ধনীর দুলালী আলিশা (তিন্নি) একদিন বাড়ি থেকে পালালো, তারপর বাবাকে ফোনে জানালো - কিং কোবরা নামে এক সন্ত্রাসী তাকে কিডন্যাপ করেছে, মুক্তিপণ চাই এক কোটি টাকা। তারপর নিজেই নিজের হাতে হাতকড়া পড়ালো, মুখে টেপ লাগালো, পা বাধল। তারপর নিজের গাড়ির পেছনের বাক্সে বন্দী করল। আলিশা যখন ডিকি-তে বন্দী, তখন ব্রিফকেস হাতে হাজির হল আরিয়ান (শাকিব খান)। তারপর ব্রিফকেস খুলে বের করলো - নগদ টাকা নয়, স্ক্রু ড্রাইভার। আলিশার বাবা আশফাক চৌধুরী (আলমগীর) দাবী অনুযায়ী টাকা নিয়ে হাজির হওয়ার আগেই আরিয়ান গাড়ির লক ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে গাড়ি নিয়ে পালাল। গাড়ি চোর আরিয়ানের সাথে গডফাদার আতিক খানের (মিশা সওদাগর) চুক্তি ছোট - একবারে পাচটি চোরাই গাড়ি হস্তান্তর করা হবে চল্লিশ লাখ টাকার বিনিময়ে। পাচটি চোরাই গাড়ি গ্যারেজে আর গাড়ির মূল্য চল্লিশ লক্ষ টাকা গ্যারেজের আলমারিতে রেখে ডিকি থেকে উদ্ধারকৃত আলিশাকে নিরাপদে কোথাও নামিয়ে দিতে গেল আরিয়ান। এদিকে গ্যারেজে আগুন লেগে পুড়ে গেল নগদ ৪০ লক্ষ টাকা, সেই সাথে পাচটি চোরাই গাড়ি। চল্লিশ লক্ষ টাকার সম্পদ মুহুর্তেই হয়ে গেল চল্লিশ লক্ষ টাকার দেনা। আরিয়ানের সামনে ত্রিমুখী বিপদ। আতিক খানকে টাকা ফেরত দিতে হবে, যে উদ্দেশ্য গাড়ি চুরি সেই উদ্দেশ্য পূরনের জন্যও চাই চল্লিশ লক্ষ টাকা, অথচ ঘাড়ের উপর ধনীর দুলালী আলিশা। এই বিবিধ সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে দারুন সম্ভাবনাময় এক গল্পের ভিত্তি স্থাপনের মাধ্যমে সোহানুর রহমান সোহানের 'সে আমার মন কেড়েছে' সিনেমা শুরু হল।



ঈদ উল ফিতরে মোট ছয়টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। ছবি মুক্তির অনেক আগে থেকেই এই সিনেমাটি বিভিন্ন সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। এর অন্যতম হল -মডেল ও টিভি অভিনেত্রী শ্রাবস্তী দ্ত্ত তিন্নির পর্দার জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খানের সাথে জুটিবদ্ধ হয়ে সিনেমার জগতে পদার্পন এবং নির্মানাধীন সময়ে পরিচালকের শিডিউল ফাঁসানোসহ বিভিন্ন রকম জটিলতার সৃষ্টি। ফলে নানা রকম যন্ত্রনার ইতি টেনে এই ঈদে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার ঘোষনা থেকেই সিনেমাটির প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়েছিল। কারওয়ান বাজারে পূর্ণিমা সিনেমা হলে আগ্রহের পরিসমাপ্তি।

যে অমিত সম্ভাবনা নিয়ে গল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, সেই সম্ভাবনার ভিত্তি স্থাপনের পর পরই গুড়া হতে শুরু করে এবং সিনেমা শেষ হওয়ার আগেই বাতাসে মিলিয়ে  গিয়ে সচেতন দর্শককে হতাশায় ডোবায়। মাত্র তিনদিন স্থায়িত্ত্বের গল্পে একাধারে সততা, নিষ্ঠা, প্রেম-ভালোবাসা-বিরহ, হাসি-কান্না-হতাশা-আশা, ধনী-গরীব দ্বন্দ্ব-সম্পর্ক এবং ফ্যান্টাসি গল্প, অপরিণত অভিনয়, অযৌক্তিক লোকেশনে দৌড়ঝাপ আর চমৎকার চিত্রায়নের পাচটি গান মিলিয়ে বিশ বছরের পুরানো জগাখিচুড়ি নতুন করে প্লেটে হাজির করার চেষ্টায় সোহানুর রহমান সোহান সম্পূর্ন সফল - তাকে অভিনন্দন। চল্লিশ লক্ষ টাকার দেনা, মাথার উপর আতিক ভাইয়ের মৃত্যু পরোয়ানা, আতিক ভাইয়ের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বাহিনি এবং কোন এক এসপির নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীর ধাওয়া থেকে বাচতে চাওয়া আরিয়ান যেভাবে পরিবারের সবার সাথে আনন্দমুখর সময় কাটায় তা বোধহয় দু:স্বপ্নেও সম্ভব হবে না। আর কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রধাণ বাহন যে সংলাপ তা অপরিণত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে হাস্যকর। উল্লেখ্য, চিত্রনাট্যকারও সোহানুর রহমান সোহান।  বিশ বছর আগে তিনি যে কাহিনীতে সিনেমা তৈরী করেছেন, এই ২০১২ সালে সেই কাহিনীর ভূমিকাই শুধু পাল্টেছে - ট্রিটমেন্ট, চিত্রায়ন, মেক-আপ, সংলাপ, উপস্থাপন এবং কাহিনীর গতিপ্রবাহ বিন্দুমাত্রও পাল্টে নি।

