ধর্ম আর বিজ্ঞানের সম্পর্ক সম্ভবত সবসময়ই সাংঘর্ষিক। যারা বিজ্ঞানকে বেছে নিয়েছেন তারা ধর্মকে পরিত্যাগ করেছেন, যারা ধর্মকে বেছে নিয়েছেন তারা পরিত্যাগ করেছেন বিজ্ঞানকে। ধর্ম ও বিজ্ঞানের এই দ্বন্দ্বে কে টিকে থাকবে তা নির্ভর করেছে ক্ষমতা কাদের হাতে তার উপর। একসময় ধর্ম পালনকারী অংশের কাছে ছিল এই ক্ষমতা, তারা অপব্যবহার করেছে তাদের ক্ষমতার, অন্যায় ভাবে দমন করেছে বিজ্ঞানচর্চাকারীদের। আবার বর্তমানে বিজ্ঞানচর্চাকারীদের হাতে ক্ষমতা আর তাই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বর্তমানেও। ধর্ম আর বিজ্ঞানের এই চিরন্তন দ্বন্দ্বের চিত্র ফুটে উঠেছে 'আগোরা' সিনেমায়। আগোরা একটি গ্রীক শব্দ, বোঝায় এমন কোন জায়গা যেখানে লোকজন একত্রিত হয়। হাজার বছর পূর্বে গ্রীক সম্রাজ্যে সম্রাটের আদেশ ও অন্যান্য নির্দেশাবলীশোনার জন্য যেখানে জড়ো হতো লোকজন সেটিই আগোরা। স্বাভাবিকভাবেই এ এলাকাগুলোতে দোকানপাট গড়ে উঠে এবং তৈরী হয় বাজার। গ্রীক আগোরা শব্দ দ্বারা যা বোঝানো হয় তাই বোঝাতে ল্যাটিনে ব্যবহার হয় 'ফোরাম' শব্দটি।


আগোরা শব্দের মতোই আগোরা সিনেমার কাহিনী হাজার বছর পূর্বের। সময়টা চতুর্থ শতাব্দী। ঘটনাস্থল স্পেনের আলেকজান্দ্রিয়া। বিখ্যাত হয়ে আছে এর বাতিঘরের জন্য যা প্রাচীনকালের সপ্তাশ্চর্যের একটি। আরও রয়েছে এর লাইব্রেরী যেখানে পূর্বের প্রায় সকল জ্ঞানের সংরক্ষনের ব্যবস্থা রয়েছে। বিশাল এই লাইব্রেরী সম্ভ্রান্ত লোকদের জ্ঞান বিতরন আর গবেষকদের প্রিয় জায়গা। এটি পেগান ধর্মচর্চাকারীদের প্রার্থনার জায়গাও বটে। এমন একটা সময় যখন পেগানরা রাজত্ব করছে, পাশাপাশি রয়েছে ইহুদীরা, আর ক্রমান্বয়ে রেড়ে চলছে নতুন একট ধর্মমত, খ্রীষ্টান ধর্ম।

হাইপেশিয়া, দূরে দেখা যায় আলেক্সান্দ্রিয়ার বাতিঘর


পেগান ধর্ম নিয়ে কিছু বলা দরকার। পেগান ধর্মাবলাম্বীরা বহুঈশ্বরে বিশ্বাসী। মূলত গ্রীক-রোমান ধর্মাবলাম্বীদেরকে ইঙ্গিত করলেও প্রাচীন আমেরিকা, মধ্য এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা সহ সকল প্রাচীন ধর্মই পেগান ধর্মের অন্তর্গত। খ্রীষ্টান ধর্মমতে নবী ইব্রাহিমের অনুসারী নয় এমন সব ধর্মই পেগান কারণ নবী ইব্রাহিম এক খোদার উপাসনা করার আহবান জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ের জন্য বিভিন্ন দেব দেবীর উপাসনা করে পেগান ধর্মাবলাম্বীরা। আর তাই পাখি, সরীসৃপ, সিংহ সহ আরও অনেক কিছুই তাদের উপাসনার বস্তু।


