রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা

রাসূলুল্লাহ-স-এর-জীবন-থেকে-নেয়া-নেতৃত্বের-শিক্ষা-Leadrship-lessons-from-the-life-of-Rasoolullah

রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা কোন মৌলিক রচনা নয়। এটি মীর্জা ইওয়ার বেগ রচিত বই Leadership Lessons from the life of Rasoolullah বইয়ের অনুবাদ-প্রচেষ্টা। চেষ্টা করবো সম্পূর্ণ বইটি অনুবাদ করতে। তখন হয়তো এই অংশটুকু পুনরায় লেখা হবে। আপাতত অনুবাদের কাজ শুরু করি।

নোটঃ বইটিতে প্রচুর কোরআনের আয়াত এবং হাদীসের রেফারেন্স দেয়া হয়েছে। আমি কোন আয়াত বা হাদীসের অনুবাদ করার চেষ্টা করি নাই, কেবল বিভিন্ন ওয়েবসাইট, বিশেষ করে ই-বাংলা লাইব্রেরিতে বাংলা কোরআন থেকে, আয়াতের অর্থ গ্রহণ করেছি। হাদীসের ক্ষেত্রে যেসব হাদীস বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পেয়েছি, সেগুলো তুলে দিয়েছি, চেষ্টা করেছি সূত্র লিংক করে দিতে। বাকীগুলো ভবিষ্যতে অনুবাদ খুজেঁ বের করবো বলে আপাতত ইংরেজিটুকুই রেখেছি। অনুবাদ সম্পূর্ণ করতে পারলে সম্পূর্ণ রেফারেন্স দেয়ার চেষ্টা করবো।

সূচিপত্র

  • শুরুর কথা
  • অসাধারণ হবার উপায়
  • অসাধারণ বিশ্বাস কি
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী লক্ষ্য
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী অঙ্গীকার
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী দল
  • এক্সট্রাঅর্ডিনারী গুণাবলী
  • বিশ্বাস ও বার্তায় পূর্ণ নিশ্চয়তা
  • বার্তায় আপসে রাজী না হওয়া
  • নিজেকে সারিতে স্থাপন করা
  • Resilience: কঠিন সত্যের মুখোমুখি হওয়া এবং সফলতায় নিশ্চিত বিশ্বাস
  • ব্যক্তিগত পছন্দের আগে লক্ষ্য
  • বার্তায় বেঁচে থাকা
  • ঝুঁকি গ্রহণ
  • বৃহৎ উদ্দেশ্যের জন্য ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য সমর্পন
  • মহানুভবতা ও ক্ষমাপরায়নতা
  • ব্যক্তি-পরিচালনা থেকে প্রক্রিয়া-পরিচালনায় স্থানান্তর
  • উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব তৈরি
  • শেষ কথা

শুরুর কথা

If greatness of purpose, smallness of means and astounding results are the three criteria of human genius then who could dare to compare any great man in history with Muhammad?

Lamartine, French historian and educator

২০০৮ সালে হজ্জের তিন দিন পরের ঘটনা। সৌদী আরবের হজ্জ মন্ত্রনালয় আয়োজিত বার্ষিক হজ্জ কনফারেন্সে আমাকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। কনফারেন্স এবং হজ্জের শেষে আমি এবং আমার স্ত্রী মক্কা থেকে মদীনা ঘুরেছি। মদীনাতুর-রাসূল, রাসূলুল্লাহর শহর। যখন তিনি এখানে থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন, তিঁনি এর নাম দিয়েছিলেন মুনাওয়ারাহ (ব্রিলিয়ান্ট, জাজ্জ্বল্যমান)। খুবই বিশিষ্ট একটি জায়গা যা আপনি কখনোই ছেড়ে যেতে চাইবেন না। আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি, তিঁনি যখন জীবিত ছিলেন এবং এখানে ছিলেন তখন কেমন ছিল। এমনকি এখনো, যখন তিনি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত, তাঁর মহিমা ও উপস্থিতি পুরোটা জুড়ে রয়েছে এবং এই শহর ও তার লোকদের এমন বৈশিষ্ট্য দান করেছে যা একে আমি যত শহরে ঘুরে বেড়িয়েছি তা থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। একজন মুসলমানের জন্য মদীনায় আসা মানে হল নিজের ঘরে আসা। এমন ঘর যা তার জন্মস্থানের চেয়েও প্রিয়। এই ঘরেই সে মৃত্যুবরণ এবং কবরস্থ হতে চায়। কোন মুসলমানের কাছে মদীনা সৌদী আরব না। এটা ইসলাম, এটা তার হৃদয়, এমন একটি জায়গা যেখানে যেতে সে ব্যাকুল, এমন জায়গা যেখানে মোহাম্মদ (স) এর বাড়ি। মদীনার জন্য এই আকুলতা নিয়ে কত কবি যে কত কবিতা লিখেছে তার ইয়ত্তা নেই!

ভোর থেকেই তাঁকে ভালোবেসে দেখতে লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিত হওয়ার অনেক আগেই তাহাজ্জুদ নামাজে তাড়িয়ে আমি তাঁর প্রতি সালাম পৌছালাম। কেমন ছিল সেই সময় যখন অন্যান্যরা তাঁর কাছে আসতো এবং তিনি এখানে সশরীরে উপস্থিত থেকে তাদের সালামের জবাব দিতেন এবং তাদের মিষ্ট হাসি উপহার দিতেন যে হাসি তাদের কাছে জীবনের চেয়েও বেশি দামী। যারা তাঁর পেছনে দাড়িয়ে নামাজ পড়েছে, যার উপর কোরআন নাযিল হয়েছে তার মুখ থেকেই কুরআন শুনেছে তারা কতইনা ভাগ্যবান!

১৪৩৫ বছর পরে বর্তমান সময়ে আমরা যারা তাকে দেখিনি এবং তার সুমধুর কণ্ঠস্বরও শুনতে পাইনি তারা তাঁকে অন্য যে কেউ বা যে কোন কিছুর তুলনায় অনেক বেশি ভালোবাসি। আমি যখন আল্লাহর কাছে তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণের জন্য এবং আমাদেরকে ইসলামের দিকে পথ দেখানোর জন্য তাঁকে সর্বোচ্চ পুরস্কার দেয়ার দোয়া করছিলাম, আমার দু’চোখ ভেসে যাচ্ছিল। মদীনা হল রাসূলুল্লাহ (স)। আরবরা একে বলে মদীনাতুর-রাসূল বা রাসূলের শহর। এখানে যারা বসবাস করে তারা অনেক গর্বিত। অন্য অনেক জায়গার চেয়ে অনেক কম আয় করার পরও বহু লোক এই শহরকে বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছে শুধুমাত্র এ কারণে যে তারা মদীনা ছেড়ে যেতে চান না। তিঁনি যে আলো জ্বালিয়েছিলেন, বহু বছর, প্রজন্ম, শতাব্দী ধরে তা আজও জ্বলছে, পৃথিবীতে আলো ছড়িয়েছে এবং যারা তাঁর আহবানকে গ্রহণ করতে রাজী হয়েছে তাদের কাছ পর্যন্ত পৌছে গেছে।

আমি রাসূলুল্লাহর (স) পাঁচটি অসাধারণ গুণের উল্লেখ করবো যা রাসূল (স) তার জীবনে পালন করেছেন এবং তার অনুসারীদের মধ্যে এত সফলভাবে বদ্ধমূল করে দিয়েছেন যে তা তাদেরকে এমন একটি দলে পরিনত করেছিল যা পৃথিবী আগে কখনো দেখেনি। সম্পূর্ণ বিসদৃশ কিছু উপজাতি যারা খুব তুচ্ছ কারণে নিজেদের মধ্যে মারাত্মক যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়িয়ে পড়ার জন্য পরিচিত ছিল তাদেরকে একত্রিত করেছিলেন, এবং তারা পৃথিবীর যেখানেই গিয়েছেন সর্বোৎকৃষ্ট আচরণ এবং পথপ্রদর্শকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

এ গুণগুলো হল:

leadership-qualities-from-the-life-of-rasoolullah

অসাধারণ হবার উপায়

কেন অসাধারণ হতে হবে? কারণ ‘যথেষ্ট ভালো’ হওয়া কখনোই যথেষ্ট নয়।

শুরুতেই ব্যাখ্যা করি আমি ‘এক্সট্রাঅর্ডিনারি’ বা অসাধারণ বলতে কি বুঝাচ্ছি, কারণ এর উপর ভিত্তি করেই বাকীটুকু বলবো। বিখ্যাত ফরাসী শিক্ষাবিদ আলফনসো ডি ল্যামারটিন (Alphonse de Lamartine) এর একটি উক্তি আছে,

‘যদি উদ্দেশ্যের শ্রেষ্ঠত্ব, উপকরণের ক্ষুদ্রতা এবং স্তম্ভিত করার মত ফলাফল মানবিক অসাধারনত্বের তিনটি শর্ত হয়, তাহলে ইতিহাসে মুহাম্মদের সাথে তুলনা করার মত আর কে আছে? দার্শনিক, ধর্মপ্রচারক, আইনপ্রণেতা, যোদ্ধা, চিন্তার বিজয়ী, যৌক্তিক বিশ্বাসের পুনস্থাপনকারী, বিশটি স্থলজ এবং একটি আধ্যাত্মিক রাজ্যের স্থপতি – তিনিই মুহাম্মদ। মানবিক শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপক যে কোন সূচকের বিবেচনায় যদি আমরা জিজ্ঞেস করি, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আর কে আছে? [Historie de le Turquie, Paris 1854, Vol:11, Pages 276-77]

অন্যরা যা চিন্তা করে তার চেয়ে বেশি কিছু করা জ্ঞানের পরিচয়ক, যুক্তিসঙ্গত বা যৌক্তিক। অসাধারণ হতে হলে যে কোন উপায়ে অস্বাভাবিক রকম সেরা হতে হবে। মনের গহীনে এমন ডাক শুনতে পারা যা অন্যরা বড়জোর চিন্তা করতে পারে, সেই তালে পথ চলা যা অন্যরা শুনতেও পারে না, তাসত্ত্বেও তাদের পা বাড়াতে উৎসাহ জোগায়। এ ধরনের লোক তারাই যারা এক্সট্রাঅর্ডিনারি, যারা খুবই ইন্সপায়ারিং। শুধু শ্বাস নেয়ার জন্য বেঁচে থাকা নয়। তাই কেউ যদি নেতৃত্ব দিতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই টিকে থাকার চেয়ে বেশি কিছু করতে হবে। এমন কিছু করতে হবে যা অন্য কেউ করেনি, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নয়, বরং সবাই যেন বুঝতে পারে তাদের পক্ষেও এমনটি করা সম্ভব। There is nothing sublime in pretending to be less than you are. নেতা হতে হলে ক্রমাগত নিজের ধ্যান-ধারনা এবং নিজের তৈরী সীমারেখা পেরিয়ে যেতে হয় কারণ শীর্ষে পৌছানোর ক্ষেত্রে বাধা একটিই, তা হলো তার নিজের মন।

নেতা হতে হলে মানুষের মন এবং আধ্যাত্মিক দুনিয়ার এমন গহীনে যাওয়ার সাহস অবশ্যই থাকতে হবে যেখানে কেউ অভিযান চালানোর সাহসই করে নি। সবসময় সঠিক বলে বিবেচনা করা হয়েছে এমন বিষয়কেও প্রশ্ন করতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে ধরনাকে সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যত মূল্যই দিতে হোক না কেন তাকে অবশ্যই সত্যের পক্ষে দাড়াতে হবে। তাকে অবশ্যই নির্যাতিত, দুর্বল এবং বঞ্চিতদের পক্ষে এবং অত্যাচারীর বিপক্ষে দাড়াতে হবে তা সে যে কেউ হোক না কেন। এ সকল বিষয় একজন নেতাকে বিশ্বাস অর্জন করতে সাহায্য করে যা, বিশ্বাস হল নেতৃত্বের ভিত্তি। একজন নেতাকে কেবল ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বস্ত হতে হবে তা নয়, বরং জনগণের মধ্যে এই বিশ্বাস থাকতে হবে যে তাকে অনুসরণ করার মধ্যে কল্যাণ আছে। সংজ্ঞানুযায়ী, নেতৃত্ব সম্মুখে থেকেই দিতে হয়। তাই নেতৃত্ব প্রদান বিশাল সাহসের ব্যাপার। প্রত্যাশা সামান্য হলে মানুষ জেগে উঠে না,  তারা জাগে যখন প্রত্যাশা বেশি হয়। তাদের এমন নেতা প্রয়োজন যে এগিয়ে নিতে পারে, পিছিয়ে নিতে নয়।

নেতাকে একইসাথে অবশ্যই লক্ষ্য এবং কৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা রাখতে হবে। কেবল বড় বড় স্বপ্ন দেখা যথেষ্ট নয় যদি সেগুলো কিভাবে অর্জন করা হবে সে ব্যাপারে কোন ধারনা না থাকে। একজন নেতাকে স্বপ্ন দেখার মত যোগ্য হতে হবে এবং তার অনুসারীদেরকে এমন এক পথ ধরে নিয়ে যেতে হবে যেই পথ শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে পারবে। এক্সট্রাঅর্ডিনারী বা অসাধারণ হতে হলে একই সাথে স্বপ্ন দেখার মত ক্ষণস্থায়ী কাজ এবং সেই স্বপ্নকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মত দীর্ঘস্থায়ী কাজও করার মত যোগ্য হতে হবে। এজন্য বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য বিভিন্ন রকমের লোক প্রয়োজন হয় এবং এ ধরনের লোক খুঁজে বের করাও একটি কাজ, কারণ একজন নেতা একই সবকিছু করতে পারে না। কৌশল বাস্তবায়নের জন্য খুবই যোগ্য এবং অনুগত একদল লোক তৈরী করা না হলে সবচে উত্তম স্বপ্নটিও আকাঙ্খার রাজ্যে নির্বাসিত হতে বাধ্য। একদল অনুসারীকে জোগাড় করা, তাদেরকে নিজেদের সর্বোচ্চ ত্যাগে অনুপ্রাণিত করা, তাদেরকে প্রশিক্ষিত ও পরিচালনা করা এবং সবশেষে তাদের পাশে থেকে প্রশিক্ষণ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কাজগুলো ঠিকমত করছে কিনা তা নজরদারি করার মত কাজগুলো একজন অসাধারণ নেতার অবশ্য পালনীয় কাজ।

সবার শেষে একজন অসাধারণ নেতাকে অবশ্যই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরী করে যেতে হবে যা তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি সত্ত্বেও তার কাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কোন অসাধারণ প্রতিভাকে যদি কোন প্রক্রিয়ার মধ্যে রূপান্তর করা না যায় তাহলে নেতার মৃত্যুর সাথে সাথে তারও মৃত্যু অবধারিত – নষ্টালজিয়া হিসেবে হয়তো পরে একসময় স্মরণ করা হবে কিন্তু নেতার পরবর্তী প্রজন্ম তার প্রতিভা থেকে কোনভাবে উপকৃত হবে না। কোন মহৎ সংগঠনকে সফল হতে হলে নেতাকে ব্যক্তি-পরিচালনাধীন থেকে কার্য-পরিচালনাধীনে রূপান্তর করতেই হবে। তা না হলে নেতার কাজ জেনারেশনকে পরিবতর্ন করার মত কিছু হবে না।

রাসূলুল্লাহ (স) এক্সট্রাঅর্ডিনারি লিডারশিপের মানদণ্ড এত প্রাণবন্ত ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন যে তার সবচে খারাপ শত্রুও তার পক্ষে কথা বলে বাধ্য হবে। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণক ঘটনা হল রাসূলুল্লাহ (স) এর চিঠি পাওয়ার পর বাইজেন্টাইন সম্রাজ্যের রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সাতে আবু সুফিয়ানের কথোপকথনের ঘটনা। আমি পরবর্তীতে এই ঘটনা সবিস্তারে উল্লেখ করেছি।

অসাধারণ হওয়া নেতার ইচ্ছাধীন বিষয় নয়। এটা নেতা হতে চাওয়া যে কোন লোকের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাজ। এমন সব দিকে অসাধারণ হতে হবে যা লোকদের অনুপ্রেরনা দিবে, শক্তিমান করবে, তাদের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করবে এবং তাদের ক্ষমতায়ন করবে। সাহসীরাই অন্যদেরকে সাহস দিতে পারে এবঙ মানবজাতির ইতিহাসে এমন কেউ নেই যে মুহাম্মদ (স) এর মত জীবনের সকল ক্ষেত্রে অসাধারণ নেতৃত্বের উদাহরণ দেখিয়েছে। এ কারণেই তার সাথীরা তার প্রতি আনুগত্যের এক উদাহরণীয় ভিন্ন মাত্রা প্রদর্শন করেছিল। তারা তাঁকে ভালোবেসেছিল এবং তিনিও তাদেরকে।

অসাধারণ বিশ্বাস কি?

রাসূলুল্লাহ (স) এর মধ্যে যে অসাধারণ গুণাবলীর সন্নিবেশ ঘটেছিল তার মধ্যে প্রথমটি হল ‘বিশ্বাস বা ফেইথ। বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বারবারা উইন্টার্সের ভাষায় বলি – ঝুঁকি নেয়ার জন্য যথেষ্ট ভরসা করার যোগ্যতা।

‌‍”When you come to the end of the light of all that you know and are about to step off into the darkness of the unknown, faith is knowing that one of two things will happen. There will be something firm to stand on or you will be taught how to fly.” ~ Barbara Winters

যখন তুমি আলোর শেষ প্রান্তে পৌছে যাবে এবং অজানা অন্ধকারের দিকে পা বাড়াবে তখন এমন শক্ত কিছু পাবে যেখানে পা রাখা যাবে অন্যথায় উড়তে শিখে যাবে – এই দুটি জিনিসের যে কোন একটি ঘটবে এমন ধারনা করাটাই বিশ্বাস। – বারবারা উইন্টার্স

শব্দগুলোর ব্যবহার খেয়াল করুন। তিনি কিন্তু বলেন নি, Faith is believing. তিনি বলেছেন, ‘Faith is knowing’ এবং এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। to know বা জানা কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত বিশ্বাস জ্ঞান করা। এটাই যে কেউকে ঝুঁকি নিতে সাহায্য করে। শেষ প্রান্তে পৌছে পা বাড়ানোর সময় বিশ্বাস করা –  আপনি ধ্বংস হবেন না বরং তার পরিবর্তে জ্ঞান ও আল্লাহর সাথে যোগাযোগের এমন স্তরে পা রাখবেন যা কখনো ভাবতেও পারেন নি।

বিশ্বাস খুবই জরুরী কারণ এটা ছাড়া মানুষের হৃদয়কে পরিবর্তন করার মত কঠিনতম কাজ করা অসম্ভব। এটি একটি ক্ষুদ্র শব্দ কিন্তু এর অর্থ বিশাল। একেক মানুষের কাছে এর অর্থ একেক রকম। তাই আমি ‘ফেইথ’ বলতে কি বুঝাচ্ছি তা বরং ব্যাখ্যা করি।

Extraordinary Faith Chart by Mirza Yawar Baig

আমার মতে ফেইথ হল একটি ডায়নামিক প্রসেস যেখানে তিনটি বিষয়ের মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। এগুলো হল: কঠিন সময়ে ধৈর্য্য ধারণ করা এবং আল্লাহর নেয়ামতের জন্য শুকর-গুজার হওয়া, আমাদের পাপ ও ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করা কারণ আমরা তাকে ভালোবাসি।

বারবারা উইন্টার্স যেভাবে বলেছে ফেইথ হল এমনভাবে জানা যখন কে সঠিক তার কোন চিহ্ন থাকে না। ফেইথ বস্তুবাদী দুনিয়ার মত অন্ধভাবে বিশ্বাস করা নয়। বিশ্বাস হল বস্তুকে অতিক্রম করে এমন কিছু দেখতে পারা যা খালি চোখ দিয়ে দেখা যায় না বা বর্ণনা করা যায় না কিন্তু হৃদয়ের চোখ দিয়ে পুরোপুরি অনুভব করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি।

জার্মানদের সাথে তীব্র এক যুদ্ধের পর একজন সৈনিক তার অফিসারের কাছ থেকে নো ম্যান’স ল্যান্ড এলাকায় গিয়ে সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে আসার অনুমতি চাইল। অফিসার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, দেখো সে মরে গেছে। এখন তোমার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার দেহ নিয়ে আসার কি দরকার? কিন্তু সৈনিক তার অবস্থানে অনড়, ফলে অফিসার এক পর্যায়ে তাকে অনুমতি দিলেন এবং কোম্পানীকে নির্দেশ দিলেন সৈন্যটি সহযোদ্ধার দেহ নিয়ে ফেরত আসা পর্যন্ত তাকে কাভার দিতে। কয়েক মিনিট পরে সৈন্যটি অক্ষত অবস্থায় ফিরে এল, তার কাঁধে সেই বন্ধুটি। অফিসারটি জিজ্ঞেস করলেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি নেয়ায় কি লাভ হল? বাঁচাতে তো আর পারলে না?

