Paradise Now: একমাত্র সিনেমা যা দেখতে গিয়ে আমি মনিটরে লাথি কষিয়েছিলাম !

কারণ মনিটরের বাম কোনায় সুহা ছিল। এবং তার উপর মেজাজ এতটাই খারাপ হয়েছিল যে লাথি কষাতে ইচ্ছে হয়েছিল। ক্ষোভটা পুষে রাখতে পারি নাই, মনিটরেই মেরে দিসিলাম।

প্রিয় ব্লগার সৌম্য একবার একটা পোস্ট দিয়েছিলেন – অগুনিত মেহেরের গল্প যা স্টিকি করা হয়েছিল বেশ কিছুদিন। এছাড়াও রয়েছে সেতুর পোস্ট প্যালাসটাইনের গাজা উপতকার অর্থনীতির চাকা হলো মাটির নিচের মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ পথ। বোধহয় এই দুটো পোস্ট দেখে তারপর সামনে এগোনো ঠিক হবে।২০০৫ সালে অস্কার মনোনয়নের সময় অস্কার কমিটি বেশ ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলেন – কারণটা অদ্ভুত। একটা ছবি তারা পেয়েছেন যা মনোনয়ন দেয়ার ব্যাপারে তারা নিশ্চিত কিন্তু ছবিটা এমন একটা দেশের যেটা আদতে কোন দেশই নয় ! ছবির নাম প্যারাডাইস নাউ। দেশের নাম ফিলিস্তিন।

যুদ্ধ নিয়ে যত মুভি আছে তার মধ্যে প্যারাডাইস নাউ অন্যতম এবং অনেক দর্শকেরই পছন্দের তালিকার প্রথম সারিতে এর অবস্থান। কাহিনী দুজন সুইসাইড বোম্বারকে নিয়ে। ফিলিস্তিনের উপর ইসরায়েলী আগ্রাসনের প্রতিবাদস্বরূপ নিজ শরীরে বোমা বেধে ইসরায়েলী কিছু পুলিশ আর জনসাধারণকে হত্যা করার মধ্যেই একজন ফিলিস্তিনীর জীবনের সার্থকতা, জান্নাত প্রাপ্তি। দুজন বাল্যবন্ধু সাইদ এবং খালিদ, যারা ইসরাঈলে আঘাত করার জন্য নিজেদের বুকে বোমা বেধে নেয় তাদেরই জীবনের শেষ দুদিনের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্যারাডাইস নাউ। খালিদ এবং সাইদ ছাড়াও রয়েছে সুহা, একজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুনী যে সাইদের প্রতি কিছুটা অনুরক্ত। আর রয়েছে নাম প্রকাশ না করা একটি ফিলিস্তিনী গ্রুপের সদস্য, নেতৃবৃন্দ।

ছবিটির পরিচালক হানি আবু আসাদ। বেশ সাহসী কাজ করেছেন তিনি এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্বে এখনো স্বীকৃতি প্রাপ্ত নয় এমন একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এই সিনেমার মাধ্যমে। ফিলিস্তিনে ইসরাঈলী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ ইসরাঈলকে একটি জাতিরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৮৭৮ সালে সাড়ে চার লাখ লোকের মাত্র সাড়ে তিন ভাগ ছিল ইহুদি, আর ১৯৪২ সালের দিকে মোট জনসংখ্যার ২০ ভাগে গিয়ে দাড়ায় তাদের সংখ্যা। মার্কিন শক্তির সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে ইসরাঈল নামের রাষ্ট্রের জন্ম। এই সমাধানটা খুব একটা সরল ছিল না, ফিলিস্তিনের উর্বর জমিগুলোর বেশীরভাগ ইসরাঈল ই পেয়েছিল এবং মজার ব্যাপার হলো তারাই এই সমাধান মেনে নেয়নি । ফিলিস্তিনকে ইসরাঈল হিসেবে সবচে’ শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে দখল চালিয়ে যেতে থাকে তারা। ফলে আরব ইসরাঈল যুদ্ধ বাধে ১৯৪৮ সালে এবং ইসরাঈল নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষনা করে। ভারতীয় উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য এবং কিছু অন্যান্য দেশ বাদে প্রায় সব দেশই ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৭ সালে শুরু হয়েছিল প্রথম ইন্তিফাদা, যা ১৯৯৩ এ শেষ হয় অসলো চুক্তির মাধ্যমে এবং ইসরাঈলকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে ইয়াসির আরাফাত নোবেল প্রাইজ পান। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা শুরু হয় ২০০০ সালে এবং শেষ হয় ২০০৮ সালে। ফিলিস্তিনীরা এখনো মার খেয়ে যাচ্ছে, সামরিক শক্তিতে দুর্বল ফিলিস্তিনীদেরকে তাই সুইসাইড বোম্বিং এর মতো পন্থা বেছে নিতে হচ্ছে।