দর্শক হিসেবে আমার জন্য সিনেমার আকর্ষন ছিল শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নি। কিন্তু তার অভিনয়, সংলাপ তাকে নাটক থেকে সিনেমায় আক্ষরিক অর্থেই 'নামিয়েছে'। অনেক পরিণত সংলাপ এবং গল্পের নাটকে অভিনয় করে যিনি অভিজ্ঞ সেই তিন্নি কিভাবে এ ধরনের সিনেমায় অভিনয় করেছেন - সে নিয়ে প্রশ্ন জাগে। তিনি কি সিনেমায় অভিনয়ের পূর্বে চরিত্র এবং চিত্রনাট্য ও সংলাপ সম্পর্কে সম্পর্ক পূর্ণ ধারনা নেন নি? নাকি শাকিব খানের সাথে অভিনয় এবং সিনেমার পর্দায় উপস্থিতির আগ্রহে তিনি তার মান-কেও বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন নি?

জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খান তার অন্যান্য সিনেমার চেয়ে খুব ভালো কিছু করেন নি, মন্দও করেন নি। তিনি নাচেন ভালো, সিনেমায় অভিনয়ের চেয়ে নিজেকে আকর্ষনীয় হিসেবে উপস্থাপন করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। একজন অভিনেতার হাতকে কাজ দিতে হয়, নাহয় ডায়লগ ডেলিভারীর সময় হাত দুটো কোমড়ে কিংবা প্যান্টের পকেটে স্থান নেয় - যা অভিনয়কে কৃত্রিম করে তোলে। পরিচালকের এ দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত ছিল। আর, অভিনয় এবং চরিত্রের প্রয়োজনে কানের দুল বিসর্জনের ব্যাপারে পরিচালকদের চিন্তা করা উচিত এবং শাকিব খানেরও মানসিকতা তৈরী হওয়া উচিত।

সিনেমায় সবই যে খারাপ তা নয়, অভিনয়ের দিক থেকে আফজাল শরিফ, শর্মিলী আহমেদ এবং মিশা সওদাগর তাদের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রায় প্রত্যেকটি গানই শ্রুতিমধুর, সুচিত্রায়িত। ছোট ছোট কমেডি দৃশ্যগুলো তুলনামূলকভাবে ভালো এবং দর্শককে আমোদিত করেছে।

শাকিব খান ও তিন্নির সিনেমা আমার মন কাড়তে সক্ষম না হওয়ার দোষ বোধহয় দর্শক হিসেবে আমারই। কারণ এই একই সিনেমা একসাথে অনেক নারী পুরুষ একত্রে উপভোগ করেছেন। আলিশা-কে উদ্ধারের প্রচেষ্টায় শাকিব খান যখন বিভিন্ন বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে দৌড়াচ্ছে - আমার পাশের দর্শক তখন উত্তেজনায় হাটু তুলে বসেছেন, সব ভুলে চিৎকার করে উঠেছেন। নতুন নতুন পোশাকে শাকিব খান পর্দায় উপস্থিত হওয়া মাত্রই সামনের সারিতে বসা মেয়েরা প্রশংসাসূচক শব্দ করেছে, শাকিব খানের কৌতুক দৃশ্যগুলোতে পুরা হল ভর্তি দর্শক হা হা করে হেসেছে। এ সকল টুকরা দৃশ্যই শাকিব খানের জনপ্রিয়তাকে নির্দেশ করে, সেই জনপ্রিয়তার কাছে তিন্নির প্রয়োজন ও অবস্থান বিন্দুসম।

সিনেমার নির্মান সময়ে পরিচালক কি দুরাবস্থার মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন, তিন্নি তাকে কতভাবে ভুগিয়েছে ইত্যাদি বিবেচনা করলে সোহানুর রহমান সোহানের নির্মান সংক্রান্ত ত্রুটিগুলো উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু সম্ভাবনাময় একটি গল্পকে মুখ থুবড়ে হত্যা করার দায়ে তিনি অবশ্যই দায়ী হবেন।