ধর্মে বিশ্বাসীদের বিশেষত ইসলাম, ইহুদী, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে ফেরেশতা সম্পর্কে বিশ্বাস রয়েছে। ফেরেশতা হল এমন সৃষ্টি যারা স্রষ্টার আদেশে বিভিন্ন রকম কার্যে নিয়োজিত থাকে। অন্যান্য ধর্মে ফেরেশতাদের জায়গায় আছে বিভিন্ন দেবতা, রয়েছে দেবতাদের অধীনস্ত বাহিনী। যেহেতু ফেরেশতা বা অ্যাঞ্জেলরা স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত, তাই ফেরেশতা সম্পর্কে একটা শ্রদ্ধা আছে, ভক্তি আছে। এই ফেরেশতারাই যদি একটা সিনেমার চরিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হয় তবে কেমন হয়?

এ পর্যন্ত তিনটি সিনেমার কথা মনে পড়ছে যেখানে ফেরেশতারা বা অ্যাঞ্জেলরা বেশ ভালো ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে একটি হল অ্যাঞ্জেল এ। এটি একটি ফ্রেঞ্চ সিনেমা। হতাশাগ্রস্থ এক যুবককে বাচাতে এক নারী অ্যাঞ্জেল এসে উপস্থিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়ে যায় একে অপরের। অসাধারণ এক সিনেমা। অন্য আরেকটি সিনেমার নাম ইটস আ ওয়ান্ডারফুল লাইফ । সাদাকালোয় নির্মিত এই সিনেমাটায় একজন অত্যন্ত ভালোমানুষকে পৃথিবীতে তার অনুপস্থিতি কি ভূমিকা রাখবে তা বোঝানোর জন্য একজন অ্যাঞ্জেলকে পাঠানো হয়। সমাজে যে ভালো মানুষের কি প্রয়োজনীতা, সেটা বোঝা যায় এখানে। হয়তো দর্শকরা কিছু সময়ের জন্য হলেও ভালো হওয়ার আগ্রহ বোধ করেন।


সম্প্রতি দেখলাম দ্যা অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যুরো। ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অল্প যে কটি সিনেমা দেখা হয়েছে এটা তার একটি। ডেভিড নরিস নামে এক খুবই তরুন ছেলে যে কিনা একজন কনগ্রেসম্যান হবার চেষ্টা করছে একটি অসফল ক্যােম্পইন চালায়। শেষে একটি বক্তৃতা তৈরী করার প্রাক্কালে দেখা হয়ে যায় এলিসের সাথে। এই পরিচয়টা তার বক্তৃতাকে পাল্টে দেয়, ব্ক্তৃতাটি বেশ জনপ্রিয় হয়। আবার দেখা হয়ে গিয়েছিল এলিসের সাথে, কিন্তু তাদের পরিচয়টা গাঢ় হবার সুেযাগ ছিল না। একদল অ্যাডজাস্টার যারা 'চেয়ারম্যান'র হয়ে কাজ করে তারা চাইছিল না ডেভিড নরিসের সাথে এলিসের দেখা হোক, সম্পর্ক তৈরী হোক - কারণ প্ল্যােন এটা নেই এবং এটা নরিসের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। সুতরাং ডেভিড নরিস চেষ্টা করতে থাকে কিভাবে এই প্ল্যানকে উপেক্ষা করে এলিেসর সাথে মিলিত হওয়া যায়।



অ্যাডজাস্টারস। মাথায় হ্যাট পড়ে আপনার আশে পাশে ঘুরছে এমন যে কেউ হতে পারে এদেরই একজন।

এখানেই দ্বন্দ্বের শুরু। মানুষ কি তার ভাগ্য বদলাতে পারে নাকি যা লিখে রাখা হয়েছে তাই তার পরিনতি? চিরন্তন এই দ্বন্দ্ব সিনেমাতেও। ডেভিড নরিস চেষ্টা করে যাচ্ছে তার নিজের মত করে ভাগ্য গড়ে নিতে। একে ইংরেজিতে ফ্রি উইল বলা হয়। অন্যদিকে, একদল অ্যাডজাস্টার বা অ্যাঞ্জেলস চেষ্টা করে যাচ্ছে প্ল্যানবুকে যা লেখা আছে অর্থ্যাত প্রিেডস্টিনেশন তা বজায় রাখা। প্ল্যানে ছিল না এলিসের সাথে নরিেসর দেখা হোক। কিন্তু ব্ক্তৃতার আগে দেখা হওয়াটা জরুরী ছিল। কারণ সেটাও প্ল্যানের একটা অংশ। এমন একটা সাক্ষাত যা নরিসের বক্তব্যকে পাল্টে দেবে, যা তাকে জনপ্রিয় করবে এবং একজন ভালো কনগ্রেসম্যান হিসেবে তৈরী করবে। কিন্তু নরিস যদি এই এলিসের প্রেমে পড়ে সম্পর্ক তৈরী করে তবে ভালো কনগ্রেসম্যান হবে না। অন্তত: প্ল্যান তাই বলে। সুতরাং প্ল্যান রক্ষার্থে অ্যাডজাস্টাররা কাজ করে যায়, ডেভিড নরিসও তার ভাগ্য বদলানোর চেষ্টা করে যায়।