সৈন্যটি বলল, স্যার, আমি যখন তার কাছে পৌছে দেখলাম সে তখনো বেঁচে আছে। আমাকে দেখে সে বলল, আমি জানতাম তুমি আসবে। সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল এবং সে আমার কাঁধেই মারা গিয়েছে। লাভ এটুকুই।

বিশ্বাস অন্ধ নয়। এটি এমন কিছু দেখতে পায় যা বিশ্বাসহীনতা দেখতে পারে না। এটি ভালোবাসা, নিষ্ঠা, বিনাস্বার্থে করা সহযোগিতার লেন্স দিয়ে দেখতে পায়। ভালোবাসার মানুষের সাথে থাকার তীব্র আকাঙ্খাই বিশ্বাস। বিশ্বাস তীব্র প্রচেষ্টায় হতাশার অন্ধকার রাস্তাকে আলোকিত করে কারণ এটি জানে এই পথে সফলতা ও ব্যর্থতা মাইলের হিসাবে মাপা হয় না বরং যিনি অন্তরের খোঁজ রাখেন তাকে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে উঠে দাড়ানো ও প্রচেষ্টা চালানোর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখনও যে সামনের দিকে এগিয়ে যায় তার মুখের হাসিই বিশ্বাস কারণ সে এমন কিছু শুনতে পেয়েছে যা অন্যরা পায় নি।

সে যখন হাঁটে, অন্যরা থেমে গিয়ে তাকে দেখে এবং বিস্মিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে তারাও ঘুরে দাড়ায় এবং তার সাথে যোগ দিতে থাকে এবং এটি একটি কাফেলায় রূপ নেয়। তারা তাকে অনুসরণ করে কারণ এর মধ্যেই তারা জীবনের অর্থ এবং নিজেদের পরিপূর্ণতা খুঁজে পায়।

ইসলামের ভাষায় বিশ্বাস হল ‘তাওয়াক্কুল’। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেছেন,

আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট। (সূরা তালাক ৬৫: ২-৩)

তাওয়াক্কুল বা বিশ্বাস উপরে বর্ণিত তিনটি কাজের ফলাফল।

তওবা (ক্ষমা প্রার্থনা)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের অপরাধের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার আদেশ করেছেন। তওবা হল পথনির্দেশনা পাবার প্রথম শর্ত কারণ তওবা হল কোন কিছু পরিবর্তনের আগ্রহ নির্দেশ করে। কোন ব্যক্তি যদি কোন পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন না হয় বা প্রয়োজন অনুভব না করে তাহলে কোন পরিবর্তন বা সংশোধন সম্ভব নয়। তাই আমরা যখন তওবা করি তার মানে হল আমরা আমাদের মনোভাব এবং পথের পরিবর্তনের ব্যাপারে সচেতন হয়েছি।

আল্লাহ তায়ালা হযরত আদম (আ) এবং হাওয়া (আ) কে প্রথম যে শিক্ষা দিয়েছিলেন তা হল তওবা। আদম – হাওয়া (আ) এবং ইবলিশ উভয়েই আল্লাহকে অমান্য করেছিল। কিন্তু পার্থক্য তৈরী হল তাদের মনোভাবে যখন তারা তাদের ভুল সম্পর্কে সচেতন হল। আদম ও হাওয়া (আ) অতিসত্বর অনুতপ্ত হলেন এবং বললেন,

তারা উভয়ে বললঃ হে আমাদের পালনকর্তা আমরা নিজেদের প্রতি জুলম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব। (সূরা আ’রাফ ৭: ২৩)

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন এবং সঠিক পথের নির্দেশনা দেন এবং তাদেরকে অন্যদের পথ নির্দেশনার উৎস বানিয়ে দেন।

অন্যদিকে ইবলিশ অনুতপ্ত ছিল না বরং সে আল্লাহর কাছে সময় চেয়ে নিল, বললঃ

সে (ইবলিশ) বললঃ আমাকে কেয়ামত দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। (সূরা আ’রাফ ৭: ১৪)

আজ আমাদেরকে যদি আমাদের খারাপ কাজ ছেড়ে দিতে বলা হয়, তবে আমরা সময় চেয়ে নেই। আমাদের ভেবে দেখা উচিত আমরা কার মনোভাবের পুনরাবৃত্তি করছি – হযরত আদম ও হাওয়া (আ) নাকি ইবলিশ (শয়তান) এর? অন্যায়ের উপর অটল থাকা (Israar ala al ma’asee) খারাপ পরিণতির কারণ (Soo al Khaatima)।

আরবীতে বলা হয়, ‘La kabeera ma’al Istighfaar wa la Shagheera ma’al Israar’ অর্থ্যাৎ তওবার চেয়ে বড় এবং গোয়ার্তুমির চেয়ে ছোট কোন গুনাহ নেই। পাপের উপর অটল থাকার ফলে হেদায়াতের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় এবং আমাদের উপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। যারা নিজেদেরকে সংশোধনকে প্রত্যাখ্যান করে পাপের উপর অটল থাকে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ

অতঃপর তারা যখন ঐ উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকে দেয়া হয়েছিল, তখন আমি তাদের সামনে সব কিছুর দ্বার উম্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি, যখন তাদেরকে প্রদত্ত বিষয়াদির জন্যে তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়ল, তখন আমি অকস্মাৎ তাদেরকে পাকড়াও করলাম। তখন তারা নিরাশ হয়ে গেল। (সূরা আল আনআম ৬: ৪৪)

আল্লাহ তায়ালা হলেন ঘায়ুর (গর্বিত, সম্মানিত) এবং আমাদের নিজেদেরকে সংশোধনের একাধিক সুযোগ দেয়ার পরেও যখন আমরা তার বিরোধিতাকে আঁকড়ে ধরে থাকি,  তখন তিনি হেদায়াতের দরজা বন্ধ করে দেন। পরিবর্তে তিনি তার জন্য বিরুদ্ধাচরনের সকল দরজা খুলে দেন যাতে সে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয় এবং তারপর যখন হঠাৎ একসময় মৃত্যু তার সামনে উপস্থিত হয় তখন তার কাছে তওবা করার কোন সুযোগ অবশিষ্ট থাকে না। আল্লাহ আমাদের এমন করুণ পরিণতি থেকে হেফাজত করুক।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সকল প্রকার অবাধ্যতা ও পাপ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। কোন পাপকেই ছোট বা ক্ষুদ্র জ্ঞান করা উচিত নয় কারণ যে কোন পাপই আল্লাহর অবাধ্যতার নিদর্শন এবং এ ধরনের মনোভাব খুবই গুরুতর। তাই নির্দিষ্ট কোন কাজ নয় বরং আমাদের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত কারণ এটিই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।

সকল পাপের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হল শিরক করা এবং কেউ যদি এর উপর মৃত্যুবরণ করে তাহলে আল্লাহ তার সকল পাপ ক্ষমা করলেও এই পাপ ক্ষমা করবেন না।

দ্বীনের যে সকল বিষয় আমাদের ভালো লাগে সেগুলো পালন করা এবং যেগুলো ভালো লাগে না তা ত্যাগ করার দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদেরকে বিশেষভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন। এটি অহংকারের চুড়ান্ত রূপ এবং আল্লাহর ক্রোধের কারণ। বর্তমান সময়ে এমন অনেক মুসলমান রয়েছে যারা ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে এমন সব কিছুকে বৈধ করে নিয়েছে এবং তারা প্রার্থনাও করে। যারা আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা ত্যাগ করে না তারা কিভাবে তার সামনে দাড়িয়ে বলে, ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন (আমরা কেবল তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য চাই)। এ ধরনের ঔদ্ধত্য – নিজেদের ইচ্ছামত বেছে নেয়া – এই দুনিয়া এবং আখিরাত দুদিকেই শাস্তির দিকে নিয়ে যায়।

তাই আল্লাহর অবাধ্যতা এবং রাসূল (স) এর সুন্নাহের বিপরীত এমন সব কিছু আমাদের অবিলম্বে পরিত্যাগ করা উচিত এবং দ্রুত তওবা করা ও ইস্তেগফার করা খুবই জরুরী। কতদিন ধরে এই কাজ করা উচিত? যতদিন আমরা বেঁচে থাকার আশা করি ততদিন।

তওবা মানে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার দিকে ফিরে আসা এবং ইস্তেগফার হল আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে ফিরে আসার উপায়। এ দুটি সম্পর্কযুক্ত এবং একটি আরেকটিকে অনুসরণ করে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এ বিষয়ে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, আমি সেটি এখানে উল্লেখ করছি।

তওবা ও ইস্তিগফারের অর্থ

স্কলাররা তওবা (ক্ষমাপ্রার্থনা) বলতে নিন্মলিখিত বিষয়গুলোকে বুঝিয়েছেন: ১) পাপকে পরিত্যাগ করা ২) পাপের দিকে পুনরায় ফিরে না আসার ব্যাপারে দৃঢ় ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞা ৩) কৃত পাপের জন্য অনুশোচনা করা, এবং, যদি পাপটি অন্য কোন মানুষের অধিকারের বিপরীত হয়, তাহলে ৪) তার ক্ষতিপূরণ করা। এগুলো তওবা বা ক্ষমাপ্রার্থনার শর্ত হিসেবে বিবেচিত। তবে, আল্লাহ ও তার রাসূল (স) বর্ণিত তওবার অর্থ আরও ব্যাপক, এবং উপরের উল্লিখিত বিষয়গুলো ছাড়াও ধৈর্য্যসহকারে আল্লাহর সকল নির্দেশ মেনে চলাও এর অন্তর্ভূক্ত। যারা তওবা করতে অনাগ্রহী তাদের অপছন্দ করা এবং তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করা, তাদেরকে তওবার জন্য উদ্বুদ্ধ করা এবং ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসকে উপেক্ষা না করার ব্যাপারে পরামর্শ দেয়াও তওবার অন্তর্ভূক্ত। তাও তওবা হল প্রতিদিন পাপ সংগঠনের বিপরীত এবং সাধারনভাবে শুধু পাপ ত্যাগ করা এবং এর জন্য অনুশোচনা করা নয়।

তওবার সারমর্ম হল আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং তিনি যা পছন্দ করেন তা পালন করা এবং যা অপছন্দ করেন তা ত্যাগ করা। তওবা হল অপছন্দনীয় থেকে পছন্দনীয়ের দিকে, অবাধ্যতা থেকে বাধ্যতার দিকে, আল্লাহর ক্রোধ থেকে দয়ার দিকে প্রত্যাবর্তন (হিজরত) করা।

ইস্তিগফার এবং তওবা

ইস্তিগফার মানে ক্ষমা চাওয়া এবং তওবা মানে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন। যখন কেউ তার ভুল বুঝতে পারে তখন সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং তারপর আল্লাহর বাধ্যগত হয়ে যায় এবং তার কাজের মাধ্যমে সে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী যে কারোর জন্য দুটোই করণীয়। তাকে অবশ্যই আল্লাহর সামেন তার ভুল, পাপ এবং খারাপ কাজ স্বীকার করতে হবে এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। একই সাথে তাকে অবশ্যই শর্তহীনভাবে খারাপ কাজগুলো ত্যাগ করতে হবে এবং ্আল্লাহর অনুগত হতে হবে। যেমন কেউ যদি নামাজ না পড়ে তাহলে সে সে সবচেয়ে খারাপ কাজগুলোর একটি করার দোষে দুষ্ট। যখন সে তার কৃতকর্মের গুরুত্ব সম্পর্কে উপলবদ্ধি করতে সক্ষম হবে, তখন সে তওবা করবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে। তারপর সে নিয়মিতভাবে নামাজ পড়া শুরু করবে। অর্থ্যাৎ সে ক্ষমা চাইল (ইস্তিগফার) করল এবং নামাজ পড়া শুরু করলো (তওবা)। নিয়মিত নামাজ পড়াই হল তার তওবা যা ছাড়া তার ইস্তিগফারের কোন গুরুত্বই নেই।

কোরআনে ইস্তিগফার, যার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা, শব্দটি দুইভাবে বর্ণিত হয়েছে। হয় শুধু ইস্তিগফার অথবা তওবার সাথে মিলে। শুধুমাত্র ইস্তিগফারের ব্যবহার পাওয়া যাবে নিচের আয়াতে যেখানে হযরত সালেহ তার জাতির উদ্দেশ্যে বলেছে,

সালেহ বললেন, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণ কামনা করছ কেন? তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছো না কেন? সম্ভবত: তোমরা দয়াপ্রাপ্ত হবে।(সূরা নামল ২৭:৪৬)

আল্লাহ আরও বলেন,

আর আল্লাহর কাছেই মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়। (সূরা বাকারা ২:১৯৯)

এবং তিনি বলেছেন ক্ষমাপ্রার্থনা কোন মানুষকে তার ক্রোধ থেকে রক্ষা করে:

অথচ আল্লাহ কখনই তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনও তাদের উপর আযাব দেবেন না। (সূরা আনফাল ৮:৩৩)

তওবার সাথে মিলে ইস্তেগফারের ব্যবহার নিচের আয়াতগুলোতে পাওয়া যায়:

আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তা সমীপে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অনন্তর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উৎকৃষ্ট জীবনোপকরণ দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী করে দেবেন আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের উপর এক মহা দিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি।(সূরা হুদ ১১:৩)

আর হে আমার কওম! তোমাদের পালন কর্তার কাছে তোমরা ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতঃপর তাঁরই প্রতি মনোনিবেশ কর; তিনি আসমান থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি ধারা প্রেরণ করবেন এবং তোমাদের শক্তির উপর শক্তি বৃদ্ধি করবেন, তোমরা কিন্তু অপরাধীদের মত বিমুখ হয়ো না।(সূরা হুদ ১১:৫২)

আর সামুদ জাতি প্রতি তাদের ভাই সালেহ কে প্রেরণ করি; তিনি বললেন, হে আমার জাতি। আল্লাহর বন্দেগী কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন উপাস্য নাই। তিনিই যমীন হতে তোমাদেরকে পয়দা করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন। অতএব; তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে চল আমার পালনকর্তা নিকটেই আছেন, কবুল করে থাকেন; সন্দেহ নেই। (সূরা হুদ ১১:৬১)

কেউ যদি পাপ করতেই থাকে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় (এর শর্তসমূহ পূরণ না করেই), তবে এটি সত্যিকারের ইস্তিগফার নয় এবং এটা তাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবে না। ইস্তিগফারের মধ্যে তওবা অন্তর্ভূক্ত, এবং তওবার মধ্যে ইস্তিগফার: প্রত্যেকটি অন্যটির মধ্যে উহ্য আছে।

ইস্তিগফার শব্দের এই যে ব্যপকতা এর মধ্যে বর্ম বা আড়ালের জন্য ক্ষমা চাওয়ার এ অর্থও অন্তর্ভূক্ত – আমাদের মানবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ক্ষতিকর এবং ধ্বংসাত্মক ভুল থেকে আড়াল বা রক্ষা করা। মানুষের সবচে বড় এবং ক্ষতিকর ত্রুটি-বিচ্যুতি হল অজ্ঞতা এবং পাপ। এই অজ্ঞতা এবং পাপের কারণে মানুষ এমন পর্যায়ে নেমে যায় যা তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এই দুই ধরনের ত্রুটি থেকে রক্ষা করার বর্ম হল নিজের ভুল সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিজের মধ্যে স্রষ্টা প্রদত্ত জ্ঞান, সুবিচার এবং ধার্মিকতা স্পষ্ট করা। আল্লাহ মানুষের মধ্যে রূহ ফুঁকে দেয়ার মাধ্যমে যে মর্যাদা দান করেছেন মানুষ যত তা ভুলে যাবে ততই সে নিজেকে পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনবে এবং ততই তার অজ্ঞতা এবং পাপ বৃদ্ধি পাবে।

যখন তওবা এবং ইস্তিগফার শব্দ দুটো একত্রে ব্যবহৃত হয় (ইস্তিগফার এর পরে তওবা), তখন একটির (ইস্তিগফার) অর্থ হল যা ঘটে গেছে তার মন্দ ও ক্ষতি থেকে প্রতিরক্ষা চাওয়া এবং দ্বিতীয়টির (তওবা) অর্থ হল আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতের মন্দ থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা করা। এখানে দুটো বিষয় দেখা যাচ্ছে – একটি হল সেই পাপ যা  ইতোমধ্যেই সংগঠিত হয়েছে, ইস্তিগফার হল তার ক্ষতি থেকে সুরক্ষা প্রার্থনা এবং অন্যটি হল,  একই পাপের ভবিষ্যত পুনরাবৃত্তি যার ভয় আমরা করছি, তওবা হল তা আর না করার দৃঢ় সংকল্প। আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণরূপে ফিরে যাওয়ার (রূজু) ক্ষেত্রে এ দুটোরই প্রয়োজন – ইস্তিগফার এবং তওবা। যখন একত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন দুটোই আলাদাভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার গুরুত্ব প্রকাশ করে, অনথায়, যখন একাকী ব্যবহৃত হয়, তখন প্রত্যেকটি অন্যটিকেও বুঝিয়ে থাকে।

তওবার সবচে বড় উপকার হল এটি নিজেই আমাদেরকে আল্লাহর সাথে সংযুক্ত করে, নিজেই আমাদের জীবনের প্রতি আমাদের মনযোগ নির্দিষ্ট করে, কারণ তওবা করার সময় আমরা আমাদের জীবনে কৃতকর্মের হিসাব করে নেই। তওবা আমাদের মধ্যে নম্রতা প্রতিষ্ঠিত করে এবং সেই সত্যের প্রতি আমাদের মনযোগ আকর্ষন করে যে একদিন আমরা মৃত্যুবরণ করবো এবং আল্লাহর দিকে ফিরে যাবো।

তবে কোনভাবেই আল্লাহর দয়া থেকে হতাশ হওয়া যাবে না। তিনি বলেছেন,

বলো, (আল্লাহ বলেছেন) ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। তিনি অতীব ক্ষমাশীল, পরমদয়ালু।’ (সূরা জুমার ৩৯:৫৩)

আমাদের আক্বীদা হল যতক্ষন পর্যন্ত কেউ নিষ্ঠার সাথে ক্ষমা চায় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সকল গুহান ক্ষমা করে দেবেন এবং তাই ্আমাদের কখনোই আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হই না।যখন আমরা অনুশোচনা করতে অস্বীকার করি এবং বিরোধিতা ও মাত্রাতিরিক্ত এবং পাপ করতে শুরু করি তখন হিদায়াতের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং এ ধরনের কাজ আমাদেরকে কুফরের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ বলেছেন,

নিশ্চিতই যারা কাফের হয়েছে তাদেরকে আপনি ভয় প্রদর্শন করুন আর নাই করুন তাতে কিছুই আসে যায় না, তারা ঈমান আনবে না। আল্লাহ তাদের অন্তকরণ এবং তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছেন, আর তাদের চোখসমূহ পর্দায় ঢেকে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। (সূরা বাকারা ২:৬-৭)

তওবা কবুল হওয়ার তিনটি শর্ত রয়েছে।

১. যিনি তওবা করছেন তাকে প্রকৃতভাবেই অনুশোচনাকারী ও অনুতপ্ত হতে হবে এবং যে কাজের জন্য তওবা করছে তাকে ঘৃণা করতে হবে। আদম এবং হাওয়া (আ) এর ক্ষেত্রে তারা আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হন এবং তৎক্ষনাত আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। তারা তাদের কাজকে ন্যয়সঙ্গত প্রমাণ করার কোন চেষ্টা করেন নি। তারা দেরী করেন নি কিংবা সময় চান নি। তারা আল্লাহকে অমান্য করার গুরুত্ব অনুভব করেছিলেন কারণ তারা আল্লাহর মহিমা এবং শ্রেষ্ঠত্ব অনুভব করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই দৃষ্টিকোন থেকে কোন পাপই ‘ক্ষুদ্র’ নয় কারণ সকল পাপই আল্লাহর অবাধ্যতা আর তিনি ‘ক্ষুদ্র’ নন।

