'ট্রি অব লাইফ' নিয়ে লিখবো বলে গত দেড় সপ্তাহ ধরে আমি কোন সিনেমা দেখিনি। কিছুক্ষন আগে উপলব্ধি করতে পারলাম, এই সিনেমা নিয়ে লেখার যোগ্যতা আমার এখনো হয়নি। গত দেড় সপ্তাহ ধরে আমি বেশ কয়েকবার লিখতে বসেছি, লিখতে পারিনি। এই সিনেমাকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব না। শেষে মরিয়া হয়ে শুরু করলাম - আমাকে কেউ দিব্যি দেয়নি যে ভালোই লিখতে হবে। যা হোক তাই লিখবো।  ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটির পরিচালক টেরেন্স মালিক, তার আরেকটি সিনেমা বেশ পরিচিত - থিন রেড লাইন। উনসত্তর বছর বয়সী এই ভদ্রলোক তার সাম্প্রতিক সিনেমাটি বানিয়েছেন তা সিনেমার ইতিহাসে আরেকটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সিনেমায় গল্পটি ন্যারেটিভ না। ১৯৫০ এর দশকে কোন এক গ্রীষ্মের সময়ে ও'ব্রেইন পরিবারের গল্প এটি। পরিবারে তিনটি ছেলে, তাদের মা এবং বাবা। বড় ছেলেটির নাম জ্যাক, মূলত মধ্যবয়সে পৌছে যাবার পরে তার সেই শৈশবমুখর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ দেখা যায় সিনেমায়। মি: ও'ব্রেইন চরিত্রে ব্রাড পিট অভিনয় করেছেন, মিসেস ও'ব্রেইন চরিত্রে জেসিকা চেস্টেইন। যেহেতু সিনেমাটি ন্যারেটিভ না, ফলে কোন নির্দিষ্ট গল্প খুজে পাওয়া কষ্টকর। তবে তারমাঝেও একটি গল্প আছে। ও'ব্রেইন পরিবােরর এক সদস্যের অকাল মৃত্যুতে মি. এবং মিসেস ওব্রেইন এর মানসিক যাতনা একই সাথে তাদের জেষ্ঠ্য সন্তান জ্যাক যার সাথে সেই অকালপ্রয়াত ভাইটির খুব ভালো সম্পর্ক ছিল তার টুকরা চিত্র দেখা যায় এই সিনেমায়। মি. ওব্রেইন চরিত্রটি বেশ কঠোর, কিন্তু কোথাও কোথাও সে কোমল। অন্যদিকে মিসেস ওব্রেইন চরিত্রটি ঠিক তার উল্টো। সন্তানদের বন্ধু সে। বাবা যখন বাড়ীতে উপস্থিত থাকেন না তখন মা'র সাথে কিশোর ছেলেদের খেলাধুলাসহ যাবতীয় দুষ্টামী-বন্ধুত্ব। বাবার উপস্থিতিতে পরিবেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি। সেখানে কেউ হাসে না, প্রত্যেকটা কাজে হতে হয় নিয়মনিষ্ঠ, শৃঙ্খলাবদ্ধ। এ ধরনের একটি চরিত্র স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের চোখে বিরূপ গণ্য হয়। কিন্তু এই ট্রি অব লাইফে মি. ওব্রেইনের এই চরিত্রটি একটু ভিন্ন। কোন এক অজানা কারণে এই চরিত্রটির প্রতি একসময় মায়া সৃষ্টি হয়, ক্ষোভ উবে যায়।

খেয়াল করলে দেখা যাবে এই সিনেমার পরিবার নিয়ে গল্পটি চিরন্তন। এইরকমই পরিবেশে বড় হয়েছি আমি আপনি, আমাদের বাবা-দাদারা। হয়তো সামনের প্রজন্ম এই রকম পরিবেশটা পাবে না, তাদের পরিবারে সন্তান সংখ্যা একটিই, খেলাধূলার জন্য ড্রইংরুমই ভালো জায়গা। বাবারা সেখানে যতটা না শাসক তার চেয়ে বেশী বন্ধু, খেলার সাথী। কিন্তু যেহেতু আমি আপনি প্রজন্মের লোক নই, তাই সিনেমাটি আপনার ভালো লাগতে বাধ্য। মনে করে দেখুন তো বাবাকে আপনি কতটা ভয় পেতেন, কিন্তু ভয়ের আড়ালে ভালোবাসাটুকুকেও উপেক্ষা করতে পারতেন না। মনে করে দেখুন নিজের ভাই বোনের সাথে মিলে আপনি কত অজানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন, আপনার প্রতিবেশীদের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছেন অনায়াসেই কারণ তারা চোর বা অন্য কিছুর ভয়ে দরজা বন্ধ করে রাখতো না, মায়ের কাছে আবদারগুলোর কথাই বা ভুলে যাবেন কেন? ট্রি অব লাইফ তাই ১৯৫০ এর দশকে কোন আমেরিকান পরিবারের গল্প না, এটা চিরন্তন সার্বজনীনতার গল্প।

