ভালো আছি ভালো থেকো, আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো - আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখার কথা বলে রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কি বোঝাতে চেয়েছিলেন সেটা ঠিক না বুঝলেও এটা বুঝি যে কবিতা সবসময় বোঝার মতো নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সোনার তরী কবিতাটি কি ভেবে লিখেছিলেন সেটা তিনিই জানেন অথচ পরীক্ষায় পাস করার জন্য আমাদের মুখস্ত করতে হয়, তিনি এই জীবনের সময় স্বল্পতার কথা তুলে ধরেছেন! আমি ব্যর্থ মানুষ, কবিকেও চিনি না, কবিতাও বুঝি না। আমার এই ব্যর্থতার পাল্লা আরেকটু ভারী হচ্ছে কিম কি দুকের সিনেমা দেখে। কিম কি দুকের সিনেমার সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে স্প্রিং সামার ফল উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং সিনেমার মাধ্যমে। একটা সিনেমা দিয়ে একজন পরিচালককে বোঝা সম্ভব নয় এটা সত্যি, কিন্তু এটা ধারণা করতে পেরেছিলাম যে তিনি একজন গুনী পরিচালক। কারণ মনের ভাব শব্দে প্রকাশ না করে ইমেজের মাধ্যমে প্রকাশ করা নি:সন্দেহে এক মুন্সিয়ানা।



সাউথ কোরিয়ান এই সিনেমা পরিচালক জন্মেছিলেন ডিসেম্বরের ২০ তারিখে, সময়টা ১৯৬০ সাল। শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, হয়তো এ কারণেই তার নির্মিত সিনেমায় কাহিনী আর ঘটনার বিমূর্ত চিত্র ফুটে উঠে বেশ সফলতার সাথে। স্প্রিং সামার .. স্প্রিং সিনেমাটি তার নবম সিনেমা। এই সিনেমার মাধ্যমে সারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কিছু দর্শক সৃষ্টি করলেও তার যাত্রা শুরু হয় ক্রোকোডাইল সিনেমার মাধ্যমে।


১৯৯৬ সালে নির্মিত সিনেমা ক্রোকোডাইল। সিনেমার প্রধান চরিত্র পুরুষটি হান নদীর তীরে বাস করে এবং একদিন আত্মহত্যা থেকে বাচায় এক নারীকে। কিন্তু পরবর্তীতে তাকেই ধর্ষন প্রচ্ষ্টো থেকে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক অস্বাভাবিক সম্পর্ক। উইকি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কাহিনী জানা গেলেও সিনেমাটি দেখার সুযোগ হয়ে উঠেনি এখনো। খুব অল্প বাজেটে নির্মিত এই সিনেমাটি কিম কি দুকের চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করতে সহায়তা করেছিল।


১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ - এই চার বছর প্যারিসে নিজের ছবি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেছিলেন কিম কি দুক। তারপর নিজ দেশে ফিরে শুরু করেন চিত্রনাট্য লেখা এবং ২০০৫ সালে জিতে নেন কোরিয়ান ফিল্ম কাউন্সিল কতৃক আয়োজিত এক প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার। পরের বছর ক্রোকোডাইল সিনেমার মাধ্যমে যে যাত্রা শুরু করেছিলেন তা এখনো অব্যাহত আছে। ২০০৮ সালের 'ড্রিম' সিনেমার মধ্য দিয়ে তার নির্মিত সিনেমার সংখ্যা দাড়িয়েছে ১৫ টি।

স্প্রিং সামার ... স্প্রিং সিনেমার মাধ্যমে কিম কি দুক বিশ্ব ব্যাপী পরিচিতি লাভ করলেও এটা কিন্তু তার আলোচিত সিনেমার প্রথমটি নয়। ২০০০ সালে কিম নির্মান করেন দ্য আইল (The Isle)। ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে এই সিনেমাটি প্রদর্শিত হয়েছিল। কিম কি দুকের সিনেমা স্টাইল সবার দৃষ্টি আকর্ষন করলেও এই সিনেমাটি তাকে কুখ্যাত করতেও বেশ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ কিছু অসহ্য এবং আপত্তিকর দৃশ্যের কারণে কিছু কিছু দর্শক থিয়েটার হল থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিছু দর্শক বমি করে ভাসিয়েছিলেন। হত্যার আসামী এক ব্যক্তি আশ্রয় গ্রহন করেন একটি ফিশিং রিসোর্টে যার মালিক হলো একটি মেয়ে। নির্বাক চরিত্রের এই মেয়েটি বেশ জেদী, নিজের চাওয়া পূরনে তার সামনে কোন বাধাই বাধা নয়। পলাতক আসামীকে ভালোবেসে ফেলে মেয়েটি আর তাই তাকে দু'বার বাচায় আত্মহত্যা থেকে, পুলিশের কাছ থেকে বাচায় আরও দুবার। আবার এই মেয়েটিই ভালোবাসার কারণে হত্যা করে একটি বেশ্যা মেয়েকে, হত্যা করে তার দালালটিকেও। কিন্তু পলাতক আসামী যখন তার কাছ থেকেই পালাতে চায় তখন বেশ অদ্ভুত এক উপায়ে তাকে ফিরে আসতে বাধ্য করে মেয়েটি। তারপর তাদের দুজনের মধ্যে যে সম্পর্কটি গড়ে উঠে তা খুব স্বাভাবিকই বটে। দ্য আইল সিনেমার কাহিনী এরকম সাধারণ হলেও পরিচালনার গুনে তা হয়ে উঠেছে বেশ আকর্ষনীয়।