২. যিনি তওবা করছেন তাকে একই কাজের পুনরাবৃত্তি না হওয়া নিশ্চিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। আদম এবং হাওয়া (আ) কতবার আল্লাহকে অমান্য করেছিলেন? একবার। তারা তাদের দীর্ঘ জীবনে সেই একবারের পর আর কখনো পাপ করেন নি। পাপের পুনরাবৃত্তি না করা ক্ষমা চাওয়ার আন্তরিকতার চিহ্ন।

৩. যিনি তওবা করছেন তাকে পাপের কারণে কারও ক্ষতি হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে, যেমন তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া, তাদের সম্পদ ফিরিয়ে দেয়া বা ক্ষতিপূরণ করা। কখনো কখনো পাপের প্রকৃতি এমন হয় যে তা অন্যের বস্তুগত বা অন্যভাবে ক্ষতি সাধণ করে। এ ক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই সংশোধণ করতে হবে এবং উক্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ করতে হবে ও তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। এ কাজটি ছাড়া আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না কারণ সে যার প্রতি অন্যায় করেছে সে আল্লাহ নয়, অন্য কেউ। যখন মানুষের অধিকার ভঙ্গ করা হয়, তখন যার অধিকার ভঙ্গ করা হয়েছে সে প্রথমে ক্ষমা না করলে আল্লাহ ভঙ্গকারীকে ক্ষমা করবেন না। এটা করা না হলে, শেষ বিচারের দিন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা অধিকার ভঙ্গকারীর ভালো কাজগুলোকে ক্ষতিগ্রস্থকে দিয়ে দিবেন এবং ক্ষতিগ্রস্থের খারাপ কাজগুলোকে অধিকার ভঙ্গকারীর উপর চাপিয়ে দিবেন এবং তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।

যারা তওবা করেন, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুহাবানাহু তায়ালার দয়ার দৃষ্টান্ত এরকম:

যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের পালনকর্তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আপনার রহমত ও জ্ঞান সবকিছুতে পরিব্যাপ্ত। অতএব, যারা তওবা করে এবং আপনার পথে চলে, তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের পালনকর্তা, আর তাদেরকে দাখিল করুন চিরকাল বসবাসের জান্নাতে, যার ওয়াদা আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, পতি-পত্নী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে তাদেরকে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। এবং আপনি তাদেরকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করুন। আপনি যাকে সেদিন অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন, তার প্রতি অনুগ্রহই করবেন। এটাই মহাসাফল্য। (সূরা আল মু’মিনুন ৪০:৭-৯)

যারা তওবাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে মহান রাব্বুল আলামীন তাকে কেবল মাফ করে দেয়াই নয় বরং তার পাপকে পূণ্যে রূপান্তরিত করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তত করে এবং দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আল ফুরক্বান ২৫:৭০)

রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তওবা করা এবং প্রতিনিয়ত তার ক্ষমাপ্রার্থনার তৌফিক দিন। তিনি আমাদের ইস্তিগফার কবুল করুন এবং আমাদের এমন জীবন যাপনে সহায়তা করুন যেন তার সামনে অপমানিত অবস্থায় উপস্থিত হতে না হয় এবং তার দয়া যেন তার ক্রোধ থেকে সুরক্ষাকারী হয়। সকল আধ্যাত্মিক উন্নতি শুরু হয় আল্লাহর দিকে ফেরার মাধ্যমে এবং এ কারণে আমি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করলাম।

সবর এবং শোকর (ধৈর্য্য এবং কৃতজ্ঞতা)

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হল আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। মানুষ কেবল তখনই সন্তুষ্ট এবং অন্তরের শান্তি লাভ করে যখন যে আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হয়। এ কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

যখন তোমাদের পালনকর্তা ঘোষণা করলেন যে, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। (সূরা ইব্রাহিম ১৪:৭)

তওবা করার তাওফিক এবং সুযোগ দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। যদি আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা তওবার পথ খোলা না রাখতেন তাহলে আমাদের কি হত? একজন মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের জন্য যত বেশি শোকর গুজার হবে, তত বেশি সে এই নেয়ামত সম্পর্কে জানবে এবং আল্লাহকে ভালোবাসবে। কৃতজ্ঞতা আল্লাহর বিশালতা ও গরিমা সম্পর্কে এবং এই পৃথিবীর স্রষ্টা ও মালিক যে মানুষের প্রতি দয়াবান সেই সচেতনতা বৃদ্ধি করে। কৃতজ্ঞতার সবচে বড় পুরস্কার হল মানুষ যে কারণে কৃতজ্ঞ তা আরও উপভোগ্য হয় এবং অকৃতজ্ঞতার প্রথম শাস্তি হল তার আনন্দ কেড়ে নেয়া, ফলে মানুষ তার যা আছে তা নিয়ে সুখী হতে পারে না এবং স্ব-নির্যাতনের যন্ত্রনায় ভুগতে থাকে।

শোকর বা কৃতজ্ঞতা সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো এটা তা অধিকার এবং তিনি এর পুরস্কার দিবেন তার নেয়ামতকে আরও বাড়িয়ে দিয়ে। পবিত্র কুরআনে বিসমিল্লাহ’র পর একদম প্রথম আয়াতটিই শোকরের আয়াত: আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন (সকল প্রশংসা এবং কৃতজ্ঞতা পৃথিবীর রব আল্লাহ’র প্রতি)। আল্লাহ কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ‌উপকারের কথাই বলেন নি, আল্লাহ এ কথাও বলেছেন যে এমনটি না করার ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বলেছেন এবং এজন্য তিনি ‘কুফর’ (অস্বীকার করা) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ ধরনের কাজের জন্য তিনি তাঁর শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন।

মজার ব্যাপার হল, আল্লাহ তায়ালা যারা সবর (ধৈর্য্য) করবে তাদেরকে সাহায্য করা এবং পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হবে শোকর। এ কারণে সবর এবং শোকর পারস্পরিক-সম্পর্কযুক্ত।

হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন। (সূরা বাকারা ২:১৫৩)

আর আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে।(সূরা আনফাল ৮: ৪৬)

সবর (ধৈর্য্য) আর শোকর (কৃতজ্ঞতা) অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ইসলামে সবর বা ধৈর্য্যের ধারনাটি অদ্বিতীয়। সাধারণভাবে ধৈর্য্য বলতে যা বোঝায়, অর্থ্যাৎ কঠিন সময়কে নিরবে সহ্য করা, সবর তা বোঝায় না। এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসলামে ধৈর্য্য বা সবর মানে যা ঘটছে তাকে অদৃষ্ট ধরে নেয়া নয়। এর মানে হল নিজের সর্বশক্তি এবং সামর্থ্য দিয়ে আল্লাহর জন্য প্রচেষ্টা চালানো এবং ফলাফলের জন্য তার উপর নির্ভর করাকে বোঝায়। আল্লাহ তায়ালা অনেক জায়গায় ‘মুজাহিদুন’ বোঝানোর জন্য ‘সাবিরুন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। একজন মুজাহিদ শুধু আল্লাহর সাহায্যের জন্য বসে থাকে না। সে তার কাছে যা আছে তাই নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় প্রচেষ্টা চালায় এবং আল্লাহর সাহায্যের জন্য দোয়া করতে থাকে। যে যুদ্ধ করছে সে কখনো বসে থেকে কষ্ট সহ্য করে না। সে সর্বদা সম্পূর্ণ জাগ্রত থাকে, বিভিন্ন কাজে জড়িত থাকে, চিন্তা ও পরিকল্পনা করে এবং যুদ্ধে জয়ের জন্য তার সর্বোচট্ট প্রচেষ্টা চালায়। সকল প্রচেষ্টার শেষে তে তার রবের দরবারে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করে কারণ সে জানে তার সাহায্য ছাড়া কোন কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।

সবর মানে কাজ করা; সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো এবং তারপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। সবরের এই ধারনাটি রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে বদরের যুদ্ধে দেখতে পাওয়া যায় যখন তিনি সামান্য উপকরন দিয়ে তাঁর পক্ষে যতটুকু সম্ভব সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করার পর আল্লাহর দরবারে দাঁড়ান এবং তার বিখ্যাত দুয়াটি করেন। রাসুলুল্লাহ (স) আল্লাহর কাছে সাহায্যের জন্য নিরন্তর দোয়া করেন এবং বলেন, “হে আল্লাহ! আত্মাভিমানী এবং উদ্ধত কুরাইশরা  তোমার স্পর্ধা করে এবং তোমার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এখানে উপস্থিত হয়েছে। হে আল্লাহ, আপনি যে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আমি তার প্রতীক্ষায় রয়েছি। আমি আপনার কাছে মিনতি করছি, আল্লাহ আপনি তাদের পরাজিত করে দিন। হে আল্লাহ! আজ যদি মুসলমানদের এই দল পরাজিত হয়, তাহলে এই দুনিয়ায় তোমার ইবাদত করার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।”

তিনি কিবলার দিকে মুখ করে দুই হাত ছড়িয়ে তাঁর রবকে ডাকতে লাগলেন যতক্ষন না পর্যন্ত তার চাদর কাঁধ থেকে পড়ে গেল। তখন আবু বকর (রা) এসে চাদরটি তুলে রাসূলুল্লাহ (স) এর কাঁধে পড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স), আপনি আপনার রবের নিকট যথেষ্ট কান্নাকাটি করেছেন। তিনি অবশ্যই তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন।”

অবিলম্বেই আল্লাহর সহায়তা পাওয়া গেল, তিনি বেহেশত থেকে ফেরেশতাদের পাঠালেন রাসূল (স) এবং তার সাথীদেরকে সহায়তা করার জন্য। আল্লাহ বলেন,

যখন নির্দেশ দান করেন ফেরেশতাদিগকে তোমাদের পরওয়ারদেগার যে, আমি সাথে রয়েছি তোমাদের, সুতরাং তোমরা মুসলমানদের চিত্তসমূহকে ধীরস্থির করে রাখ। আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দেব। কাজেই গর্দানের উপর আঘাত হান এবং তাদেরকে কাট জোড়ায় জোড়ায়। (সূরা আনফাল ৮:১২)

তোমরা যখন ফরিয়াদ করতে আরম্ভ করেছিলে স্বীয় পরওয়ারদেগারের নিকট, তখন তিনি তোমাদের ফরিয়াদের মঞ্জুরী দান করলেন যে, আমি তোমাদিগকে সাহায্য করব ধারাবহিকভাবে আগত হাজার ফেরেশতার মাধ্যমে। (সূরা আনফাল ৮:০৯)

রাসূলুল্লাহ (স) হেলান দেয় অবস্থায় কিছুটা তন্দ্রাবস্থায় ছিলেন,  তারপর তিনি মাথা তুললেন, তার চোখে আনন্দের অশ্রু: হে আবুবকর, তোমাকে অভিনন্দন। আল্লাহর বিজয় সন্নিকটে। বালুঝড়ের গভীরে আমি ঘোড়ায় বসা জিবরাইলকে (আ) দেখতে পাচ্ছি। তারপর তিনি তেলাওয়াত করলেন,

এ দল তো সত্ত্বরই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। (সূরা কামার ৫৪:৪৫)

জীবরাইল (আ) এর নির্দেশনা অনুযায়ী রাসূল (স) এক মুঠো নুড়ি-বালি তুলে নিলেন, শত্রুদের দিকে ছুড়ে মারলেন এবং বললেন, ‘বিভ্রান্তি তাদেরকে পাকড়াও করুক’। যেইমাত্র তিনি ধূলি নিক্ষেপ করলেন, এক ভয়ানক বালিঝড় বিস্ফোরিত অগ্নিকণার ন্যায় শত্রুদের চোখে পড়তে লাগল।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

আর তুমি মাটির মুষ্ঠি নিক্ষেপ করনি, যখন তা নিক্ষেপ করেছিলে, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ স্বয়ং। (সূরা আনফাল: ৮: ১৭)

হাদীসের বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে সেদিন প্রকৃতপক্ষেই ফেরেশতারা নাজিল হয়েছিলেন এবং মুসলমানদের পক্ষে লড়াই করেছিলেন। ইবনে আব্বাস বলেন: সেদিন যখন একজন মুসলমান একজন কাফেরকে তাড়া করছিল, তখন সে তার উপর চাবুকের আওয়াজ শুনতে পেল যার এবং একজন ঘোড়সওয়ার আরোহী বলছিল: মারো হাইজুম। তিনি দেখলেন শত্রুসৈন্য মস্তকচ্ছিন্ন হয়ে লুটিয়ে পড়ল। একজন আনসার রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে এলেন এবং ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। রাসূল (স) বললেন, ‘তুমি সত্য বলেছো। এটা ছিল তৃতীয় জান্নাতের পক্ষ থেকে সহায়তা।’ বদরে রাসূলুল্লাহ (স) বিপদআপদের মুখোমুখি হলে সালাত এবং সবরের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার কুরআনিক নির্দেশনার সংক্ষিপ্তসার প্রদর্শন করেছিলেন। তিনি সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং তারপর তার রবকে ডেকেছিলেন।

আল্লাহর ভালোবাসা

যখন কেউ তওবা ও ইস্তেগফার করে এবং প্রতিনিয়ত আল্লাহকে তাঁর অনুগ্রহের শোকর করে, এটা স্বাভাবিক যে সে আল্লাহকে ভালোবাসতে শুরু করবে। তবে, আল্লাহর ভালোবাসার সাথে অন্যান্য ভালোবাসাকে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা হল ইবাদত এবং এটা তার নিজস্ব উপায়ে হয়। এটা আমরা যেরকম চাই সেরকমভাবে প্রকাশ বা স্বীকার করার মত কিছু নয়। যে সকল মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসে তারা সর্বদা তাঁর অনুগত এবং তার প্রদত্ত নেয়ামত তার অবাধ্যতায় কখনো ব্যবহার করে না। আল্লাহ আমাদের যা দিয়েছেন – আমাদের জীবন, সময়, সামর্থ্য, সম্পদ, শিক্ষা, ক্ষমতা এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি – তার অবাধ্যতায় ব্যবহার করা অকৃতজ্ঞতার সর্বোচ্চ বহি:প্রকাশ। একারণেই আল্লাহর নৈকট্যের উপায় হল কাসরাতুস সুজুদ – বেশি বেশি সিজদা করা। সিজদা হল মুসলমানদের আইকনিক সিম্বল যার মাধ্যমে সে কোন প্রকার সংকোচ এবং শর্ত ছাড়াই সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। ঠিক এ কারণেই আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা হারাম, মুসলমানের জন্য তার স্রষ্টা ব্যতীত অন্য কারও নিকট নিজেকে উপস্থাপন করা এবং অসহায় সমর্পণ করার অনুমতি নেই। এর বিপরীত করার অর্থ মানবতার অপমান এবং কেবলমাত্র আল্লাহ-ই যে এরূপ আনুগত্যের যোগ্য সেই সত্যকে অস্বীকার করা। সকল ইবাদত কেবল আল্লাহরই জন্য, তিনি ছাড়া অন্য কেউ বা কিছুই ইবাদতের যোগ্য নয়।

প্রশ্ন হল, কিভাবে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া সম্ভব? এর জবাব আল্লাহ তায়ালা নিজেই দিয়েছেন, যখন তিনি তাঁর রাসূলকে বলেন:

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু। (সূরা আল ইমরান ৩: ৩১)

স্রষ্টার প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হল তার প্রতি অনুগত হওয়া এবং তার রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করা। আমরা যখন তা করবো, আল্লাহ আমাদের ভালোবাসবেন। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের এটাই চাবিকাঠি।

আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়া এবং তার সাথে সংযোগ স্থাপনের উপায় হল তার প্রতি অনুগত হওয়া এবং তার রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণ করা। এ ব্যাপারে আমাদের মনে কোন প্রকার সন্দেহ থাকা উচিত নয়। যদি কেউ মনে করে যে সে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কিংবা তার রাসূলের সুন্নাহ উপেক্ষা করে বা সুন্নাতের বিপক্ষে গিয়েও তা’ল্লুক মা’ল্লাহ (আল্লাহর সাথে সংযোগ) বজায় রাখতে সক্ষম হবেন তাহলে সে নিজেকে বোকা বানালো। আল্লাহ বলেন সবকিছুকে অতিক্রম করে তাকে ভালোবাসাই ঈমানের পরিচায়ক। একজন ঈমানদার ব্যক্তি যে কোন ব্যক্তি ও যে কোন কিছুর চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসেন এবং তার প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যের মাধ্যমেই তা প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন:

আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশী। আর কতইনা উত্তম হ’ত যদি এ জালেমরা পার্থিব কোন কোন আযাব প্রত্যক্ষ করেই উপলব্ধি করে নিত যে, যাবতীয় ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য এবং আল্লাহর আযাবই সবচেয়ে কঠিনতর। (সূরা বাকারা ২: ১৬৫)

আল্লাহর কোন নির্দেশ শুনলে ঈমানদারদের অবস্থা কি হয় আল্লাহ সে সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন :

তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরা বাকারা ২: ২৮৫)

এবং আল্লাহ তাদের সম্পর্কেও জানিয়ে দিয়েছেন যারা তাদের ইচ্ছা-আকাঙখাকে তাঁর নির্দেশের তুলনায় অগ্রাধিকার দেয় এবং বলে :

আপনি কি তাকে দেখেন না, যে তারা প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ শোনে অথবা বোঝে ? তারা তো চতুস্পদ জন্তুর মত; বরং আরও পথভ্রান্ত। (সূরা ফুরকান ২৫: ৪৪)

দুইদলের মধ্যবর্তী রেখা স্পষ্ট। আমরা কোন দিকে যেতে চাই সেটা আমাদেরকেই বেছে নিতে হবে।

আল্লাহ তার বান্দাদের মধ্যে কাদের নিকটবর্তী বলে দিয়েছেন :

নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন, যারা পরহেযগার এবং যারা সৎকর্ম করে। (সূরা নাহল ১৬: ১২৮)

যারা আল্লাহকে ভালোবাসে এবং তার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন :

সেদিন প্রত্যেকেই যা কিছু সে ভাল কাজ করেছে; চোখের সামনে দেখতে পাবে এবং যা কিছু মন্দ কাজ করেছে তাও, ওরা তখন কামনা করবে, যদি তার এবং এসব কর্মের মধ্যে ব্যবধান দুরের হতো! আল্লাহ তাঁর নিজের সম্পর্কে তোমাদের সাবধান করছেন। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু। (সূরা আল ইমরান ৩: ৩১)

আল্লাহ এমন একটি সম্পর্কযুক্ত দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন যেখানে আমাদের সকল কর্মকাণ্ডের দুই ধরণের পরিণতি রয়েছে : দুনিয়াতে উপকার অথবা ক্ষতি এবং আখিরাতে পুরস্কার অথবা শাস্তি। প্রত্যেকটি কাজই দুই ধরণের ফলাফল তৈরি করে। একটি এই দুনিয়ায় এবং অন্যটি আখিরাতে পাওয়া যাবে।

মনে রাখা উচিত আল্লাহ যখন তার বান্দাকে ভালোবাসেন, তার ভালোবাসা এই পৃথিবী এবং তাঁর সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। অন্যদিকে, যখন আল্লাহ তার কোন বান্দাকে অপছন্দ করেন, তার ঘৃণা এই দুনিয়া এবং এর সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মানুষ আমাদের ভালোবাসবে, সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে নাকি ঘৃণা, অপমান ও অসম্মান করবে তা নির্ধারিত হয় আল্লাহ আমাদের পছন্দ করেন না অপছন্দ তার উপর।

যারা মানুষকে নেতৃত্ব দিতে এবং প্রভাবান্বিত করতে আগ্রহী, তাদের অবশ্যই উপলব্ধি করা উচিত যে আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করা এবং তার প্রতি অনুগত হওয়া ব্যতীত তারা আশা করা ঠিক নয় যে মানুষ তাদের ভালোবাসবে।

হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: “যদি আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা তার কোন বান্দাকে পছন্দ করেন, তিনি জীবরাইল (আ) কে ডেকে বলেন, আমি অমুককে ভালোবাসি, তাই তুমিও তাকে ভালোবাসো।

If Allah loves a slave [of His], He calls Jibreel (AS) and says: ‘I love So-and-so, therefore love him.'” He (Rasoolullah) said: “So Jibreel loves him. Then he (Jibreel) calls out in heavens, saying: ‘Allah loves So-and-so, therefore love him.’ And the inhabitants of heaven love him.” He (Rasoolullah ) said: “Then acceptance is established for him on earth. And if Allah hates a slave [of His], He calls Jibreel (AS) and says: ‘I abhor So-and-so, therefore abhor him.’ So Jibreel abhors him. Then Jibreel calls out to the inhabitants of heaven: ‘Allah abhors So-and-so, therefore abhor him.'” He (Rasoolullah ) said: “So they abhor him, and hatred is established for him on earth.” [Muslim, Bukhari, Malik, and at-Tirmidhi]

হাদীসে কুদসী: আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন,

Allah said: Whosoever shows enmity to someone devoted to Me, I shall be at war with him. My slave draws not near to Me with anything more loved by Me than the religious duties I have enjoined upon him, and My slave continues to draw near to Me with supererogatory (Nawaafil) works so that I shall love him. When I love him I am his hearing with which he hears, his seeing with which he sees, his hand with which he strikes and his foot with which he walks. Were he to ask [something] of Me, I would surely give it to him, and were he to ask Me for refuge, I would surely grant him it. I do not hesitate about anything as much as I hesitate about [seizing] the soul of My faithful slave: he hates death and I hate hurting him. [Bukhari]

এই তিনটি পদক্ষেপ হল আমাদের অন্তরে তাওয়াককুল প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার উপায়।

রাসূলের সিরাতে তাওয়াককুলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ তার নবীত্বের শুরুর দিকে যখন রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘ওয়া সুবাহা!’