ট্রি অব লাইফ এখন পর্যন্ত যারা দেখেছেন তারা প্রায় সবাই বলেছেন এই সিনেমা মাথার উপর দিয়ে গেছে। সত্যিই তাই, কারণ টেরেন্স মালিক এখানে গতানুগতিক পদ্ধতিতে সিনেমা বানাননি। তিনি এর সাথে জীবনদর্শনকে, ধর্মীয়অস্তিত্ব এবং প্রভাবকে একত্র করার চেষ্টা করেছেন। এটা দেখার বিষয় নয়, উপলব্ধি করার বিষয়। ও'ব্রেইন পরিবারের গল্প থেকে বেরিয়ে গিয়ে যখন অপার্থিব দৃশ্যাবলীর শুরু হয়, তখন দেখতে ভালো লাগলেও এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে, পুরো দৃশ্যটাই যৌক্তিক। একটি পৃথিবীর শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীকে তুলে ধরা হয়েছে এই সিনেমায়। ফলে মহাকাশ জগত এবং পৃথিবী সৃষ্টির পূর্ব কাহিনীর পাশাপাশি মানবপূর্ব ইতিহাসও এখানে পাওয়া যায়। আবার সিনেমার শেষে মৃত্যু পরবর্তী অবস্থার একটা চিত্রও তৈরী করেছেন টেরেন্স মালিক। আপনি ধর্মে বিশ্বাসী হন আর না হন, মৃত্যুর পরে আপনি আপনার প্রিয়জনের সাথেই থাকতে চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। আমরাও সিনেমায় দেখতে পাই বিশাল এক সমুদ্রের পাড়ে সমবেত হয়েছে ওব্রেইন পরিবার, সেখানে আছে তাদের প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন প্রিয় মুখ।

টেরেন্স মালিকের এই সিনেমাটি বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার স্ট্যানলি কুব্রিকের '২০০১: আ স্পেস অডিসি'-র সিগনেচার ফিল্ম। সম্ভবত কুব্রিকের সিনেমাটির পর আর কেউ এ ধরনের সিনেমা নির্মান করেননি, টেরেন্স মালিক আবারও নির্মান করলেন। আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন শটের সমাহার স্ট্যানলির ২০০১ সিনেমায় পাওয়া যায়। ফলে বিশ্বখ্যাত ফিল্ম ক্রিটিকরাও তাদের সমালোচনায় কুব্রিকের নাম উচ্চারণ করেছেন। যারা সিনেমা নির্মান সম্পর্কে আগ্রহী তারা এই সিনেমাটির নির্মান পদ্ধতি নিয়ে পড়াশোনা করে দেখতে পারেন। ট্রি অব লাইফের স্পেশাল ইফেক্টের সুপারভাইজার ছিলেন ডগলাস ট্রাম্বাল, তিনি কুব্রিকের ২০০১ সিনেমাতেও একই কাজ করেছেন, মজার ব্যাপার হল এই ডিজিটাল যুগে এসে তারা দুজনে সেই কুব্রিকের সময়েই ফিরে গেছেন, সেই ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে ইফেক্টগুলো তৈরী করেছেন।

যারা আইএমডিবি-র রেটিং এর উপর অনেক নির্ভর করেন তাদের জন্য এই সিনেমাটা হতাশাব্যাঞ্জক হবে। ওখানে রেটিঙ মাত্র ৭.১। রোটেনটম্যাটোস এ এর রেটিঙ ৮৪%, মেটাক্রিটিকে ৮৫%। পুরস্কারের ডালিতে ইতোমধ্যেই অনেকগুলো পুরস্কার বাগিয়ে নিয়েছে এই সিনেমা। অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে মনোনীত হয়েছে বেস্ট পিকচার, ডিেরক্টর এবং সিনেমাটোগ্রাফীতে। আমার বিশ্বাস দুর্দান্ত লাইটিং এবং সিনেমাটোগ্রাফীর কল্যাণে সিনেমাটোগ্রাফী বিভাগে এই সিনেমা অস্কার জয় করবে। সিনেমার প্রত্যেকটি দৃশ্য একএকটি জীবন্ত ওয়ালপেপার। প্রায় পুরো সিনেমাতেই ক্যামেরার এত সপ্রভিত আচরন এবং মুভমেন্ট দেখিনি, সম্ভবত সম্পূর্ণ চিত্রগ্রহণই স্টেডিক্যামে করা। ক্যামেরা যখন দুলে দুলে এই চরিত্র থেকে সেই চরিত্রে ঘুরে বেড়ায় তখন বাস্তবিকই মনে হবে আপনি জীবনবৃক্ষের এক ডাল থেকে অন্য ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেই সাথে আছে মিউজিক। প্রতি মুহুর্তে আপনাকে গভীর থেকে গভীরে ডুবে যেতে সাহায্য করবে - ও'ব্রেইন পরিবারের চতুর্থ সন্তান হিসেবে নিজেকে একাত্ম করার সুযোগ দেবে।

[caption id="" align="alignnone" width="600" caption="স্টেডিক্যামে চিত্রগ্রহন চলছে"][/caption]

এই সিনেমা অবশ্যই সবার জন্য না, যারা সিনেমা দেখে ভাবতে চান, সিনেমা নির্মানের পেছনে পরিচালকের ভাবনাকে বুঝতে চান এবং মনে করেন সিনেমাকে আর্ট হিসেবে একটা মূল্য দেয়া উচিত, শুধু দর্শকপ্রিয়তার উপর ভিত্তি করে নয়, তাদের জন্য ট্রি অব লাইফ। একবার দেখলে মাথার উপর দিয়েই যাবে, কিন্তু তাই বলে এর উপভোগে কোন ব্যত্যয় ঘটবে না।