গোলামীর জীবন শুরু করেছি মাত্র দিন দশেক হল। ১৪ ফেব্রুয়ারীর রােত সেন্ট মার্টিন যাবার সুযোগ হাতছাড়া করতে হল গোলামীর কারণে। বিনে পয়সায় ছেড়া দ্বীপে আবারও ঘুরতে যাওয়ার এই সুযোগা ছাড়ার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু উপায় নেই - গোলামী বড়ই খারাপ। তাই বলে বিরিশিরি যাবার সুযোগটা ছাড়া উচিত হবে না - যদিও পাক্কা দেড় হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে এই ট্যুরে।









বিরিশিরি ভ্রমণের আগ্রহের পেছনে কিছু ভূমিকা আছে। ঘোরাঘুরি শুরু করেছি সবে মাত্র, একদিন হঠাৎ ঝোক চাপল গারো পাহাড় দেখতে যাবো। গারো পাহাড়ের কোন বৈশিষ্ট্য না জেনেই গারো পাহাড়ে যাবার খায়েশ। সামু ব্লগে একটা পোস্ট দিয়ে ফেললাম - সাহায্য চেয়ে। তখন একজন ব্লগার মন্তব্য করেছিলেন গারো পাহাড়ে না গিয়ে বিরিশিরি যেন যাই। যাওয়া হয় নাই সঙ্গীসাথীর অভাবে। তারপর অনেকদিন বাদে চতুরে ব্লগিং করছি, হঠাত একদিন একুয়া রেজিয়া'র একটা পোস্ট চোখে পড়ে গেল - তিনি ঝটিকা বিরিশিরি ঘুরে এসেছেন। সেই পোস্টটার দুইটা ভালো ভূমিকা আছে। এক, এই পোস্ট পড়ে আমারও ভ্রমণব্লগ লেখার আগ্রহ তৈরী হল এবং সেইদিনই আমি শুরু করলাম বান্দরবান ভ্রমণ নিয়ে আমার সিরিজ - হাতের মুঠোয় মেঘদল। দুই, বিরিশিরি-কে আমার 'দ্রষ্টব্য' তালিকায় যুক্ত করা হল।





কোন জেলা ঘুরতে যাবার আগে তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি ওয়েবসাইটে ঘোরাঘুরি করি। বিশেষ করে সব জেলাকে নিয়ে সরকারের 'তথ্য বাতায়ন' সাইটগুলো বেস্ট। প্রয়োজনীয় তথ্যের অনেকটাই পাওয়া যায় এখান থেকে। একুয়া রেজিয়ার পোস্ট পড়ে ইন্টারনেট ঘেটেঘুটে নেত্রকোনা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে মাথা ভরপুর করছি এমন সময় হঠাত একটা সুযোগ এসে গেল। কামলা খাটি এমন একটা প্রতিষ্ঠান তাদের উইন্টার ক্যাম্প করার পরিকল্পনা করছে তখন। তােদর ইচ্ছা ছিল বগুড়া, সিরাজগঞ্জ এইসব জায়গায় বেড়াতে যাবে যেখানে সেমিনার-কনফারেন্স করার সুযোগ থাকবে, থাকার ব্যবস্থাও আছে। পরিকল্পনার মাঝপথে বাগড়া দিয়ে বললাম - নেত্রকোনা বিরিশিরি কেন নয়? কি আছে সেখানে - প্রশ্ন করার সুযোগটাও দিলাম না, মাথাভর্তি তথ্য উগড়ে দিলাম এবং মুহুর্তে সিদ্ধান্ত পাল্টে গেল। সুতরাং - দারাশিকো যাচ্ছে বিরিশিরি।





