A Separation : ভালোবাসা আর ত্যাগের দ্বান্দিক যুদ্ধ

কল্পনা করুন, আপনি একজন বিবাহিত পুরুষ। দীর্ঘ ১৪ বছরের সংসার আপনার। সংসারে রয়েছে আপনার স্ত্রী, পবিত্র ও নিষ্পাপ একটি কন্যা আর দূরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত আপনার বৃদ্ধ বাবা। অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও, সংসারে প্রেম ভালোবাসার কমতি নেই। কিন্তু আপনার স্ত্রী এই সংসারে থাকতে রাজি নই। একমাত্র মেয়ের সুন্দর ভবিষ্যতের চিন্তায় বিভোর আপনার স্ত্রী চায়, স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমাতে। আপনার স্ত্রী তার সিদ্ধান্তে অটল। কিন্তু আপনি বৃদ্ধ বাবাকে রেখে এক মুহূর্তের জন্যও বিদেশে যেতে প্রস্তুত নন। ফলে আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটি আপনাকে ডিভোর্স দেবার সিদ্ধান্ত নিল। একবার ভেবে বলুনতো, কি করবেন আপনি? একদিকে আপনা্‌র, যার সাথে জীবনের একান্ত মুহূর্তগুলো কাটিয়াছেন, সেই প্রিয়তমা স্ত্রী আর একমাত্র মেয়েটির উজ্জ্বল ভবিষ্যত অন্যদিকে আপনার বৃদ্ধ বাবা। কোনটিকে বেছে নিবেন আপনি? বৃদ্ধ বাবাকে নাকি স্ত্রী-সন্তানকে?  উত্তর যাই হোক, সন্দেহ নেই, এটি যে কোন মানুষের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা।

উপরের গল্পটির যদি একটি নির্মম পরিসমাপ্তি দেখতে চান, তবে আপনাকে অবশ্যই দেখতে হবে ইরানি পরিচালক আসগার ফারহাদি’র সর্বশেষ চলচ্চিত্র “Nader and Simin, A Separation” । ইরানি পরিচালক বলতে এতদিন শুধু মাজিদ মাজিদি, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, জাফর পানাহি, মহসেন মকমলবাফ ইত্যাদি কয়েকজনকেই বুঝতাম। কিন্তু এই ছবিটি দেখার পরে সেরা পরিচালকদের তালিকায় আর একজন কে স্থান দিতে হল। গল্প নির্বাচন আর নির্মাণ, কোনটিতেই আসগার ফারহাদি অন্যদের চেয়ে কম নন।

সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয়েছে তেহরানে বসবাসরত একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে নিয়ে। Nader (Peyman Moaadi) এবং Simin (Leila Hatami ) এর ১৪ বছরের সংসার। এগার বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে Termeh। Nader এবং Simin এর সংসার প্রায় ভাংগনের মুখোমুখি। কেননা Simin তার স্বামী আর মেয়েকে নিয়ে ইউরোপে চলে যেতে চায়, একমাত্র মেয়েটির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু Nader এর বৃদ্ধ বাবা Alzheimer নামে এক কঠিন রোগে আক্রান্ত। সে কিছুতেই দেশ ছাড়তে রাজি নয়। বাধ্য হয়ে Simin পারিবারিক আদালতে ডিভোর্স এর জন্য গেল। কিন্তু উপযুক্ত কারণ না পেয়ে আদালত তা বাতিল করে। তারপর Simin সংসার ফেলে চলে গেল তার মায়ের কাছে।

Nader তার বাবাকে দেখাশোনার জন্য Razieh নামে এক অন্তসত্ত্বা নারীকে পরিচারিকা হিসেবে রাখল। তারপর ঘটনা মোড় নিল আর এক দিকে। মিথ্যা অর্থ চুরির দায়ে Razieh কে অপমান করে তাড়িয়ে দিল Nader। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে সিড়িতে পরে পেটের বাচ্চাটি নষ্ট হয়ে গেল Razieh’র। আদালতে মামলা করল Razieh। অভিযোগ প্রমাণিত হলে নিশ্চিত এক থেকে তিন বছরের কারাদন্ড। বাবাকে বাচাতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিল Termeh। যাই হোক এক পর্যায়ে নাটকীয়ভাবে মামলা থেকে মুক্তি পেল Nader।