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন:

যখন ‘(হে নবী!) আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দিগকে সাবধান করুন’ আয়াতটি নাযিল হয়, তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাফা পাহাড়ে উঠলেন এবং হে বনী ফিহর! হে বনী আ’দী! বলিয়া কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রকে ডাক দিলেন, ইহাতে তাহারা সকলে সমবেত হল। অতঃপর তিনি বললেনঃ বল তো, আমি যদি এখন তোমাদিগকে বলি যে, এই পাহাড়ের উপত্যকায় একটি অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনী তোমাদের উপর আতর্কিতে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত রহিয়াছে, তবে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে? সমবেত সকলে বললঃ হাঁ, কারণ আমরা আপনাকে সর্বদা সত্যবাদীই পেয়েছি। তখন তিনি বললেনঃ আমি তোমাদিগকে সম্মুখে একটি কঠিন আযাব সম্পর্কে সাবধান করিতেছি।’ এই কথা শুনিয়া আবু লাহাব বললঃ সারাটা জীবন তোমার বিনাশ হউক। তুমি কি এইজন্যই আমাদিগকে একত্রিত করেছ? তখন تبت يدا ابى لهب وتب নাযিল হইল অর্থঃ আবু লাহাবের উভয় হাত ধ্বংস হউক এবং তাহার বিনাশ হউক। – (বুখারী, মুসলিম)

খেয়াল করুন, রাসূলুল্লাহ (স) বিভিন্ন উপায়ে তার বহুত্ববাদী সমাজের কাছে ইসলামকে উপস্থাপন করতে পারতেন। তিনি গোত্রের শ্রেষ্ঠত্ব এবং মহত্ব দাবী করতে পারতেন। তিনি অভিজাত গোত্রদের মধ্যে অভিজাত গোত্র – কুরাইশ গোত্রের অন্তর্গত বনু হাশিম গোত্র – এর সদস্য ছিলেন। তাই তিনি নিজেকে প্রথমে একজন গোত্রপ্রধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন এবং তারপর ইসলামের দাওয়াত দিতে পারতেন।

বিকল্পভাবে, তিনি সমাজ সংস্কারকের পথ অবলম্বন করতে পারতেন। তৎকালীন মক্কাকে সামাজিক অবক্ষয়ের আধিক্য, নিপীড়ন এবং পাপের স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মুহাম্মদ (স) প্রথমে এসবের বিরুদ্ধে বলতে পারতেন, নিজের পক্ষে অনেক লোক জমায়েত করার পর তারপর তার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের মতবাদ হিসেবে ইসলামের পরিচয় দিতে পারতেন।

সবশেষে তিনি ইসলামকে একটি বিকল্প ধর্ম, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন থিওরি, সত্যে পৌছানোর নতুন উপায়, রোমে যাওয়ার আরেকটি পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন। জান্নাতে পৌছানোর একমাত্র পথ, মুক্তির একমাত্র উপায়, একমাত্র সত্য ধর্ম যা ছাড়া আর কোন কিছুই শেষ বিচারের দিনে আল্লাহ’র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না – এমনভাবে উপস্থাপন না করলেও পারতেন। তিনি ইসলামকে বর্তমান সময়ের আরও অনেক নবযুগের তত্ত্বের ন্যয় একটি তত্ত্ব, যা একটি বহুত্ববাদী সমাজ সহজেই গ্রহণ করে, হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতেন।

তিনি এ ধরনের কিছুই করেন নি। তার কাছে যতরকম বিকল্প উপায় ছিল তার কোনটিই তিনি ব্যবহার করেন নি বরং সব কিছু থেকে সুস্পষ্ট অবস্থানে থেকে তিনি আহবান জানিয়েছেন, ‘মূর্তিপূজা ত্যাগ করো এবং কোন শরীক না করে কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত করো অথবা যখন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে তখনকার শাস্তির জন্য প্রস্তুত হয়ে যাও।’

এভাবে আহবানের ফলে তিনি একদিকে মক্কার সবাইকে তার শত্রুভাবাপন্ন করে তুললেন কারণ আদর্শের দিক থেকে তিনি তাদের ধর্মকে আঘাত করেছেন এবং এর অলীক রূপকে তুলে ধরেছেন। Its mythology stood out for what it was; a myth। এবং তিনি আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ধারনা উপস্থাপন করেছেন যার কাছে কোন কিছুই গোপনীয় নয়। যারা নিজেদের ক্ষমতা এবং সম্পদের জোরে তাদের ইচ্ছানুযায়ী যা খুশি করতে অভ্যস্ত ছিল তাদের জন্য এটা খুব সুখকর ধারনা ছিল না। সকল যুগেই ধনী এবং ক্ষমতাশালীরা কোন একদিন তাদেরকে জবাবদিহিতার জন্য ডাকা হবে এবং কৃতকর্মের জন্য মূল্য দিতে হবে এমন ধারনাকে ভালোভাবে নেয়নি। এ বিষয়গুলো মক্কার সাধারণ লোকদের কাছে, বিশেষত কুরাইশদের কাছে এতটাই অবাস্তব এবং বেমানান ছিল যে তারা তাৎক্ষনিক বিদ্রোহ করে বসল। কুরাইশরা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল কারণ তারা ছিল যাজক শ্রেণির, কা’বা ঘরের জিম্মাদার যেখানে তারা তাদের ৩৫০টি মূর্তি স্থাপন করেছিল; এদের উপাসনা, বিশেষ করে হজ্বের সময়, তাদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল

মুহাম্মদ (স) এর বাণী কেবলমাত্র তাদের বিশ্বাসকেই বিপন্ন করেনি বরং তাদের চোখে তারচেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাদের অর্থনীতির জন্যও হুমকীস্বরূপ ছিল, তারা এটা সহ্য করতে পারেনি। ফলে তারা তাদের সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধিতা করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (স) কেন ইসলাম প্রচারের জন্য ঠিক এ পদ্ধতি অনুসরণ করেছিল বোঝার একমাত্র উপায় হল কুরআন অধ্যয়ন এবং দেখা যে আল্লাহ’র অন্যান্য আম্বিয়াগণ কি করেছিলেন। তারা সকলেই একই কাজ করেছিলেন। তারা তাদের বার্তা কোনপ্রকার ঘুরপথে না গিয়ে বা প্রচ্ছন্নতার আশ্রয় না নিয়ে সুস্পষ্টভাবে এবং সরাসরি বর্ণনা করেছিলেন।

তাঁরা মানুষের কাছ থেকে কোন অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক পুরস্কার চাননি । তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালিত করেছিলেন কেবলমাত্র আল্লাহকে ভয় করে এবং কেবলমাত্র তার কাছ থেকেই পুরষ্কারের আশায়। কোনরকম পার্থিব পুরষ্কারের আশা ব্যতিরেকে ইসলামের প্রচার এবং শিক্ষাদানে তাদের স্পষ্টতা ছিল সকল যুগের আম্বিয়াগণের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য। যুগ যুগ ধরে আম্বিয়াগণ মানবজাতির পথপ্রদর্শনে যা করে এসেছেন, মুহাম্মদ (স) কেবল তার পুনরাবৃত্তি করেছেন। বর্তমান সময় পর্যন্ত আম্বিয়াগণের উত্তরাধিকারীগণ – জ্ঞানী ব্যক্তিরা যারা আল্লাহর বাণীকে মানবজাতির কাছে পৌছে দিয়েছেন – একই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। তারা স্পষ্টভাবে এবং সরাসরি বলেছেন এবং তারা মানুষের কাছ থেকে কোন পুরষ্কারের আশা বা বিনিময়ে এ কাজ করে গেছেন। যে কেউ এই প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনবে সে নিজেকে আম্বিয়াগণের মহিমান্বিত নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহ্য এবং এর সাথে যুক্ত আল্লাহর সাহায্য থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্নি করবে।

আমি যখনই রাসূলুল্লাহ (স) এর শক্তিশালী, গভীর, ধৈর্য্যশীল এবং অবিচল ঈমানের কথা চিন্তা করি, রাসূল (স) এর ইসলাম প্রচার শুরুর এই ঘটনাটি আমার ভাবনায় চলে আসে কারণ এটি সফলতার জন্য আল্লাহর উপর তাঁর পূর্ণ নির্ভরতার চিত্র অঙ্কিত করে যেখানে তিনি অন্য কোন কিছুকে, এমনকি তাঁর নিজস্ব ফয়সালাকেও, হস্তক্ষেপ করার সুযোগ না দিয়ে তাঁর প্রতি যে আদেশ করা হয়েছে তা অনুসরণ করেছেন।

আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা তাকে মানুষকে সতর্ক করার জন্য নির্দেশ করেছেন এবং তিনি তাই করেছেন। এমন না যে নিজস্ব বিবেচনাবোধ ব্যবহার করার খারাপ বা বেঠিক, কিন্তু যার উপর ওহী নাযিল হয় তার জন্য বিনাপ্রশ্নে অনুসরণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় নেই। একই যুক্তি বর্তমানে যারা সেই বাণীকে বহন করে চলেছেন অর্থ্যাৎ মুসলমানগণ, যারা সেই ঐশীবাণী, এর সত্যতা, যার উদ্দেশ্য সমগ্র মানবজাতি, এর ঐশ্বরিক উৎপত্তি এবং শেষ দিন পর্যন্ত এর অপরির্তনীয় ব্যবহারযোগ্যতার উপর বিশ্বাস করে, তাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। আমরা বাণীর মধ্যে কোন পরিবর্তন সাধন না করে আমাদের যা করতে বলা হয়েছে তা বিনাপ্রশ্নে পালন করি। এটি আমাদের নিজেদের সততাকেই প্রমাণ করে।

এই বৈশিষ্ট্যই পূর্বে যারা ওহীপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তাদের থেকে মুসলমানদেরকে পার্থক্য করে, কারণ তারা তাদের ঐশীবাণীতে, এর ব্যাখ্যায় এমন পরিবর্তন করেছিলেন যে তার ঐশ্বরিক গুণাবলী নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং খোদার কথা মানুষের কথায় পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। গত শত সহস্র বছরে মুসলমানদের কখনোই এই অপবাদের মুখোমুখি হতে হয়নি।

মক্কার তের বছরের নবীত্বের সময়কাল পুরোটাই ছিল ক্রমাগত নৈরাশ্য আর ব্যর্থতার সময়। কেউ যদি সম্ভাব্য সফলতার কোন দৃশ্যমান চিহ্ন খুঁজে, তাহলে কিছুই পাবে না। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (স) কিভাবে তার মিশন চালিয়ে গেলেন। তার প্রত্যয় এবং উদ্যম অফুরন্ত, রাতে দাঁড়াতেন রবের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য, আর দিনে কেউ যদি তার কথা শোনার জন্য থামতো, তবে তার কাছেই দাওয়াত পৌছাতেন – তা সে গ্রহণ করুক বা না করুক। তারা যেরকম প্রতিক্রিয়াই দেখাক বা যেরকম আচরনই করুক, তিনি কখনোই ধৈর্য্য হারাতেন না, রাগতেন না, তাদের বাজে আচরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না কিন্তু তিনি কখনোই তার মিশন থেকে সরে আসেন নি কিংবা প্রচারে সামান্য দুর্বলতার আশ্রয়ও নেন নি। তার এবং তার মিশনের জন্য কোন সাপ্তাহিক ছুটি বা বিরতি ছিল না – তিনি অবিরামভাবে দিনে ও রাতে কাজ করে গেলেন। সম্পূর্ণ এবং সর্বাত্মক ঈমান ছাড়া আর কি এমন প্রচেষ্টার কারণ হতে পারে? আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কার এই উচ্চতার শ্রেষ্ঠত্ব থাকতে পারে? আমাদের জীবনে শেখার মত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অন্যতম হল এই হতাশা এবং আপাতঃব্যর্থতার মুখে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করা। যে সবচে দ্রুতগতির সে নয়, দৌড়ে সেই জিতে যে সবচে বেশি ধৈর্যশীল। আমরা সহসাই হাল ছেড়ে দেই, দ্রুতই নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ি এবং দৃশ্যমান ফলাফলের প্রতি অতিরিক্ত ফোকাস দেই। আমরা ভুলে যাই, ইসলাম হৃদয়ে প্রবেশ করে এবং এই প্রবেশের বেশিরভাগ অংশই অদৃশ্য। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর জীবনী থেকে আমরা জানতে পারি ইসলাম কিভাবে অন্তরে প্রবেশ করে কিন্তু প্রকাশ্যে আসতে কিছু সময় লেগে যায়।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কখন ওমর (রা) এর অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দেন তার একটি ঘটনা রয়েছে। ঘটনাটি ওমর (রা) নিজেই বর্ণনা করেছেন। তিনি মদ্যপান করতেন এবং তার মদ্যপানের সঙ্গী-সাথী ছিল। এক গভীর রাতে, ওমর (রা) এর মদ্যপানের ইচ্ছা হল কিন্তু তিনি এজন্য কোন সঙ্গী পেলেন না। যেহেতু তার কিছু করার ছিল না, তিনি ঠিক করলেন কা’বা তাওয়াফ করবেন। গভীর রাত। তিনি যখন কা’বায় উপস্থিত হলেন, দেখলেন রাসূলুল্লাহ (স) কা’বার সামনে প্রার্থনায় দন্ডায়মান। ওমর (রা) কা’বার পেছন দিকে চলে গেলেন এবং এর কিসওয়া’র (পর্দা) আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন। তারপর গোপনে একদম রাসূলুল্লাহ (স) এর সামনে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি সালাতে দন্ডায়মান অবস্থায় আল হাক্বাহ তেলাওয়াতরত রাসূলুল্লাহ (স)-কে অ্যাম্বুশ করতে চেয়েছিলেন।

ওমর (রা) নিজেকে বললেন, এটা নিশ্চয়ই কোন কবির বয়ান। রাসূলুল্লাহ (স) তেলাওয়াত করলেন:

এটা কোন কবির কালাম নয়; তোমরা কমই বিশ্বাস কর! ً(আল হাক্কাহ ৬৯:৪১)

ওমর (রা) খুব অবাক হলেন, ভাবলনে, এটা অবশ্যই কোন ‘কাহিন’ (ভবিষ্যতবক্তা) এর বয়ান।

রাসূলুল্লাহ (স) আরও তিলাওয়াত করলেন:

এবং এটা কোন অতীন্দ্রিয়বাদীর কথা নয়; তোমরা কমই অনুধাবন কর। (আল হাক্কাহ ৬৯:৪২)

ওমর (রা) বিস্মিত হলেন এবং স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। এই ঘটনারও কয়েক বছর পরে তিনি সত্যি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণের বিখ্যাত ঘটনাটি আমরা সবাই-ই জানি। যারা জানেন না, তাদের জন্য আমি আরেকবার ঘটনাটি বর্ণনা করতে চাই। কারণ হৃদয়কে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য কুরআনের আয়াতের যে ক্ষমতা তা এখানেও প্রকাশ পায়। আমি বহুবার বলেছি, কুরআন কথ্য ভাষা হিসেবে নাযিল হয়েছে এবং এর সর্বোচ্চ শক্তি প্রকাশ পায় যখন এটি শোনা হয়। এর ছন্দ, বলার ঢং, নির্দেশনার মহিমা এবং যোগাযোগের স্পষ্টতার মধ্যে এমন কিছু আছে যা প্রকৃত সত্যসন্ধানীর হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আমি এজন্যও ঘটনাটি উল্লেখ করতে চাই কারণ এটি রাসূল (স) এর সিরাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা যার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স) এর ঈমান কিভাবে এর চরম শত্রুকেও প্রভাবান্বিত করেছিল তার পরিচয় পাওয়া যায়।

একদিন, রাসূলুল্লাহ (স) কে নিয়ে কি করা যায় এমন আলোচনা চলছিল কুরাইশ এবং তার বন্ধুদের মাঝে। তারা জানতে চাইল, ‘কে মুহাম্মদ (স)-কে হত্যা করতে আগ্রহী?’ ওমর (রা) এগিয়ে এল, ‘আমি করবো’। তিনি তার তলোয়ার নিয়ে দারুল আকরামের দিকে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) এর সাথে তার সাক্ষাত হল। সে জানতে চাইল, ‘কোথায় যাচ্ছো?’ ওমর (রা) বলল, যে লোকটা আমাদের বিভক্ত করেছে এবং আমাদের দেবতাদের অভিশাপ দিয়েছে তাকে খুন করতে যাচ্ছি।‘

সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি মনে করো বনু আবদ মানাফ গোত্রের লোককে হত্যা করলে তারা তোমাকে এই পৃথিবীর বুকে হাঁটতে দিবে?’ এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গেল এবং ওমর (রা) তাকে বললেন, ‘আমার ধারনা তুমি মুসলমান হয়ে গেছ। যদি তাই হয় তাহলে মুহাম্মদ (স) কে হত্যার আগে আমি তোমাকে খুন করবো।‘

সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা) তাকে বললেন, ‘মুহাম্মদ (স)-কে হত্যা করার আগে নিজের ঘর সামলাও না কেন?’ ‘কি বলতে চাও?’, ওমর (রা) জানতে চাইলেন। সাহাবী বললেন, ‘তোমার বোন এবং তার স্বামী মুসলমান হয়ে গিয়েছে।‘ তার বোন ফাতিমা বিনতে আল খাত্তাব (রা) এবং তার স্বামী সাঈদ বিন যায়েদ (রা) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। সাঈদ বিন যায়েদ (রা) ছিলেন ওমরের চাচাতো ভাই এবং সেই সৌভাগ্যবান দশজনের একজন যাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। তাদেরকে খাব্বাব বিন আল আরাত (রা) কোরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন এবং ওমর (রা) যখন তাদের বাসায় উপস্থিত হলেন তখন তিনি শুনতে পেলেন তারা কোরআন তেলাওয়াত করছে।

তিনি দরজায় কড়াঘাত করলেন। যখন তারা দেখল, দরজায় ওমর (রা) দাঁড়িয়ে, খাব্বাব (রা) লুকিয়ে পড়লেন। ‘কিসের শব্দ পেলাম?’, জানতে চাইলেন ওমর (রা)। ফাতেমা (রা) বললেন, ‘কিছু না। আমরা কথা বলছিলাম।‘ ওমর (রা) ক্রুদ্ধ হলেন এবং বললেন, ‘মিথ্যা কথা বলো না। তোমরা কি মুসলমান হয়ে গিয়েছো?’ সাঈদ (রা) বললেন, ‘যদি ইসলাম তোমার ধর্ম থেকে ভালো হয় তাহলে?’ ওমর (রা) তাকে আক্রমন করলেন, মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে তার উপর বসে পড়লেন। ফাতেমা (রা) স্বামীকে রক্ষার জন্য এগিয়ে এলেন কিন্তু ওমর (রা) তার মুখে আঘাত করলেন এবং তার মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। যদিও তিনি ওমরের বোন, তিনি ভয় পেলেন না। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর শত্রু। আমি আল্লাহর উপর ঈমান এনেছি বলে আমাকে মেরেছো? তাহলে শুনে নাও, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং মোহাম্মদ (স) তার রাসূল। এখন তুমি যা খুশি করতে পারো।‘

তাঁর দৃঢ়তায় ওমর (রা) হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং তার রক্তাক্ত মুখ দেখে তিনি তার কর্মের জন্য খুব লজ্জিত হলেন। তিনি সাঈদ (রা)-কে ছেড়ে দিয়ে বসলেন, বললেন, ‘তোমাদের কাগজগুলো দাও।’ ফাতিমা (রা) দিতে অস্বীকার করলে ওমর (রা) বললেন, ‘তোমার কথা আমাকে প্রভাবিত করেছে, কথা দিচ্ছি তোমার কাগজগুলো নিরাপদে ফেরত দিবো।‘ ফাতেমা (রা) বললেন, ‘তুমি মুশরিক এবং অপবিত্র। আগে গোসল করে আসো।’ ওমর (রা) গোসল করে আসলে তিনি কাগজগুলো দিলেন। ওমর (রা) কাগজে লিখা আয়াত তেলাওয়াত শুরু করলেন।