প্রিডেস্টিনেশন নাকি ফ্রি উইল? ফ্রি উইল খুবই শক্তিশালী একটা ক্ষমতা। আপনি যদি ফ্রি উইল ব্যবহার করতে পারেন তো সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সহজ। অন্যদিকে প্রিডেস্টিনেশন পেছন দিকে টেনে ধরবে। এক এক ধর্মে এক এক ভাবে দেখা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে এর মাঝামাঝি অবস্থান লক্ষ্যনীয়। সিনেমায় শেষ পর্যন্ত ফ্রি উইলের জয় দেখা গেলেও প্রশ্ন রেখে যায়। কর্পোরেট দুনিয়ায় চেয়ারম্যানই সব ক্ষমতার অধিকারী, তাই সিনেমায়ও ইশ্বর এর নাম চেয়ারম্যান। কিন্তু মানুষ চেয়ারম্যানের মত ঈশ্বর চেয়ারম্যানের ক্ষমতায়ও ঘাটতি আছে এমন একটা ধারণা সিনেমা থেকে তৈরী হতে পারে। ডেভিড তার ফ্রি উইল দিয়ে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তকে পাল্টে দিতে পেরেছে - এটাই কি সত্যি, নাকি চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রিডেস্টিনেশনেই পৌছেছে ডেভিড তার জবাব পাওয়া যাবে না সিনেমায়, জবাব দর্শকের মস্তিস্কে, হৃদয়ে। সমালোচক রজার এবার্ট দারুন একটি রিভিউ লিখেছেন এই সিনেমা নিয়ে - পড়ে দেখা যেতে পারে।


অ্যাঞ্জেলরা ডেভিড নরিসের কাজে বাধা দেয়ার দারুন একটা ব্যাখ্যা করেছে। তারা চায় নরিস একজন কনগ্রেসম্যান হোক, তার মত একজন কনগ্রেসম্যান থাকা দরকার। সে উদ্যমী, সে প্রত্যয়ী। কিন্তু এলিসের সাথে সম্পর্কে জড়ালে তার কনগ্রেসম্যান হবার সম্ভাবনাটুকু নষ্ট হবে - সুতরাং এলিসের সাথে নরিসের সম্পর্ক নষ্ট করার যাবতীয় পদক্ষেপ তারা নেয়। ব্যক্তিগতভাবে এই জায়গাটায় আমি খুব প্রীত। অল্প বয়সেই আমি অনেক অনেকগুলা উদাহরণ দেখে ফেলেছি যেখানে এই প্রকৃতির আহবানে সাড়া দিতে গিয়ে সম্ভাবনাময়ী ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যেতে। সবসময়ই প্রকৃিতর প্রয়োজন তা আমার মনে হয়নি। অনেক সময়ই আশেপাশের পরিবেশ অনেক বেশী প্রভাবিত করছে, এই পরিবেশের মধ্যে আমাদের গল্প-উপন্যাস-নাটক-সিনেমা-গান রয়েছে। স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া একটা ছেলে বা মেয়ের প্রেম করার পেছনে তার দৈহিক বা মানসিক প্রয়োজন যতটা বেশী তারচে বেশী প্রয়োজন আত্মসন্তুষ্টি যার সিংহভাগ আসে লোকদেখানোর মানসিকতা থেকে। একজন প্রেমিকের দৈনিক চিন্তাভাবনা এবং কর্মকান্ডের একটা বড় অংশ যায় তার প্রেমিকাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য। ফলে এই প্রেমিক গোষ্ঠী দ্বারা ঐতিহাসিক কিছু প্রেমকাব্য এবং মহাপোন্যাস তৈরী হয় সত্যি, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সমাজ পরিবর্তন হয় না। নচিকেতার "অনির্বান -৩" এর গানটা মনে পড়ে যায়।


তোকে নিয়ে ঘর বাধবার স্বপ্ন আমার অন্তহীন, রাত্রিদিন।
কিন্তু বুকে বাধে আরেক আশা
ফুটপাতে যাদের বাসা
আগে তাদের জন্য একটা ঘর বানাই।


প্রেমকে উপেক্ষা করে সমাজ-রাষ্ট্র বদলে দেয়ার সাহস এবং পৌরুষ সবার থাকে না। প্রয়োজনের প্রেম চাই, অসময়ের-অপ্রয়োজনের-লোকদেখানো প্রেম নয়।

জর্জ নোলফির পরিচালনায় এই সিনেমাটার গল্প ফিলিপ কে ডিক এর অ্যাডজাস্টমেন্ট টিম অবলম্বনে। অভিনয় করেছে ম্যাট ডেমন এবং এমিলি ব্লান্ট। বেশ উপভোগ্য সিনেমা। বিশেষ করে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে ফেরেশতাদের কাজকর্ম দেখাটা দারুন। দরজা দিয়ে এক জগত থেকে আরেক জগতে স্থানান্তরের বিষয়টা নি:সন্দেহে চমকপ্রদ। আইএমডিবি রেটিং ৭.১ হলেও দর্শককে ভাবানোর জন্য বেশ ভালো একটি সিনেমা।