রাজকন্যার সাদা রুমাল


এক
এই গল্পের সব কিছুই একটু ব্যতিক্রম, গতানুগতিক নয়। যেমন ধরা যাক,

অনেক দিন আগে এই পৃথিবীতে এক দেশ ছিল, অন্যান্য সব গল্পের মত এই দেশ বা রাজ্যটি অনেক বড় ছিল না বরং সবচেয়ে ছোট রাজ্য ছিল এই দেশটি, নাম ‘মাইক্রোকান্ট্রি’। অন্যান্য গল্পের মত এই রাজ্যটি খুব ধনী ছিল না, ছিল না অনেক জৌলুস। খুবই দরিদ্র রাজ্য ছিল সেটি, সেই রাজ্যের রাজা আর প্রজার সাথে কোন তফাৎ ছিল না। রাজা ছিল খুবই গরীব, তার কোন রাজপ্রসাদ ছিল না, ছিল না কোন লোক লস্কর। রাজা নিজের জীবিকা নিজেই উপার্জন করত, এমনকি বাগান পরিস্কারের কাজটিও তাকে নিজ হাতেই করতে হত। একই রকম ছিল রানীর জীবন, সে নিজেই রান্না বান্নার কাজ করত, তার কোন আয়া ছিল না। অন্যান্য লোকদের সাথে তাদের তফাৎ ছিল এই যে, পুরো দেশে একজন মাত্র রাজা এবং একজন মাত্র রানী ছিল।

নিয়মানুযায়ী সেই রাজ্যে একজন মন্ত্রীও ছিল, তার অবস্থা রাজার অবস্থা থেকে কোন অংশে কম নয়, বেশী তো নয়ই। সেও নিজেই নিজের কাজ করতো, রাজাকে দেশ চালানোর জন্য বুদ্ধি পরামর্শ দিত, অবশ্য এজন্য যে সে খুব টাকা কামাতো তা কিন্তু নয়।

সেই রাজ্যে একজন কৃষকও ছিল। সত্যিকার অর্থে একজন নয় বরং অনেক কৃষক থেকে আমরা একজনকেই বেছে নিয়েছি। সেও সারাদিন কৃষিকাজ করত, যা ফসল ফলাতো তা দিয়ে তার পরিবারের ভরন পোষন হয়ে যেত।

মাইক্রোকান্ট্রিতে অর্থ ছিল না কিন্তু সবার মনে শান্তি ছিল, সুখ ছিল। ছোট্ট এ রাজ্যে সবাই নিজে নিজে কষ্ট করে জীবন যাপন করতো, সবাই ছিল গরীব আর তাই কারও মনে কোন ভেদাভেদ ছিল না। আর গরীব রাষ্ট্র ছিল বলে অন্য কোন রাজ্য জয় করার ব্যাপারে তাদের কোন আগ্রহ ও চেষ্টা ছিল না, আর সে কারণেই তাদের কোন সেনাবাহিনীও ছিল না। অন্যদিকে এত ছোট রাজ্য জয় করে কোন কিছুই লাভ করা যাবে না জেনে অন্য রাজারাও এদিকে নজর দিত না – ফলে সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করছিল।

রাজা , মন্ত্রী আর কৃষক – প্রত্যেকেরই একটি করে পুত্র সন্তান ছিল। তাদের নাম যথাক্রমে রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র এবং কৃষকপুত্র! তারা তিনজনেই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত! সকলেরই চিন্তা ছিল কিভাবে এই দেশের উন্নতি করা যায়। উন্নতির প্রধাণ শর্ত ছিল অর্থ। তাদের অভাব সেটাই। তাই তারা ভাবছিল কিভাবে এই অর্থ উপার্জন করা যায় যা দিয়ে তাদের দরিদ্র রাজ্যের উন্নতি সম্ভব!

এমন একদিন মাইক্রোকান্ট্রির রাজা তার সকল রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে একটি সংবাদ প্রেরণ করলেন। “অনেক দূরে ম্যাক্রোকান্ট্রি নামে বিশাল এবং ধনী যে রাজ্য আছে তার রূপবতী ও গুনবতী একমাত্র কন্যার জন্য পাত্র খোজা হচ্ছে। যে কেউ এতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। রাজকন্যা যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করবে। তবে শর্ত হল রাজকন্যা যদি তাকে পছন্দ না করে তবে রাজকন্যার ইচ্ছে অনুযায়ী সেই পুরুষকে পাত্রী বেছে নিতে হবে! অর্থাৎ রাজকন্যা যাকে বিয়ে করতে বলবে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য হেরে যাওয়া প্রতিযোগী!”

রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র এবং কৃষকপুত্র এই ঘোষনা শুনল। প্রত্যেকের মনেই যে চিন্তা আসল তা হল – এই রাজকন্যাকে যদি বিয়ে করা যায় তবে ভবিষ্যতে একটি বড় রাজ্যের রাজা হওয়া সম্ভব, আর তবেই হাতে আসবে অনেক টাকা যা দিয়ে মাইক্রোকান্ট্রির উন্নতি করা সম্ভব। তিনজনেই দৃঢ় প্রতিগ্গ হল তারা এই প্রতিযোগিতায় নাম লেখাবে। অবশেষে একদিন তাদের মা-বাবাকে বিদায় দিয়ে তারা ম্যাক্রোকান্ট্রির পথ ধরল। তাদের বাবা- মা আর দেশবাসী অশ্রুসজল চোখে তাদের বিদায় দিল। আর প্রাণভরে দোয়া করতে লাগল যেন তারা জয়ী হয়ে ফিরে আসে।

দুই
তারপর রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র আর কৃষকপুত্র একসঙ্গে চলতে লাগল। যেহেতু তারা সবাই ছিল খুব গরীব তাই তাদের কোন বাহন ছিল না। হেটে রওনা হল দূর দেশ ‘ম্যাক্রোকান্ট্রি’র উদ্দেশ্যে। পথে অনেক ঘটনা ঘটল, অনেক মজা হল, কষ্টও কম হল না। কিন্তু দেশের সেবা করা আর রাজকন্যাকে বিয়ে করার সুখ স্বপ্ন তাদের সকল কষ্টকে দূর করে দিল।
কিন্তু পথ যে আর ফুরায় না, তারা চলতেই লাগল, চলতেই লাগল, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। অবশেষে একদিন পথ শেষ হল, তারা এসে উপস্থিত হল ম্যাক্রোকান্ট্রির দোরগোড়ায়। এসেই তারা পড়ল মহা সঙ্কটে, এত দূরের যাত্রায় তাদের যে হাল হয়েছে তাতে কেউ তাদের রাজপুত্র কিংবা মন্ত্রীপুত্র বলে বিশ্বাস করবে না, কৃষকপুত্রের অবশ্য সে সমস্যা নেই, কিন্তু তাই বলে সেতো তার বাকী দুই বন্ধুকে বাদ দিয়ে যেতে পারে না।

সমস্যার সমাধান হয়ে পড়ল হঠাৎই! রাজ্যে নতুন দেখে এক লোক তাদের দিকে এগিয়ে এল। জানতে চাইল কি উদ্দেশে এ রাজ্যে আগমন। রাজপুত্র একটু দোনামোনা করছিল, কিন্তু মন্ত্রীপুত্র বলেই ফেলল, ‘আমরা এসেছি রাজকন্যাকে বিয়ে করতে!”
“বেশ তো, তা এখানে দাড়িয়ে থাকলে কি আর বিয়ে করা হবে, না রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত যেতে হবে” – এই কথা বলে সে একজন কর্মচারীকে দেখিয়ে দিল। “কোন ভয় নেই, যেহেতু প্রতিযোগিতা, তাই ধনী গরীব সবাইকেই সম্মান দেখানো হচ্ছে!”
তো আর কি! সেই কর্মচারী তাদেরকে নিয়ে এল রাজপ্রাসাদে। বিশাল এক দালানের এক বিশাল ঘরে তাদের তিনজনের থাকার ব্যবস্থা হল। এই দালানে অন্যান্য প্রতিযোগীরাও অবস্থান করছে। তাদেরকে নতুন কাপড় চোপড় দেয়া হল, এত সুন্দর সে জামাগুলো যে পড়ার পড় বোঝা গেল না কে রাজপুত্র আর কে কৃষকপুত্র! আরও দেয়া হল বড় আকারের তিনঠি ঘোড়া। প্রত্যেকের সুবিধা আর দেখাশোনার জন্য দেয়া হল একজন করে খানসামা। তাদেরকে দেয়া হল রাজকীয় আর সুস্বাদু মজাদার সব খাবার আর ফলের রসের তৈরী পানীয়!

