২০১২ সালটা বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের জন্য বেশ উল্লেখযোগ্য একটি বছর। এ বছর চলচ্চিত্রকে শিল্প ঘোষনা করা হয়েছে, বাংলাদেশের সিনেমা প্রথমবারের একই সাথে কয়েকটি দেশে মুক্তি পেয়েছে, মধ্যবিত্ত শ্রেনীর দর্শকেরা হলে ফিরতে শুরু করেছে এবং অন্যান্যের মধ্যে, বেসরকারী উদ্যোগে অনেকগুলো সিনেমাহলকে ডিজিটালাইজ করে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নির্মিত সিনেমাকে হলে মুক্তি দেয়া সম্ভব হয়েছে। ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত যে সিনেমাগুলো বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে, তার মধ্যে 'ভালোবাসার রং' অন্যতম। এই সিনেমার মাধ্যমে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া এবং বাপ্পী ও মাহি নামের দুজন নায়ক নায়িকার অভিষেক ঘটল।

কাহিনীর প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের কক্সবাজার। সুদর্শন তরুন বাপ্পী (বাপ্পী) তার বন্ধুবান্ধব নিয়ে বিভিন্ন রকম কাজ করে, যেমন, কোন মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে দেয়া, কারও মুরগীর খামার সম্পূর্ন ধ্বংস করা ইত্যাদি। আপাতদৃষ্টিতে খারাপ এ কাজগুলোর ফলাফল খারাপ নয়, ভালো। এই বাপ্পীই চৌধুরী সাহেবের (রাজ্জাক) নাতনী মাহির (মাহি) প্রেমে পড়ল। মাহির মন জয়ের উদ্দেশ্যে তার দেয়া বিভিন্ন শর্তাবলী যেমন চৌধুরী সাহেবের ছড়ি, টেপ রেকর্ডার চুরি করে আনা ইত্যাদি পূরণের মাধ্যমে মাহির সাথে বাপ্পীর সম্পর্ক পরিণত হলেও এসময় হাজির হয় সালাম জোয়ারদার (মিজু আহমেদ)। তার উদ্দেশ্য শামসুদ্দিন চৌধুরীর পালিত নাতনী মাহি নামের ফারিয়া চৌধুরীকে যেভাবেই হোক কব্জা করা। কিন্তু চৌধুরী সাহেবের বাধার কারনে উদ্দেশ্য অর্জনে দায়িত্ব দেয়া হয় আরেকজনকে, সে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী তুফান (অমিত হাসান)। তুফানের হাত থেকে বাচানোর জন্য মাহিকে নিয়ে দূরে নির্জন পাহাড়ে চলে যায় বাপ্পী।

শাহিন সুমন পরিচালিত এই সিনেমার কাহিনী গতানুগতিক সিনেমা থেকে ভিন্ন কিছুই নয়। কাহিনীর মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা, বিশালাকৃতির ফাঁক ফোকর বেশ ভালোভাবেই বিদ্যমান। প্রধান চরিত্র মাহি ও বাপ্পীর মধ্যে গভীরতার অভাব প্রকট। সংলাপ যথারীতি বৈচিত্রহীন, বাস্তবতা থেকে ভিন্নতর, সময় ও স্থানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ন। বাপ্পীর বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে কাবিলা মামা (কাবিলা) নির্ভর হাস্যরসের যথেষ্ট উপাদান ছিল প্রথমার্ধে, শেষার্ধে খরা। চৌধুরী সাহেব চরিত্রটি আরও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারতো, কিন্তু যথাযথ মনযোগের অভাব চরিত্রটিকে গুরুত্বহীন করেছে।

