[caption id="" align="alignleft" width="245"] সালমান শাহ (১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭০ - ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬)[/caption]

রাজনৈতিক সম্পাদিত-প্রকাশিত: http://goo.gl/uneSd

আজ সালমান শাহের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ‘এলাম-দেখলাম-জয় করলাম’- এর সবচে ভালো উদাহরন বোধহয় সালমান শাহ। ২৮ টি চলচ্চিত্রে সাড়ে তিন বছরের অভিনয় জীবন তার।

১৯৯৩ সালের ২৫শে মার্চ তারিখে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দিয়ে শুরু করে ১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বরের ‘বুকের ভেতর আগুন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে শেষ করা ক্যারিয়ারে মোট সিনেমার সংখ্যা ২৮টি। সময় সাড়ে চার বছর। চলচ্চিত্র মুক্তি পাবার সময় হিসাব করলে চার বছর হলেও ক্যারিয়ার জীবন সাড়ে তিন বছর, কারণ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তারিখে সালমান শাহ দেহ রাখেন। ১৯৯৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রায় সব চলচ্চিত্রের কাজই অসমাপ্ত ছিল তার, নতুন নায়ক দিয়ে, গল্পে সামান্য পরিবর্তন করে পরিচালকরা তার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করেন এবং মুক্তি দেন।

সালমান শাহ অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর মুক্তির সময়
কেয়ামত থেকে কেয়ামত (১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ), তুমি আমার ছবিটি (১৯৯৪ সালের ২২ মে), অন্তরে অন্তরে (১৯৯৪ সালের ১০ জুন), সুজন সখী (১৯৯৪ সালের ১২ আগস্ট), বিক্ষোভ (১৯৯৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর), স্নেহ (১৯৯৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর), প্রেমযুদ্ধ (১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর), কন্যাদান (১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ), দেনমোহর (১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ), স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৫ সালের ১১ মে), আঞ্জুমান (১৯৯৫ সালের ১৮ আগস্ট), মহামিলন (১৯৯৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর), আশা ভালোবাসা (১৯৯৫ সালের ১ ডিসেম্বর), বিচার (১৯৯৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি), এই ঘর এই সংসার (১৯৯৬ সালের ৫ এপ্রিল), প্রিয়জন (১৯৯৬ সালের ১৪ জুন), তোমাকে চাই (১৯৯৬ সালের ২১ জুন), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬ সালের ১২ জুলাই), জীবন সংসার (১৯৯৬ সালের ১৮ অক্টোবর), মায়ের অধিকার (১৯৯৬ সালের ৬ ডিসেম্বর), চাওয়া থেকে পাওয়া (১৯৯৬ সালের ২০ ডিসেম্বর), প্রেম পিয়াসী (১৯৯৭ সালের ১৮ এপ্রিল), স্বপ্নের নায়ক (১৯৯৭ সালের ৪ জুলাই), শুধু তুমি (১৯৯৭ সালের ১৮ জুলাই), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭ সালের ১ আগস্ট) ও বুকের ভেতর আগুন (১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর)।


সালমান শাহ’র প্রথম সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চরম ব্যবসা সফল একটি সিনেমা। হিন্দী ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক’ এর অনুকরণে বাংলা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এর পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান একটি বিশাল জুয়া খেলেছিলেন নি:সন্দেহে। ভিসিপি/ভিসিআর এর কল্যানে আমির খান ও জুহি চাওলা তখন বেশ পরিচিত মুখ – বিশেষত: মধ্যবিত্ত দর্শকশ্রেনীর কাছে। বলিউডে প্রচুর কাটতির চলচ্চিত্র ‘ক্যায়ামত সে ক্যায়ামত তক’ দেশীয় দর্শকদের কাছে অপরিচিত ছিল না, অন্তত: পত্রিকার বিনোদন পাতার কল্যানে। পুরো নতুন নায়ক নায়িকা সালমান শাহ এবং মৌসুমীকে জুটি করে এ ধরনের একটি প্রচুর দর্শকপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রের বাংলা সংস্করণ তৈরী করেছিলেন সোহান।

[caption id="" align="aligncenter" width="391"] পুরো নতুন নায়ক নায়িকা সালমান শাহ এবং মৌসুমীকে জুটি করে এ ধরনের একটি প্রচুর দর্শকপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্রের বাংলা সংস্করণ তৈরী করেছিলেন সোহান[/caption]

সালমান শাহ এবং মৌসুমীর জন্যও কাজটা খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল, আমির খানের ভাবমূর্তি ছাড়িয়ে সালমান শাহ’কে প্রতিষ্ঠিত করা খুব সহজসাধ্য ছিল না। প্রতিভাবান অভিনেতা সালমান শাহ সাফল্যের সাথে এই কাজটি করতে পেরেছিলেন, আমির খানকে অনুকরণ নয়, সালমান শাহ’র স্বকীয়তাই মূর্ত হয়ে উঠে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রে।