এত সমাদর আর যত্ন পেয়ে দুদিনেই তারা সকল ক্লান্তি আর দুর্বলতা কাটিয়ে উঠল। আর প্রত্যেকে নিজে নিজে ঠিক করতে লাগল কি করলে রাজকন্যা অন্য সবাইকে বাদ দিয়ে তাকেই বিয়ের জন্য পছন্দ করবে!

এভাবে সাত দিন কেটে গেল! প্রতিদিনই কোন না কোন প্রতিযোগী অংশ নিচ্ছে, যদিও রাজকন্যা কাউকেই পছন্দ করছে না। তিন বন্ধু এতে আশাবাদী হয়ে উঠে, নিশ্চয়ই তাদের যেকোন একজনকে পছন্দ করবে রাজকন্যা!

অবশেষে একদিন রাজকন্যার দূত আসল। রাজকন্যার নাম স্যক্রেড। দূত এসে জানালো তারা তিনজনই শেষ প্রতিযোগী। তারপরেই রাজকন্যা স্যাক্রেড তার পছন্দের মানুষটিকে বেছে নিবেন। এখন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে হবে সবার আগে কে যাবে – রাজপুত্র, মন্ত্রীপুত্র নাকি কৃষকপুত্র। প্রত্যেকেরই যাবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু রাজপুত্রের প্রতি সম্মান জানিয়ে সিদ্ধান্ত হল , প্রথমে যাবে রাজপুত্র, তারপর যাবে মন্ত্রীপুত্র এবং সবশেষে যাবে কৃষকপুত্র! দূত তাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিল।

অতঃপর, রাজপুত্র মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল – কখন রাত পোহাবে, আর সে পারবে রাজকন্যার মন জয় করতে!

তিন
অবশেষে রাত পোহাল।
সকাল বেলায় রাজপুত্র একটু শীতলতা বোধ করল, এ আর কিছু না, উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ।  রাজকন্যা স্যাক্রেডকে অাজ সে জয়ী করতে পারবে নিশ্চয়ই!

খুব সকালেই রাজকন্যার দূত আসল। তার সাথে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরনাদি, রাজপুত্র যা খুশি বেছে নিতে পারবে। তাকে দেয়া হল একুট জরীদার সুন্দর জামা, চুমকি আর কাচ বসানো মূল্যবান এক পাগরী, কারুকার্য করা বিশাল এক তরবারী। আর একটি সাদা রুমাল। রুমালটি রাজকন্যার তরফ থেকে, যার এককোণে   সুতো দিয়ে ‘স্যাক্রড’ লেখা। এই রুমাল দেখেই রাজকন্যা তাকে চিনে নিতে পারবে। সুতরাং কোনভাবেই এই রুমাল হারানো যাবে না।

রাজপুত্র সুন্দর পোশাক পড়ল, এতদিনে তাকে সত্যিকারের রাজপুত্র বলে মনে হচ্ছিল।  মন্ত্রীপুত্র আর কৃষকপুত্রের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে চলল রাজকন্যার মন জয় করতে।

রাজপুত্র প্রথমে একটি রাজপ্রসাদে ঢুকল। সকালে রাজকন্যা স্যাক্রেড রোদ পোহাতে আসেন, তবে সে কোন কক্ষে থাকে, সেটা খুজে বের করতে একটু সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানের জন্য রাজপুত্র দেখা পেয়ে গেল একজন সুন্দরী পরিচারিকার।  রূপ দেখে রাজপুত্র অবাক, তার চোখে ঘন করে কাজল দেয়া, কি গভীর সে দৃষ্টি। তার নাম সুনয়না! সুনয়না রাজপুত্রকে দেখে গালভরা হাসি উপহার দিল, তারপর বলল, “এতবড়  প্রাসাদে রাজকন্যা স্যাক্রেড কোথায় যে আছে তা তো কেউ জানে না, আর তুমি যদি তাকে খুজে বের করতে যাও তবে সারাদিনেও খুজে পাবে না। তারচে’ বরং আমার এক কর্মচারীকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, তার একঘন্টা লাগবে মাত্র। রাজকন্যাকে খুজে পেলে সে তোমাকে নিয়ে যাবে’খন।” রাজপুত্র ভাবল সত্যিই তো! এত সুন্দরী সুনয়নার সাথে কিছু সময়ও কাটানো যাবে! রাজকন্যাকে খুজে বের করার জন্য সারাদিন তো পরেই রয়েছে – তাই সে রয়ে গেল আর কর্মচারী খুজতে বেরোল।

