গুডফেলাস সিনেমাটি দেখেছেন? স্ট্যানলি কুব্রিকের দ্য শাইনিং? এ দুটো সিনেমায়ই স্টেডি ক্যামের অপূর্ব ব্যবহার দেখানো হয়েছে - মনে করতে পারছেন? হয়তো কষ্ট হচ্ছে। তাহলে ভারতীয় সিনেমা থেকে উদাহরণ দিই - এবার আপনি পারবেনই। ফারাহ খানের পরিচালনায় শাহরুখ খান অভিনীত উদ্ভট সিনেমা 'ম্যায় হু না' দেখেছেন নিশ্চয়ই? সেখানে একটি গান ছিল - চলে য্যয়সে হাওয়া । এবার নিশ্চয়ই মনে করতে পেরেছেন তাই না? গানটি অন্যরকম লেগেছিল না? শুনেছিলাম এই গানটা শ্যূট করতে টানা ২৯ দিন রিহার্সেল চলেছিল। কেন? কারণ এই গানটার একটা বড় অংশ স্টেডিক্যামে শ্যুট করা। আসুন গানটা দেখে নিই।


স্টেডিক্যামের মূল কারিগরি ক্যামেরায় নয়, বরং তার স্ট্যান্ডে। ধরা যাক, আপনি সিনেমার প্রধান চরিত্র যে নায়ক তার পেছন পেছন ছুটছেন - এ রুম থেকে সে রুম, এ গলি থেকে সে গলি। দুভাবে টেক করা সম্ভব এই দৃশ্যটা। ইন্টাকাটের মাধ্যমে অর্থ্যাৎ রুমের বাইরে থেকে ঢোকার মুহূর্তে কাট এবং পরবর্তীতে রুমের ভেতর থেকে টেক। দ্বিতীয় পদ্ধতি - সরাসরি ক্যামেরা নিয়ে চরিত্রের পেছন পেছন গমন। যদি ট্রলি/ডলি করার সুযোগ না থাকে সেক্ষেত্রে হ্যান্ডহেল্ড শটই ভরসা এবং প্যানেলে নেয়ার পরে বোঝা যাবে ক্যামেরা কি পরিমান কেপেছে - হয়তো প্রধান চরিত্র কিছুসময় পরপরই ফ্রেমআউট হয়ে যাবে। হাটা-চলার ক্ষেত্রে নাহয় এটা নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব, কিন্তু চরিত্র যদি দৌড়াতে থাকে তবে? অনেকটা এ ধরনের সমস্যা থেকেই মুক্তির জন্য স্টেডিক্যাম শট নেয়া হয় - আপনি ক্যামেরা হাতে নিয়ে দৌড়াবেন কিন্তু ঝাকুনি হবে না, যা হবে সেটা নিয়ন্ত্রন করে নেবে ক্যামেরা নিজেই।  চলুন গুডফেলাস সিনেমা থেকে একটি স্টেডিক্যাম শট দেখে নিই - বুঝতে সুবিধা হবে।



গ্যারেট ব্রাউন নামে একজন সিনেমাটোগ্রাফার ১৯৭৬ সালে প্রথম স্টেডিক্যাম উদ্ভাবন করেন যার নাম শুরুতে 'ব্রাউন স্ট্যাবিলাইজার' ছিল। ক্যামেরাকে স্ট্যাবিলাইজ করার জন্যই স্ট্যাবিলাইজার। তিনি দশ মিনিটের একটি ডেমো রিল প্রস্তুত করেন এবং বিভিন্ন পরিচালকদের দেখান, এই তালিকায় স্ট্যানলি কুব্রিক ছিলেন। রকি (১৯৭৬), ম্যারাথন ম্যান (১৯৭৬) সিনেমায় স্টেডিক্যাম বেশ সার্থকভাবে তুলে ধরা হয়, মজার ব্যাপার হলো, স্টেডিক্যামের প্রসারের ব্যাপারে বেশ আগ্রহী স্ট্যানলি কুব্রিক ১৯৮০ সালে এসে তার দ্য শাইনিং সিনেমায় স্টেডিক্যাম শট নেন। ক্যামেরায় ছিলেন উদ্ভাবক গ্যারেট ব্রাউন। ইউটিউবের লিংকটা এমবেড করা যাচ্ছে না, সুতরাং নিচের লিংকে ক্লিক করে দেখে নিন।