ফিলিস্তিনীদের এই চরিত্র সিনেমাতে যেমন ফুটে উঠেছে তেমনি দেখা গিয়েছে সিনেমার মুক্তির সময়ও। অস্কারের জন্য ফিল্মটা জমা পড়েছিল ‘ফিলিস্তিনী’ সিনেমা হিসেবে। কিন্তু ইসরাঈলী প্রভাবশালীরা চেষ্টা করেছিল যেন সিনেমাটি ফিলিস্তিনের সিনেমা হিসেবে দেখানো না হয়। তাদের এই চেষ্টা একেবারে বৃথা যায় নি। অনুষ্ঠানে একে বলা হয়েছে “প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটি”র সিনেমা হিসেবে।
ফিলিস্তিনী সিনেমা হিসেবে এটি যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে অথচ কিছু সমস্যা যে নেই তাও নয়। মজার ব্যাপার হলো সিনেমাটা বানানোর জন্য তহবিল সরবরাহ করেছে একজন ডাচ, দুইজন জার্মান, একজন ফ্রেঞ্চ এবং একজন “ইসরাঈলী” প্রোডিউসার। ইসরাঈলী প্রযোজক টাকা দিচ্ছে তার দেশের বিরুদ্ধে সিনেমা বানানোর জন্য – একজন ইসরাঈলী ইহুদীর কাছ থেকে এটা আশা করাটা হাস্যকর মনে হয় না?
পুরো সিনেমা জুড়ে ইসরাঈলীদের নির্যাতন অত্যাচারের বর্ননা থাকলেও কাহিনীটা এমন নয় যা ফিলিস্তিনীদের পক্ষে যায়। সুইসাইড বোম্বিং এমন একটা ব্যাপার যা যে কোন মানুষই অপছন্দ করে। ফলে পুরো ছবিটাই দর্শককে এ ধরনের প্রতিবাদ করার বিপক্ষে অবস্থান করতে সাহায্য করে।
এছাড়াও রয়েছে শক্তিশালী চরিত্র সুহা। সে একজন মেয়ে, ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত। যদিও তার বাবা ফিলিস্তিনীদের একজন বিখ্যাত যোদ্ধা, সে বর্তমানকালের এ ধারার প্রতিরোধ পছন্দ করে না। খালিদ (দুজনের একজন বোম্বার) কে লক্ষ্য করে তার বক্তব্যটা ছিল – If you can kill and die for equality you should be able to find a way to be equal in life….. Then at least the Israelis don’t have an excuse to keep on killing….. If you kill, there’s no difference
between victim and occupier. সুহার যুক্তি ছিল যেহেতু ইসরাঈলীদের সামরিক শক্তি ফিলিস্তিনীদের চেয়ে বেশী সেহেতু তাদের ভিন্ন কোন পন্থা অবলম্বন করা উচিত। তার বক্তব্য ছিল ফিলিস্তিনীরা আক্রমন করছে বলেই ইসরাঈলীরা তাদের ধ্বংস করছে এবং হয়তো তারা থামবে যদি এরা বন্ধ করে। যদিও সাইদ এবং খালিদ দুজনেই এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে এসেছে পুরো সময়, শেষ পর্যন্ত খালিদ তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে – Suha was right. We won’t win this way…. We kill and are killed, and nothing changes…. There are other means of
liberation and resistance… খালিদ ফিরে যায়, কিন্তু বুকে বাধা বোমা নিয়ে থেকে যায় সাইদ।
