উপক্রমনিকা





ভোলার চর কুকড়ি মুকড়ি থেকে ট্রলারে করে ফিরছি, মাথার উপর চড়া রোদ, গায়ের চাদরে ঘোমটা দিয়েছি। হাতে বাজারের সবচে সস্তা ডিজিটাল ক্যামেরা, ছবি তুলবো এমন কোন বিষয় নেই - চারদিকেই পানি আর পানি, সুতরাং ছবি তোলাও বন্ধ। চড় কুকড়ি মুকড়ির কথা ভাবছি। অনেক বছর বাদে হয়তো আবার আসবো এই জায়গায়, তখন অনেক পাল্টে যাবে। অনেক বছর আগে আসতে পারলে কেশরওয়ালা কুকুর দেখতে পেতাম।





কুকড়ি মুকড়ি নিয়া লিখবো কিনা ভাবতে শুরু করলাম। ভ্রমণব্লগ লেখার জন্য চতুরমার্ত্রিক বেস্ট। বান্দরবন ভ্রমণ নিয়ে ভালো সারা পেয়েছি। চর কুকড়ি মুকড়ি বা ভোলা নিয়ে লিখব। পটুয়াখালী, কুয়াকাটা নিয়ে লিখব। কুষ্টিয়া, জয়পুরহাট নিয়ে লিখব। যে সকল জায়গায় গিয়েছি, সব নিয়ে লিখবো। ছবি দেয়া যাবে না অবশ্য। আগে বেশী গরীব ছিলাম, ক্যামেরা ছিল না, ছবি তুলতে পারি নাই। তাতে কি - লিখবো, পাঠক আমার চোখে দেখবে। একটা একটা করে বেশ অনেকগুলো জেলা ঘুরলাম - সব মিলিয়ে ২৮টা। বাকীগুলোও হয়ে যাবে কারণ আমি সুেযােগ বেড়াই না, সুযোগ তৈরী করে বেড়াই। সবাই দেশ ভ্রমণ করে, আমি করবো বঙ্গভ্রমন - কারন আমার সামর্থ্য সীমিত।





তারপর, কড়া রোদের মধ্যে ই বিশাল নদীর মাঝে ভটভট শব্দ তুলে একদল মানুষের সাথে ভেসে যাবার সময় আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম - আমি একটা ইবুক লিখবো - নাম হবে দারাশিকোর বঙ্গভ্রমণ









গায়ে চাদরটা জড়িয়ে একটা এক প্রান্ত হাতের মুঠোয় গুজে আমি ছুটছিলাম। যাচ্ছি হোটেল ফার্মগেট। সেখানে সকাল সাড়ে আটটায় একটা গেটটুগেদার। নাস্তাটাও জম্পেশ হবে বোধকরি। বাতাস হচ্ছে বেশ, তবে তূলনামূলকভাবে ঠান্ডা কম। ঠিক সময়ের ৩ মিনিট আগে পৌছে গেলাম। কেউ আসে নি এখনো। আমি আরও ৩ মিনিট অপেক্ষা করলাম, তারপর উদ্যোক্তা মাসুম ভাইকে ফোন দিলাম - আমি পৌছে গিয়েছি, আপনারা কই?





এই মাঘের শেষদিকে এসে বিনােমঘে বজ্রপাত হল। গেটটুগেদার সকাল সাড়ে আটটায় নয়, রাত সাড়ে আটটায়। গালি দিলাম নিজেকে। এই মিটিঙ এর জন্য ফজরের পর ঘুমাই নাই, সকালে নাস্তা না করেই বেড়িয়েছি, দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসেছি। কি আর করা। একটা হোটেলে ঢুকে পড়লাম। নাস্তা খেতে খেতে সিদ্ধান্ত - মানিকগঞ্জ যাচ্ছে দারাশিকো, দেখবে বালিয়াটি প্রাসাদ।





মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় বালিয়াটি প্রাসাদ সম্পর্কে প্রথম দেখেছিলাম বন্ধু ইকবালের ফেসবুক ওয়ালে। আরেক বন্ধু রোমানের বাড়ি মানিকগঞ্জে, কয়েকজন মিলে ঘুরে এসেছে জমিদার বাড়ি। কিভাবে যেতে হবে সেটা জানা গেল রোমানের কাছ থেকে। সুতরাং, একটা আট নাম্বার বাসে করে আমি চলে গেলাম গাবতলী। সেখানে আধাঘন্টা দাড়িয়ে থেকে চড়ে বসলাম পদ্মা লাইনের বাসে। পদ্মা লাইন মানিকগঞ্জ হয়ে পাটুরিয়া যাবে। আমি একদম একা।





এই প্রথমবার আমি একদম একাকী কোথাও বেড়াতে যাচ্ছি। আমি যে হুট করে যাচ্ছি তা নয়। গতকাল থেকেই চিন্তা ভাবনা চলছে, মানিকগঞ্জে কি কি দেখার আছে সে ব্যাপারে ধারনা নিয়েছি। তারপর বেশ কিছু বন্ধুকে ফোন করেছি - কেউ যেতে রাজী হল না। প্রত্যেকেই নিজস্ব তারিখ দিচ্ছে। আমি রাজী নই। এই মুহুর্তে আমি ফুলটাইম বেকার, এমবিএ পরীক্ষা শেষ হয়েছে, ইন্টার্নশীপ পিরিয়ড চলছে। যতদিন পারা যায় স্বাধীন থাকার চেষ্টায় আমি কোথাও ইন্টার্ন করার চেষ্টা করিনি, চাকরীর চেষ্টা করছি। যে কোনদিন আমার চাকরী হয়ে যাবে আমি জানি - তাই প্রতিটি দিনকে কাজে লাগানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা বেড়াও।





গাবতলী থেকে মানিকগঞ্জ যাবার জন্য পদ্মা লাইন এবং ভিলেজ লাইন - এ দুটো বাসের কথা রোমান বলে দিয়েছিল। এগুলো ছাড়াও লোকাল বাস আছে। এরা মাঝপথে যাত্রী উঠাবে-নামাবে। ভাড়া একটু কম। পদ্মায় ৬০ টাকা লাগল। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে নেমে তারপর সিএনজি-তে করে সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড। জনপ্রতি ৩০ টাকা। ঢাকা শহরের বাইরে সিএনজি টেক্সীগুলো বেশ সার্ভিস দিচ্ছে। পাচজন যাত্রী একজন ড্রাইভার এই নিয়ে ছয়জন দিব্যি চলে যেতে পারে অনেক দূর পর্যন্ত। রিজার্ভ করার বিপুল ভাড়া নেমে আসে পাচ ভাগের এক ভাগে। এটা একটা ভালো ব্যাপার।





সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা, বা অটোতে বালিয়াটি প্রাসাদে যাওয়া যায়, ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। আমিও পাইলটের পাশে চড়ে বসলাম। অটো চলতে শুরু করলে বুঝলাম পেছনে তিনজন যাত্রীই মেয়ে, এবং এরা কেউই স্কুল পাশ করার বয়স হয়নি। কল কল করছে। এই কলকল আমার যাত্রা পথই নয়, পুরো বালিয়াটি প্রাসাদ ভ্রমণেই ছিল। এমনটি নয় যে আমি তাদের সাথে ঘুরেছি, বরং তারা এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিল যে নিস্তব্ধ প্রাসাদাঙ্গনে গমগম করছিল। ছবি তোলার সময় আমাকে বেশ সাবধান থাকতে হল, লুকায়া ছবি তোলার অভিযোগে মাইর দেয়া শুরু করলে মুশকিল হবে।





