ব্লগার মুনতা একদিন ফেসবুকে আমাকে জিজ্ঞেস করল - 'Incendies দেখেছেন?' এই ধরনের প্রশ্ন অনেকেই করে, বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই যে উত্তর দিই, এবারও তাই দিলাম, 'দেখি নাই।' 'বলেন কি, এই সিনেমা অবশ্যই দেখবেন, মাথা নষ্ট করা মুভি' - আমি যেন অবশ্যই দেখি সেজন্য সে ঘেটেঘুটে দুটো লিঙ্ক বের করে আমাকে দিয়ে গেল। আমি ডাউনলোড কমান্ড দিয়ে শীতনিদ্রায় গেলাম। কয়েকদিন পরে মুনতা আবারও ফেসবুকে নক করলো - 'ভাই সিনেমাটা দেখছেন?' সিডের অভাবে সিনেমাটা ১৫ পার্সেন্ট নেমে বন্ধ হয়ে গেছে বলে ডিলিট করে দিয়েছিলাম। তারপরে প্রায় এক মাস পিসি নষ্ট ছিল। তারও প্রায় এক মাস পরে সিনেমাটা আবার খুজে বের করে ডাউনলোড করলাম। মুনতার জন্য হলেও সিনেমাটা দেখা দরকার।

২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটা সেরা বিদেশী মুভির ক্যাটাগরীতে অস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল কিন্তু পুরস্কার পায় নি। মনট্রিল ফিল্ম জার্নাল একে ৪ এ সাড়ে তিন দিয়ে বলেছেন পরিচালক তার সেরা কাজ করেছেন এই সিনেমায়। দ্য গেজেট একে ৫ এ ৫ দিয়ে বলেছেন, 'মাস্টারপিস'। রোটেন টম্যাটোস বলেছে এই সিনেমার ৯২শতাংশ জায়গা সজীব, ফ্রেশ। তাদের রেটিঙ - ৭.৯/১০। অস্কার না পেলেও এখন পর্যন্ত ৩১টি পুরস্কার জিতেছে এই সিনেমা। এত গুনে গুনান্বিত যে সিনেমা তা না দেখার কোন কারন থাকতে পারে না।

মায়ের হঠাৎ মৃত্যুর পরে যমজ ভাই বোন সিমন ও জেন মারওয়ানের নিকট দুটি চিঠি উপস্থাপন করে নোটারি। মা তার শেষ ইচ্ছা নোটারির নিকট জানিয়ে গেছেন - মেয়েকে দেয়া চিঠিটি পৌছুতে হবে তাদের বাবার নিকট। আর ছেলেকে দেয়া চিঠিটি পৌছুতে হবে তাদের ভাইয়ের নিকট। যতদিন পযর্ন্ত তা না হচ্ছে ততদিন তাকে কবর দেয়া হবে উপুর করে। কঠিন এই শর্ত। ভাই বোনের নিকট অবাস্তবও বটে। কারণ তাদের বাবাকে তারা দেখেনি কোনদিনই, তাদের কোন ভাই আছে সে কোথাও কোনদিন শোনা হয় নি মায়ের নিকটে। তবে কেন এই কঠিন শর্ত? যাদের অস্তিত্ব সম্পর্কেই কোন ধারনা নেই তাদের খুজে বের করতে হবে, কিন্তু কিভাবে?

সিনেমার একদম শুরুতেই এই ড্রামাটিক নিড দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পুরো সিনেমা এই নিডকে স্যাটিসফাই করার প্রচেষ্টায় কাহিনী বর্তমান আর অতীতের মাঝে ছোটাছুটি করেছে। বর্তমানে আছে কন্যা জেন মারওয়ান (পরবর্তীতে সিমন মারওয়ানও যুক্ত হয়), আর অতীতে আছে মা নাওয়াল মারওয়ান। মূলত মায়ের বিপ্লবী জীবনকে একটু একটু করে খুড়ে বের করেছে তার সন্তানেরা। একটু একটু করে বেরিয়ে এসেছে এমন সব অধ্যায় যা কোনদিনই মায়ের কাছ থেকে তারা জানে নি, এমন সব ঘটনা যা কোন সন্তানের পক্ষেই সহ্য করা সম্ভবপর নয়।

কানাডা থেকে নির্মিত এই সিনেমার প্রেক্ষাপট কানাডা নয়, মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশ যা স্পষ্ট নয়। তবে কাহিনী বিন্যাস ও ঘটনাপ্রবাহ লেবাননকেই ইঙ্গিত করে। খ্রীষ্টান তরুনী নাওয়াল একজন শরনার্থীকে ভালোবেসে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তার ভাইয়েরা তার প্রেমিককে হত্যা করে, অথচ নাওয়ালের পেটে সন্তান। গভীর গোপনীয়তার মধ্যে এই সন্তানের জন্ম হয়, জন্মের পরই নাওয়ালের নানী তার পায়ে তিনটি উল্কির ফোটা দিয়ে দেন, যেন সন্তানের মা ভবিষ্যতে সন্তানকে চিনে নিতে পারে। তারপর সেই সন্তানকে পাঠিয়ে দেয়া হয় এতিমখানায়। ঘটনাপ্রবাহে দেশে সিভিল ওয়ার শুরু হলে নাওয়াল তার ছেলেকে খুজে ফেরে এবং একসময় চরমপন্থী এক দলের সাথে যুক্ত হয় ও পরিকল্পনা মোতাবেক বিপক্ষ খ্রীষ্টান দলনেতাকে হত্যা করে। তারপর শুরু হয় জেলখানায় তার দুর্বিষহ জীবন।

পলিটিক্যাল আবহে নির্মিত এই সিনেমা পলিটিক্যাল নয়, পুরোটাই ফিকশন। কিন্তু নাওয়ালের এই অধ্যায়টুকু মিলে যায় সুহা বেচারার জীবনের সাথে। সুহা বেচারা একজন লেবানিজ মেয়ে যে একুশ বছর বয়সে সাউথ লেবানন আর্মির জেনারেলকে হত্যা প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় এবং ধরা পরে। তারপর কুখ্যাত খিয়াম জেলে চরম নির্যাতন আর বঞ্চনায় কাটে দীর্ঘ দশটি বছর। তার এই যন্ত্রনাকাতর জীবন নিয়ে তিনি দুটো অটোবায়োগ্রাফি লিখেছেন।

নাওয়াল মারওয়ান চরিত্রে অভিনয় করেছেন লুবনা আজাবাল, প্যারাডাইস নাউ সিনেমায় তার সাথে আপনাদের পরিচয় হবার কথা। অসাধারণ এই কাহিনীর সাথে তাল মিলিয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে স্কর্চহেড নামের একটি নাটক থেকে। গল্পের প্রতিটি বাঁকে নতুন আর চমকপ্রদ ঘটনাবলী সিনেমাটিকে টানটান উত্তেজনাময় করে তুলেছে। পরিচালক Denis Villeneuve এই উত্তেজনাকে দর্শকের মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্য অবশ্যই বাহবা পাবেন। দর্শককে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য যে গল্পকে তিনি বেছে নিয়েছেন তা কতটা বাস্তবসম্মত সেই প্রশ্ন অবান্তর হয়ে দাড়ায় দর্শকের কাছে, কারণ সিনেমা শেষ হতে হতে নাওয়াল মারওয়ানের জীবন ছুয়ে গেছে সব দর্শককেই, ছুয়ে যাবে আপনাকেও। বাজি?