১। তোয়া-হা। ২। আপনাকে ক্লেশ দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করিনি। ৩। কিন্তু তাদেরই উপদেশের জন্য যারা ভয় করে। ৪। এটা তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ, যিনি ভূমন্ডল ও সমুচ্চ নভোমন্ডল সৃষ্টি করেছেন। ৫। তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন। ৬। নভোমন্ডলে, ভুমন্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে, তা তাঁরই। ৭। যদি তুমি উচ্চকন্ঠেও কথা বল, তিনি তো গুপ্ত ও তদপেক্ষাও গুপ্ত বিষয়বস্তু জানেন। ৮। আল্লাহ তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমন্ডিত নাম তাঁরই। (সূরা ত্বোয়া-হা ২০:১-৮)

ওমর (রা) আয়াতগুলো পড়লেন এবং বললেন, ‘কুরাইশরা কি এর বিরোধী? সত্যিই এসব যিনি বলেছেন তিনি উপাসনার যোগ্য। মুহাম্মদ (স) কোথায় আছে আমাকে বলো।’ যখন ওমর (রা) আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইলেন, খাব্বাব বিন আল আরাত (রা) বেরিয়ে এলেন এবং বললেন, ‘হে ওমর, রাসূলুল্লাহ (স) এর দোয়া আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কবুল করেছেন।’ রাসূলুল্লাহ (স) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমর ববিন হিশাম অথবা ওমর বিন আল খাত্তাব, এই দুজনের যে কোন একজনকে, যাকে তুমি সবচেয়ে পছন্দ কর, দিয়ে ইসলামকে সম্মানিত (শক্তিশালী) করো।’

তারা ওমর (রা) কে রাসূলুল্লাহ (স) এর অবস্থান বললেন এবং তিনি সরাসরি সেখানে হাজির হয়ে দরজায় করাঘাত করলেন। সাহাবীরা তাকে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন এবং সবাই বসে রইলেন। হামজা (রা) তাদের দেখে বললেন, ‘কি ব্যাপার?’ তারা বলল, ‘দরজায় ওমর।’ ‘তো কি হয়েছে? যদি সে ভালো উদ্দেশ্যে আসে তো ভালো, কিন্তু যদি খারাপ উদ্দেশ্যে আসে তাহলে আমি তার তলোয়ার দিয়েই তাকে হত্যা করবো। দরজা খুলে দাও।’ ওমর (রা) ঘরে ঢুকলে হামজা (রা) এবং অন্যরা তাকে ধরে ফেলল এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছে নিয়ে গেল।

‘ওকে ছেড়ে দাও’, রাসূল (স) বললেন। তারা ছেড়ে দিল। রাসূল (স) ওমর এর ঘাড়ে ধরে বললেন, ‘হে ইবন আল খাত্তাব, তুমি কেন এসেছো এখানে? তুমি কি আল্লাহ তোমাকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত ইসলামের সাথে লড়াই করবে?’ ওমর (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি সাক্ষ্য দিতে এসেছি যে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং আপনি তার রাসূল।’ রাসূলুল্লাহ (স) তাকবীর দিলেন, তার সাথে উপস্থিত সকলের তাকবীরে জায়গাটি মুখরিত হয়ে গেল। তারা এত উচ্চে তাকবীর দিয়েছিলেন যে, তার পরপরই সবার নজর এড়াতে তারা দ্রুত আলাদা হয়ে পড়েলেন।

এক্সট্রাঅর্ডিনারী লক্ষ্য

সীরাতে রাসূলুল্লাহ (স) এর এক্সট্রাওর্ডিনারি লক্ষ্য, তাঁর বার্তায় অবিচল আস্থা সম্পর্কিত সবচেয়ে সুন্দর যে ঘটনাটি আমি মনে করতে পারি; মানবজাতির কল্যাণে এর সত্যতা, গুরুত্ব এবং ক্রিটিক্যালিটি বর্ণনা করছি। ঘটনাটা ইসলামের প্রথম যুগে মক্কায় ঘটেছিল যখন তার পক্ষে কোনরকম সহযোগিতা ছিল না এবং বলা যায় তিনি সেসময় একাই ইসলামের বাণী প্রচার করছিলেন।

বর্ণনাকারী বলেন: হজ্ব সম্পন্ন করার পর আমি মিনার একটি পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সমতল অংশ হজ্ব করতে আসা তীর্থযাত্রীদের তাঁবুতে ঢেকে গিয়েছিল। সেটা ছিল গ্রীষ্মের মধ্য দুপুর, তীব্র গরম এবং শুষ্ক। আমি দেখলাম, এই গরমের মধ্যে একজন ব্যক্তি তাঁবু থেকে তাঁবুতে গিয়ে মানুষকে কেবল আল্লাহর উপাসনা করতে আহবান জানাচ্ছে এবং মূর্তিপূজার ব্যাপারে সতর্ক করছে। কেউ তার কথা শুনে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কেউ ধমক দিচ্ছে। বাকীরা তো তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। তার বাণীকে কেউ গ্রহণ করতে করেছে দেখিনি। সেই তীব্র গরমের মধ্যে আমি লোকটাকে দেখলাম তার নিজের তাঁবুর সামনে একটি পাথরের উপর বিশ্রামের জন্য বসলেন। তাঁবু থেকে তার মেয়ে পানি হাতে বের হয়ে এসে তার বাবার মুখ ধুইয়ে দিল এবং পানি খেতে দিল। বাবার দুরাবস্থা দেখে সে খুব কষ্ট পেল, ‘ওরা আপনার এ কি অবস্থা করেছে, আব্বা?

মানুষটি উত্তর দিল, ‘দু:খ পেও না, প্রিয় কন্যা। এমন একদিন আসবে যখন এই বার্তা পৃথিবীর বুকে সকল স্থায়ী অস্থায়ী ঘরে পৌছে যাবে।’ রাসূলুল্লাহ (স) এর মিশন যে ডিভাইন তার কোন প্রমাণ না থাকলেও এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কার এইরকম মিশন চালিয়ে নেয়ার সাহস, সহিষ্ণুতা এবং ধৈর্য্য থাকবে যেখানে এর সফলতার বিন্দুমাত্র কোন চিহ্ন নেই? আর কে তার মিশনের সাফল্য সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিত এবং বিশ্বাসী যে একের পর এক ব্যর্থতা আর হতাশার পরও এগিয়ে নেয়ার শক্তি পায়? একজন নবী ছাড়া আর কে একের পর এক প্রত্যাখ্যান গ্রহণ করতে পারে কিন্তু তাসত্ত্বেও যারা তার কথা শুনতে মোটেও আগ্রহী নয় তাদের কাছে তার বার্তা নিয়ে যেতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না?

রাসূল (স) এর বক্তব্যে যে লক্ষ্য প্রকাশ পেয়েছে তার প্রকৃতি বিস্ময়কর মনে হতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছিলেন, ‘দু:খ পেও না, প্রিয় কন্যা। এমন একদিন আসবে যখন এই বার্তা পৃথিবীর বুকে সকল স্থায়ী অস্থায়ী ঘরে পৌছে যাবে।’ এখানে যে মানুষটি বলছেন যে তার বার্তা একদিন পৃথিবীর সকল স্থায়ী -অস্থায়ী ঘরে পৌঁছে যাবে তিনি তখন পর্যন্ত নিজে ব্যক্তিগতভাবে বার্তা পৌছাতে পারেন এমন ঘরেও পৌঁছায় নি। এমন একজন মানুষ পৃথিবীর মানুষের মুক্তির কথা বলছে যে কিনা নিজের মুক্তির নিশ্চয়তাও দিতে পারে না। যেই অপরিচিত মানুষগুলো এতটা তাকে ফিরিয়ে দিচ্ছে তাদের চিরন্তন কল্যাণের জন্যই কিনা ভাবছে মানুষটি।

অন্যদিকে, এক্সট্রাঅর্ডিন্যারি লক্ষ্যের বৈশিষ্ট্যই হল এক্সট্রাঅর্ডিনারি প্রচেষ্টা চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করা। ক্ষুদ্র আশায় মানুষ জেগে উঠে না, বৃহৎ আকাঙ্ক্ষা মানুষকে জাগিয়ে তোলে। মাউন্ট এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা কোন অভিযাত্রীর মোটিভেশনাল লেকচারের দরকার হয় না। পাহাড় তাকে অনুপ্রাণিত করে। পাহাড়ের সর্বশেষ শৈলশিরাটি অতিক্রম করার পর চূড়ায় দাঁড়িয়ে তার যে আনন্দ হবে তার ভাবনাই তাকে বেস ক্যাম্পে দাঁড়ানো অবস্থায় অনুপ্রাণিত করে এবং তার প্রতি ঘন্টার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতে থাকে। পাহাড়ে চূড়ার প্রতিকূলতাই তাদের প্রেরণা। নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন অ৯অ, আপনার বাসা থেকে এগারো কিলোমিটার হেঁটে যেতে আগ্রহ পান কিনা? পাহাড়ে চড়া নি:সন্দেহে পৃথিবীর বুকে হাঁটা কিন্তু এর দুর্গমতা এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। একটি লক্ষ্য অর্জনের সাথে যুক্ত তৃপ্তির পরিমাণ এর প্রতিকূলতার সমানুপাতিক।

বৈপ্লবিক পরিবর্তন কোন সাধারণ পরিবর্তন নয় বরং অনেক বেশি ধাতুগত এবং সহজাত; বিশ্বাসের পরিবর্তন সম্পর্কে কথা বলার মত কঠিন আর কি হতে পারে। এর চ্যালেঞ্জটা বোঝা খুবই জরুরী কারণ সকল কর্মই হল বিশ্বাসের ফলাফল। মানুষ তার নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে, সচেতনভাবে হোক বা অবচেতনভাবে। যেমন, মানুষ তার ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী আচরণ করতে পারে, সচেতনভাবে এবং কিছু রীতিনীতি পালনের মাধ্যমে; আবার তারা তাদের নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট কোন কাজকে লাভজনক মনে করে তাতে বিনিয়োগ করতে পারে। আবার মানুষ ঘুম থেকে উঠে কাজে যোগ দেয় কারণ অবচেতনভাবে সে বিশ্বাস করে সে ওইদিন এবং পরের দিনগুলোতে বেঁচে থাকবে এবং পৃথিবীও ধ্বংস হবে না। সুতরাং বিশ্বাস আমাদের সকল চিন্তা এবং কর্মের ভিত্তি গড়ে দেয়। এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে বলা যে এটা সম্পূর্ণ ভুল এবং এর জন্য চিরন্তন শাস্তি পেতে হবে বলাটা সহজ কাজ নয়। তা সত্ত্বেও রাসূল (স) তার বার্তার সত্যে এত গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে কোন কিছুই তাকে অন্যের কাছে বার্তা নিয়ে যেতে বিরত করতে পারেনি। বর্ণিত আছে যে তিনি একদা তার চরম শত্রুদের অন্যতম আবু জেহলের বাড়িতে একশতাধিক বার গিয়েছেন এই আশায় যে সে ইসলামের দাওয়াত কবুল করবে। নবী ছাড়া আর কে এমন একজনকে বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করবে যে কিনা তার ক্ষতি করার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে?

এক্সট্রাঅর্ডিনারি লক্ষ্য অর্জনের কর্মকাণ্ডের আরেকটি ব্যাপার হল এখানে কর্মই প্রশিক্ষণ। আরব প্রবাদ বলে, ‘যদি কোমড় না ভাঙে, তবে এটা তোমাকে শক্তিশালী করে তুলবে।’ এক্সট্রাঅর্ডিনারি লক্ষ্যের জন্য কাজ করাও তেমনি, এটা কেবল শক্তি বৃদ্ধি করে। রাসূলুল্লাহ (স) এবং প্রথম যুগের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটেছে। সকল প্রকার বিরোধিতা, নির্যাতন এবং শাস্তি তাদেরকে এবং আল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্কে কেবল শক্তিশালীই করেছে এবং তাদেরকে আরও স্থিতিশীল (রেজিলেন্ট) করেছে। এক্সট্রাঅর্ডিনারি লক্ষ্য জোর প্রচেষ্টা চালানোকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। If it is worth doing, then it is worth the effort. সমগ্র মানবজাতিকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা এবং জান্নাতে নেয়ার চেষ্টার চেয়ে মূল্যবান প্রচেষ্টা আর আত্মত্যাগ আর কি হতে পারে? আমরা যাকে ত্যাগ বলছি, রাসূল (স) এবং তার সাহাবীরা তাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখেছিল এবং এ কারণে তাদের পক্ষে কোন দ্বিধা ছাড়াই এটা করা সম্ভবপর হয়েছিল।

এক্সট্রাঅর্ডিনারি সংকল্প

মানুষ যখন কোন বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প গ্রহন করে একমাত্র তখনই সে তা থেকে ফল লাভ করতে পারে। রাসূলুল্লাহ (স) এর জন্য এটা কখনোই সামান্য সন্দেহের বিষয়ও ছিল না। তাঁর বড় সফলতা হল এমন একটা প্রজন্ম তৈরি করা যারা তাঁর সংকল্পের অংশীদার হয়েছে এবং এর জন্য নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে এর সর্বোচ্চ প্রমাণ রেখেছে। ইসলামের বার্তার প্রতি তাঁর সংকল্প নিয়ে কারও মনে যেন বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ না থাকে সেজন্য তিনি ব্যক্তিগত দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে সফল হয়েছিলেন; তিনি নিজে পালন করেছেন এবং সকলের কাছে প্রচার করেছেন। কেবলমাত্র রাসূল (স) নয়, সাহাবীরাও, যারা তাঁর কাছ থেকে ভালোভাবে শিখেছিলেন, তাদের জীবনে এর দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন। তাদের এই সংকল্পের প্রমাণ সীরাতের অনেক ঘটনায় পাওয়া যায়।

বদর যুদ্ধের সময় সাহাবীরা সামান্য সরঞ্জামাদি নিয়ে বদরের কূপের দিকে চলছিল। তাঁরা পূর্ণাঙ্গ কোন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না বরং আস শামস থেকে ফেরা আবু সুফিয়ানের কাফেলা দখল নেয়ার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল। এই কাফেলার পণ্যদ্রব্য কেনা হয়েছিল মক্কার মুজাহিরদের বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির বিনিময়ে। তাদের দলে মাত্র দুইটি ঘোড়া এবং সত্তরটি উট ছিল। একটি উটে তিনজন সওয়ারী পালাক্রমে সওয়ার হত। রাসূল (স) এর সহযোগী ছিল আলী ইবনে তালিব (রা) এবং উলুবাবা (রা)। তারা তাঁকে উটটি দিতে চাইলে তিনি বললেন, ‘তোমরা আমার চেয়ে শক্তিশালী নও এবং আমিও তোমাদের মত বেশি পুরষ্কার আশা করি।’ তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সবসময় সাথীদের কাছ থেকে যেরকম সংকল্প আশা করেন, তার চেয়ে বেশি না হলেও সমান সংকল্প প্রদর্শন করেছেন।

খন্দকের যুদ্ধের সময় যুদ্ধ পরিকল্পনার জন্য রাসূল (স) একটি শূরা গঠন করেন। পারস্য থেকে আগত সালমান আল ফারিসি (রা) বললেন, ‘আমাদের ওখানে কোন সৈন্যবাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা করলে আমরা পরিখা খনন করি। আমরা কেন এখানে একটি পরিখা খনন করছি না?’ আল্লাহর রাসূল (স) একমত হলেন এবং মদীনার উত্তর দিক অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় সেখানে খন্দক খননের সিদ্ধান্ত নিলেন। পূর্ব এবং পশ্চিমে আল হাররা (একটি আগ্নেয়গিরি উপত্যকা) দ্বারা সুরক্ষিত ছিল এবং দক্ষিণে ছিল দুর্ভেদ্য খেজুর বাগান। প্রতি দশজনকে চল্লিশ ফুট পরিখা খনন করতে দেয়া হল। মুসলমানগণ ছিলেন দরিদ্র‍্য, ক্ষুধার্ত এবং দুর্বল। আনাস ইবনে মালিক বলেন যে এক শীতের রাত্রে রাসূল (স) তাদের নিকট গেলেন এবং তাদের দুরাবস্থা দেখে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই এসব আখিরাতের জন্য। হে আল্লাহ, মুজাহির এবং আনসারদেরকে ক্ষমা করুন।’ এটা সাহাবীদের অজানা ছিল না যে ( It was not lost on the Sahaba that) যখন তারা তীব্র ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছিল, তাদের নেতা তখন তাঁবুর উষ্ণতায় ঘুমাচ্ছিলেন না বরং তিনি তাদের মাঝে হেঁটে হেঁটে তাদের খোঁজ নিচ্ছিলেন এবং তাদের জন্য দোয়া করছিলেন। মানুষ অন্য মানুষের প্রতি বিশ্বস্ত হয়, কোন পদবী বা র‍্যাংকের নিকট নয়।

আল বারা’আ বলেন, খন্দকের এক দিনে আমি রাসূল (স) কে মাটি বহন করতে দেখলাম। তার শরীরে এত মাটি লেগেছিল যে তাঁর চামড়া দেখা যাচ্ছিল না।’ রাসূল (স) এর সংকল্পের এটা একটা উদাহরণ। এমন কোন কাজ ছিল না যাকে তিনি তাঁর জন্য অমর্যাদাকর গণ্য করেছেন। এমন কিছু ছিল না যা তিনি নিজে করেন নি কিন্তু অন্যকে করার আদেশ করেছেন। নেতৃত্ব সবসময় সামনে থেকেই দিতে হয়। মানুষ নেতাকে অনুসরণ করে কারণ নেতা তাদের সামনে পথ চলে। মাঝে মাঝে আমরা এটা ভুলে যাই।

এই সময় রাসূল (স) নিজে এত বেশি ক্ষুধার্ত ছিলেন যে তিনি পেটের সাথে দুটো পাথর বেঁধে রাখতেন। জাবির ইবনে আব্দাল্লা যখন অন্যদের সাথে মিলে পরিখা খনন করছিলেন, তখন রাসূল (স) কে এই অবস্থায় দেখেন; সবার পেটে যখন একটি পাথর বাঁধা তখন রাসূলের (স) পেটে বাঁধা দুটি পাথর! তিনি স্ত্রীর নিকট গিয়ে বললেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (স) কে অবর্ণনীয় অবস্থায় দেখে এসেছি। তোমার কাছে কোন খাবার আছে?’ তার স্ত্রী জবাব দিলেন, ‘আমার কাছে আছে বলতে কিছু বার্লি এবং একটি ছোট খাসী।’ জাবির বিন আবদুল্লাহ খাসীটিকে জবেহ করলেন এবং তার স্ত্রীকে বললেন কিছু রুটির খামি তৈরি করতে। যখন গোশত রান্না হতে লাগল এবং তার স্ত্রী রুটি বানাতে লাগল, জাবির বিন আবদুল্লাহ রাসূল (স) এর কাছে গিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেছি, আপনি অনুগ্রহ করে আপনার একজন বা দুইজন সাথীসহ আমার সাথে আসুন।’ রাসূলুল্লাহ (স) জানতে চাইলেন তার কাছে কতটুকু খাবার আছে এবং জাবির তাকে বলল। রাসূল (স) বললেন, তা যথেষ্ট। তুমি তোমার স্ত্রীকে বল আমি না আসা পর্যন্ত স্যুপের পাত্র যেন সরিয়ে না নেয়।’

তারপর রাসূলুল্লাহ (স) দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকলেন, ‘হে মুহাজির, হে আনসার; জাবির তোমাদেরকে তার বাড়িতে খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।’ জাবির খুব বিস্মিত হল কারণ সে আশা করেছিল রাসূল (স) এক বা দুইজন সাথী নিয়ে আসবেন কিন্তু তিনি তো এখন পুরো ক্যাম্পকেই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সে বিব্রত হয়ে দৌড়ে বাসায় গেল এবং যা ঘটেছে স্ত্রীকে খুলে বলল। তিনি (স্ত্রী) জানতে চাইলেন, ‘তিনি কি জানতে চেয়েছেন আমাদের কাছে কি পরিমাণ খাবার রয়েছে?’ জাবির বললেন, ‘হ্যা।’ ‘আপনি কি তাকে বলেছেন?’, জিজ্ঞেস করলেন তার স্ত্রী। ‘হ্যা’, তিনি উত্তর দিলেন। তিনি (স্ত্রী) বললেন, ‘তাহলে দুশ্চিন্তা করবেন না, আল্লাহ এবং তার রাসূল (স) ভালো জানেন।’ জাবির বলেন, ‘এই কথাগুলো আমাকে আশ্বস্ত করল।’

রাসূলুল্লাহ (স) জাবিরের বাড়িতে প্রবেশ করলেন এবং খাদ্য বিতরণের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তিনি রুটি ছিঁড়ে এবং গোশত ও ঝোল পরিবেশন করে সাহাবীদেরকে দশজনের দলে আসতে বললেন। রাসূল (স) খাবার তৈরি করে পরিবেশন করতেন এবং তারা পেটপুরে খেতেন এবং চলে যেতেন এবং আরেকটি দশজনের দল আসতো এবং খেতো। সর্বমোট ৮০০ জন সাহাবী খেল। রাসূল (স) যখন পাত্রের নিকট ফিরে যেতেন, পাত্রটি পূর্ণ ছিল এবং রুটি তৈরি হচ্ছিল। তাই তিনি জাবিরের স্ত্রীকে প্রতিবেশীদের খাওয়াতে বললেন। তার লোকদের মনোবল এত বেশি ছিল যে এটা তাদের কাছে কোন বিস্ময়কর ঘটনা ছিল না। (It is hardly a surprise that the morale of his people was so high) একজন নেতা যিনি আপনার সকল কষ্টের অংশীদার তার থেকে আপনি আর কি আশা করেন?

