বাংলাদেশী সিনেমায় এক ধরনের খরাভাব বিরাজ করছে প্রায় দেড়দশক ধরে। গতানগতিক ধারার সিনেমা নির্মানের জোয়ার বয়েছে দীর্ঘসময়, অশ্লীল সিনেমার জোয়ারও দৃষ্ট হয়েছে কোন বছরে। তারপর যথারীতি ভাটার টানে গত দুই বছরে এফডিসি থেকে ছবি নির্মান প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির উন্নয়নে ভারতীয় সিনেমাকে অবদান রাখার জন্য আমদানীর অনুমতি দেয়া হয়েছে, ইতিমধ্যে তিনটি কোলকাতার সিনেমা এদেশে প্রদর্শিত হয়েছে যা মানের দিক থেকে গতানুগতিক বাংলা সিনেমার চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। চলচ্চিত্রকর্মীদের দাবীর মুখে বেশ কিছু দিকের উন্নয়নও সম্ভবপর হয়েছে। ডিজিটাল সিনেমা স্বীকৃতি পেয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিস প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে, এ বছরের ঘোষিত বাজেটে সিনেমায় কর মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তরুন সিনেমা নির্মাতারাও এগিয়ে এসেছেন, গতানুগতিকের বাইরে বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে সিনেমা নির্মান করছেন। সবদিক মিলিয়ে, বর্তমান সময়ে বাংলা সিনেমার এই নবজাগরনকে হয়তো চলচ্চিত্র গবেষকরা একটি আন্দোলন (বাংলা নবজাগরন?)হিসেবে চিহ্নিত করবেন। এক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর ভিন্নতার জন্য নোমান রবিনের চলচ্চিত্র 'কমন জেন্ডার'কে তারা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় রাখবেন, সে নি:সন্দেহ।

হিজড়াদের নিয়ে কোন পূর্নাঙ্গ সিনেমা এই দেশে আগে নির্মিত হয় নি, অল্প যা কিছু হয়েছে সেখানে হিজড়ারা সাধারণত কমেডি চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে শারীরিকভাবে ভিন্ন এই গোষ্ঠী এই সমাজের গুরুত্বপূর্ন কিন্তু বিচ্ছিন্ন ও বঞ্চিত অংশ। এই হিজড়াদের নিয়েই নোমান রবিন তার চলচ্চিত্র 'কমন জেন্ডার' নির্মান করেছেন। হিজড়াদের বাল্যকাল, হিজড়াগোষ্ঠীতে অন্তর্ভূক্তি, জীবন-জীবিকা পদ্ধতি, হাসি-কান্না-বঞ্চনা, প্রেম-ভালোবাসা ইত্যাদির আখ্যান এই সিনেমা। বাবলি, সুস্মিতা, টুশি  এরা সবাই হিজড়া, বস্তিতে এক মাসির তত্ত্বাবধানে থাকে। এক হিন্দু বিয়েতে দলবেধে নাচতে গিয়ে সুস্মিতাকে সাধারন মেয়ে ভেবে পছন্দ করে সঞ্জয়। পরবর্তীতে হিজড়া পরিচয় পেয়েও বন্ধুত্বের আহবান ফিরিয়ে নেয় না এবং সঞ্জয়ের এই ইতিবাচক দৃষ্টিভংগী সুস্মিতার নারী মানসিকতাকে জাগ্রত করে তোলে, স্বপ্ন দেখতে শেখায়। কিন্তু সঞ্জয়ের বাবা-মা একজন হিজড়াকে প্রেমিকা নয়, বন্ধু হিসেবেও গ্রহন করতে আপত্তি জানায়, প্রশ্ন তোলে সমাজের গ্রহনযোগ্যতা নিয়ে। এইরকম একটি কাহিনীর মধ্য দিয়েই হিজড়াদের জীবনের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে চলচ্চিত্রে।