চলচ্চিত্র জীবনে সালমানের অভিনীত মোট সিনেমা ২৮টি, যার ২০টিই ব্যবসা সফল সিনেমা। বড় পর্দার পাশাপাশি ছোটপর্দায় কিছু কিছু কাজ করেছিলেন সালমান, করেছেন মডেলিং। সালমান শাহ স্টাইলে কপালে রুমাল বাধা, সানগ্লাস, নিদেনপক্ষে একটা ভিউকার্ড – হার্টথ্রব বলতে যা বোঝায় সালমান শাহ অল্প কদিনে ঠিক তাই হয়ে উঠেছিলেন। এ প্রজন্মের তরুন তরুনীদের হৃদয়ে বাংলাদেশী কোন নায়কের অবস্থান হয়তো নেই, কিন্তু সালমান শাহ’র জন্য একটি কোমল স্থান এখনো পাওয়া যায়। সালমান শাহ পরবর্তী যেসব তরুন চলচ্চিত্র জগতে পা রেখেছেন তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সালমানকেই অনুসরন করেছেন, তার জনপ্রিয়তায় ভাগ বসানোর চেষ্টা করেছেন।

সালমান শাহ পূর্ব এবং পরবর্তী সময়ের চলচ্চিত্রের ক্রান্তিকালের বিপরীতে সালমান শাহ’র ভূমিকা উল্লেখ করেন কেউ কেউ। সালমান শাহ পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র শিল্পে যে ধ্বস নেমেছে, তার সাথে সালমান শাহকে যুক্ত করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। সালমান শাহ চমৎকার অভিনেতা ছিলেন, কিন্তু এক সালমান শাহ পুরো চলচ্চিত্র শিল্পকে কতটা সহায়তা করতে পারতেন?

তার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোতে গল্প বেশ, চিত্রনাট্য মজবুত, সংলাপ প্রাণবন্ত এবং কারিগরি মানও উন্নত; যেমন- দেনমোহর, সুজন সখি, স্বপ্নের ঠিকানা- কিন্তু বাদবাকী কাজগুলোতে কি গড়পরতা ঢাকাই ছবির ঢং এর উপস্থিতি নেই? সালমানের সময়ে বছরে গড়ে ৭০-৭৫ টি চলচ্চিত্র বাজারে আসতো, সালমান পূর্ব সময়েও এর পরিমান তাই ছিল, পরবর্তীতে বরং নব্বই দশকে এই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে ৯০-৯৫ এ পৌঁছে। একজন প্রতিভাবান অভিনেতার প্রস্থানে চলচ্চিত্র সংখ্যা কিম্বা দর্শক কমে নাই। বৈচিত্রপূর্ণ বিষয় ও ধরনের গল্পে যদি উন্নত কারিগরী ব্যবহার করে উপস্থাপন করা যায় তবেই চলচ্চিত্র শিল্প উন্নত হতে পারে, অন্যথায় কোনঠাসা হয়ে পড়তে বাধ্য।
এক নজরে সালমান শাহ

জন্ম : ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭০
বাবা : কমর উদ্দিন চৌধুরী
মা : নীলা চৌধুরী
আসল নাম : শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন
স্ত্রী : সামিরা
প্রথম চলচ্চিত্র : কেয়ামত থেকে কেয়ামত
শেষ ছবি : বুকের ভেতর আগুন
প্রথম নায়িকা : মৌসুমী
সর্বাধিক ছবির নায়িকা : শাবনূর (১৪টি)
মোট ছবি : ২৭টি
বিজ্ঞাপনচিত্র : মিল্ক ভিটা, জাগুরার, কেডস, গোল্ড স্টার টি, কোকাকোলা, ফানটা।
ধারাবাহিক নাটক : পাথর সময়, ইতিকথা
একক নাটক : আকাশ ছোঁয়া, দোয়েল, সব পাখি ঘরে ফেরে, সৈকতে সারস, নয়ন, স্বপ্নের পৃথিবী।
মৃত্যু : ৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬

এখন শাকিব খান নির্ভর হয়ে আছে বাংলা চলচ্চিত্র। শাকিব খান মাত্রই বাজার-পাওয়া চলচ্চিত্র, ব্যবসা সফল। প্রোডিউসাররাও শাকিব খানের শিডিউল পাওয়ার পরেই চিত্রনাট্য তৈরীর কাজ শুরু করেন। সালমান শাহ বেচে থাকলে বর্তমানের শাকিব খানের মতই একচেটিয়া সালমান নির্ভর শিল্প যে হত না- তার কোন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না, বরং তার জীবিতাবস্থায়ই এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২৮ চলচ্চিত্রের পুরা অর্ধেক- ১৪ টিতেই সালমান শাহ’র সাথে নায়িকা শাবনূর, এখন যেমন শাকিব খানের সাথে অপু বিশ্বাস।

এই অবস্থা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য কোনোভাবেই স্বাস্থ্যকর নয়। একটি সফল শিল্পখাত গড়ে তোলার জন্য সালমান শাহ’র মতো প্রতিভাবান সুদর্শন অভিনেতার প্রয়োজন অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু সেই সাথে অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপাদানগুলোর সুসামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নও চাই। বর্তমানের প্রযোজক-পরিচালকরা গতানুগতিক ‘সামাজিক-অ্যাকশন’ সিনেমার গন্ডি থেকে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন ধারার চলচ্চিত্র নির্মান শুরু করলে একাধিক সালমান শাহ গড়ে উঠতে পারে, চলচ্চিত্র শিল্পও একটি নির্দিষ্ট গতিপথ ধরে এগোতে পারে।