অলৌকিক ঘটনা: ভবিষ্যৎবাণী

একটা পাথরের চাঁই পরিখা খননকারীদের কাছে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভাঙ্গা যাচ্ছিল না। সুতরাং তারা রাসূল (স) এর নিকটে আসলেন। তিনি তাদের সাথে গেলেন এবং কুড়াল তুলে পাথরে চাঁইতে আঘাত করলেন। আগুনের ফুলকি ছুটল এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার।’ তারপর তিনি দ্বিতীয়বার আঘাত করলেন, আগুনের ফুলকি ছুটল এবং তিনি বললেন, ‘আল্লাহু আকবার।’ তারপর তিনি তৃতীয়বার আঘাত করলেন এবং পাথরের চাঁইটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধূলায় পরিণত হল। সালমান আল ফারিসি জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আগুনের ফুলকি কি ছিল এবং আপনি আল্লাহু আকবার বললেন কেন?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘প্রথমবারে আমি যখন আঘাত করলাম, আমাকে রোমান সাম্রাজ্য বিজয়ের সুসংবাদ দেয়া হল এবং আমি এখান থেকেই আস-শামের লাল প্রাসাদ দেখতে পেলাম। দ্বিতীয়বারে আমাকে পারস্য জয়ের সুসংবাদ দেয়া হল এবং আমি সাদা প্রাসাদ আল কিসরা দেখতে পেলাম। তৃতীয়বারে আমাকে ইয়েমেন জয়ের সুসংবাদ দেয়া হল এবং আমি সানা’আর দরজা দেখতে পেলাম। তাই আমি বললাম ‘আল্লাহু আকবার।’

সাহাবীদের সংকল্পের কথা বলতে গেলে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে হয় যখন রাসূলুল্লাহ (স) কোন এক অভিযানে আম্মার বিন ইয়াসির এবং আব্বাদ বিন বাশিরকে পাহারার জন্য নিয়োজিত করেছিলেন। তারা দুজনে ঠিক করে নিল, প্রথমে একজন ঘুমাবে এবং অন্যজন জেগে থাকবে, তারপর অর্ধেক রাত পার হলে, সে অন্যজনকে জাগিয়ে দিবে। প্রথমে আব্বাদ বিন বাশিরের ভাগে জেগে থাকার দায়িত্ব পরল এবং তিনি ভাবলেন, পাহাড়ার সময়ে তিনি নামাজ আদায় করবেন। শত্রুদলের একজন গোপনে আব্বাদের পেছনে উপস্থিত হয়ে তীর ছুড়ল, তীরটি তার শরীরে পাশ দিয়ে বিদ্ধ হল। আব্বাদ দাঁড়িয়ে থেকে নামাজ অব্যাহত রাখলেন। শত্রুসৈন্যটি আরও একটি তীর ছুঁড়ল, এই তীরটিও তার শরীরে লাগল। তাসত্ত্বেও তিনি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে থাকলেন। শত্রুর ছোঁড়া তৃতীয় তীরটি আব্বাদকে আঘাত করলে সে আম্মারকে জাগিয়ে তুলল। আব্বাদের সঙ্গীকে দেখে শত্রুসৈন্যটি পালিয়ে গেল। আম্মার বিন ইয়াসির দেখল যে রক্তক্ষরণে আব্বাদ মারা যাচ্ছে, সে তাকে বলল, ‘সুবহানআল্লাহ, তুমি আমাকে জাগিয়ে দিলে না কেন?’ আব্বাদ বলল, ‘If it wasn’t for the fact that this man kept shooting arrow after arrow and I was afraid that I may die and thereby fail my responsibility to Rasoolullah, I would not have woken you up until I finished my entire recitation.’

সাহাবীরা ছিলেন ইসলামের জীবন্ত উদাহরণ। এই ঘটনাটি সাহাবীদের ঈমানের স্তর সম্পর্কে ধারনা দেয়। আব্বাদ বিন বাশির (রা) শরীরে তিনটি তীর বিদ্ধ হবার পরেও নামাজে খুশু বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটা ইসলামের প্রতি তাদের দায়িত্বশীলতারও উদাহরণ। আব্বাদ একটি শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছে যার মানে হল ‘দরজার সুরক্ষা’ অর্থাৎ আমি যে দরজা সুরক্ষা প্রদান করছি সেখান দিয়ে শত্রুর প্রবেশ বাঁধাগ্রস্ত করা। এটা সকল মুসলমানের দায়িত্ব। শত্রু হল শয়তান অথবা এমন কেউ যে ইসলাম বা মুসলমানদের ক্ষতি করতে চায়। সকল মুসলমানের উচিত আল্লাহ প্রদত্ত যে কোন উপায়ে ইসলাম অথবা মুসলমানদের ক্ষতি প্রতিরোধ করা এবং ইসলাম ও মুসলমানদেরকে যে কোন উপায়ে সহযোগিতা করা। আমাদেরকে ‘কি হয়েছিল’ জিজ্ঞাসা করা হবে না, বরং জানতে চাওয়া হবে, ‘তুমি কি করেছিলে?’

এক্সট্রাঅর্ডিনারি দল

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার নবীর চারদিকে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করেছেন যারা নিজেরাই এক একটি আদর্শ (benchmarks)। আগেই বলেছি, মুহাম্মদ (স) তার প্রেরিত নবীদের মধ্যে সর্বশেষ হবেন, এটা আল্লাহর ইচ্ছা এবং একারণে উত্তরসূরি তৈরি করা আবশ্যক ছিল যারা এই বাণীকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এরা হলে রাসূল (স) এর সাহাবীরা, যাদেরকে বলা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজিন্ম।

আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন: “সর্বোত্তম মানুষ হচ্ছে আমার যুগের মানুষ। এরপর উত্তম হল, এর পরবর্তীতে আগমনকারী লোকেরা। তারপর উত্তম হল যারা তাদের পরবর্তীতে আসবে তারা। অতঃপর এমন এক কওমের আগমন ঘটবে যাদের কারও সাক্ষ্য কসমের আগেই হয়ে যাবে, আবার কসম সাক্ষ্যের আগেই হয়ে যাবে।” (বুখারী) (সূত্র)

এ বিষয়ে সেরা বইগুলোর অন্যতম একটি বই, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ রচিত Men Around the Messenger থেকে উদ্ধৃত করছি।

‚It was neither invented discourse nor false rumor that was recorded in history about the great company of men who came into the world of belief and faith. That is because the entirety of human history has never witnessed such accurate documentation, honesty, and investigation of facts as did that epoch of Islamic history and its men. An extraordinary human effort has been exerted to study and pursue its tidings. Successive generations of able and brilliant scholars have not left unexamined even the smallest details or minutest explanations concerning that early epoch without putting them under microscopic investigation, scrutiny, and criticism.

The spectacular magnitude we encounter on the pages of this book of those colossal men of the Companions of the Messenger (PBUH) is not something legendary, even though they may seem like legends due to their miraculous nature! These are facts characteristic of the personality and life of the Prophet’s Companions. They soar high and are exalted and ennobled, not because of the author or, depicter, but because of what the Companions themselves desired and the extraordinary and righteous effort they exerted for the sake of excelling and attaining perfection.‛

আল্লাহর রাসূলের একটি কাজ অন্য সকল নবীর কাজের তুলনায় ভিন্নতর এবং অধিকতর জটিল ছিল। তাঁর পূর্বের সকল আম্বিয়ার কাজ ছিল মানুষের কাছে তাদের বার্তা পৌঁছানো। একারণে তাদের অনুসারী ছিল। মুহাম্মদ (স) সকল নবীর শেষ নবী হওয়ায় এবং তার মধ্য দিয়ে নবুয়্যতের ধারার সমাপ্তি ঘটায় তাঁর কাজ কেবল বার্তাই পৌঁছাননোই ছিল না বরং এমন প্রজন্ম তৈরি করাও ছিল যারা তাঁর বার্তা পৃথিবীর সকল প্রান্তে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেয়ামত পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাবে। এটা নবীত্বের সিলমোহরের বরকত যে দাওয়াহ’র কাজ তার উম্মতকে দেয়া হয়েছে।

সংক্ষেপে বলে গেলে, অন্যান্য আম্বিয়ারা অনুসারী তৈরি করেছিলেন, আর মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (স) তৈরি করেছিলেন নেতা।

এদের প্রথম ছিলেন তার খলিফা – খলিফাতুর রাসূলুল্লাহ – আবু বকর সিদ্দিক। তিনি কত উত্তম পন্থায় নেতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় রাসূল (স) এর ওফাতের পর তার প্রথম কাজে। আমি কিছুটা বিস্তৃত আকারে ঘটনাটা বলবো দুটো কারণে, প্রথমত, এই ঘটনাটা আমাদের বারবার স্মরণ করা উচিত এবং দ্বিতীয়ত, এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে আল্লাহর রাসূল (স) সুস্পষ্টভাবে সাহাবীদেরকে ইঙ্গিত দিয়েছেন কে হবে তার উত্তরসূরি। তিনি এমনভাবে কাজটি করেছিলেন যে তারা কোন সন্দেহ ছাড়াই স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাঁকে বেছে নিয়েছিলেন।

এই বিষয়ে যারা সন্দেহ পোষন করে এবং কুৎসা রটনা করতে চায় তারা হয় রাসূল (স) এর জীবন এবং সময় সম্পর্কে অজ্ঞতার পরিচয় দেয় অথবা তাদের নিগূঢ় উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে।

শেষের দিনগুলো

আল্লাহর রাসূল (স) বলেছেন, ‘When any calamity befalls you think of my death and that calamity will seem like nothing.’ মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় দু:সংবাদ ছিল রাসূল (স) এর মৃত্যু শুধু একারণে নয় যে, তারা তাঁর সঙ্গ পাবার বরকত থেকে বঞ্চিত হল, একারণেও তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে ওহি আসা বন্ধ হয়ে গেল এবং আল্লাহর সাথে সংযোগের সমাপ্তি ঘটল।

সফর মাসে শেষের শুরু হল। রাসূল (স) অনেক আয়াত এবং ইঙ্গিতের মাধ্যমে জানতে পারলেন, তাকেও পূর্বের নবীদের মত মৃত্যুবরণ করতে হবে। তিনি এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং অপেক্ষা করতে লাগলেন। আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা বলেন,

নিশ্চয় তোমারও মৃত্যু হবে এবং তাদেরও মৃত্যু হবে। (সূরা জুমার ৩৯:৩০)

৩৪)আপনার পূর্বেও কোন মানুষকে আমি অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরঞ্জীব হবে? প্রত্যেককে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। ৩৫)আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দ্বারা পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। (সূরা আম্বিয়া ২১:৩৪-৩৫)

১৪৪) আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন।  ১৪৫) আর আল্লাহর হুকুম ছাড়া কেউ মরতে পারে না-সেজন্য একটা সময় নির্ধারিত রয়েছে। বস্তুতঃ যে লোক দুনিয়ায় বিনিময় কামনা করবে, আমি তাকে তা দুনিয়াতেই দান করব। পক্ষান্তরে-যে লোক আখেরাতে বিনিময় কামনা করবে, তা থেকে আমি তাকে তাই দেবো। আর যারা কৃতজ্ঞ তাদেরকে আমি প্রতিদান দেবো। (সূরা আল ইমরান ৩: ১৪৪-১৪৫)

১) যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় ২) এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, ৩) তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী।  (সূরা নাসর ১১০: ১-৩)

আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।  (সূরা মায়েদা ০৫:০৩)

আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালার সুন্নাত হল মিশন সম্পূর্ণ হলে তিনি তার নবীকে ডেকে নেন। তিনি অনেকবার ইঙ্গিতে জানিয়েছেন, রাসূলুল্লাহ (স) এর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। আল্লাহ তা’য়ালা আরও জানিয়েছেন, নবীত্বের কাজ মুহাম্মদ (স) এর সাথেই শেষ হয়ে যাবে না বরং তার উম্মাতকে এই দায়িত্ব প্রদান করা হবে এবং তারা যতদিন এই কাজ চালিয়ে যাবে, রাসূল (স) এর মত তাদের জন্যও আল্লাহর সহায়তা আসবে।

রাসূল (স) এর মৃত্যুনির্দেশক হাদীস

হজ্বের খুতবার শুরুতে তিনি বলেন:

আমার কাছ থেকে হজ্বের নিয়মাবলী শিখে নাও কারণ আমি হয়তো এই বছরে পরে আর হজ্ব করতে পারবো না।

মুয়াজ বিন জাবালকে ইয়েমেনে প্রেরণের প্রাক্বালে তিনি বললেন :

ফেরার সময় হয়তো তোমাকে আমার কবর এবং মসজিদের পাশ দিয়ে ফিরতে হবে। এবং মুয়াজ চোখ মুছলেন।

 

রাসূল (স) বলেন,

জীবরাইল (আ) (বছরে) একবার আমার সাথে কোরআন তেলাওয়াত করতো। এবছর তিনি দুইবার করেছেন এবং এর শুদ্ধতা নিশ্চিত করেছেন।

Rasoolullah woke up and called Abu Muwayhiba, his servant late one night and said, ‘O Abu Muwayhiba, I have been commanded to ask forgiveness for the people of Al Baqee’a. So come with me.’ They went there and Rasoolullah said, ‘As salaamu alaikum Ya Ahlal Maqaabir. Congratulations that you do not experience what people here are experiencing. Trials and tribulations come like dark portions of the night following each other in succession, the last being worse than the first. (then he looked at Abu Muwayhiba and said) I was given the choice of the keys of the treasures of the earth and to live in this world as long as the world exists and then Jannah; or to meet Allah now and Jannah.’ Abu Muwayhiba said, ‘Choose us Ya Rasoolullah ’ Rasoolullah said, ‘No I have chosen to meet Allah and Jannah.’ Then he made dua for the forgiveness of the people of Al Baqee’a and then they left. When he reached home, his terminal illness began.

Ayesha (RA) said, ‘O My head, O my head!’ Rasoolullah said, ‘No I should say O My Head.’ When she complained of her headache more, he joked with her and said, ‘Actually if you were to die it wouldn’t be such a bad thing because I would wash you and pray for you and attend your funeral.’ She said, ‘Ya Rasoolullah let someone else have this good fortune because if I die you will still have your other wives to care for you.’

রাসূল (স) এর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেল। তাঁর মাথাব্যাথা বেড়ে গেল এবং তীব্র জ্বর হল। একজন সাহাবী রাসূল (স) এর কপালে হাত রাখলেন এবং সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আমি আপনার শরীরে হাত রেখে সহ্য করতে পারছি না। আপনার জ্বর খুবই তীব্র।’ আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, ‘হ্যা, আমরা নবীরা সাধারণ মানুষের দ্বিগুন যাতনা ভোগ করি।’ তিনি তাঁর স্ত্রীদের কাছে গেলেন। তিনি যখন হযরত মায়মুনা (র) ঘরে ছিলেন তখন তার আরেকবার তীব্র ব্যাথার উদ্রেক হল, তাই তিনি হযরত আয়েশা (রা) এর ঘরে গেলেন এবং সকলকে সেখানে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে বললেন। তাঁর স্ত্রীগণ সেখানে তাঁর শুশ্রূষা করতে সম্মত হলেন। তাঁর মাথা একটি কাপড়ে শক্ত করে বেঁধে দেয়া হল এবং তিনি একপাশে হযরত আলী (রা) এবং অন্যপাশে হযরত আল আব্বাস (রা) এর উপর ঝুঁকে (leaning) ছিলেন। তিনি সেখানে শয্যা গ্রহণ করলেন।

আল্লাহর রাসূল (স) মসজিদে গিয়ে লোকদের সাথে কথা বলতে এবং তাদেরকে নির্দেশনা (covenant) দিতে চেয়েছিলেন, তাই তিনি মদীনার সাতটি ভিন্ন ভিন্ন কূপ থেকে পানি এনে জ্বর কমানোর জন্য ঢালতে বললেন। তারপর তিনি একপাশে আলী বিন আবি তালিব এবং অন্যপাশে আল আব্বাসের একজন পুত্রের সহায়তায় মসজিদে গেলেন। তিনি এতটাই দূর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে নিজে হাঁটতে পারছিলেন না। তিনি একটি খুতবা দিলেন, আল্লাহর প্রশংসা করলেন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন এবং তারপর আল্লাহর কাছে উহুদ যুদ্ধের শহীদদের জন্য ক্ষমমা প্রার্থনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁর সাথীদের প্রতি এবং যারা তাঁর মিশন বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি খুব বিশ্বস্ত ছিলেন। আল্লাহর রাসূল (স) তাঁর উম্মাতের জন্য বেঁচে ছিলেন।

তিনি বললেন, ‘হে মুহাজির সকল, তোমরা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাচ্ছো কিন্তু আনসাররা বৃদ্ধি পাচ্ছে না। তারা সেই লোক যারা আমাকে শুরুর দিকে সহায়তা করেছে, তাই তাদের মধ্যে সম্মানীতদেরকে সম্মান করো এবং যারা ভুল করে তাদেরকে ক্ষমা করে দাও। হে লোকসকল, উসামার নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত রাখো। তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগ তার বাবার বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযোগের মত একই। (Your complaint against his leadership is the same as your complaint against the generalship of his father before him) আল্লাহ সুবহানাহুতায়া’লা সাক্ষী, উসামা তার বাবার মতই নেতৃত্বের যোগ্য।’ রাসূল (স) থামলেন, স্তব্ধ নীরবতা বিরাজ করছিল। তারপর তিনি বললেন, ‘হে লোকসকল, আল্লাহর এক বান্দাকে এই দুনিয়া এবং আল্লাহর হাতে যা রয়েছে তার মধ্যে বাছাই করতে দেয়া হয়েছিল এবং সে আল্লাহর সাথে যা তা পছন্দ করল।’ (আবু বকর (রা) কাঁদতে শুরু করলেন, লোকেরা অবাক হল কেন তিনি কাঁদছেন। তিনদিন পরে তারা জানতে পারল।) আবু বকর (রা) বললেন, ‘আমরা নিজেদের এবং আমাদের সন্তানদের আপনার জন্য কোরবানি করবো ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল (স) তাকে থামিয়ে দিলেন এবং বললেন, ‘বন্ধুত্ব এবং সম্পদে আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ব্যক্তি আবু বকর। আমি যদি আল্লাহ ব্যতীত আর কাউকে খলিল হিসেবে বেছে নিতাম, সে হত আবু বকর। কিন্তু আমি আল্লাহর খলিল এবং আবু বকর আমার বন্ধু এবং ইসলামের সাথী। মসজিদের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যাবে কেবল আবু বকরের দরজা হবে না।’ তারপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইহুদী ও খ্রীস্টানদেরকে তাদের নবীর কবরের উপর উপাসনার ঘর নির্মানের জন্য অভিশাপ দিক। আরব উপত্যাকায় আর কোন ধর্ম টিকে থাকা উচিত নয়। তোমরা সালাতের হেফাজত করো। তোমাদের অধীনে যারা রয়েছে তাদের যত্ন নিও। তোমাদের নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। উসামার বাহিনীকে পাঠিয়ে দাও।