ঢাকা থেকে সোজা উত্তরে নেত্রকোনা। পাশে আছে সুনামগঞ্জ, আরও উত্তরে আছে ভারতীয় সীমান্ত। ঢাকা থেকে বিরিশিরি যাবার বাস আছে - জিনাত পরিবহন তার একটি। আবার ময়মনসিংহ গিয়ে সেখান থেকেও বিরিশিরি যাবার সুযোগ আছে। যেহেতু আমরা যাচ্ছি এক সাথে অনেকগুলো মানুষ মিলে এবং দুই দিনের প্রোগ্রাম ঠিক করা, তাই যাত্রার শুরুটা আমাদের পছন্দমত হওয়া উচিত ছিল। সেই অনুসারে একটা বাস ভাড়া করে ফেলা হল। আমাদের নিয়ে রাতের বেলা রওয়ানা হবে, আবার দুিদন পরে সন্ধ্যার সময় আমাদের নিয়ে ঢাকায় ফিরবে। মাঝের সময় তারা যা খুশি করতে পারে। বাসের নাম হযরত শাহজালাল (র), নেত্রকোনা রুটে চলাচল করে। সুতরাং সমস্যা হল না।





সব্বাই যখন রেডি হয়ে বাসে বসে অপেক্ষা করছে আমি তখন ঘুমে। সারাদিন গোলামী করে বাসায় ফিরেছি, বিনা নোটিশে মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গেল। বাসা থেকে যারা যাচ্ছে তারা রেডি হচ্ছে, আমি তখন ঘুমাতে গেলাম - নির্দেশ, গাড়ী ছাড়ার দশ মিনিট আগে যেন আমাকে জানানো হয়, আমার পৌছুতে লাগবে পাচ মিনিট, বাকী পাচ মিনিট রেডি হতে। ঝিম মেরে পড়ে ছিলাম, মাথা ব্যাথা নিয়েই সাড়ে এগারোটায় বাসে উঠে চোখ বুজে পড়ে থাকলাম। মনে মনে জোর প্রার্থনা করছি যেন ভোর হবার সাথে সাথেই ব্যাথা দূর হয়। কোন পেইন কিলার খাওয়া হয়নি, সুতরাং প্রার্থনা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।





রাত সাড়ে তিনটায় বিরিশিরি পৌছে গেল বাস। ছ'ঘন্টার যাত্রা মাত্র চার ঘন্টা। রাস্তার অবস্থা বেজায় খারাপ, বিশেষ করে ময়মনসিংহের পর থেকে - গত কয়েকমাসে বেশ কিছু জেলা ঘোরার সুযোগ হয়েছে, এত বাজে রাস্তা কোথাও ছিল না। সিদ্ধান্তহীনতায় একঘন্টা বাসেই বসে থাকা হল, তারপর ওয়াইএমসিএ রেস্টহাউজের উদ্দেশ্যে যাত্রা। বিরিশিরি বাসস্ট্যান্ড এর উল্টোদিকে একটু ভেতরে প্রথমে ওয়াইএমসিএ এবং তার কিছু পরে ওয়াইডব্লিউসিএ-র রেস্ট হাউস। এগুলো আন্তর্জাতিক খ্রীষ্টান মিশনারী প্রতিষ্ঠান - ইয়াং মেন/ওমেন খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন। বিরিশিরিতে বিশেষত গারো উপজাতিদের মাঝে তাদের কাজ। তাদের কাজে তারা বেশ সফল। কারণ যতটুকু জানতে পেরেছি কোন গারোই আর তাদের ধর্ম পালন করে না, খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে এক/দুই পুরুষ আগে। এই নতুন ধর্ম তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থাকে উন্নত করার পেছনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে চলছে।





