১৯৯৩ সালের ২৫শে মার্চ সালমান শাহ - মৌসুূমী অভিনীত এবং সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত সিনেমা 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' মুক্তি পাওয়ার এক বছরে কোন সিনেমা মুক্তি পায় নি। কিন্তু তার পরের বছর ১৯৯৪ সালে সালমান শাহ অভিনীত ছয়টা সিনেমার মুক্তি 'কেয়ামত থেকে কেয়ামত' সিনেমার সাফল্যকেই ইঙ্গিত করে। শিবলী সাদিক পরিচালিত 'অন্তরে অন্তরে' সালমান শাহ-মৌসুমী অভিনীত দ্বিতীয় সিনেমা*। এই জুটির কাছে দর্শকের চাহিদা ছিল অনেক এবং বেশ সাফল্যের সাথেই এই জুটি দর্শকের চাহিদা পূরন করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্তরে অন্তরে সিনেমার একটি গান 'এখানে দুজনে নিরজনে সাজাবো প্রেমের পৃথিবী'। রুনা লায়লা এবং এন্ড্রু কিশোরের কন্ঠে গাওয়া এই গানটি এখনো প্রেমের গান হিসেবে নবীন। একই সাথে, এই গানের সাথে সালমান শাহ এবং মৌসুমীর অভিনয়কে নবীন বললে অত্যুক্তি হবে না। গান এবং তার চিত্রায়নের কারণেই হয়তো 'কালজয়ী' গানের তালিকায় এই গানটি যুক্ত হবে। বলা বাহুল্য, একটি গান হুট করে কালজয়ী হয় না।



সমুদ্রের তীরে নৌকায় বসে চোখে চোখ রেখে দুজনায় হারিয়ে যাওয়া এবং সেই হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সালমান মৌসুমীর ঠোট ছুয়ে দেয়ার জন্য এগিয়ে আসলে মৌসুমীর পলায়ন, তারপর হাটু গোটানো কালো প্যান্ট আর বোতাম খোলা শার্টের ভেতরে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি পরিহিত সালমানের পিছু দৌড় আমাদেরকে গানের মধ্যে নিয়ে যায়। তারপর ক্যামেরার দিকে ফিরে সালমানের হাত তুলে কাছে আসার আহবান আমাদেরকে মৌসুমীর স্থলে স্থাপিত করে এবং সালমানের প্রেমে ডুব দেয়াতে নি:সঙ্কোচ হতে উদ্বুদ্ধ করে। আর একারণেই নির্জন সমুদ্র তীরে প্রেমিক-প্রেমিকার জুটিবদ্ধ নৃত্য আমাদেরকে একবারের জন্যও 'দর্শক' ভাবতে দেয় না।
এখানে দুজনে নিরজনে
সাজাবো প্রেমেরও পৃথিবী

সালমান এবং মৌসুমী যে সত্যিই নিরজনে প্রেমের পৃথিবী রচনায় ব্যস্ত তা বোঝানোর জন্যই বোধহয় চিত্রগ্রাহক লঙ শটে দ্রুত জুম আউট করে সমুদ্র তীরে প্রেমময় এই জুটিকে তুলে ধরে। কিন্তু একই সাথে চিত্রগাহকের অপটুতাও ধরা পরে ক্যামেরা উপর থেকে নিচে নামানোর অমসৃনতার মাধ্যমে। বোধকরি, সেই সময় ক্রেন ও ট্রলি বেশ অপরিপক্ক কোন অ্যাসিস্ট্যান্টের হাতে পরেছিল। সে যাই হোক, প্রেমিকা মৌসুমী গুল্ম ঝোপের পাতার ফাক দিয়ে মুখ বের করে তাদের নির্মিতব্য পৃথিবীর বৈশিষ্ট্য কেমন হবে তা সালমানকে প্রকারান্তরে আমাদের জানিয়ে দেয় -
পাখি শোনাবে যে গান
সুরে ভরে দেবে প্রাণ
ফুল দেবে ছড়িয়ে সুরভি।