রাসূল (স) নামাজের ইমামতি করতে যেতে পারলেন না, তাই তিনি নির্দেশ দিলেন, আবু বকর (রা) কে নামাজের ইমামতি করার জন্য বলতে। তিনি বললেন, ‘Mooroo Aba Bakr fa yusalli bin naas.’ (আবু বকরকে নামাজের নেতৃত্ব দেয়ার আদেশ করো) আয়েশা (রা) বিতর্কের ভয়ে তার পিতাকে নামাজ পড়াতে দিতে চাননি। তাই তিনি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স), তিনি অত্যন্ত নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি হয়তো আপনার স্থলে দাঁড়ালে নিজেকে সামলাতে (overcome) পারবেন না।’

আল্লাহর রাসূল (স) এই আপত্তির পুনরাবৃত্তিতে বিরক্ত হলেন এবং বললেন, আবু বকরকে সালাতে লোকদেরকে নেতৃত্ব করতে বলো। তোমরা মমেয়েরা ইউসুফের (সময়কার) মেয়েদের মতো।’ পরে আয়েশা (রা) বলেন, ‘আমি চাইনি আমার পিতা সালাতে নেতৃত্ব দিক কারন মানুষ হয়তো রাসূলুল্লাহ’র (স) জায়গায় তাকে পছন্দ করবে না।’

কোন ঐতিহাসিক ঘটনা বুঝতে হলে অবশ্যই সেই সময়ের প্রেক্ষাপট, সাংস্কৃতিক দ্যোতনা এবং সেই সময়ে মানুষের আচরনের মধ্য দিয়ে দেখতে হবে। আমরা বর্তমান সময়ের মানদণ্ড চৌদ্দ শতক আগে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারি না এবং বলতে পারি না যতক্ষণ পর্যন্ত ঘটনাটি আমাদের বর্তমান সময়ের বিচারে ‘গ্রহণযোগ্য’ না হচ্ছে, ততক্ষণ একে গ্রহণ করবো না। আরবদের মধ্যে, এমনকি তাদের মধ্যেও যারা তথাকথিত আমেরিকার ওয়াইল্ড ওয়েস্টকে দখল করতে গিয়েছিল, মুখের কথাই চুক্তি হিসেবে গণ্য হতো। অনেক বড় লেনদেন কেবলমাত্র একে অপরকে দেয়া মুখে প্রতিশ্রুতি প্রদানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো। কিছু চুক্তি লিখিত হতো বটে, তবে তা এ কারণে নয় যে মুখের কথা যথেষ্ট নয় বরং কিছু নির্দিষ্ট বিষয় এতটা জটিল যে সাধারণভাবে মনে রাখা সম্ভব নয়। তবে এ ধরনের চুক্তি মুখের কথার উপর ভিত্তি করেই স্বাক্ষরিত হত। চুক্তির লিখন ছিল গৌণ বিষয় এবং চুক্তির বিশুদ্ধতায় কিছুই বৃদ্ধি করতো না। একবার কোন বিষয়ে দুটি পক্ষ একমত হলে, উভয় পক্ষই তা মমেনে চলতো, তা লিখিত হোক বা না হোক। এ কারণেই কাউকে মিথ্যেবাদী বলা ছিল খুনের মত ঘটনা, কারণ কোন ব্যক্তি যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেয় এবং এ ব্যাপারে কিছু না করে, তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায় সে এই অভিযোগকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর মাধ্যমে সে সমাজে বসবাসের যোগ্যতা হারালো। এমনকি বর্তমান সময়েও, একজন আরবকে সবচেয়ে খারাপ বলার উপায় হল তাকে মিথ্যেবাদী বলা।

যারা রাসূল (স) কে মক্কায় বিরোধিতা করেছিল তাদের চেয়েও মদীনার মুনাফিকদেরকে আল্লাহ তা’য়ালা আরও কঠোরভাবে অভিশাপ দিয়েছেন কারণ তারা মুসলমান হবার ভান করলেও গোপনে তারা রাসূল (স) এর বিরোধিতা করতো। তারা অভিশপ্ত কারণ তারা ছিল মিথ্যেবাদী। ইসলাম সত্যবাদিতার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করে এমনকি এর জন্য যদি নিজের, নিজ পিতা, ভাই এবং পরিবারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে হয় তারপরেও। ইসলাম হল সত্য এবং সকল প্রকার মিথ্যার বিরুদ্ধে এর অবস্থান।

এখানে, আবু বকর (রা) এর উত্তোরাধিকারের ঘটনায়, আমরা কোন সাধারণ মানুষের কথা নিয়ে আলোচনা করছি না। আমরা আল্লাহর রাসূল (স) এর মুখের কথা নিয়ে কথা বলছি যার উপর তাদের ঈমান প্রতিষ্ঠিত। সাহাবীরা শুধুমাত্র রাসূল (স) কে প্রশ্নাতীতভাবে মান্যই করতো না, তার এমনকি তাঁর অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষাতে সাড়া দেয়ারও চেষ্টা করতো, কারণ তারা তাঁকে ভালোবাসতো, তাঁর নিকটবর্তী ছিল এবং তাঁর যোগাযোগের সূক্ষ্ম পার্থক্যও বুঝতে পারতো। সুতরাং যদি তিনি যদি ইঙ্গিত করতেন যে আবু বকর তাঁর উত্তরসূরি হবেন, তাহলে সেই সময় কেউ এই আপত্তি তুলত না যে এটা লিখিত নয়।

এটা অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে যে সাহাবীদের কাছে সালাত ছিল সকল বিষয়ের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে ধর্মের অবস্থান ছিল অন্য সবকিছুর আগে, আর নামাজ হল ধর্মের মধ্যে প্রধান। নামাজের ইমাম ছিল তাদের জীবনের ইমাম। রাসূলুল্লাহ (স) নিজে সর্বদা নামাজের ইমাম ছিলেন। এটা খুবই স্পষ্ট ছিল যে যখন রাসূলুল্লাহ (স) তার আখেরি অসুস্থ্যতার সময়ে স্পষ্টভাবে আবু বকর (রা) কে মনোনীত করলেন এবং নামাজ পড়ানোর নির্দেশ দিলেন, তার মানে হল তিনি তার উত্তরসূরি হিসেবে আবু বকর (রা) কে বাছাই করে নিলেন। আমার বিশ্বাস, রাসূল (স) একে লিখিত রূপ দেননি কারণ তিনি তার প্রশিক্ষণ সম্পর্কে খুবই নিশ্চিত ছিলেন এবং তিনি জানতেন লোকেরা আবু বকর (রা) কে কতটা শ্রদ্ধা করে। যদি তিনি সত্যিই এটা লিখে রাখা, এমনকি অন্য কাউকে, আলী ইবনে আবি তালিবসহ, উত্তরসূরি নিযুক্ত করার প্রয়োজন মনে করতেন তাহলে এমনটি করার জন্য বৃহস্পতিবার আখেরি অসুস্থতা শুরু হওয়া থেকে সোমবারে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যথেষ্ট সময় এবং সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। এ থেকে স্পষ্ট, তাঁর উত্তরসূরি কে হচ্ছেন এবং তার অনুসারী সাহাবীগণ যে তার ইচ্ছাকে সম্মান করবে এবং মেনে নিবে তা নিয়ে তাঁর মনে কোনরূপ সন্দেহ ছিল না। প্রকৃতপক্ষে ঠিক তাই ঘটেছিল এবং আলী বিন আবি তালিব (রা) সহ সকলেই বিনা দ্বিধায় আবু বকর (রা) কে খলিফাতুর রাসূলুল্লাহ হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন।

আবু বকর সিদ্দিক ছিলেন তাদের শাইখ। তারা তাঁকে অন্যদের চেয়ে অধিক শ্রদ্ধা করতো, পরামর্শ এবং বিধিনিষেধ জানার জন্য তার কাছে আসতো এবং রাসূল (স) এর সাথে বিভিন্ন বিষয়ে ইন্টারসিড করার জন্য অনুরোধ করতো। ওমর ইবনুল খাত্তাব হুদাইবিয়ার সন্ধির ব্যাপারে তার আপত্তি সম্পর্কে কথা বলতে কার কাছে গিয়েছিল? রাসূল (স) সেই মহিলাকে কি বলেছিল যখন সে কোন এক বিষয়ে তাঁর কাছে প্রশ্ন করেছিল এবং তিনি তাকে পরের দিন আসতে বলেছিলেন? মহিলা প্রশ্ন করলেন, আমি এসে যদি আপনাকে না পাই, তখন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘আবু বকরকে জিজ্ঞেস করো।’ মহিলা পুনরায় জানতে চাইলেন, ‘যদি আবু বকরও না থাকে?’ তিনি বললেন, ‘ওমরকে জিজ্ঞেস করো।’ রাসুল (স) এর সীরাত খুবই সতর্কতার সাথে এবং বিশ্বস্ত উৎস থেকে অধ্যয়ন করা এবং যারা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে যাদেরকে রাসূল (স) অন্যদের তুলনায় বেশী বিশ্বাস করতেন তাদের থেকে সাবধান থাকা জরুরী। তারা খুব কমই উপলব্ধি করতে পারে যে কোন সাহাবীর সততায় কালিমা লেপন করা মানে হল কোরআন এর বিশুদ্ধতা এবং ইসলামের সম্পূর্ণ কাঠামোতেই কালিমা লিপ্ত করা। কারণ এই সাহাবীরাই আল্লাহর কথা এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর নির্দেশাবলী আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন। আমরা যদি তাদেরকে একটি বিষয়ে বিশ্বাস করতে না পারি তাহলে কিভাবে বাকী বিষয়গুলোতে করবো? ধর্ম হিসেবে ইসলামের কি অবস্থা হবে? হয়তো আল্লাহ ও তার রাসূলের এইসব শত্রুরা তাদের কর্মের ফলাফল সম্পর্কে ঠিক বুঝতে পারে কিন্তু করে কারণ তারা ইসলামের ক্ষতি করতে চায়।

আবু বকর (রা) কে নামাজের নেতৃত্ব দেয়ার নির্দেশ দানের মধ্যে রাসূল (স) এর কি অভিপ্রায় তা সাহাবীদের কাছে পরিষ্কার ছিল। এ কারণে কেউ তাকে উত্তরসূরি নির্ধারণের জন্য কারও নাম উল্লেখ করা অথবা লিখে রাখার জন্য বলেনি, যদিও এসব করার জন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রদত্ত খুতবার পর থেকে সোমবার মধ্য-সকাল পর্যন্ত যথেষ্ট সময় এবং সুযোগ তাঁর পক্ষে ছিল। তিনি সুবোধ্য ছিলেন এবং পুরো সময়টাতেই তার কর্মক্ষমতা তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। বহু লোক তার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তিনি তাদের সাথে কথা বলেছেন। তিনি যদি চাইতেন তাহলে খুব সহজেই আলী ইবনে আবি তালিব বা অন্য কারও নাম বলতে পারতেন। তিনি আলি বিন আবি তালিবকেও সালাতে নেতৃত্ব দেয়ার নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালার দ্বারা নির্দেশিত ছিলেন এবং তিনি তাই করেছিলেন যা আল্লাহ তায়ালা চেয়েছেন। এ বিষয়টি আমাদের সবসময় মনে রাখা উচিত। আবু বকর (রা) বৃহস্পতিবার রাসূল (স) এর নির্দেশের পর থেকে সোমবারে রাসূল (স) এর ওফাত পর্যন্ত নামাজ পড়িয়েছেন। একবার আজান হওয়ার পরও আবু বকর (র) উপস্থিত না হওয়ায় মুয়াজ্জিন হযরত ওমার বিন আল খাত্তাবকে নামাজ পড়ানোর জন্য বললেন। রাসূলুল্লাহ (স) ওমরের গলার আওয়াজ শুনে বললেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা এবং মুমিনরা চায় না আবু বকর ছাড়া আর কেউ আমীর হোক।’ এটা রাসূল (স) এর স্পষ্ট ইঙ্গিত যে তিনি আবু ববকর (রা) কে তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করেছেন।

ফাতিমা (রা) প্রতিদিন তাঁর বাবাকে দেখতে যেতেন। তিনি (নবীজী) তাকে চুম্বন করতেন এবং নিজের আসনে বসতে দিতেন। একবার তিনি তাঁকে দেখতে এলেন এবং চুম্বন করলেন। রাসূল (স) তার কানে ফিসফিস করে কিছু বললেন এবং সে কাঁদতে শুরু করল। এবার তিনি অন্যকিছু ফিসফিস করে বলে বললেন এবং সে হাসল। আয়েশা (রা) তার কাছ থেকে রাসূল (স) কি বলেছেন তা জানার চেষ্টা করলেন কিন্তু সে বলতে অস্বীকার করল। রাসূল (স) এর মৃত্যুর পর সে জানালো, ‘তিনি বলেছিলেন যে এই অসুস্থতা থেকেই তিনি মৃত্যুবরণ করবেন এবং আমি কাঁদলাম। তারপর তিনি বললেন যে এই ঘরের মানুষদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম তার সাথে মিলিত হবো এবং আমি হাসলাম।’ অসুস্থতার শেষদিনে ফাতেমা (রা) বললেন, ‘হে আমার পিতা, আপনার কি যন্ত্রনাই না হচ্ছে।’ রাসূল (স) উত্তরে বললেন, ‘আজকের পর আমি আর যন্ত্রণা ভোগ করবো না।’ আমাদের উচিত নিজেদেরকে রাসূল (স) এর পরিবার এবং সাহাবীদের স্থানে নিজেকে কল্পনা করা যেন তারা সেই শেষ কয়টা দিন কেমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাদের কর্তব্য সম্পাদন করেছে তা বুঝতে পারি। রাসূল (স) এর ঘরে সাতটি দিনার ছিল। তিনি ওগুলো দান করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। রাসূলের অসুস্থতার কারণে আয়েশা (রা) তা করতে ভুলে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (স) বারবার অচেতন হয়ে চেতন ফিরে পাচ্ছিলেন। এমনই একবার চেতন হয়ে তিনি দিনারগুলো তখনো আছে কিনা জজানতে চচাইলেন। আয়েশা (র) জানালেন সেগুলো তখনো আছে। রাসূল (স) ওগুলো চাইলেন এবং তিনি তাঁর হাতে ওগুলো তুলে দিলেন। ‘এটা কি ভালো দেখাবে যদি মুহাম্মদ এই অবস্থায় তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করেন?’ দিনারগুলো তৎক্ষণাৎ বিলিয়ে দেয়া হল।

রবিবার রাত অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণভাবে কেটে গেল।

সোমবারে সাহাবীরা হযরত আবু বকর (রা) এর নেতৃত্বে নামাজ আদায় করছিলেন, রাসূল (স) তার ঘর এবং মসজিদের মধ্যবর্তী পর্দা সরিয়ে দিলেন। আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (স) দাঁড়ালেন এবং আমাদের দেখলেন। তার মুখমন্ডল ছিল চাঁদের ন্যায়। তারপর তিনি আলি বিন আবি তালিব এবং ফাহাদ ইবনুল আব্বাস এর উপর ভর করে মসজিদে আসলেন। তাকে দেখে লোকেরা এতই খুশি হল যে তারা প্রায় নামাজ ছেড়ে দিচ্ছিল। আবু বকর (রা) তেলাওয়াতে তার কন্ঠস্বর উঁচু করে বুঝাতে চাইলেন নামাজ জারী রাখা উচিত। আবু বকর (রা) বুঝতে পারলেন এই উত্তেজনার একটিই মানে, রাসূলুল্লাহ (স) আসছেন। তাই তিনি পিছিয়ে আসতে শুরু করলেন কিন্তু রাসূল (স) তাকে সামনের দিকে ঠেলে দিলেন এবং বললেন, ‘তুমি পড়াও’ এবং তিনি তার পাশে বসে পড়লেন ও বসেই নামাজ শেষ করলেন। এটাই সর্বশেষ দৃশ্য যা রাসূল (স) অবলোকন করলেন; তাঁর উম্মাত একসাথে নামাজে দাঁড়িয়ে আছে।

এই দৃশ্যটি ছিল তাঁর মিশন সম্পন্ন হবার ইঙ্গিতবাহী এবং তাকে সবচেয়ে খুশি করেছিল।

নামাজের পর তিনি সমবেতদের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার কন্ঠে ভাষন দিলেন যা এমনকি মসজিদের বাহির থেকেও শোনা গেল। তিনি বললেন, ‘হে মানবসকল, আগুন তৈরি হয়ে আছে। বিধ্বংসী আক্রমণ অন্ধকারের ন্যায় ধেয়ে আসছে। আল্লাহ সাক্ষী, এর পরে আমি আর কোনকিছুর জন্য দায়ী হবো না। কোরআন যা বৈধ করেছে তা ব্যতীত আর কোন কিছুকে আমি বৈধ করিনি এবং কোরআন যা নিষেধ করেছে তা ব্যতীত আর কোন কিছুকে আমি নিষেধ করিনি। আল্লাহর অভিশাপ তাদের উপর যারা কবরকে নিজেদের মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে (কবরকে উপাসনার স্থান বানিয়েছে)।

রাসূল (স) এর রোগমুক্তিতে মুসলমানরা এতটাই আনন্দিত হয়েছিল যে উসামা বিন যায়েদ চলে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। আবু বকর (রা) রাসূল (স) কে প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমরা সবাই আপনার জন্য দোয়া করেছিলাম, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনাকে আপনার উপর রহমত বর্ষন করেছেন এবং সুস্বাস্থ্য দান করেছেন। আমি খারিজার কন্যার সাথে (তার স্ত্রী) দিন কাটাবো বলে কথা দিয়েছিলাম। আমাকে কি অনুমতি পেতে পারি?’ রাসূল (স) তাকে অনুমতি দিলেন এবং তিনি মদীনার সীমান্তে সুনাহ (Sunh) এ গেলেন। হযরত ওমর (রা) এবং হযরত আলী (রা) তাদের নিজেদের ব্যবসায়ে ফেরত গেলেন। রাসূল (স) আয়েশা (রা) এর ঘরে ফিরে আসলেন। আয়েশা (রা) এর ভাই, আব্দুর রহমান বিন আবু বকর, রাসূল (স) কে দেখতে এলেন। তার পকেটে একটি মিসওয়াক ছিল। আয়েশা (রা) লক্ষ্য করলেন রাসূল (স) মিসওয়াকটির দিকে তাকিয়ে আছেন, তাই তিনি জানতে চাইলেন ওটা তার চাই কিনা। রাসূল (স) মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন এবং তিনি মিসওয়াকটি নিয়ে চিবিয়ে নরম করে দিলেন এবং রাসূল (স) এর দাঁত পরিষ্কারের জন্য তার মুখে দিলেন। আয়েশা (রা) সূরা ফালাক্ব এবং সূরা নাস পড়ে রাসূল (স) এর হাতে ফুঁ দিলেন এবং তার শরীরে বুলিয়ে দিলেন।

আল্লাহর রাসূল (স) এর অবস্থার দ্রুত অবনতি হল এবং তিনি একটি পানিভর্তি পাত্রে হাত ডুবিয়ে নিয়ে মুখ মুছতে লাগলেন এবং বললেন, ‘As sakaraathil mawti bil haq’ (মৃত্যুর অসারতা (যন্ত্রনা) সত্য)।’

তারপর সেই অন্তিম সময় উপস্থিত হল। আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, ‘I saw him looking towards the heavens and saying, ‘Bal il Rafeeqil A’ala Bal il Rafeeqil A’ala Bal il Rafeeqil A’ala.’ So I knew that the angel of death had come and asked his permission and he chose Allah and did not choose us.’ Then his head turned towards me and I screamed.