দ্য আইল সিনেমার একটি অন্যতম অসাধারণ দৃশ্য


২০০০ সালেই কিম কি দুক নির্মান করেন আরেকটি সিনেমা, নাম 'রিয়েল ফিকশন'। সিনেমা হিসেবে খুব আলোচিত না হলেও এর নির্মান পদ্ধতির জন্য এটি আলোচিত। উইকি বলে এই সিনেমাটি রিয়েল টাইমে নির্মিত, কোন রিটেক নেয়া হয় নি এবং ইচ্ছে করেও লো কোয়ালিটির অনেক ভিডিও এখানে ব্যবহার করেছেন কিম।


পরের বছরই ২০০১ সালে 'ব্যাড গাই' নামে একটা সিনেমা পরিচালনা করে কিম নিজেকে বেশ পরিচিত করে তোলেন এবং বক্স অফিসে কিছুটা হলেও সফলতা লাভ করেন। এই সিনেমার কাহিনী গড়ে উঠেছে জোর করে একটি মেয়েকে পতিতাবৃত্তি গ্রহণ করানোকে কেন্দ্র করে। গ্যাঙস্টার, বেশ্যাবৃত্তিকে বেশ খোলাখুলিভাবে উপস্থাপন করার কারণে কিমের এই ছবিটি বেশ সমালোচিতও বটে। কিমের বক্তব্য, তিনি এই সিনেমার মাধ্যমে একটি প্রশ্নের উত্তর খুজতে চেয়েছেন, যেখানে সব মানুষ জন্মের সময় সমতা নিয়ে আসে তারা কেন পরবর্তীতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এই যে সামাজিক শ্রেনীবিন্যাস কি মুছে দেয়ার মতো নয়? (উইকি)


২০০৩ সালে কিম নির্মান করেন তার স্প্রিং সামার ফল উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং সিনেমাটি। সিনেমার কাহিনী একজন বৌদ্ধ ধর্মাবলাম্বী মন্কের। কিভাবে সময়ের আবর্তনের বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে তার জীবন প্রবাহিত হয় সে গল্পই দেখা যায় এই সিনেমায়। শৈশব, যৌবন, বার্ধক্যে নানা ঘটনা তাকে বুঝতে শেখায়, জীবন একটা চক্র, নির্দিষ্ট সময় পর পর আবর্তিত হয়। মানুষের জীবনের দৃ:খ, আনন্দ, বেদনা ইত্যাদি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন কিম। এই সিনেমায় কিম অনেক পরিবর্তিত বিশেষ করে তার পূর্বের কাজগুলোর তুলনায়। কিমের এই সিনেমাটা সিনেমা বোদ্ধা থেকে শুরু করে সকল স্তরের দর্শকের কাছে বেশ প্রিয়।


২০০৪ সাল কিম কি দুকের জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ন সময় বলা যেতে পারে। এই বছর কিম দুটো সিনেমা নির্মান করেন - একটি সামারিটান গার্ল, অন্যটি থ্রি আয়রন। ১৯৯৬, ২০০০ এবং ২০০১ সালেও দুটো করে সিনেমা নির্মান করলেও এ বছরই দুটো সিনেমার জন্যই পুরস্কার অর্জন করেন। সামারিটান গার্লের কাহিনী দুটো টিনএজ মেয়েকে ঘিরে। তারা দুজনে পরিকল্পনা করে ইউরোপে বেড়াতে যাবার, কিন্তু এক বান্ধবী জি-ইয়ং তার টাকা জমানোর জন্য নিজেকে বেশ্যাবৃত্তিতে জড়ায়, আর তার বান্ধবী ইয়ো-জিন তার দালাল হিসেবে কাজ করে। কোন একদিন পুলিশের হাত থেকে বাচার উদ্দেশ্যে জি-ইয়ং আত্মহত্যা করে, আর তার জমানো টাকা ফেরত দেয়ার জন্য নিজেকে বেশ্যাবৃত্তিতে জড়ায়। নিষ্পাপমুখী এই মেয়েটির বাবা একদিন জেনে ফেলে তার কর্মকান্ডের কথা, তার অগোচরে পিছু নেয়। কিন্তু অন্তর্বেদনা তাকে ধীরে ধীরে হিংস্র করে তোলে, বিশেষ করে টিনএজ মেয়ের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করায় দু একটা খুন ও সে করতে পিছপা হয় না। কিম কি দুকের এই সিনেমাটি তার অন্যান্য সিনেমা থেকে বেশ আলাদা। সত্যি কথা বলতে কি, এই সিনেমায় কিম কি দুকের সেই চির পরিচিত স্টাইল খুজে পাওয়া একটু কষ্টকর। সিনেমার কাহিনী এবং বর্ননা ভঙ্গী সিনেমাটিকে সার্থক করে তুলতে সাহায্য করেছে।