বাধঁভাঙ্গা জোয়ারের মতো করে খ্রীষ্টান ধর্মাবলাম্বীদের সংখ্যা তখন বেড়ে চলছে। আর এ ধর্ম প্রচারের কাজটি তারা করছে পেগানদের বিদ্রুপ করার মাধ্যমে, মাঝে মধ্যে ঘটছে আগুনে জীবন্ত ব্যক্তি নিক্ষেপ করার মতো গুরুতর ঘটনাও। ধর্মপ্রিয় এবং ধর্মান্ধ ব্যক্তিদের যখন এ অবস্থা তখন হাইপেশিয়া ব্যস্ত চাদ, সূর্য, পৃথিবী আর অন্যান্য গ্রহ-তারাদের নিয়ে।
হাইপেশিয়া একজন দার্শনিক, একজন জ্যোতির্বিদ, একজন তরুনী। তার বাবা আলেক্সান্দ্রিয়া মিউজিয়াম এবং লাইব্রেরীর প্রধান, আর হাইপেশিয়ার ছাত্ররা হলো সম্ভ্রান্ত বংশের যুবকরা, হাইপেশিয়া তাদের দর্শন শেখায়, জ্যোতির্বিদ্যা শেখায়। পৃথিবী গোল না চ্যাপ্টা, পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, না সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে - এই সব চিন্তায় হাইপেশিয়া মগ্ন, আর তাই সে বিভেদ করে না তার ছাত্রদের মধ্যে কে পেগান কে খ্রীষ্টান, সে উপেক্ষা করে যায় তার ছাত্র অরিস্টিস এর প্রেমকে, কারণ তার বিশ্বাস, বিয়ে হয়তো তার বিজ্ঞানচর্চাকে বাধাগ্রস্থ করবে।



ছাত্রদের সামনে হাইপেশিয়া, "কেন একটি রুমাল উপর থেকে ছেড়ে দিলে নিচে পড়ে?"


ছাত্ররা যখন বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে আত্মস্থ করতে ব্যর্থ তখন হাইপেশিয়ার দাস ডেভুস, যে গোপনে হাইপেশিয়ার প্রেমাসক্ত এবং ধর্মান্তরিত খ্রীষ্টান, চর্চা করে বিজ্ঞানের, ব্যাখ্যা করে যায় কিভাবে পৃথিবী ঘুরছে তার নিজস্ব অক্ষের উপর, কিভাবে ঘরছে অন্যান্য গ্রহগুলো।

হাইপেশিয়ার কাছ থেকে শোনা তথ্যের উপর ভিত্তি করে ডেভুস কতৃক গোপনে নির্মিত সৌরজগত, দেখছে হাইপেশিয়া


হাইপেশিয়ার সকল যুক্তি আর অনুরোধ উপেক্ষা করে পেগানরা আক্রমন করে খ্রীষ্টানদের, উদ্দেশ্য তাদের ধর্মকে বিদ্রুপ করার প্রতিশোধ গ্রহন কিন্তু ঘটনা পাল্টে যেতে বেশী সময় লাগে না। খ্রীষ্টানরা তাড়া খেয়ে পেগানরা আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় সেরাপিয়াম লাইব্রেরীতে । সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রিফেক্টের আদেশে লাইব্রেরী ছেড়ে দিতে হয় খ্রীষ্টানদের হাতে, হাইপেশিয়া আর তার সঙ্গী সাথীরা চেষ্টা করে যতটুকু সম্ভব লাইব্রেরীর সম্পদ রক্ষা করবার। লাইব্রেরী দখলের পর উন্মত্ত, ধর্মান্ধ খ্রীষ্টানরা আগুলে জ্বালিয়ে দেয় পেগানদের সকল চিহ্ন, জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র লাইব্রেরীকে পরিণত করে গবাদিপশুর খোয়ারে। খ্রীষ্টান ডেভুসকে মুক্ত করে দেয় হাইপেশিয়া, সে পরিণত হয় একজন পারাবোলানী তে। পারাবালানীরা স্বেচ্ছাসেবী, রোগীদের সেবা করে, খাওয়ায়, মৃতদের সৎকার করে। তবে স্থানীয় বিশপদের বডিগার্ডের ভূমিকায়ও দেখা যায় তাদের। ডেভুসের জ্ঞানচর্চা গোল্লায় যায়, ধর্মীয় চর্চা স্থান নেয় সেখানে। অন্যদিকে, বিজ্ঞান চর্চা হাইপেশিয়াকে শেখায় খোদার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে।