এই উপমহাদেশে ইসলাম খুব দ্রুত প্রচার এবং প্রসারের পেছনে যে কারণ বেশী ভূমিকা পালন করেছিল, এখানেও তাই। হুমায়ূন কবীর (পরে আসছে তার কথা) জানিয়েছিলেন - পনেরো বছর আগেও বিরিশিরি অঞ্চলের মুসলমানরা তােদর বাড়িতে কামলা খাটা গারোদের প্লেটে খেতে দিত না - কলাপাতা ছিল উপযুক্ত, হয়তো মাটির সানকি। দরিদ্র এবং নিরক্ষর গারো জাতির তুলনায় শিক্ষা এবং অর্থে বড় হওয়াই বাঙ্গালীদের এই আচরণের উৎস, এবং গারোদের ইসলাম গ্রহন করার পরিবর্তে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করতে উৎসাহিত করার পেছনেও এই একই কারণ। ওয়াইডব্লিউসিএ - থেকে একটু দূরেই প্রায় এক একর এলাকায় ইটের দেয়াল প্রস্তুত হচ্ছে দেখে জানা গেল সেখানে একটি ইংলিশ মিডিয়াম কলেজ তৈরী হচ্ছে - উদ্দেশ্য গারোদের শিক্ষার উন্নয়ন - করছে খ্রীষ্টান মিশনারীরাই। বেকার গারো যুবকরা নাকি নিয়মিত ভাতা পায় এ সকল প্রতিষ্ঠান থেকে। মনে পড়ে গেল বান্দরবান ভ্রমণেও এই একই দৃশ্য দেখেছিলাম। উপজাতিদের এই খ্রীষ্টধর্ম গ্রহনকে খ্রীষ্টানসমাজের আগ্রাসন হিসেবে কেউ কেউ দেখলেও আমি দেখছি মুসলমানদের উন্নাসিকতাকে। ইসলামে অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ জাকাত ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হল এই দাওয়াহ কার্যাবলী। নিয়ম থাকলেও অনুসরণের অভাবে খ্রীষ্টান বা অন্য ধর্ম এক্ষেত্রে এগিয়ে যাবে - এ আর ভিন্ন কি?





রেস্টহাউজে বিভিন্ন ক্যাটাগরীর রুম আছে। প্রতি জন ১২০ টাকা করে ভাড়া, খাবার ব্যবস্থাও তাদের। সকালের নাস্তা ৪০ টাকা, দুপুরের খাবার ১২০ টাকা এবং রাতের খাবার ১১০ টাকা। তরকারী হিসেবে মুরগী, গরু, মাছ - যা চান তাই। সম্পূর্ণ হালাল খাবার, সুতরাং দুশ্চিন্তা করার কিছুই নেই। সবজিটা দারুন হয়, মুরগীটাও। আর সকাল বেলা ডালের চাটনীটা - উমম অসাধারণ। খাবার সময় দাম মনে না রাখাই ভালো।





তিন ঘন্টার ঘুম-বিশ্রাম শেষে ব্রেকফাস্ট, তারপর দলবেধে চীনামাটির পাহাড়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা। বিরিশিরি বাসস্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা চলে গেছে পশ্চিমে সেটাই চীনামাটির পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা। বাসস্ট্যান্ড থেকেই মটরসাইকেল পাওয়া যায়, কিন্তু ভালো হল একটু হেটে গিয়ে সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে তারপর মোটরসাইকেল বা রিকশায় উঠা। চুক্তিভিত্তিক যাওয়া আসা - অথবা শুধু যাওয়া। ১০০-৩০০ টাকা খরচ পড়বে কিভাবে যাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে। দুরত্ব প্রায় ৭/৮ কিলো। আমরা এতগুলো মানুষ রিকশা বা বাইক কোনটাই নিলাম না - একসাথে এতগুলো পাওয়াও যাচ্ছিল না। হাটাপথেই যাত্রা শুরু হল।





নৌকায় জনপ্রতি ৪টাকা দিয়ে সোমেশ্বরী নদী পার হয়ে আমরা আবার হাটা শুরু করলাম। দুই ধারে বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝখান দিয়ে সামান্য পিচঢালা রাস্তা, তারপর মাটির রাস্তা। সেই রাস্তার পুরোটা জুড়ে আছে আক্ষরিক অর্থেই ধূলার পাহাড়। এত মিহি ধূলা আর কোথাও দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। প্রতি পদক্ষেপে পায়ের কাছে ছোট একটা ঝড় তৈরী হচ্ছে, ট্রাক্টরচালিত ট্রাক কিংবা মটরবাইক পাশ দিয়ে যেতে থাকলে নিজের নাকমুখ বাচাতে ব্যস্ত সবাই। মাথার উপর চড়া রোদ, যথারীতি আমি চাদরে ঘোমটা দিয়ে চলছি - রোদ, ধূলা উভয় থেকেই বাচার জন্য। চাদরে ঘোমটা দেয়ার এই ব্যাপারটা নিয়ে এবার বেশ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল। যেহেতু খুব অল্প লোক নিয়ে ঘুরে বেড়াই, কেউ প্রশ্ন তোেল না, এবার হাসাহাসি হল আমাকে নিয়ে। প্রশ্ন এল - মেয়েদের মত ঘোমটা দিই কেন? আমি বলি - এনার্জি সেভ করি। ব্যাপারটা কিছুই না - আরবরাও রোদ থেকে বাচার জন্য এখনো এইরকম মাথা-কান ঢেকে চলে। আমি অনুভব করি, এই ঢেকে চলাটা ভ্রমনের সময় সত্যিই বেশ সাহায্য করে।