একই বছর কিমের আরেকটি সিনেমা থ্রি আয়রন মুক্তি পায়। বোধহয় এ যাবত মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে এটাই সবচে' বেশী কাব্যিক এবং বিমূর্ত। যদিও সিনেমার কাহিনীর শুরুটা বেশ আকর্ষনীয়, শেষ দিকে সিনেমার ব্যাখ্যা করতেই দর্শক বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়বেন নি:সন্দেহে। মোটরবাইকের আরোহী এক ছেলে সারা দিন ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বাড়ির দরজায় টেকআউট মেনু লাগায়, আর রাতের বেলা সেই সব বাড়ির মধ্য থেকে খালি একটি বাড়ি বেছে নিয়ে চুরি করে ঢোকে, নিজের ঘরের মতো করে থাকে। আবার রাড়ির মালিক ফিরে আসার পূর্বেই রাস্তায় নেমে পড়ে। এমনই এক ঘটনায় তার সাথে জড়িয়ে পড়ে সান হুয়ার সাথে যে কিনা একসময় বিভিন্ন ন্যুড ফটোগ্রাফির মডেল ছিল। স্বামীর সাথে তিক্ত সম্পর্ক আর মোটরবাইকের আরোহীর ত্রানকর্তার রূপে সে তার সাথেই ঘর ছাড়ে। কিন্তু স্বামী আবার ফিরে পায়। জেলে বন্দী হয় বাইক আরোহী। তারপরই সিনেমার কাব্যিক রূপ চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়।

থ্রি আয়রনের পরে কিম আরও চারটি সিনেমা নির্মান করেছেন, প্রত্যেক বছরে একটা করে। ২০০৮ এর পর থেকে তার সিনেমা নির্মান এখন পর্যন্ত বন্ধ আছে। তার সবকটি সিনেমার চিত্রনাট্যকারও তিনি। স্প্রিং সামার থেকে শুরু করে বাকীগুলোর সম্পাদনা করেছেন তিনি, অতঁর বলতে যা বোঝায় কিম এখন তাই। কিমের চারটি সিনেমা দেখার পর তার ডিরেক্টোরিয়াল স্টাইল সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। কিমের সিনেমার চরিত্ররা কথা কম বলে। এই 'কম' এর মাত্রা এতটাই তীব্র যে পুরো সিনেমায় তাদের ডায়লগ থাকে না বললেই চলে, সেক্স নিয়ে কিমের কোন আদিখ্যেতা নেই, কিমের সিনেমায় হিংস্রতার একটা প্রকাশ থাকেই। দ্য আইল সিনেমায় মেয়েটির কোন ডায়লগ নেই, একটি তীব্র চিতকার ছাড়া। থ্রি আয়রন সিনেমায় মোটরবাইকের আরোহীর কোন ডায়লগ নেই, নায়িকা মেয়েটিরও ছিল না, কিন্তু শেষে দু একটি ডায়লগ পাওয়া যায়। স্প্রিং সামারে ও একই অবস্থা। সেই দিক থেকে সামারিটান গার্লে সংলাপ রয়েছে বেশ। অবশ্য লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে তার সিনেমার ঠিক সেই মানুষগুলোই চুপচাপ যাদের রয়েছে কোন না কোন অপরাধবোধ। কিমের ভাষায়, মানুষের প্রতি তাদের বিশ্বাষ ভঙ্গ হয়েছে, তাই তারা নিরব। তাদের নিরবতা এক প্রকার ভাষাই, সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ। এমনকি তাদের হিংস্রতা তাদের এই গোপন কষ্ট আর বেদনারই একটা বহি:প্রকাশ।


এটাও দ্য আইল সিনেমা থেকে নেয়া
সিনেমায় কিম বেশ হিংস্র, বিশেষ করে জীবিত কীট পতঙ্গ, প্রানীর বেলায় - তার প্রায় সিনেমায় এটা দেখা যায়। মানুষের ক্ষেত্রেও এটা দেখা যায়। দি আইল মুভিতে মানুষকে শাস্তি দেয়ার রূপ অসহ্য।

সব মিলিয়ে কিমের সিনেমা কিরকম? আত্মজীবনী? কিম বলেন, অনেকটাই। নিজের জীবনের বেশ কিছু প্রশ্নের সমাধান তিনি খুজে নিচ্ছেন তার পরিচালনার মুণ্সিয়ানা দিয়ে। কতটা কাব্যিক তার সিনেমা? কিম বলেন, সেমি অ্যাবস্ট্রাক্ট। আসলেই সেমি অ্যবস্ট্রাক্ট। বাস্তবতার বাহিরে আরও অতিরিক্ত কিছু, সেখানে কিমের কল্পনা, আমাদের স্বপ্ন - সব কিছুর সংমিশ্রন।