সুনয়না রাজপুত্রকে নিয়ে তার ঘরে বসালো, জানতে চাইল তার বিস্তারিত। রাজপুত্র তাদের রাজ্যের কথা বলল, তাদের দারিদ্রের কথা বলল, আর বলল তার র্দঢ় সংকল্পের কথা। রাজপুত্রের দুঃখের কাহিনী শুনে সুনয়নার চোখে জল এর, সে রাজপুত্রের কাধেঁ মাথা রেখে কাদল আর বলল নিশ্চয়ই রাজপুত্র জয়ী হবে।
একঘন্টা পরে সেই কর্মচারী এসে জানালো, রাজকন্যা স্যাক্রেড সকালের রোদ পোহানো শেষ করে অন্য প্রাসাদে চলে গেছেন। কি আর করা, রাজপুত্রকে এবার অন্য প্রাসাদে যেতে হবে। কিন্তু সুনয়নাকে বিদায় দিতে গিয়ে রাজপুত্র দেখল তার চোখের কাজল পানিতে ধুয়ে গিয়ে খুব বিশ্রী দেখাচ্ছে। রাজপুত্র তার রুমাল দিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া কাজল মুছে দিল। খুশী হয়ে সুনয়না তাকে গভীর এক চুমু উপহার দিল।

রাজপুত্র এবার গেল দ্বিতীয় প্রাসাদে। এখানে রাজকন্যা স্যাক্রেড স্নান করে।  কিন্তু প্রাসাদে ঢুকতেই একজন পরিচারিকা তাকে সাদর আমন্ত্রন জানালো। টকটকে লাল তার ঠোট। আর কি মিস্টি হাসি! নাম তার সুহাসিনী। সে রাজপুত্রকে বলল, রাজকন্যা এখন গোসল করছে, এ অবস্থায় ভেতরে যাবার অনুমতি নেই। সে বরং ঘন্টাখানেক অপেক্ষা করতে পারে, গোসল শেষে রাজকন্যার সাথে দেখা করবে। রাজপুত্র অপেক্ষা করল, লাল ঠোটের রূপবতী মেয়ের সাথে গল্পে মশগুল হয়ে রইল। মনে মনে কামনা করছিল রাজকন্যা স্যাক্রেড যদি এরকম সুন্দর করে হাসতে আর গল্প করতে পারে তবেই না সুখ। কিন্তু গল্পে গল্পে সময় পার হয়ে গেল, যখন হুশ হল তখন দেরী হয়ে গেছে। রাজকন্যা দুপুরের খাবার জন্য আরেকটি প্রাসাদে চলে গেছে। তাই রাজপুত্র বিদায় নিল। বিদায় বেলায় সুহাসিনী তার লাল ঠোট দিয়ে ভালোবাসার চিহ্ন একে দিল রাজপুত্রের গালে। ঠোটের লাল লেগে গেল গালে, রাজপুত্র রুমালে মুছে নিল।

তৃতীয় প্রাসাদে তাকে বরন করল অনিন্দ্য সুন্দরী এক রমনী। তার নাম সুরাধুনী। সুরাধুনী তাকে বলল নিশ্চয়ই তার অনেক ক্ষুধা লেগেছে! সুতরাং তার উচিত তার হাতের রান্না খেয়ে তবেই রাজকন্যার সাথে দেখা করতে যাওয়া। রাজপুত্র রাজী হল। সুরাধুনী হাতে তুলে তাকে খাইয়ে দিল।  খাওয়া শেষে রাজপুত্র রুমালে মুখ মুছে দিল। যেহেতু তৃতীয় প্রাসাদেও রাজকন্যা স্যাক্রেড ছিল না, সে ততক্ষনে অন্য প্রাসাদে বিশ্রামের জন্য চলে গেছে, তাই রাজপুত্র সেই প্রাসাদ ত্যাগ করল।

