লোহার রেলিং ঘেরা সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে প্রফেসর ইয়াং কু-উন তার চারপাশের শিক্ষার্থীদেরকে ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে বলছিলেন। ডেমোক্রেসি নিয়ে আবাহাম লিংকনের সংজ্ঞাটি উচ্চারণ করার পরে তিনি জানালেন এমন একটি চায়নার স্বপ্নই তিনি দেখছেন যেটা হবে পিপল’স রিপাবলিক। শিক্ষার্থীদের পোষাক, মাথায় লম্বা টিকি, আশেপাশের রাস্তাঘাট-ঘর আর প্রফেসরের এই বক্তব্য একদম শুরুতেই জানিয়ে দিল, এই সিনেমা বর্তমানের নয়, অতীতের এবং এই সিনেমা পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার ইতিহাসের সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রফেসরের বক্তব্যের ঠিক পরমুহূর্তেই অজ্ঞাতস্থান থেকে একটি বুলেট এসে কপালে বিদ্ধ হল, তিনি মারা গেলেন এবং আমরা জানতে পারলাম ১৯০১ সালের ১লা অক্টোবর তারিখে ঘটে যাওয়া প্রফেসর ইয়াং কু-উন এর এই হত্যাকান্ডই হংকং এর ইতিহাসের প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকান্ড। গুপ্তঘাতকের চোখ আর মুখের পার্শ্বদেশ দেখা গেল ধোয়া উঠা বন্দুকের নলের পাশে। বডিগার্ডস অ্যান্ড অ্যাসাসিন্স সিনেমার নামকরনের হেতু উন্মোচিত হয়ে গেল প্রথম ৫ মিনিটেই।

২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এবং টেডি চ্যান পরিচালিত এই সিনেমাটি দেখার জন্য খুব বেশী ইতিহাস সচেতন হতে হয় না, কারণ পরিচালক সিনেমার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন একদম শুরুতেই। প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটার ঠিক পাচ বছর পর ১৯০৬ সালে ডা: সান ইয়াট সেন বা সান ওয়েন হংকং এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। তার উদ্দেশ্য ব্রিটিশ কলোনী হংকং, যা তখন দুর্ণীতিগ্রস্থ কিং ডায়নেস্টির শাসনে চলছে, এর বিভিন্ন সম্প্রদায়গুলোকে একত্রিত করা যা কিং ডায়নেস্টির পতন ঘটিয়ে পিপলস রিপাবলিক অব চায়নার সৃষ্টি করবে। কিন্তু শাসক গোষ্ঠী কিং ডায়নেস্টির রাণী এভাবে ছেড়ে দিতে রাজী ছিলেন না, তিনি জেনারেল ইয়ানকে দায়িত্ব দিলেন – ডা: সান ওয়েন যদিও হংকং এ জীবিত অবস্থায় প্রবেশ করতে পারে, জীবিত যেন বের হতে না পারে।



ইতিহাস বলে ষোল শতক থেকে কিং ডায়নেস্টি শাসন কার্য চালনা শুরু করে, এবং আঠারো শতকের শেষ দিকে এসে তা অত্যন্ত দূর্নীতিগ্রস্থ হয়ে পরে। কিং ডায়নেস্টির শোষন থেকে উত্তোরনের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি বিপ্লবের। এই বিপ্লবক্ষেত্র তৈরী করার জন্যই কাজ করে যাচ্ছিলেন ডা: সান ইয়াট সেন। জীবনের দীর্ঘ একটি সময় নির্বাসনে থাকা এই বিপ্লবীকে ফাউন্ডিং ফাদার অব চায়না হিসেবে গন্য করা হয়। নির্বাসনে থাকা অবস্থায়ই তিনি বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরী করছিলেন কিন্তু হংকং এর বিভিন্ন গোত্রগুলোকে একতাবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে তাকে একবার হংকং এ আসা প্রয়োজন ছিল। কিং ডায়নেস্টি তাকে হত্যার জন্য সকল চেষ্টা চালাবে এমনটি জানা সত্ত্বেও ঝুকি নিয়ে গোপন একটি মিটিং এর আয়োজন করা হল যেখানে ১৩টি গোত্র প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। রাণীর নির্দেশে জেনারেল ইয়ান তার গুপ্তঘাতক বাহিনী নিয়ে প্রস্তুতি নিলেন ডা: সান ওয়েনকে হত্যা করার। আর চায়না ডেইলীর সম্পাদক চেন শাওবাই এবং তার ব্যবসায়ী বন্ধু লী ইউটাং  গড়ে তুললেন বডিগার্ড বাহিনী যারা জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করে যাবে ডা: সান ইয়ান সেনকে।