গত মার্চ মাসে মুক্তি পাওয়ার পর চলচ্চিত্রটি রীতিমত ঝড় তুলেছে। বার্লিন ইন্ট্যা. ফিল্ম ফেস্টে এটা শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার হাতিয়ে নিয়েছে। ডারবান, সিডনী, ইয়েরেভেন, মেলবোর্ন ফিল্ম ফেস্টটিভাল সহ প্রায় ২১ টি আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টে এটি পুরস্কার জিতেছে। শুধু তাই নয়, IMDB’র টপ ২০০ চলচ্চিত্রে নিজেকে স্থান করে নিয়েছে। তাছাড়া আগামী বছর অস্কার এর জন্য এটি ইরানের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগটিও ইতোমধ্যে পেয়ে গেছে।

চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় ও সিনেমাটোগ্রাফি এক কথায় অসাধারণ। চলচ্চিত্রটির অধিকাংশই Handheld শট। এডিটিং কত সুন্দর হতে পারে, না দেখলে বোঝার উপায় নেই। এটি সিনেমাকে এক অদ্ভূত গতি এনে দিয়েছে। প্রায় দুই ঘন্টার সিনেমাটিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চোখের পলক পরবে না।

পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা যদি দেখতে চান, তবে সিনামাটি দেখুন। সন্তানের প্রতি পিতার ভালোবাসা যদি দেখতে চান, তবে সিনেমাটি দেখুন। ধর্মের প্রতি ভালোবাসা যদি দেখতে চান, তবে  সিনামাটি দেখুন। সততা আর ত্যাগের উদাহরণ যদি দেখতে চান, তবে সিনামাটি দেখুন।

তবে শেষ কথা, সিনামাটি যেমনি হোক, শেষ দৃশ্যে আপনার চোখের দু’ফোটা পানি পড়তে বাধ্য। কেন বলছি? তা আজ আর বলব না। নিজে দেখে নিবেন।

আমার স্মৃতিতে এখনো, নিষ্পাপ মেয়েটির চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রুগুলো ভাসছে।

About শোয়াইব সৈনিক

আমি শোয়াইব সৈনিক।

View all posts by শোয়াইব সৈনিক →

17 Comments on “A Separation : ভালোবাসা আর ত্যাগের দ্বান্দিক যুদ্ধ”

  1. কাইয়ূম ভাই, আপনাকে ধন্যবাদ। আশা করি সিনেমাটি ভাল লাগবে।

  2. দারুণ শুরু শোয়াইব।

    ক্রমাগত লিখতে থাক, তবে তুমি নিজের স্টাইল খুঁজে পেয়ে যাবে।

  3. পরিচালক সম্পূর্ন নতুন আমার কাছে, সিনেমাটার নাম শুনেছি, কিন্তু দেখা হয় নি। এই পরিচালক সম্পর্কে কিছু জানালে ভালো হতো রিভিউটা।
    কিপিটাপ 🙂

  4. পরিচালক এর আরেকটি ম্যূভি আছে, About Elly (2009), দেখতে পারেন।

  5. দেখার ইচ্ছা আছে। কিন্তু এই মুহূর্তে netflix এ dvd বা streaming কোনোটাতেই movie টা নেই। আপনার কাছে কোনো link আছে?