এই উপমহাদেশীয় সিনেমার চিরাচরিত্র বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সিনেমার ব্যাকরণ ভেঙ্গে এবার সালমান-মৌসুমীর কস্টিউমে পরিবর্তন। প্রেমের যে পৃথিবী এই জুটি নির্মান করছে তার সাথে দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত পোষাক বেমানান হয়তো। এ যেন প্রতিদিন ডাইনিঙ টেবিলে ভাত তরকারীর ফাকে একদিন ভালো কোন রেস্টুরেন্টের ডিনার। ঘূর্নায়মান মৌসুমীর গোল ঘাগড়া আর কালো সানগ্লাস পরিহিত সাদা গলাবন্ধ টিশার্টের সালমান শাহ সেই ডিনারের অতিথি।
তুমি আমি হয়ে যাবো একাকার
প্রেম ছাড়া রবে না কিছু আর
তুমি সূর্য তুমি চন্দ্র
আমার দুটি নয়নে।।

গানের এই অংশে সঙ্গীতের সাথে ছবির সম্পাদনা বেশ সঙ্গতিপূর্ণ। ছন্দে ছন্দ মিলিয়ে ছবির চিত্রায়ন ভাবনা আরও তৃপ্ত করে দর্শক মনকে। কিন্তু সমুদ্রকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে সাদা টিশার্টের সালমানকে দেখতে ভালো লাগলেও বেখাপ্পা দেখায়। এযুগের বলিউডি পরিচালকরা হয়তো সালমান শাহ'কে এই খাপহীন অবস্থা থেকে মুক্ত করতে বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিিবহীনভাবে কমলা কিংবা বেগুনী শার্টে উপস্থাপন করতো। কল্পনায় ওই দৃশ্য দেখেই অস্বস্তি বোধ হয়, তারচে' বেখাপ্পা দৃশ্য ভালো।

আবারও কস্টিউমের পরিবর্তন। এবার মৌসুমী অনেকটা আরব্য রজনীর নারীদের মত মাথায় অলঙ্কার সজ্জিত হিজাব আর সালমান শাহ তার সম্পূর্ন বিপরীত অাধুনিক যুগের সৌন্দর্য সচেতন পুুরুষের মত মাথায় বেধেছেন রুমাল। সালমানের এই রুমাল সেই সময়ে কি পরিমান প্রভাব ফেলেছিল তা ওই সময়ের দর্শকরা বেশ ভালো বলতে পারবেন। গানের এই জায়গায়, যুগের থেকে এগিয়ে গিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকার কিছু দুষ্টামী দেখি। মানব মনের অবদমিত যৌন-চেতনার নগ্ন প্রকাশ যে যুগে কি প্রভাব ফেলেছিল জানা নেই, তবে হয়তো বর্তমান সময়েও রক্ষনশীল নারী-পুরুষের কাছে কিছুটা অগ্রহনযোগ্য হিসেবে গন্য। বিশ বছর পরে পার্কে-মাঠে-রেস্টুরেন্টে এই দৃশ্যের ক্রমাগত চিত্রায়ন হয়তো চোখকে একটুও বিব্রত করে না, কিন্তু ধর্মীয় এবং জাতীয় চেতনায় পরিগঠিত মন কিছুটা সঙ্কোচ বোধ করে।
এসো এসো হৃদয়েরও বিছানায়
দিন যেন এভাবেই কেটে যায়
আমি ধন্য আমি পূর্ণ
তোমায় পেয়ে জীবনে।।

স্থূলভাবে কিছু কিছু দৃশ্যের চিত্রায়ন বিশেষত সালমানের কোমর দোলানো এই অংশে দেখা যায়। কিন্তু সালমানের 'আমি ধন্য, আমি পূর্ণ''র প্রকাশভঙ্গীতে যে আকুলতা আর ভালোবাসা, তা ওই স্থূলতাকে ছাপিয়ে যায়। তারপর ক্রেনশটে উপর থেকে আমারা দেখতে পাই প্রেমিক এই জুিট হাতে হাত ধরে ছুটে যাচ্ছে তাদের নির্মিত ভালোবাসার পৃথিবী যেটা আক্ষরিক অর্থে একটি ছোট্ট পর্ণ কুটির ব্যতীত আর কিছু না। সালমান ও মৌসুমীল কস্টিউম আবারও পরিবর্তন হয়ে রেগুলার ডাইনিং এর বাস্তবতায় ফিরে এসেছে - সাধারণ সেলোয়ার শর্ট কামিজে মৌসুমী আর হাটু গোটানো প্যান্টের সাথে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জিতে সালমান।