বডিগার্ড বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যদের সকলেই তরুন। ষোল বছরের তরুনী ফ্যাং হং থেকে শুরু করে সতেরো বছরের লি চংগুয়াং, জুয়ারী পুলিশ সদস্য শেন চ্যংগ্যং, রিকশা চালক ডেং সিদি, স্টিংকি তফু বিক্রেতা অস্বাভাবিক বিশালদেহী ওয়াং ফুমিং, আরও আছে তাদের নেতৃত্বদানকারী ডেইলি চায়নার সম্পাদক চেন। চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে এরা সবাই যদিও বডিগার্ড বাহিনীর সদস্য তথাপি এদের সবার উদ্দেশ্য সমান নয়। ফ্যাং হং চায় তার বাবার হত্যার বদলা নিতে, শেন চ্যংগ্যং চায় তার সন্তানের চোখে তার পরিচয়কে তুলে ধরতে, ওয়াং ফুমিং চায় তার শাওলিন প্রশিক্ষনকে কাজে লাগিয়ে আবার ফিরে যেতে। শুধু লি চংগুয়াং বিপ্লবকে হৃদয়ে ধারণ করে ইতিহাসের এই পরিবর্তনমুখী সময়ের সাক্ষী হতে চায়। পরিচালকও বডিগার্ড বাহিনীর এই ত্যাগী সদস্যদের জন্মসন ও জন্মস্থান উল্লেখ করার মাধ্যমে ঐতিহাসিক চরিত্রদের স্থান দিয়েছেন তার সিনেমায়।

হংকং এর মার্শাল আর্ট ভিত্তিক সিনেমা সম্পর্কে যাদের আগ্রহ আছে তাদের জন্য বডিগার্ডস অ্যান্ড অ্যাসাসিন্স বেশ উপযুক্ত সিনেমা, তবে যারা শুধু মার্শাল আর্টের প্রয়োগ দেখতে আগ্রহী তারা বেশ হতাশ হবেন। কারণ শুধু দাঙ্গা-হাঙ্গামার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিচালক সিনেমার চরিত্রগুলোকে তৈরী করেছেন, কাহিনীর প্রয়োজনে লতাপাতা বিস্তার করেছেন, এনেছেন পরিমিত প্রেম-বিরহ। সিনেমার প্রথম অর্ধেকে মার্শাল আর্ট ভিত্তিক অ্যাকশন দৃশ্য মাত্র একটি হলেও শেষের অর্ধেক প্রায় পুরোটাই এই ধরনের অ্যাকশনে পরিপূর্ণ। হংকং এর মার্শাল আর্ট কি - তার উত্তম চিত্র ফুটে উঠেছে এই সিনেমায়। অস্ত্র হিসেবে হুক, ছুড়ি, বল্লম, বাশের লাঠি, তরোয়াল, ক্রসবো সহ বিভিন্ন অস্ত্রের নিপুণ ব্যবহারে একদিকে যেমন বিস্ময় জাগে ঠিক তেমনি গা শিউরে উঠে এর নৃশংসতায়, নিষ্ঠুরতায়।

ওয়েবে সামান্য পড়াশোনায় ডা: সান ইয়াট সেনকে রক্ষা করার জন্য বডিগার্ড বাহিনীর সাথে অ্যাসাসিন্সদের এই সংঘর্ষ কোথাও স্থান না পাওয়ায় ধরে নিয়েছি বিপ্লবকালীন সময়ের অসংখ্য ঘটনার একটি নিয়েই নির্মিত এই সিনেমা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমায় যেমন একটি সেতু বা কালভার্ট উড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে স্মরনীয় করে তুলি, ঠিক সেরকম একটি ঘটনাই হয়তো বডিগার্ডস অ্যান্ড অ্যাসাসিন্স সিনেমার উপাদান। দারুন এই সিনেমাটি ওই বছরের দ্বিতীয় সেরা চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত।

একশ বছর আগের পরিবেশ তুলে ধরতে চরম সার্থক এই সিনেমার টার্গেট দর্শক হয়তো তরুন সমাজ যাদের সহযোগিতায় একটি পরিবর্তন সাধিত হবে, বর্তমান প্রজন্ম নয়, তাদের ছেলের প্রজন্ম ভোগ করবে সেই পরিবর্তনের সুফল। এ দেশের তরুন সমাজ উব্ধুদ্ধ হোক এই সিনেমার মাধ্যমে, শুভকামনা।