বালিয়াটি প্রাসাদ সম্পর্কে খুব বেশী তথ্য প্রাসাদ ভ্রমন থেকে জানা যায় না। দশটাকা মূল্যের টিকিট দিয়ে প্রবেশ করলেই প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের একটা সাইনবোর্ড থেকে জানা গেল ৫.৮৮ একর জায়গার উপরে নির্মিত মোট ৭টি প্রাসাদে ২০০ ঘর রয়েছে। লবন ব্যবসায়ী গোবিন্দ রাম সাহার পরবর্তী বংশধর উনিশ শতকে ঔপনিবেশিক স্থাপত্যিক গঠনে এই প্রাসাদগুলো তৈরী করেন। বোর্ডের তথ্য সামান্য হলেও প্রয়োজনীয় আরও তথ্যাদি পাওয়া গেল ব্লগেই । কিছু তথ্য কপি পেস্ট করা হল।





মহেশরাম সাহা নামের এক কিশোর‍ নিত্যান্তই ভাগ্যের অন্মেষনে বালিয়া‍টী আসেন এবং ‍জনৈক পানের ব্যবসায়ীর বাড়িতে চাকরি নেন। পরবর্তীতে ঐ বাড়ীরই মেয়ে বিয়ে করে শ্বশুরের সঙ্গে ব্যবসা করে প্রথম শ্রেনীর ব্যবসায়ী হন। তার ছেলে লবনের ব্যবসা করে আরো উন্নতি লাভ করেন এবং তিনি চার ছেলে জন্ম দেন। তাদের নাম আনন্দ রাম, দধি রাম,পন্ডিত রাম এবং গোলাপ রাম। এই চার ছেলে মিলেই বালিয়াটী গোলাবাড়ী, পূর্ববাড়ী, পশ্চিমবাড়ী, মধ্যবাড়ী ও উত্তর বাড়ী নামে পাঁচটি জমিদার বাড়ির সৃষ্টি করেন। আনুমানিক ১৭৯৩ খিষ্টাব্দে উক্ত চার ছেলের মাধ্যমেই জমীদার বাড়ীর গোড়াপত্তন হয়।





বর্তমানে যে প্রসাদটি "বালিয়াটি প্রাসাদ" নামে খ্যাত এটি কে বলা হতো পূর্ব বাড়ী। এদের রাজত্বকাল ছিল ১৭৯৩-১৯৪৮সাল পর্যন্ত। ১৯৪৮ সালে ‍ইতি ঘটে তাদের জমিদারী। এখানে জমিদারী করতেন চারটি পরিবার বড় তরফ, মেঝ তরফ, নয়া তরফ এবং ছোট তরফ। বড় তরফের প্রধান জমিদার রাজচন্দ্র, মেঝ তরফের প্রধান জমিদার ঈশ্বর চন্দ্র, নয়া তরফের প্রধান জমিদার ভগবাদ চন্দ্র এবং ছোটতরফের প্রধান জমিদার ভৈরব চন্দ্র। পশ্চিম থেকে পূর্ব পযর্ন্ত যে চারটি সুবৃহত ও সৃদৃশ্য অট্রলিকা দাড়িয়ে আছে এ গুলো বড়, মেঝ, নয়া ও ছোট তরফ নামে জনশ্রুতিতে নিবন্ধ। ১৩০০ বঙ্গাব্দের ১লা বৈশাখ এই প্রাসাদে জমিদারগন প্রথম এ গৃহপ্রবেশ করেন বলে জানা যায়। ১৬.৪০ একর বিশাল এলাকা জুড়ে ছিল এই বাড়ীর অবস্থান। ৫.৮৮ একর জমির উপরে বড়ির মূল সৌধমালা। ১০.৫২ একর জায়গার মধ্যে ছিল বিশাল বাগান। সামনের চারটি প্রসাদ ব্যবহারিত হত ব্যবসায়িক কাজে। এই প্রসাদের পেছনের প্রাসাদকে বলা হয় অন্দর মহল সেখানে বসবাস করত তারা। ১৯৪৮ সালে জমিদাররা চলে যাবার পর এই প্রসাদে চলে লুটপাট। তখন বালিয়াটীতে একটি ক্লাব তৈরি করা হয় এতে কিছু হলেও কমেছিল লুটপাট। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর অধিগ্রহন করেন এবং বর্তমানে এর সংস্কার কাজ চলছে।