চতুর্থ প্রাসাদে যে পরিচারিকা তাকে বরন করল তার শরীরে আতরের মাদকতা মিশে রয়েছে। সেও তাকে কিছু সময় থাকতে বলল, কিন্তু রাজপুত্র রাজী হলনা, এভাবে যদি শেষ পর্যন্ত রাজকন্যার সাথেই দেখা না হয়।  কিন্তু নিজেকে আতরের সুগন্ধে সাজিয়ে নিতে ভুলল না। পরিচারিকা তাকে সাজিয়ে দিল। রাজপুত্র এবার আগেই পঞ্চম প্রাসাদে গিয়ে বসে রইল। রাজকন্যা স্যাক্রেড বিকেলে এখানে আসে সখীদের নিয়ে।

বিকেলে রাজকন্যা স্যাক্রেড এসেছিল, রাজপুত্র আর রাজকন্যা কথাও বলেছিল, কিন্তু কি কথা হয়েছিল তা কেউ জানে না, সবাই শুধু জানে রাজকন্যা স্যাক্রেড রাজপুত্রকে পছন্দ করেনি। আর তার ইচ্ছে অনুযায়ী রাজপুত্র বিয়ে করল সকাল থেকে দেখা হওয়া পরিচারিকাদের একজনকে।

পরদিন মন্ত্রীপুত্রের পালা!

চার
সকাল বেলায় মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যা স্যাক্রেডের পাঠানো পোষাক এবং নামাঙ্কিত সাদা রুমাল নিয়ে রওয়ানা হল। কৃষকপুত্র শুভকামনা করল। মন্ত্রীপুত্রও খুব আত্মবিশ্বাসী, তার জয় হবেই!

যথারীতি প্রথমেই সুনয়নার সাথে দেখা। সে পরামর্শ দিল কর্মচারী খুজে বেরাক রাজকন্যাকে, ততক্ষন দুজনে একটু গল্পগুজব করি। মন্ত্রীপুত্র বুদ্ধিমান, সে বলল, “তারচেয়ে আমরা দুজনেই খুজে বেরাই, তুমি তো চেনই, একই সাথে গল্প করা যাবে।” দুজনে চলল, মন্ত্রীপুত্র মজার মজার সব কথা আর চুটকি বলতে লাগল, সুনয়না তো হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, মন্ত্রীপুত্র তাকে ঘরে সামলায়। শেষ কৗতুকটা ছিল এত হাসির যে তার চোখে পানি চলে এল। সেই পানিতে কাজল ধুয়ে একাকার। কিন্তু রাজকন্যা স্যাক্রেডকে খুজে পাওয়া গেল না। বিদায় বেলায় রুমালে সুনয়নার কাজল মুছে দিল তারপর, থুতনিতে একটু আদর করে বিদায় নিল।

দ্বিতীয় প্রাসাদে টকটকে লাল ঠোট নিয়ে সুহাসিনী তাকে আমন্ত্রন জানালো। মন্ত্রীপুত্র সুহাসিনীর অনুরোধ রক্ষা না করে স্নান ঘরের দিকে রওয়ানা হল। কিন্তু স্নান ঘরে রাজকন্যা স্যাক্রেডকে পাওয়া গেল না। তিনি আজ স্নান করতে আসবেন না। তাই মন্ত্রীপুত্র ফিরে চলল। কিন্তু বিদায় বেলায় সুহাসিনীর লাল ঠোটের আবেদন ফেরানো তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। লাল রং টুকু সে তার রুমালে মুছে নিল।

সুরাধুনীর কাছেও রাজকন্যাকে পাওয়া গেল না। তবে মন্ত্রীপুত্রের যত্নের কোন অভাব হল না। এবারও সুরাধুনী তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিল, রুমালে মুখ মুছিয়ে দিল। তারপর দেখিয়ে দিল কোন প্রাসাদে যেতে হবে। বিদায় বেলায় সুরাধুনী মন্ত্রীপুত্রের কানে কানে বলল, রাজকন্যাকে বাদ দিয়ে যদি আমাকে বিয়ে করো তবে সবসময় এভাবেই আদর করে খাওয়াবো। মন্ত্রীপুত্র আশ্বাস দিয়ে চলল অন্য প্রাসাদের দিকে!