সিনেমার ভালো দিকের মধ্য প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নির্মিত সিনেমার ঝকঝকে তকতকে রূপ। বাংলা সিনেমার দর্শকরা নিশ্চিত এত ভালো প্রিন্টের ছবি আগে কখনো দেখে নি। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নির্মিত সিনেমা এটিই প্রথম নয়, এর আগে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নির্মিত সিনেমা স্বল্পসংখ্যক হলে মুক্তি পেয়েছে এবং এদের কোন কোনটি 'ডিজিটাল সিনেমা মানে বড় আকারের নাটক' সংশয়যুক্ত মনোভাব তৈরীতে সাহায্য করেছে। ভালোবাসার রং সে দিক থেকে সম্পূর্ন দূষন মুক্ত। এটি সব দিক থেকেই চলচ্চিত্র, বড় আকারের নাটক নয়। বাংলাদেশী সিনেমার এত আকর্ষনীয় রূপ-বর্ণ দেখার পরে গতানুগতিক সাধারণ বা কদাকার চেহারার সিনেমাকে দর্শক পুনরায় গ্রহন করবে কিনা সে বিষয়ে ভেবে দেখার সময় হয়েছে।

ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোয়া লক্ষ্য করা যায় অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে এবং গানের চিত্রায়নে এবং টাইটেল তৈরীতে। গানের চিত্রায়নে ইফেক্ট ব্যবহার খুব পরিপক্ক নয়, ব্যবহারও অপ্রয়োজনীয়। সেই তুলনায় অ্যাকশন দৃশ্যে ইফেক্ট এর ব্যবহার বেশ সফল, বিশেষ করে বনের বাঘের ঝাপিয়ে পড়ে শিকার ধরার দৃশ্যটার যে কৃত্রিমভাবে তৈরী তা বুঝতে অনেক দর্শককেই বেগ পেতে হবে। সিনেমার গানগুলো বেশীরভাগই শ্রুতিমধুর, চিত্রায়ন আকর্ষনীয়।

[caption id="" align="aligncenter" width="469"] যথারীতি গানগুলোর চিত্রায়ন আকর্ষনীয়। তবে রোমান্টিক সিনেমার গান হিসেবে চিত্রায়নে আরও বৈচিত্র আর নান্দনিকতা প্রত্যাশা ছিল।[/caption]

কাহিনীর ও সংলাপের তুলনায় নবাগত বাপ্পী ও মাহি বেশ ভালো অভিনয় করেছে, কিন্তু সেই অভিনয়েও অপরিপক্কতার ছাপ স্পষ্ট। নায়ক এবং নায়িকা বেশ আকর্ষনীয়, কিন্তু সিনেমায় অভিনয়ের গুরুত্বও অনেক। বাপ্পীর সংলাপ প্রদান দর্শককে অনন্তর কথা মনে করিয়ে দেবে, ভুল উচ্চারনের জন্য নয়, সংলাপের ধরন ও উচ্চারণভঙ্গির জন্য। বিভিন্ন গানের সাথে নাচের ক্ষেত্রে দুজনেই উতরে যায়, তবে বানিজ্যিক সিনেমার জন্য এ অবশ্যই পর্যাপ্ত নয়। অ্যাকশন দৃশ্যেও বাপ্পী তেমন কোন ভিন্নতা বা যোগ্যতা ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার অ্যাকশন বেশ হাস্যকর। নায়িকা মাহি দেখতে আকর্ষনীয়, তাকে আরও আকর্ষনীয় চরিত্রে উপস্থাপনের জন্য আটোসাটো পোশাকে উপস্থাপন শুধু অপ্রয়োজনীয়ই নয়, নিন্দনীয়ও। আকর্ষনীয় চেহারা ও শরীর তৈরীর জন্য বাপ্পী ও মাহি যতটা পরিশ্রম করেছে তার চেয়েও অনেক বেশী পরিশ্রম ও সাধনার প্রয়োজন অভিনয়, সংলাপ, এক্সপ্রেশন, নৃত্য ইত্যাদিতে দক্ষতা অর্জনের জন্য।