প্রাসাদের দেয়ালে চারটে দরজা রয়েছে। প্রত্যেকের উপরই একটি করে সিংহমূর্তি। সাম্মুখভাগের তিনটা প্রাসাদ বিশাল বিশাল পিলার সমৃদ্ধ। ভেতরের গুলো অনেকটা অন্দরমহলের মত। দালানগুলোর একটিতেই মাত্র প্রবেশাধিকার রয়েছে, সেটা একটা মিউজিয়াম। বেশ কিছু সিন্দুক, খাট, আলমারিসহ অন্যান্য আসবাবপত্র, তৈজসপত্র ইত্যাদি দিয়ে মিউজিয়ামটি সাজানো। একজন বৃদ্ধমত ভদ্রলোক একাকী নিবিষ্ট মনে পত্রিকা পড়ছিলেন, ছবি তোলা নিষেধাজ্ঞা মেনে নিলাম নিজ দায়িত্বেই।





সামনের তিনটা প্রাসাদের পাশ দিয়ে কোন প্রতিষ্ঠিত রাস্তা নেই। কিন্তু হেটে যাবার পথ আছে। বোধকরি পেছনের প্রাসাদের বাসিন্দারা ঘরের ভেতর দিয়েই যাতায়াত করতেন। একটি বড় কুয়া পাওয়া গেল পেছনে। প্রায় পনেরো ফিট নিচে ময়লা আবর্জনায় ভরপুর। একদম শেষে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর। সেই পুকুরে ছয়টি বাধানো ঘাট। শীতকাল বলে পানি অনেক নিচে নেমে গিয়েছে। পুকুরের উত্তর কোণায় রয়েছে সারি সারি বাথরুম এবং টয়লেট। সবই ধ্বংসস্তুপ। তবে এতদিন পরে দেখে আইডিয়াটা বেশ ভালো লাগল। পুকুরের উত্তর পূর্ব কোনায় একটা সুরঙ্গ মত আছে, বলা হয় ওই পথে নদীতে যাওয়া যেত।





আমার প্রবেশাধিকার ছিল না প্রাসাদের বদ্ধ কক্ষগুলোতে। পরে ব্লগে আরও কিছু ছবি দেখলাম যেগুলো প্রাসাদের দোতালা বা ছাদ থেকে তোলা হয়েছে।





বালিয়াটি প্রাসাদ থেকে পাচ মিনিটের হাটা দূরত্বে ঈশ্বরচন্দ্র হাই স্কুল। বালিয়াটির জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র রায় চৌধুরীর নামানুসারে স্কুলটির নাম ঈশ্বরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় হয়েছে। ১৯১৫-১৬ খৃীষ্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্রের পুত্র হরেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী স্কুলটির প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমত স্কুলটির নামকরণ করা হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র হাই ইংলিশ স্কুল। হরেন্দ্র কুমার চৌধুরী প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ব্যয়ে করে স্কুলটির সুদীর্ঘ এবং সুদৃশ্য পাকা ভবন নির্মাণ করে দেন। বর্তমানে মানিকগঞ্জের পুরাকীর্তি স্মৃতি বিজড়িত এ স্কুলটি স্থানীয় স্কুল কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। স্কুলের সামনের ঘন ফুলের বাগানের কারণে একতালা ভবনটি দেখা যায় না তেমন, তবে কাছে গেলে প্রাসাদভ্রমণের অনুভূতি পাওয়া যায়।





সাটুরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকাগামী বাস আছে, বন্ধুর সেটা জানা ছিল না বোধহয়। ঢাকা থেকেই চলে আসা যেত তবে। ভাড়া একই - ৬০ টাকা। উঠে পড়লাম, গন্তব্য গাবতলী