পৌনে দুই ঘন্টা লাগল পৌছুতে। চীনা মাটির পাহাড়ের পাদদেশে সবাই বসল বিশ্রাম নিতে। আমি বসলাম না, আগে ঘুরে নিই, ছবি তোলা শেষ করি - বিশ্রামটা তখন বেশী সময় নেয়া যাবে। চীনামাটির পাহাড় মূলত চীনামাটির খনি। উচ্চতায় ৪০-৫০ ফুট, বৈশিষ্ট্য এর মাটিতে। সাদা মাটি, এই পাহাড় কেটে চীনামাটি সংগ্রহ করা হয়, যে স্থানে মাটি কেটে নেয়া হয়েছে সেখানে তৈরী হয়েছে লেক। প্রায় চারটি। লেকের পানি একেকটায় একেক রকম। প্রথম লেকটায় পানি একটু ঘোলা, তারপরেরটায় একটু পরিস্কার, রং সবজে, পরিস্কার হতে থাকলে সেই পানির রং হয় নীলচে। সর্বশেষ লেকটার পানি সবচে নীল। ওই লেকের নাম নীল পানির হ্রদ। পানির রং অদ্ভুত রকম নীল। প্রাকৃিতকভাবে এই অবস্থা। এই হ্রদগুলির পানি সবসময় নীল থাকে না। শীতকালে পানির রং নীলচে হয়ে যায়, যেমনটি বর্ষাকালে বগালেকের পানি হয়ে যায় ঘোলা। পাহাড়ে উঠা যায়, রক ক্লাইম্বিং এর অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব চীনামাটির পাহাড়ে। সত্যিই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠার সুযোগ আছে, যারা এই ঝামেলায় যেতে চান না তারা একটু ঘুরে নিরাপদেই যেতে পারবেন।





চীনামাটির পাহাড়ে ছায়ার বড্ড অভাব। দুটো গাছ আছে, তার তলায় বিশ্রাম নেয়া সম্ভব। তবে আশে পাশে দোকান বা ঘরবাড়ির বড্ড অভাব। সুতরাং যদি খাবার এবং পানি সাথে নিয়ে যাওয়া যায় তবে বেশ হয়, নাহয় গলা ভেজাবার পানির জন্য ঘুরতে হবে। চীনামাটির পাহাড় জায়গাটা নারীবান্ধব, অর্থ্যাৎ নারীদের সাথে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া যাবে যদি না তাদের ধূলাতে আপত্তি না থাকে। আর হ্যা, শীতকাল বলেই এত ধূলা, বৃষ্টির সময় গেলে এই ধূলোই প্রচন্ড কাদায় পরিনত হয়। তখন হেটে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকে কম, কারণ কাদায় রিকশার চাকা আটকে যায়। আমাদের ভ্রমণে একটা মজা হল রাস্তার পাশের বরই গাছ। ছোট, কষা বরই ভর্তি গাছগুলো। ওইসব এলাকায় বোধহয় বাচ্চাকাচ্চা নাই, অথবা থাকলেও তারা খুবই ভদ্র, কারণ বরইগুলো পেকে গেলেও কেউ খাচ্ছে না। আমাদের ছেলেরা এই ভদ্রতাটুকু দেখাতে পারে নি। এটাই হয়তো ট্যুরের মজা।





ফেরার রাস্তাটা ক্লান্তিকর। যদি না সোমেশ্বরী নদীর সাথে সখ্যতা গড়ার কোন পরিকল্পনা না থাকে।