বিশ বছর আগের এই গানের ভাষা এবং সেই সাথে এর চিত্রায়ন এই শাহরুখ-সালমান খান শাসিত সময়েও কেন এত নবীন? আমি একটা কারণ খুজে পাই, এই গানের মধ্যে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ বেশ প্রবলভাবে বিদ্যমান। শুরুতে, মাঝে এবং শেষে। গত প্রায় এক দশকে এদেশের বানিজ্যিক সিনেমাগুলোর কোনটাই মধ্যবিত্ত সমাজকে তুলে ধরে না। প্রায় সব সিনেমাতেই ধনী এবং গরীবের দ্বন্দ্ব এবং এরা ধনী দরিদ্র রেখার দুই প্রান্তে অবস্থানরত এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই দরিদ্র ধনীদের উপর বিজয়ী - ধনে, মানে, কর্মে। ফলে, বাংলাদেশের দর্শক শ্রেনীর একটা বিশাল অংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই সকল সিনেমার প্রধান দর্শক, একই সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেনীর দর্শক এখানে উপেক্ষিত, নির্বাসিত, বঞ্চিত। শিবলী সাদিকের এই গানের চিত্রায়ন তাই অনেক বেশী অ্যাপিলিঙ। সালমান শাহ এখানে বলিউডের অনুকরনে শার্ট খুলে নগ্নগাত্রে সি-বিচে নাচে না, আবার অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল শ্রেনীর প্রতিনিধি হিসেবে হাফপ্যান্ট বা ট্রাউজার পরে পানিতে দৌড়ায় না। সালমানের পোষাক নির্বাচন আমাদেরকে এর সৌন্দর্যটাকেই বড় করে তুলে ধরে, দামী পোষাক বা বড়লোকের উদ্ভট পোষাককে নয়। সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাটু গোটানো প্যান্ট এখানে সাধারণ মানুষের প্রতিচ্ছবি - দরিদ্র বা ধনী এখানে প্রতিফলিত হয় না। একই কথা মৌসুমীর জন্যও প্রযোজ্য। শর্ট কামিজ হয়তো সেই সময়ের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে ছিল, কিন্তু কামিজের জায়গায় স্কার্ট বা কাধ খোলা জামা আসেনি। ফলে 'এখানে দুজনে নিরজনে'র মৌসুমী আমাদের অতি পরিচিত, সে আমাদের পাশের বাড়ির মেয়েটি যাকে আমরা সকাল সন্ধ্যা যাওয়া আসার মাঝে দেখতে পাই।

সালমান শাহ আর মৌসুমীর এই গানটির জনপ্রিয়তা আর বিশ্লেষন আমাকে কিছু ইঙ্গিত দেয়। এদেশের বানিজ্যিক সিনেমার ক্ষমতা বোধহয় ফুরিয়ে যায় নি। মধ্যবিত্ত শ্রেনী এখানে হাভাতের মত হা করে চেয়ে আছে। এক গ্রাস খাবার নিয়ে এখানে কাড়াকাড়ি পড়বে। জেনে শুনে এই এক একটি গ্রাস নিেয় যদি একজন শিবলী সাদিক এগিয়ে আসেন এই মুহূর্তে, তবে সিনেমাহলগুলো আবার কানায় কানায় ভরে উঠবে, সপ্তায় সপ্তায় পত্রিকার পাতায় সিনেমার সংবাদ ছাপা হবে গুরুত্বের সাথে, ইত্তেফাক পত্রিকার ভেতরের পাতায় প্রত্যেক শুক্রবার বিশাল বিশাল চলচ্চিত্রের পোষ্টারে লেখা থাকবে - 'শুভমুক্তি' অথবা 'চলিতেছে'। শুভকামনা।

*(এই তথ্যে কিছুটা সংশয় আছে। কারণ উইকিপিডিয়া বলছে ওই একই বছরে আরও একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। যাচাই করার সুযোগ হয় নি)