সাইদ কেন থেকে গিয়েছিল? সে কি তার দেশকে এতটা ভালোবাসে যে এর জন্য প্রাণ দিতে তার বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে না? নাকি সে এখনি জান্নাত লাভে আগ্রহী? বোধহয় কোনটাই না। সাইদের বাবা ছিল একজন ‘ কোলাবরেটর ‘, নিজের দুরাবস্থা কাটাতে সে ইসরাঈলীদের সহযোগীতা করেছিল এবং এজন্য তার ফাসিও হয়েছিল। সবাই জানে সে কথা, বাবার করে যাওয়া এই অপরাধ নিয়ে সাইদ কিভাবে বেচে থাকে? চারিদিকের ইসরাঈলীদের বেষ্টনী আর শরনার্থী ক্যাম্পে জীবন যাপন থেকে মরে যাওয়াই কি উত্তম নয়? আসলে সাইদ একজন যোদ্ধা নয়, সে একজন আত্মঘাতী মাত্র। এই জীবনকে বয়ে চলা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, ইসরাঈলে বোমা হামলা তাকে একটা সুযোগ প্রদান করেছে মাত্র। ফলে সাইদের থেকে যাওয়ার মাধ্যমে কিন্তু ফিলিস্তিনীদের যুদ্ধের কোন স্বীকৃতি পাওয়া যায় না, সত্য হয়ে টিকে থাকে খালিদের কথাই – যেন সেটাই সঠিক সিদ্ধান্ত।
মুভিটা আমাকে কনফিউস করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটা কাদের ছবি? ফিলিস্তিনীদের? নাকি ফিলিস্তিনীদের দিয়ে বানানো ইসরাঈলের পক্ষের ছবি? আমি আত্মঘাতী বোমা হামলার পক্ষপাতী নই, কিন্তু তাই বলে সামরিক পদ্ধতি বাদ দিয়ে ইসরাঈলের আনুগত্য মেনে নেবে ফিলিস্তিনীরা যারা প্রকৃতপক্ষে সেই দেশের প্রকৃত উত্তোরাধিকারী সেটা কাম্য নয়। ফিলিস্তিনীদের অধিকার তাদেরক্ই আদায় করে নিতে হবে। বাকী বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলাফল কি হয়েছে তা তো স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে – নিজেদের জমি থেকে ক্রমশই উচ্ছেদ হতে হচ্ছে তাদেরকে। ইসরাঈলী লেখক আইরিট লিনোর বলছেন, “একটা ছবির জাতীয়তা নির্ধারণ হয় কোন দেশের অর্থায়নে তা নির্মিত হয়েছে তার দ্বারা, প্যারাডাইস নাউ ইউরোপিয় ফান্ডের প্রযোজনায় এবং ইসরাইলী আরব পরিচালকের ছবি ছাড়া আর কিছু নয়।
হয়তো সবাই মিলে বাহ বাহ দেয়ার মাধ্যমে যে সত্যটিকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করছে, আইরিট সেটাই একটু উসকে দিয়েছেন মাত্র।

ফিলিস্তিনীদের এই সংগ্রাম নিয়ে তথ্য পেয়েছি যেখান থেকে
ফিলিস্তিনে মুক্তি সঙগ্রাম
আরও দেখতে পারেন ডকুমেন্টারী “অকুপেশন ১০১”

About দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - [email protected]

View all posts by দারাশিকো →

One Comment on “Paradise Now: একমাত্র সিনেমা যা দেখতে গিয়ে আমি মনিটরে লাথি কষিয়েছিলাম !”

  1. প্যারাডাইস নাউ নিয়ে আমারও অনেক ডাউট আছে, কিন্তু এতোটা বিরোধী নই। আমার ধারণাগুলো পরে বলছি।
    এখন রেফারেন্স নিয়ে একটা কথা বলি: রেফারেন্স হিসেবে তাগরিব নামক সাইটের যে লেখা উইজ করেছেন সেটা দেখলাম আমার একটা লেখা থেকে হুবহু কপি পেস্ট করা। মূল লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন। নিচে আমার লেখাটার লিংক দিলাম:
    http://www.cadetcollegeblog.com/muhammad/13934

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুক মন্তব্য