বাপ্পী ও মাহির তুলনায় পুরানোরা বেশ ভালো অভিনয় করেছে। রাজ্জাক, আলী রাজ, মিজু আহমেদ তাদের অভিজ্ঞতার যথাযথ প্রয়োগ দেখিয়েছেন। কাবিলা সত্যিই দর্শকদের আমোদিত করেছেন। কাবিলাকে কেন্দ্র করে ভালো কমেডি সিনেমা নির্মান করা গেলে পরিচালকরা পয়সা তুলে আনতে পারবেন, এমন আস্থা তৈরী করেছে কাবিলা মামা চরিত্রটি। অভিনয় নিয়ে অবশ্যই বলতে সে হল তুফান চরিত্রে অমিত হাসান। দীর্ঘদিন নায়ক চরিত্রে অভিনয় করা অমিত হাসানের গেটআপ, সংলাপ প্রদান, অ্যাকশন - দুর্দান্ত। তার - 'হেই-ই, কারও হাত থাকবে না কারও পাও থাকবে না ......' দীর্ঘদিন টিকে থাকবে। নায়ক থেকে ভিলেন চরিত্রে এই স্থানান্তর অমিত হাসানকে নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে উৎসাহ দেয়। স্মার্ট, বুদ্ধিদীপ্ত ভিলেন চরিত্রে অমিত হাসান অনেক ভালো করার যোগ্যতা রাখেন।

যারা বানিজ্যিক বাংলা সিনেমা সম্পর্কে ধারনা রাখেন, তারা পরিচালক শাহিন-সুমনের কাছ থেকে বেশী কিছু আশা করবেন না, হোক সে সিনেমা আন্তর্জাতিক মানের রেড ক্যামেরায় নির্মিত। কতটা অযোগ্যতা নিয়ে একজন পরিচালক একের পর এক সিনেমা নির্মান করে যেতে পারে তার উদাহরণ হবে শাহিন সুমন। সিনেমা দেখতে যতই আকর্ষনীয় হোক না কেন, সিনেমার প্রাণ কাহিনী আর অভিনয় যদি আকর্ষন করতে না পারে তবে সেই সিনেমা পঙ্গু, চলচ্চিত্র শিল্পের বোঝা। এ কারণেই আকর্ষনীয় নায়ক নায়িকা, ঝকঝকে তকতকে প্রিন্ট আর অত্যাধুনিক রেড ক্যামেরায় নির্মিত 'ভালোবাসার রং' ময়ূরপুচ্ছের কাক ব্যতীত আর কিছুই নয়।

'ভালোবাসার রং' সিনেমার জন্য যদি প্রশংসা করতে হয় তবে সে জাজ মাল্টিমিডিয়া। এফডিসি থেকে নির্মিত সিনেমা কতটা আকর্ষনীয় হতে পারে তার প্রথম স্যাম্পলটা এনে দিয়েছেন তারা। এই স্বাদ পাওয়ার পরে দর্শকরা অসুন্দরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে বিশাল রকম পরিবর্তন আসতে বেশীদিন অপেক্ষা করতে হবে না। 'ভালোবাসার রং' সিনেমার জন্য যদি নিন্দা করতে হয়, তবে সেও জাজ মাল্টিমিডিয়া। আধুনিক প্রযুক্তি, নতুন নায়ক নায়িকা নিয়ে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিকে পাল্টে দেয়ার জন্যই যদি আগমন, তবে কাহিনীকার হিসেবে আবদুল্লাহ জহির বাবু এবং পরিচালক হিসেবে শাহিন সুমনকে বাছাই করা কেন? ভালোবাসার রং -এর তুফানের সংলাপই জাজ মাল্টিমিডিয়ার জন্য - 'হেই-ই, কারও হাত থাকবে না কারও পা থাকবে না, কিন্তু সিনেমা নির্মানের জন্য যোগ্যতাহীন পরিচালক নিয়োগ করা যাবে না।'

 



























সিনেমার নামভালোবাসার রং
চিত্রনাট্য ও পরিচালনাশাহিন সুমন
মুক্তির সাল৫ অক্টোবর, ২০১২
কাহিনী ও সংলাপআবদুল্লাহ জহির বাবু
অভিনয়েবাপ্পী, মাহি, রাজ্জাক, মিজু আহমেদ, অমিত হাসান
রেটিং৩.৫/৫

*রেটিং বাংলাদেশী সিনেমাকে বিবেচনায় রেখে করা হয়েছে।

দৈনিক সমকাল ১১ সেপ্টেম্বর ২০১২ নন্দন পাতায় প্রকাশিত