  6. চমৎকার রিভিউ।
    আচ্ছা বলেন তো ঢাকা শহরে কোথায় ইরানি মুভির ডিস্ক পাওয়া যায়।

    আসলে বিখ্যাত না হয়ে উঠলে অন্যদের দিকে আমরা মনোযোগ দিই না।
    রসুল সাদ আমেলি’র কয়েকটা মুভি দেখেছিলাম। ভালো লেগেছিল।

    1. হক কথা বলেছেন ভাইজান।
      কিন্তু নির্দিষ্ট কোন জায়গার কথা বলতে পারছি না। আজিজ কিংবা রাইফেলস স্কোয়ার এর নাম করা যায়, তবে সেখানেও বিখ্যাত সিনেমা ছাড়া পাওয়ার সুযোগ কম। তবে, চলচ্চিত্র সংসদগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেন, তাদের কাছে অরিজিনাল ডিভিডি আসে প্রায়ই। অথবা বাহির থেকে কিনে আনে। ফাও দেখার সুযোগ আছে সেখানে 🙂

  7. এর আগেও ইরানী মুভি দেখেছি। তাদের প্রায় মুভিতে আমার দু-ফোটা অশ্রু থাকে। এক কথায় আমার আবেগকে নাড়া দিয়ে যায়। আপনার লেখার হাত অনেক ভালো। সুন্দর করে গুছিয়ে লিখতে পারেন। অনেক ভালো লাগলো। অবশ্যি দেখব।

    আর, চট্টগ্রাম আসলে ফেইসবুকে ম্যাসেজ দিবেন। আপনার সাথে একটু দেখা করতে হবে। ভালো থাকবেন।

  8. আপনার মন্তব্য নিঃসন্দেহে যে কাউকে লেখার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করবে। চট্টগ্রামে খুব কম যাওয়া হয়। তবে গেলে দেখা করার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

  9. the most important sequence of that film was the ending of that film…how it ends? and that is missing in this review…
    is there any actual ending of this film …did the director try to finish the film ? or he just left this to the audience… ?

    before finishing this review u said the causes of watching this film…and thats make me so interested…its hilarious… to see the love affection between man and religion and children and parents…? i think u just missed the principle motive of this film…. my friend 🙂

    1. shonkhogrib আপনার মন্তব্য পড়ে ভাল লাগলো।
      আমি আপনার প্রথম মন্তব্যের সাথে পুরোপুরি একমত। হ্যা, সেই অর্থে সিনেমাটিতে শেষ বলে কিছু ছিল না। মেয়েটি কি সিদ্ধান্ত নেই, সেটি পরিচালক সরাসরি না দেখিয়ে দর্শকের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। আসলে আমার লেখা “শেষ” শব্দটি দ্বারা আমি “সিনেমার শেষ” বুঝাতে চাই নি। “তবে শেষ কথা, সিনামাটি যেমনি হোক, শেষ দৃশ্যে আপনার চোখের দু’ফোটা পানি পড়তে বাধ্য”- বাক্যটি দ্বারা আমি সরাসরি সিনেমাটির শেষ দৃশ্যের উপর গুরুত্ব দেবার চেষ্টা করেছি। কেননা বাবা-মা’র ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে, আর সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে একমাত্র মেয়েটির চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে দৃশ্যটি আসলেই হৃদয় বিদারক এবং অনেক কঠিন। আমি আসলে এটির উপর গুরুত্ব দেবার চেষ্টা করেছি। সিনেমাটির গল্পের শেষ বুঝাতে চায়নি।

      সত্যি কথা বলতে এই সিনেমাটি দ্বারা পরিচালক আসলে ইরানি সমাজ ব্যবস্থাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি হয়ত বুঝাতে চেয়েছেন এখান থেকে সবাই বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে আমার একটি বক্তব্য হলো যে, আমি পরিচালকের সব কথার সাথে পুরোপুরি একমত নাও হতে পারি। কেননা আমি তার সব কথা মানতে রাজি নয় বা বাধ্য নয়। সুতরাং আমি যেটা মানি না বা বিশ্বাস করি না সেটা আমি আমার লেখাতে তুলে ধরে আরেক জনকে বিশ্বাস করাতে চায় না। তাই আমি এটা নিয়ে কোন কথা বলিনি। তবে আমি যা বলেছি বা বলার চেষ্টা করেছি আমার মতে সেগুলোও হয়ত সঠিক।
      আপনাকে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক মন্তব্য