সম্ভবত হিজড়াদের জীবনের এই বিশাল অধ্যায় তুলে আনার প্রচেষ্টাই সিনেমার কাহিনীকে অনেক জায়গায় বাধাগ্রস্থ করেছে, সিনেমাকে অহেতুক দীর্ঘতা দিয়েছে। ছোট ছোট ঘটনা হিসেবে সবগুলোই কম বেশী গুরুত্বপূর্ন, কিন্তু সামষ্টিকভাবে কাহিনী খুব মজবুতভাবে গাথা নয়। কাহিনীকার নোমান রবিন দর্শকের অন্তরে নাড়া দিতে চেয়েছেন, কিন্তু কাহনির গতি ধরে রাখতে পারেন নি। তাই, সুস্মিতার গল্পের শেষে বাবলির গল্পের উপস্থিতি আরেকটি নতুন গল্প হিসেবে হাজির হয়। সমাজের মুসল্লী চরিত্রের উপস্থিতিও অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়, এ যেন মন রক্ষার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে সুস্মিতার পরিবারে অন্তর্ভূক্তি বিচ্ছিন্নভাবে এসেছে, অথচ একে বাদ দিলেও কাহিনী খুব বেশী বাধাগ্রস্থ হতো না। যে সকল বিষয়কে তুলে ধরা হয়েছে সিনেমায়, তার সবই আরও গোছালো, মজবুতভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হত। এই যুতবদ্ধতার অভাবে সিনেমাটির গতি অনেকখানি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। কাহিনীর তুলনায় চিত্রনাট্য অনেক পরিণত, সংলাপ আকর্ষনীয় ও চিন্তা উদ্রেককারী।

[caption id="" align="aligncenter" width="596" caption="সিনেমার কমন জেন্ডাররা (ছবিসূত্র: বিডিআপলোড.কম)"][/caption]

হিজড়া সুস্মিতা চরিত্রে অভিনয় করেছে সাজু খাদেম, বুবলি চরিত্রে দীলিপ চক্রবর্তী, তাদের মাসি চরিত্রে সোহেল খান। সাজু খাদেম ও দীলিপ চক্রবর্তী অসাধারণ অভিনয় করেছেন, বিশেষত: দিলীপের শেষ দৃশ্যের অভিনয় হৃদয় ছুয়ে যাওয়ার মত। যোগ্যতার চেয়ে নিম্নমানের অভিনয় করেছেন শহিদুল আলম সাচ্চু, রোজী সিদ্দিকী। মাসি চরিত্রে সোহেল খানের খুব বেশী কিছু করার ছিল না, তিনি তার চরিত্রে উতরে গেছেন ভালোভাবে। অন্যান্য হিজড়া চরিত্রেও অভিনেতারা বেশ শক্তিশালী অভিনয় করেছেন। সঞ্জয় চরিত্রে (নাম ভুলে গেছি)ও বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। তোতা চরিত্রে রাশেদ মামুন অপু বেশ সফল, দর্শককে নির্ভেজাল বিনোদন দিয়েছেন কিন্তু মৃত্যুদৃশ্যের অহেতুক দৈর্ঘ্য দর্শককে বিরক্ত করে। বাকী চরিত্ররা গল্পের প্রয়োজনে খুব স্বল্প সময়ের জন্য পর্দায় উপস্থিত থেকেছেন।

এই সিনেমায় একটি আইটেম সং রয়েছে, গানের কথা ও সুর উপভোগ্য, যদিও আইটেম সং এর বৈশিষ্ট্যানুসারেই অপ্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে। সিনেমার বাকীগানগুলোও বেশ চমৎকার এবং উপভোগ্য। আরেফিন রুমি এবং বালামকে এ জন্য ধন্যবাদ। আবহসঙ্গীত যথাযথ ভূমিকা রেখেছে যদিও বিভিন্ন দৃশ্যে শব্দ বেশ উচ্চকিত, এ জন্য দায়ী কি প্রেক্ষাগৃহ নাকি শব্দ-প্রকৌশলী তা জানা নেই।

ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি প্রযোজনা ও পরিবেশনের দায়িত্বে আছে ইআর সিনেমা। চিত্রগ্রহনে জাহেদ নান্নু, সম্পাদনায় হাসান মেহেদী ত্রুটিমুক্ত নন। সব মিলিয়ে কমন জেন্ডার অবশ্যই দর্শক মনকে নাড়া দিয়ে যাবার মত একটি সিনেমা, কিন্তু সমাজের সামষ্টিক আচরণকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পারে, পরিবর্তন করতে পারবে কিনা সে প্রশ্নসাপেক্ষ। ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত হওয়ার কারণে সকল ধরনের দর্শকের কাছে পৌছুতে পারাও একটা বাধা। কাহিনীর ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকে উপেক্ষা করে সিনেমার শেষ পর্যন্ত পৌছুতে পারলে 'কমন জেন্ডার' অবশ্যই উপভোগ্য একটি সিনেমা এবং এ ধরনের বিষয়কে সাধারণ জনগনের সামনে নিয়ে আসার জন্য পরিচালক নোমান রবিন অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। হিজড়ারা মানুষ হিসেবে যথাযথ অধিকার পাক, বাংলা সিনেমার এই 'বাংলা নবজাগরন' দীর্ঘস্থায়ী হোক। শুভকামনা।

(তথ্যগত যে কোন সংশোধনী কামনা করছি)