চতুর্থ প্রাসাদে এবার আর সুগন্ধি মাখা রমনীকে পাওয়া গেল না, তার পরিবর্তে রয়েছে আকর্ষণীয় এক তন্বী মেয়ে, সুগঠিত তার দেহ, রূপ যেন ঝরে ঝরে পড়ছে। নাম তার রূপীনি। মন্ত্রীপুত্রের কোমর জড়িয়ে সে নিয়ে গেল বিশ্রাম কক্ষে। দুপুরের রোদে বেরানোর জন্য কিছু অনুযোগও করল, তারপর চুলে বিলি কাটতে কাটতে মন্ত্রীপুত্রকে ঘুম পারিয়ে দিল।
ঘুম ভেঙ্গে মন্ত্রীপুত্র দেখল রূপিনী অঘোরে ঘুমোচ্ছে, বিকেল পর হয়ে গেল বলে। মন্ত্রীপুত্র ঝুকে তাকে আলতো করে চুমু খেল…তবে রে… ঠোটে কি লাগল! এত রং!সাদা গুড়ো! তবে কি রূপীনী সত্যিকারের রূপবতী নয়? রুমাল দিয়ে একটু ঘষে দিল মন্ত্রীপুত্র। কিছু রং উঠে এল। মনটাই খারাপ হয়ে গেল তার। এদিকে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, তাই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল।

শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যা স্যাক্রেডের দেখা পেয়েছিল, কিন্তু স্যাক্রেড তাকেও পছন্ধ করে নি। কি হয়েছিল কেউ জানে না, শুধু জানে মন্ত্রীপুত্র রাজকন্যা স্যাক্রেডের ইচ্ছেনুযায়ী তার এক পরিচারিকাকে বিয়ে করেছে।

সবশেষে কৃষকপুত্রের পালা। সেও পরদিন সকাল বেলা রাজকন্যা স্যাক্রডের সাদা রুমাল আর সুসজ্জিত রাজপেষাক পড়ে রওয়ানা হল। তাকে বিদায় দেয়ার মত কেউ ছিল না, কিন্তু তাই বলে তার আত্মবিশ্সাসে ঘাটতিও ছিল না।

সুনয়না তাকেও একই বুদ্ধি দিল। কিন্তু কৃষক পুত্র রাজী হল না। সে বলল, “এটা একটা পরীক্ষা নিশ্চয়ই। আমি তোমার কিংবা অন্য কারও সাহায্য নিলে তবে রাজকন্যা নিশ্চয়ই খুশি হবেন না। তারচে’ তুমি এখানে দাড়াও, আমি একটু কষ্ট করে খুজে আসি।” কৃষক পুত্র সুনয়নাকে ছাড়াই ঘুরতে লাগল। অর্ধেক প্রাসাদ ঘোরার পরই তার মনে হল, ‘আরে রোদ চড়ে গেছে। রাজকন্যা নিশ্চয়ই এখন রোদ পোহাবেন না।’ সুতরাং সে সুনয়নাকে বিদায় দিয়ে অন্য প্রাসাদে রওয়ানা হল। পেছনে সুনয়না কত কাদল, চোখের কাজল পানিতে ধুয়ে গেল, কৃষক পুত্রের মন গলল না।

টকটকে লাল ঠোটের সুহাসিনী তাকে স্নান ঘরে যেতে নিষেধ করল, “কৃষকপুত্র রাজী হল, তবে সে বলল, রাজকন্যা যখন গোসল করছে তখন এখানে অপেক্ষা করার কোন মানে নেই। আমি বরং পরের প্রাসাদে গিয়ে অপেক্ষা করি।” সুতরাং কৃষকপুত্র বিদায় নিল।

সুরাধুনীর কাছে যখন সে উপস্থিত হল তখনও দুপুর হয়নি। সুতরাং সুরাধুনির অনুরোধ সহজেই উপেক্ষা করতে পারল। রূপিনীর প্রাসাদে কৃষকপুত্র পৌছানোর পর রূপিনী তাকে বিশ্রাম নিতে বলল। কিন্তু কৃষক পুত্র জানালো সে এখনো ক্লাস্ত হয়নি। বরং রাজকন্যা স্যাক্রেডকে বিয়ে করেই সে বিশ্রাম নেবে। তাই সে তখনই বিদায় নিল।

এবার সে পৌছুল নতুন এক প্রাসাদে। এখানে রাজকন্যা স্যাক্রেড দুপুরে বিশ্রাম নেয়। এখানে তাকে অভ্যর্থনা জানালো অনিন্দ্য সুন্দরী এক রমনী। সে তাকে অপেক্ষা করতে বলল।  কিন্তু কৃষক পুত্র রাজী হল না, সে তাকে বলল, যাও রাজকন্যাকে গিয়ে বল, কৃষক পুত্র এসছে দেখা করতে। পরিচারিকা দোনামোনা করল কিন্তু কৃষকপুত্রে অনমনীয় ভাবের কাছে নতি স্বীকার করতে হল।

কিছুক্ষন পরেই রাজকন্যা স্যাক্রেডের পক্ষ থেকে ডাক এল। কৃষকপুত্র ভেতরে গেল। সেখানে রাজকন্যা সখীদেরকে নিয়ে বসে আছে, সখীরা কেউ তার পুলে বিলি কাটছে, কেউ পায়ে মালিশ করে দিচ্ছে, কেউ বা বাতাস করছে।
“স্বাগতম হে কৃষকপুত্র” রাজকন্যা স্যাক্রেড বলল।
“ধন্যবাদ রাজকন্যা, এই অসময়ে িবরক্ত করার জন্য আমি দুঃখিত।”
“আমার দেয়া রুমালটা দেখি”
“অবশ্যই রাজকন্যা,তবে তার আগে যদি আপনি সবাইকে যেতে বলেন তবে খুশী হই।”
“কেন?”
আপনি জানেন আমি খুব গরীব রাজ্য মাইক্রোকান্ট্রি থেকে এসেছি। আপনি সেখানকার রানী হলে এত সুখ ভোগ করতে পারবেন না, তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেয়া ভালো।”
রাজকন্যা স্যাক্রেড হাত নড়ে সবাইকে বিদায় করে দিলেন। তারপর কৃষকপুত্রের কাছ থেকে রুমালটা নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, “সুনয়না, সুহাসিনী কিংবা সুরাধুনরি সাথে দেখা হয়নি?”
“হয়েছিল, তারা সবাই আমাকে আকৃষ্ট করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম তারা সবাইকেই এভাবে স্বাগত জানায়। আমি একজন ভালো মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, তাই তাদেরকে এড়াতে সমস্যা হয়নি” কৃষক পুত্র বলল হাসিমুখে।

রাজকন্যা স্যাক্রেড হাসিমুখে উঠে দাড়ালো। “ধন্যবাদ হে কৃষকপুত্র! তুমিই প্রথম প্রতিযোগিতায় এত দ্রুত আমার কাছে এসেছ। তোমার রুমাল সম্পুর্ণ সাদা, যেরকমটা আমি তোমাকে দিয়েছিলাম। বাকীদের রুমালে ছিল নানা রকম ময়লা, যার শাস্তি  তারা ভোগ করছে। তারা তাদের মত চরিত্রের মেয়েকেই স্ত্রী হিসেবে পেয়েছে। আর তোমার জন্য রয়েছি আমি। আমি তোমাকে সুন্দর হাসি উপহার দেব, তোমার হাসিতে হাসব কিংবা কাদবো, তোমাকে খাইয়ে দেবো, তুমি দেবে আমাকে, তোমাকে ঘুম পারিয়ে দেবো, অনেক সুখের সংসার হবে আমাদের, তুমি হবে আমার রাজা, আমি হবো তোমার রানী!”

রাজকন্যা স্যাক্রেডকে জরিয়ে ধরল কৃষকপুত্র। “উহু… … তুমি হবে আমার স্ত্রী আর … …সকল প্রজার রানী!”

অতঃপর কি হল সে গল্প হবে আরেকদিন!


দারাশিকো

নাজমুল হাসান দারাশিকো। ব্লগার। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - [email protected]

ফেসবুক মন্তব্য

3 Responses

  1. ভালোলেগেছে।<br /><br />তবে আগেই অনুমান করতে পেরেছি, কৃষক পুত্রের সাথেই বিয়ে হবে।

  2. Doctor Farjana Ahmed Mim says:

    অনেক ভালো লাগছে। Assume করে ছিলাম, রাজকন্যার পরিচারিকা গুলো একধরনের পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares