিতে লেপে না যায় সেদিকে সতর্ক খেয়াল রাখা চাই।

রেটিং: ৩.৫/৫

ছবিসূত্র: ইন্টারনেট