চলছে খ্রীষ্টানদের আক্রমন থেকে জ্ঞান রক্ষার প্রচেষ্টা


তারপর বেশ কিছু বছর কেটে যায়। পেগান ধর্মাবলাম্বী অরিস্টিস ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হয় এবং আলেক্সান্দ্রিয়ার প্রিফেক্ট পদ লাভ করে। খ্রীষ্টানরা পেগানদেরকে পদানত করার পর ইহুদীদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পাড়ে, আক্রমন পাল্টা আক্রমন চলে দুপক্ষে, হতাহত হয় দুপক্ষের মানুষ। আর হাইপেশিয়া তার জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যায় একাগ্রচিত্তে। অরিস্টিস তার গভীর বন্ধু, তার দ্বারা প্রভাবিত। আর তাই খ্রীষ্টান বিশপ সিরিল একদিন দোষী এবং ডাইনী হিসেবে ঘোষনা করে হাইপেশিয়াকে। প্রমাণ অকাট্য - বাইবেলে যীশু যা বলে গিয়েছেন এমন কথা হাইপেশিয়াকেই ইঙ্গিত করে যে।
ধর্মান্ধ পারাবোলানীরা হাইপেশিয়াকে ধরে নিয়ে যায়, অবশ্য ডেভুস চেষ্টা করেছিল পূর্বেই হাইপেশিয়াকে সতর্ক করে দিতে, কিন্তু ততক্ষনে দেরী হয়ে গিয়েছিল। পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয় জ্ঞান সাধক বিজ্ঞানী হাইপেশিয়াকে। মৃত্যুর পূর্বে হাইপেশিয়া আবিষ্কার করে যায়, the Earth orbits around the Sun in an elliptic, not circular, orbit with the Sun at one of the foci.


২০০৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আগোরা মুভিটির পরিচালক আলেসান্দ্রো আমেনাবার। ২০০৪ সালে একই পরিচালকের দ্য সি ইনসাইড মুভিটির সেরা বিদেশী ছবির তালিকায় অস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছিল। হাইপেশিয়া চরিত্রে অভিনয় করেছে 'দ্য মাম্মি' খ্যাত রেচেল উইজ। তার অভিনয় স্বচ্ছ, স্বাভাবিক। ডেভুস চরিত্রে রূপদানকারী ম্যাক্স মিগেলার অভিনয় অসাধারণ। ডেভুস খ্রীষ্টান হয়েও স্বাভাবকি মানুষ। মানুষকে ক্ষমা করার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি তার থেকে বিদায় নেয় নি। ডেভুস চরিত্রটি পারফিউম: দ্য স্টোরী অব আ মার্ডারার সিনেমার গ্রানুইলি চরিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয় কারণ তার সংলাপের স্বল্পতা।


হাইপেশিয়া নামের এই নারী মহিয়সীর কোন কাজ বর্তমান পৃথিবীতে নেই। নেই লাইব্রেরী অব সেরাপিয়ামও, ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন এর ধ্বংশের পেছনে। তবে এ বাপারে সবাই একমত যে, ধর্মান্ধ খূষ্টান, ইহুদী ও পেগানদের পারস্পরিক সংঘর্ষই এর ধ্বংসের প্রধান কারণ। চতুর্থ শতাব্দীকে ফুটিয়ে তুলতে পরিচালক চেষ্টার ত্রুটি করেন নি, হয়তো এ কারণেই ছবিটির আকর্ষনীয়তা বেড়েছে বহুগুনে।


হাইপেশিয়াকে কেন্দ্র করে যে ছবির কাহিনী তার নাম কেন হাইপেশিয়া না হয়ে 'আগোরা' হলো সেটা বুঝতে না পারলেও এতটুকু জানি ছবির থিমের সাথে নামটি মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। সব মিলিয়ে আগোরা চমৎকার একটি মুভি। মিস করা উচিৎ হবে না বোধহয়।


httpv://www.youtube.com/watch?v=RbuEhwselE0


অফটপিক: সিনেমাটি নিয়ে পড়তে গিয়ে জানা গেল অনেক কিছু, সেখান থেকেই কিছু উল্লেখ। আলেক্সান্দ্রিয়ার এই পরিস্থিতি কিন্তু সবসময় এরকম থাকেনি, আড়াইশ-তিনশ বছর পরে এর পরিবর্তন ঘটে মুসলমানদের কতৃক আলেক্সান্দ্রিয়া বিজয়ের মাধ্যমে । মুসলমানরা এই শহরকে আবার জ্ঞানচর্চার পীঠ বানান। বিজ্ঞান চর্চা এবং জ্ঞান বিস্তারের কেন্দ্র হয়ে উঠে আলেক্সান্দ্রিয়া, স্পেন। সম্ভবত, এখানেই মুসলমানরা অন্যান্য ধর্মের সাথে পার্থক্য দেখিয়েছিলেন। সে সময়ের মুসলমান বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞান চর্চাকে ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখেন নি। বরং তারা বেশ ভালো ধার্মিক হিসেবেও সুপরিচিত। ব্লগের ইসলামপ্রেমীরা বোধহয় এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন