জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র 'ঘেটুপুত্র কমলা' মুক্তি পেয়েছে দেশের মাত্র দুটি প্রেক্ষাগৃহে। জীবিত অবস্থায় হুমায়ূন আহমেদ 'ঘেটুপুত্র কমলা' সম্পর্কে দর্শকদের অনুরোধ করেছিলেন তারা যেন বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সিনেমাটা দেখতে না যায়। ছবি মুক্তির আগে থেকেই তাই 'ঘেটুপুত্র কমলা' নিয়ে কিছু গুঞ্জন তৈরী হয়। যে সিনেমা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে না দেখার অনুরোধ স্বয়ং পরিচালক করেন সে সিনেমা বর্তমান সমাজে কতটুকু প্রয়োজন এবং এর প্রভাব কি হতে পারে সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সকল প্রশ্নের জবাব আর দারুন মানবিকতার এক গল্প নিয়ে উপস্থিত হয়েছে 'ঘেটুপুত্র কমলা'।



ঘেটুগান বা ঘেটুপুত্র বর্তমান প্রজন্মের নিকট বোধগম্য কোন বিষয় নয়। তাই সিনেমার প্রো-লগে পরিচালক ঘেটুগানের পরিচয় তুলে ধরেছেন। প্রায় দেড়শ বছর আগে হবিগঞ্জ জেলার জলসুখা গ্রামে এক বৈষ্ণব আখড়ায় 'ঘেটুগান' নামে নতুন এক সংগীতের ধারার প্রচলণ হয়েছিল। অল্পবয়সী কিশোররা মেয়েদের পোশাক পরে নাচগান করতো যাদের বলা হত 'ঘেটু'। এই ঘেটুরাই একসময় বিকৃতরুচির বিত্তবানদের ভোগলালসায় ব্যবহৃত হওয়া শুরু করেছিল। সময়ের বিবর্তনে বিলুপ্ত এই ঘেটুগান ও ঘেটু এবং এ সংক্রান্ত কদর্য ইতিহাসকে দর্শকের সামনে নিয়ে এসেছে 'ঘেটুপুত্র কমলা'।

হাওর অঞ্চলের এক জমিদার পানিবন্দী সময়ের শুরুতে নিজ বিনোদনের জন্য নানারকম উদ্যোগ নেন। এ বিনোদনের জন্য যেমন চিত্রশিল্পী আসে, তেমনি আসে ঘেটুদল। ঘেটুর আসল নাম 'জহির', ঘেটু নাম 'কমলা'। পানিবন্দীর তিনমাস সময় জমিদারের মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্য আগত কমলার জানা ছিল না, নাচ গান ছাড়াও তাকে অন্য কোন ভূমিকা পালন করতে হবে কিনা। ইতিহাস অনুযায়ী, ঘেটু-দেরকে স্ত্রীরা সতীন হিসেবে গন্য করতো। জমিদার স্ত্রীর পক্ষেও সংসারে ঘেটুর উপস্থিতি সহ্য করা সম্ভব ছিল না। ঘেটুকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন তিনি।

ঘেটুগানের প্রচলন দেড়শ বছর আগে শুরু হলেও 'ঘেটুপুত্র কমলা' সিনেমায় নির্দিষ্ট কোন সময়কে উপস্থাপন করা হয় নি। ভিক্টোরিয়ার মুখাংকিত রূপার টাকার অস্তিত্ব থেকে বোঝা যায় সময়কাল অন্তত একশ বছর পূর্বেকার। একই ভাবে, হবিগঞ্জ জেলায় ঘেটুগানের উৎপত্তি হলেও সিনেমায় জমিদার কোন অঞ্চলের তা নির্দিষ্ট নয়। সিনেমার সংলাপে কোনভাবেই হবিগঞ্জ অঞ্চল প্রতিফলিত হয় না।

'ঘেটুপুত্র কমলা'র কাহিনী ঐতিহাসিকভাবে কতটা সত্য তা জানা নেই। তবে বিত্তবানের ভোগ লালসায় ঘেটু-র প্রকাশ্য ব্যবহারকে তখনকার সমাজ কিভাবে মেনে নিয়েছিল কিংবা আদৌ মেনে নিয়েছিল কিনা - তার কোন উত্তর পাওয়া যাবে না এই সিনেমায়। ফলে 'ঘেটুপুত্র কমলা' ইতিহাসের অংশকে ধারণ করলেও নির্ভর করার মত উপাদানে পরিণত হয় না। অন্যদিকে, বিরতির আগে কাহিনী ও চিত্রনাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ যে আবেদন তৈরী করেছিলেন তা কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয় বিরতির পরের ঘটনাপ্রবাহে। ঘেটুপুত্রকে হত্যা করার পরিক্ল্পনা বাস্তবায়িত হবার কোন কর্মকান্ড লক্ষ্য করা যায় না দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর অংশে। ফলে কাহিনীতে ফিরে আসার আগে গান আর টুকরা কিছু দৃশ্যে সময় ব্যয়িত হয়। সিনেমার সমাপ্তিতে দর্শককে কিছুটা আশাহত হতে হবে কারণ যে আবেদন নিয়ে ঘেটুপুত্র কমলার গল্প তৈরী হয়েছিল, তা পুরোপুরি তুপ্ত হয় না। অবশ্য এটা পরিচালকের কৌশলও হতে পারে। জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে তিনি ধরতে চেয়েছেন বলেই দর্শকের চাহিদাকে হয়তো উপেক্ষা করে গেছেন।

গল্পের এই সামান্য দুর্বলতা ঢেকে যায় এর নান্দনিক ও বাস্তবসম্মত পরিবেশে উপস্থাপনার কারনে। পুরানো জমিদার বাড়ির উপস্থাপন একে কখনোই মেকি বলে চিহ্নিত করেনি। বেশ কিছু দৃশ্যে পরিচালকের ডিটেইল সংক্রান্ত মুন্সিয়ানার পরিচয় স্পষ্ট। কিছু দৃশ্যে রূপক এবং আলোছায়ার ব্যবহার দর্শকমনে স্মরনীয় হয়ে থাকবে। সিনেমার গানগুলো শ্রুতিমধুর, দৃশ্যায়ন ছিল চমৎকার। কিন্তু 'যমুনার জল দেখতে কালো' গানের সংগীত ও উপস্থাপন প্রকৃত ঘেটুগানের স্বরূপ চিহ্নিত করতে অসহযোগিতা করে।

জমিদার চরিত্রে তারিক আনাম খান বেশ সাবলীল এবং অত্যন্ত মাপা অভিনয় করেছেন। জমিদার স্ত্রী চরিত্রে মুনমুন আহমেদ, কমলার পিতা চরিত্রে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, ড্যান্স মাস্টার চরিত্রে প্রাণ রায় - প্রত্যেকেই বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। সে তুলনায় ঘেটু-র মা চরিত্রে তমালিকা কর্মকারের অভিনয় ছিল অনেক বেশী জড়তাপূর্ন, মেকি। কমলা চরিত্রের মামুন স্বাভাবিকভাবেই বেশ মানিয়ে অভিনয় করেছে। অগভীর চরিত্র চিত্রশিল্পীর ভূমিকায় সংগীত শিল্পী আগুন তুলনামূলক ভাবে ভালো অভিনয় করেছেন।

সব মিলিয়ে ঘেটুপুত্র কমলা কেমন ছবি? ভালো ছবি। শিশু নির্যাতন এবং মানুষের বিকৃত মানসিকতার বিরুদ্ধে অসম্ভব আবেদনময় এবং সময় উপযোগী একটি সিনেমা। গুনী এই নির্মাতার মৃত্যুতে এ ধরনের বক্তব্য নির্ভর ভালো ছবি নির্মান যেন বন্ধ হয়ে না যায় সেই কামনা করি।

চলচ্চিত্র: ঘেটুপুত্র কমলা
কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনা: হুমায়ূন আহমেদ
অভিনয়ে: তারিক আনাম খান, মুনমুন আহমেদ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, প্রাণ রায়, আগুন, মামুন
রেটিং: ৪.৫/৫