http://youtu.be/cy7ztJ3NUMI

স্টেডিক্যামের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো জানার জন্য উইকিসহ আরও কিছু ওয়েব দেখা যেতে পারে। স্টেডিক্যাম করা বেশ ঝুকিপূর্ন, কারন এই সময়টায় ক্যামেরাম্যান প্রায় ২০ কেজি বহন করেন যার পুরো প্রেশার তার মেরুদন্ডের উপর পরে। যারা নিয়মিত স্টেডিক্যাম করেন তারা দৈনিক চারঘন্টার বেশী কাজ করেন না, নিয়মিত মেডিটেশন করেন এবং সাধারণত চল্লিশ বছর বয়সের পর থেকে মেরুদন্ডের ব্যাথায় ভুগতে শুরু করেন। এ সমস্ত কারণে স্টেডিক্যামের চার্জ তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশী। এসকল তথ্য বাংলাদেশি সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামান থেকে শোনা - কোন রেফারেন্স দিতে পারছি না।

বাংলাদেশে যতটুকু জানি স্টেডিক্যাম রয়েছে দুটো - এর একটা রয়েছে ডিএফপি-তে। অবশ্য এটা কোনদিন ব্যবহার হয়নি বলেই শুনেছি, প্রধাণ কারন এর ব্যবহারবিধি সম্পর্কে না জানা। দ্বিতীয় স্টেডিক্যামটি রয়েছে সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামানের ব্যক্তিগত মালিকানাধীনে। একটা ওয়ার্কশপে তার স্টেডিক্যামকরা কিছু দৃশ্য দেখেছিলাম। বাংলাদেশী সিনেমায় স্টেডিক্যাম করা হয়েছে এমন কোন তথ্য আমার কাছে নেই, তবে নুরুল আলম আতিকের ডিজিটাল ফিল্ম 'ডুবসাতার' এর শেষের দিকে সি বিচের দৃশ্যটি স্টেডিক্যামে নেয়া - নিয়েছেন রাশেদ জামান।

দেখে নিন খুব পপুলার কিছু স্টেডিক্যাম শটের তালিকা।

বাংলাদেশে কেন স্টেডিক্যাম শট নেয়া হয় না সে ব্যাপারে প্রশ্ন জাগতে পারে। সম্ভবত প্রধান কারণ বাজেট স্বল্পতা। দ্বিতীয় যে কারন তা হলো পরিচালক এবং সিনেমাটোগ্রাফারদের অজ্ঞতা। স্টেডিক্যাম আবিস্কারের আগেই এমন কিছু বিখ্যাত শট রয়েছে যা দেখে স্টেডিক্যাম বলেই মনে হয়, মূলত এগুলো ট্র্যাকিং শট। চলুন এমন একটি শট দেখে নিই আই অ্যাম কিউবা সিনেমা থেকে।


সম্ভবত এখানে বেশ ক'জন ক্যামেরাম্যান কাজ করেছেন। ক্যামেরাটিকে বসানো হয়েছে একটি বোর্ডের উপর তারপর সেই বোর্ডটি হাত থেকে হাতে ঘুরে বেরিয়েছে, শেষদিকে কোন ক্রেনে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের বেস্ট কিছু ট্র্যাকিং শট দেখতে এখানে ঘুরে আসুন

খরচ এড়ানোর জন্য স্টেডিক্যাম নিয়ে গবেষনা করছেন অনেকেই সারা বিশ্বে। ইউটিউব আর ওয়েব ঘাটলে কিভাবে চলনসই একটি স্টেডিক্যাম বানানো যায় সে বিষয়ে টিউটোরিয়াল পাওয়া যায়। বুয়েটের কিছু ছেলে এরকম একটা এক্সপেরিমেন্ট করছে তার একটা নমুনা পেয়েছিলাম ফেসবুকে, দেখে নিতে পারেন এখান থেকে

একটি দেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি অল্প যে কটা বিষয়ের উপর নির্ভর করে দাড়াতে পারে, টেকনলজি তার অন্যতম। বুয়েটের এই ছেলেদের প্রচেষ্টাকে আমি স্বাগত জানাই, এরাই তো ইন্ডাস্ট্রির চাকা উন্নতির দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারবে, তাই না?

কৃতজ্ঞতা: সিনেমাটোগ্রাফার রাশেদ জামান