সংবাদটি মদীনাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। ওমর এবং মুগিরা (রা) রাসূল (স) এর ঘরে ছুটে আসলেন। ওমর (রা) বলকেন, ‘তিনি অচেতন হয়ে গেছেন।’ মুগিরা (রা) বললেন, ‘তিনি মারা গেছেন।’ ওমর (রা) বললেন, তুমি ফিতনা তৈরি করতে চাইছো। মুনাফিকদের ধ্বংস করা ব্যতীত তিনি মৃত্যুবরণ করবেন না।’ ওমর (রা) মসজিদে গেলেন এবং তার ততরবারি বের করে বললেন, লোকেরা বলছে যে রাসূল (স) মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি মারা যাননি বরং মুসা (আ) এর মত অজ্ঞান হয়ে গেছেন। যদি কেউ বলে তিনি মারা গেছেন, আমি এই তরবারি দিয়ে তার মাথা কেটে ফেলবো।’

আবু বকর (রা) তখন মদীনার সীমান্তে ছিলেন, তার কাছে এই সংবাদ পৌঁছালে তিনি দ্রুত ফিরে এলেন। তিনি কারও সাথে কথা না বলে সোজা আয়েশা (রা) এর ঘরে গেলেন যেখানে রাসূল (স) শায়িত ছিলেন। তিনি রাসূল (স) এর ঢেকে রাখা মুখ উন্মুক্ত করে তাকে চুম্বন করলেন এবং কাঁদলেন, বললেন, ‘আপনি জীবিত অবস্থায় পবিত্র ছিলেন, মৃত অবস্থায়ও পবিত্র। যে মৃত্যু আপনার জন্য অবধারিত ছিল, আপনি তার মধ্য দিয়েই চলে গেলেন।’

তিনি তারপর মসজিদে এলেন এবং দেখলেন ওমর (রা) লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করছেন। তিনি বললেন, ‘ Ijlis Ya Omar,’ (বসে যাও, হে ওমর)। কিন্তু ওমর (রা) তাকে উপেক্ষা করলেন। তাই আবু বকর মিম্বারে আরোহন করলেন এবং লোকদের উদ্দেশ্যে কথা আরম্ভ করলেন। লোকেরা ওমর (রা) কে ছেড়ে তার কথা শুনতে এল। তিনি বললেন, ‘man kaana yaabudu Muhammadan in kaana Muhammadan qad-maat. Wa in kaana ya-budullah fa innallaha hayyun la yamooth. (যারা মুহাম্মদের উপাসনা করে, তারা জেনে রাখুক যে মুহাম্মদ এখন মৃত। যারা আল্লাহর উপাসনা করে তারা জেনে নিক আল্লাহ কখনো মৃত্যুবরণ করে না)। তারপর তিনি নিন্মোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন:

আর মুহাম্মদ একজন রসূল বৈ তো নয়! তাঁর পূর্বেও বহু রসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুতঃ কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ, আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন। (সূরা আল ইমরান ৩: ১৪৪)

ওমর (রা) বললেন, ‘এই আয়াতটি কোরআনের?’ আয়াতটি তিনি জানতেন কিন্তু এমনভাবে বললেন যেন তিনি এই প্রথমবার শুনলেন।’ এবার তিনি ভেঙ্গে পড়লেন এবং বললেন, ‘আমার পা আমাকে আর বহন করতে পারছে না।’ বর্ণনাকারী বলেন, সকলেই আয়াতটি এমনভাবে তেলাওয়াত করছিল যেন তারা এটি প্রথমবার শুনছে।’

রাসূল (স) এর আশেপাশের মানুষ যাদেরকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন তাদের প্রকৃতি কিরূপ তা বোঝানোর জন্য আমি এই ঘটনাটি এত বিশদভাবে বর্ণনা করলাম। সাহাবীদের মধ্যে এমন কেউ ছিল না যে রাসূলুল্লাহকে আবু বকর (রা) এর চেয়ে বেশি ভালোবাসতো এবং যাকে রাসূলুল্লাহ (স) আবু বকরের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। যদি এমন কেউ থাকতো যার প্রিয়তম বন্ধুর মৃত্যুতে দু:খে ভেঙ্গে পড়া এবং ক্রিয়াহীন হয়ে যুক্তিযুক্ত মনে হয় তিনি হলেন আবু বকর (রা)। অথচ তিনিই একমাত্র লোক যিনি তার যন্ত্রণাকে পাশ কাটিয়ে শক্ত খুঁটি হলেন যেন অন্যরা তার থেকে সহায়তা নিতে পারে। শক্তিশালী ছিল ওমর (রা), অথচ সেই রাসূলুল্লাহ (স) এর মৃত্যুকে গ্রহণ করতে পারেনি এবং বাস্তবতার আঘাতে ভেঙ্গে পড়েছিল। যে আবু বকর (রা) রাসূল (স) কে অন্য যে কারও চেয়ে বেশি ভালোবাসতো সেই দৃঢ় থেকে উম্মাহকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হয়েছিল। প্রশিক্ষণের প্রমাণ পাওয়া যায় যখন নেতা তার অনুসারীদের মাঝে অনুপস্থিত থাকেন। এবং এরকম একটি সময়ে রাসূলুল্লাহ (স) এর প্রথম দিকের শিক্ষার্থী আবু বকর (রা) কে পাওয়া গেল সর্বোত্তম অবস্থায়। তার কর্মের মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করেছেন রাসূল (স) সর্বোত্তম ব্যক্তিকেই বাছাই করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (স) এর মিয়াহন কেবলমাত্র তার বার্তা পৌঁছানো ছিল না বরং ছিল এমন একটি জাতি প্রস্তুত করা যারা প্রজন্মের পর প্রজন্মে এই বার্তা পৌঁছে দিবে। আবু বকর (রা) এমন একটি প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই কাহিনীটি দিয়েই এই অধ্যায়টি সমাপ্ত করা যায় কারণ ইতিহাস সাক্ষী এর পরে কি ঘটেছিল এবং পরবর্তী চৌদ্দশত বছর ধরে বর্তমান সময় পর্যন্ত ঘটে চলছে, এমন সময় ও স্থানে যা রাসূল (স) জানতেনও না, দেখেনও নি।

একজন নেতার কাছে কঠিনতম কাজ তার নির্দেশ মান্য করানো নয়, বরং সে যে স্বপ্ন দেখেছে তাদেরকে দিয়েও সেই একই স্বপ্ন দেখানো। এমন এক ভিশন অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা যা একমাত্র সেই দেখতে পেরেছে। যখন মানুষ কোন ভিশন অর্জনের জন্য দৃঢ় সংকল্প করে, একমাত্র তখনই তারা এর বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। যে কোন ক্ষেত্রেই একজন নেতার জন্য এটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।

মুহাম্মদ (স) এটা শুধু তার নিজের প্রজন্মেই সফলভাবে করতে সক্ষম হয়নি, পরের প্রজন্ম যারা জন্মই নেয়নি তাদের মাঝেও পৌঁছে দিয়েছেন। যারা মুহাম্মদ (স) এর সময়ে বেঁচে ছিল না, কখনো তাকে দেখে নি কিংবা তার কন্ঠ শুনেনি তারাও এমনভাবে তাঁর বার্তা দূর দুরান্তে পৌঁছে দিচ্ছেন যেন তারা সরাসরি তাঁর কাছ থেকেই আসছেন। তারা তাঁকে নিজেদের পিতামাতা ও সন্তানদের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন এবং তার সম্মান রক্ষার্থে প্রয়োজনে নিজেদের জীবন ত্যাগ করতে রাজী এবং এমন কিছু করাকে গৌরবের কাজ বলে মনে করেন। রাসূল (স) এর নেতৃত্বে এমন কি ছিল যা এসব কিছু সম্ভবপর করে তুলেছে? কি এমন বিষয় যা তাকে যে কোন বিচারেইই স্মরণীয় করেছে? তাঁর মধ্যে কি এমন ছিল যার কারণে তার চরম শত্রুও তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁর সম্পর্কে ভালো বলতে বাধ্য হত? বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ঘটনাটি যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি সেরকম একটি ঘটনা।

এক্সট্রাঅর্ডিনারি গুণাবলী

বলা হয়, শেষ পর্যন্ত ফলটাই ঘরে নেয়া যায়। ফলাফল নির্ভর করে গুণের উপর। গুণ হলো সবচেয়ে বড় পার্থক্যকারী, অনুসারীদের জন্য সবচাইতে প্রেরনাদায়ক এবং চলমান সফলতার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা।

আগেই বলেছি, রাসূল (স) এবং সাহাবীদের কাছে নামাজ ছিল সবকিছু পরিমাপ করার মিটার। তাদের জীবনকে সংজ্ঞায়িত করেছে নামাজ। তাদের সকল প্রয়োজন পূরণের জন্য তারা সালাতের দিকেই তারা মুখ ফিরাতো। সালাত ছিল তাদের নিরবতার, রবের সাথে কাটানোর সময়, তাদের কর্মশক্তির প্রেরণা।  নামাজ ছিল তাদের চিত্তবিনোদন, ভারমুক্ত করার উপকরণ এবং তাদের শক্তি। রাসূল (স) বিলাল বিন রাবাহ (রা) কে ডেকে নামাজের জন্য আজান দিতে বলতেন, ‘Farehna biha Ya Bilal,’ (এর মাধ্যমে আমাদের শান্তি দাও হে বিলাল)।

নামাজের মাধ্যমেই রাসূল (স) তার উত্তরসূরি কে হবেন সেই বার্তা দিয়ে যান এবং তাঁর রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্বে পৃথিবীর যে দৃশ্যটি তাকে সুখী করেছিল তা ছিল সাহাবীদের নামাজ। তাই এটা খুব স্বাভাবিক যে রাসূলুল্লাহ (স) নামাজের ভাষাতেই গুণাবলী বর্ণনা করবেন। বিখ্যাত হাদীসে জীবরাইলে রাসূল (স) জীবরাইল (আ) এর প্রশ্নের উত্তরে ইহসান (যার একটি অর্থ উৎকর্ষতা) বলতে কি বোঝায় বলেছেন। আমি এখানে সম্পূর্ণ হাদীসটি উপস্থাপন করছি, তবে আলোচনার ক্ষেত্রে কেবলমাত্র আল ইহসান সম্পর্কে গুরুত্বারোপ করবো।

ইয়াহিন বিন ইয়ামুর এর সূত্রে বর্ণিত যে একদা তিনি মসজিদে প্রবেশের সময় আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) এর সাথে দেখা হল। তিনি (আবদুল্লাহ ইবনে ওমর) বলেন, ‘আমার বাবা, ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা), বলেন, একদা আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর খিদমতে ছিলাম। এমন সময় একজন লোক আমাদের কাছে এসে হাযির হলেন। তাঁর পরিধানের কাপড় ছিল সা’দা ধবধবে, মাথার কেশ ছিল কাল কুচকুচে। তাঁর মধ্যে সফরের কোন চিহ্ন ছিল না। আমরা কেউ তাঁকে চিনি না। তিনি নিজের দুই হাঁটু নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দুই হাঁটুর সাথে লাগিয়ে বসে পড়লেন আর তার দুই হাত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দুই উরুর উপর রাখলেন।

 

তারপর তিনি বললেন, হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইসলাম হল, তুমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত (নামায/নামাজ) কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রামাযানের রোযা পালন করবে এবং বায়তুল্লাহ পৌছার সামর্থ্য থাকলে হাজ্জ (হজ্জ) পালন করবে। আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। তার কথা শুনে আমরা বিষ্মিত হলাম যে, তিনই প্রশ্ন করেছেন আর তিনই-তা সত্যায়িত করছেন।

 

আগন্তুক বললেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ঈমান হল আল্লাহর প্রতি, তার ফেরেশতাদের প্রতি, তার কিতাবসমূহের প্রতি, তার রাসুলগণের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান আনবে, আর তাকদিরের ভালমন্দের প্রতি ঈমান রাখবে। আগন্তুক বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন।

 

তারপর বললেন, আমাকে ইহসান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইহসান হলো, এমনভাবে ইবাদত-বন্দেগী করবে যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, যদি তুমি তাকে নাও দেখ, তাহলে ভাববে তিনি তোমাকে দেখছেন।

 

আগন্তুক বললেন, আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ বিষয়ে প্রশ্নকারীর চাইতে যাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে তিনি অধিক অবহিত নন। আগন্তুক বললেন, আমাকে এর আলামত সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসুল বললেনঃ তা হলো এই যে, দাসী তার প্রভুর জননী হবে; আর নগ্নপদ, বিবস্ত্রদেহ দরিদ্র মেষপালকদের বিরাট বিরাট অট্টালিকার প্রতিযোগিতায় গর্বিত দেখতে পাবে।

 

উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বললেন যে, পরে আগন্তুক প্রস্হান করলেন। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে উমর! তুমি জানো, এই প্রশ্নকারী কে? আমি আরয করলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই সম্যক জ্ঞাত আছেন। রাসুল বললেনঃ তিনি জিবরীল। তোমাদের তিনি দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।  (সহীহ মুসলিম ৮) (সূত্র)

আমার দৃষ্টিতে আল ইহসান সম্পর্কিত চিহ্নিত অংশটুকু রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবনে উৎকৃষ্টতার ধারণার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত যা রাসূল (স) নিজে পালন করেছেন এবং আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে রেখে গেছেন যেন আমরা নিজেরাই পরিমাপ করতে পারি। আমি আগেও বলেছি, ইসলাম এবং রাসূল (স) এর শিক্ষার ক্ষেত্রে সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ধর্মের আঙ্গিকে বলা হয়েছে কিন্তু এর প্রয়োগ কেবলমাত্র ধর্মীয় প্রার্থনাই নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এ কারণেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার রাসূলের শুধুমাত্র উপাসনার অংশটুকু নয়, সমগ্র জীবনকেই মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে ঘোষনা করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহুতা’য়ালা বলেন:

যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। (সূরা আহযাব ৩৩ঃ২১)

ইসলাম হল জীবনের পূর্নাঙ্গ পথ যা ধর্মবিশ্বাস (আকীদা) থেকে শুরু করে উপাসনা (ইবাদত), আচরণবিধি (আখলাক), ব্যবহার (মু’য়ামিলাত) এবং সমাজ (মু’য়াশিরাহ) পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে, যদিও নীতিমালা এবং আদর্শসমূহ ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা হয়, তারা জীবনের বাকী সকল ক্ষেত্রেও পরিব্যপ্ত।

এই হাদীসে উৎকর্ষতা/শ্রেষ্ঠত্ব বলতে রাসূল (স) যা বলেছেন তার সহজ অর্থ হলো আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার উপস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা। এর মানে হল তিনি আমাদের দেখছেন, তিনি আমাদের সহায়তা করবেন, আমাদের বিচ্যুতিসমূহ ক্ষমা করবেন, আমাদের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করবেন এবং আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল কাজে, কথায় এই সচেতনতার সার্বক্ষণিক উপস্থিতি থাকতে হবে। আমাদের প্রত্যেকটি লেনদেন, প্রত্যেকটি কথোপকথন, প্রত্যেকটি সম্পর্ক স্থাপনের সময় এটি মনে রাখতে হবে। ভাবুনতো এমন একটা সমাজ তৈরি হলে কেমন হবে যেখানে সকল সদস্য এই সত্যটি সম্পর্কে জ্ঞাত এবং সতর্ক যে সে এক আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ যার কাছে কোন কিছুই লুক্কায়িত নয় এবং একদিন তাকে জবাবদিহির জন্য ডাকা হবে ও সে কেমন জীবন যাপন করেছে তার উপর ভিত্তি করে তাকে পুরস্কার অথবা শাস্তি দেয়া হবে? এটা হবে এমন একটি সমাজ যেখানে মানুষ বস্তুগত সম্পদ নয় বরং পরস্পরের কাছে ভালো হওয়ার, অধিকার পূর্ণ করার জন্য প্রতিযোগিতা করবে।

রাসূলুল্লাহ (স) তার নিজের জীবনে এমন একটি সমাজ তৈরি করেছিলেন। রাসূল (স) কে অন্যান্য শিক্ষকদের থেকে আলাদা করেছে তার জীবন যা ছিল তাঁর প্রচারিত শিক্ষার জীবন্ত উদাহরণ। তার জীবনে কথা ও কাজের মধ্যে কোন অমিল ছিল না। তিনি অন্যকে যা করতে বলেছেন তা নিজে করেছেন এবং তিনি ছিলেন জীবন-যাপন, হাঁটা-চলা, কথা-বার্তায় ইসলামের পতাকাবাহক। তার জীবনে, ইসলাম কেবলমাত্র কোন তত্ত্ব, আদর্শ বা দর্শন ছিল না বরং সত্যিকারের বাস্তব পদ্ধতি যা পরবর্তীতে আবু বকর (রা) এর পরবর্তী খলিফা সাইয়্যিদিনা ওমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল। খলিফা নির্বাচিত হবার পর ওমর (রা) কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, আবূ বকর (রা) আমার জন্য অনেক উঁচু আদর্শ স্থাপন করে তার পরবর্তী খলিফাদের জন্য কঠিন করে গেছেন।’

আরেকটি উদাহরণ: প্রত্যেকদিন ভোরে ফজর নামাজের আগে আবু বকর সিদ্দিক (রা) মদীনার সীমান্তে অবস্থিত একটি ক্যাম্পে যেতেন। তিনি তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করতেন এবং কিছু সময় কাটিয়ে ফিরে আসতেন। তার মৃত্যুর পরে ওমর (রা) ঠিক করলেন ওই তাঁবুতে কে বাস করে তা জানতে আগ্রহী হলেন। তিনি ক্যাম্পে গিয়ে বয়সের কারণে প্রায় অন্ধ একজন বৃদ্ধা মহিলাকে পেলেন।

তিনি তাকে তার নিজের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বৃদ্ধা মহিলা উত্তর দিলেন, ‘আমি এক বৃদ্ধা মহিলা যার এই দুনিয়াতে কেউ নেই এবং আমি এখানে আমার ভেড়া নিয়ে একাকী বাস করি। প্রত্যেক সকালে মদীনা থেকে একজন লোক আমার এখানে এসে আমার তাঁবু পরিষ্কার করে, আমার খাবার রান্না করে, ভেড়ার দুধ দোহন করে, তাদের যত্ন নেয় এবং তারপর ফিরে যায়। তার যত্ন-পরিচর্যা ব্যতীত আমার পক্ষে টিকে থাকতে পারতাম না। ওমর (রা) জানতে চাইলেন, ‘আপনি জানেন তিনি কে?’ উত্তরে তিনি জানালেন লোকটি কে সে সম্পর্কে তার ককোন দধারনা নেই কারণ সে কখনো তাকে বলেনি।

ওমর (রা) তাকে বললেন, ‘তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স) এর খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা)।’

এমন একটা সমাজে বসবাসের কথা ভেবে দেখুন যেখানে একজন শাসক নিজে দুর্বল ও বঞ্চিতদের সেবা করছে। এমন একটি সমাজ যার শাসক তার জনগণের ভয়ে ভীত নয় বরং শাসিতদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাব দেয়ার ভয়ে ভীত।

আমীরুল মু’মিনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে খলিফা থাকাকালীন সময়ে একদিন তিনি সাহাবীদের সাথে এক স্থানে এলেন এবং বললেন, সকল প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার যিনি মহিমান্বিত এবং তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে দেন সে যাই চাক না কেন। এমন এক সময় ছিল যখন আমি আমার পিতার উটের রাখাল ছিলাম। আমি উটগুলোকে নিয়ে এখানে আসতাম। আমার পিতা আমাকে অনেক কাজ দিতেন এবং আমি যদি কাজ না করতাম, তবে তিনি আমাকে প্রহার করতেউ এবং আমি খুব জীর্ণ শীর্ণ পোষাক পরিধান করতাম। কিন্তু আজ আমার দিকে তাকাও, আল্লাহ আমাকে এত উচ্চতায় নিয়ে এসেছেন যে আমার আর আল্লাহর মাঝে আর কেউ নেই।’

আবদুর রহমান ইবনে আওফ বর্ণনা করেন যে ওমর (রা) লোকদের মসজিদে ডাকলেন এবং তারা জমায়েত হবার পর তিনি মিম্বারে উঠলেন এবং বললেন, ‘আমি আমার কিছু ফুপুদের রাখাল ছিলাম এবং আমি যখন ঘরে ফিরতাম, তারা আমাকে মুঠোভর্তি খেজুর অথবা কিসমিস দিতেন এবং আমাকে একটি দুর্বিষহ দিন যেত।’ তারপর তিনি মিম্বার থেকে নেমে পড়লেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ তাকে বললেন, ‘এই খুতবার কারণ কি?’ আপনি তো নিজেকে সবার সামনে ছোট করলেন। এতে কি লাভ হল?’ ওমর (রা) বললেন, ‘তোমার অমঙ্গল হোক হে ইবনে আওফ। আমার নফস আমাকে বলছিল, ‘তুমি হলে আমীরুল মু’মিনীন। তোমার থেকে ভালো আর কে আছে?’ আমি আমার নফসকে শিক্ষা দিলাম সত্যিটা কি।’

Omar ibn Al Khattab could not be fooled by anyone including himself. আবদুল্লাহ বিন মাসুদ সাহাবীদের সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ সাক্ষী, তারা এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ লোক ছিলেন। তারা ছিলেন সবচেয়ে পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী (সর্বাধিক তাক্বওয়াবান)। তাদের ছিল সুগভীর জ্ঞান। And they were the least superficial (least formality).’ তিনি ‘সকল জ্ঞান’ বলেন নি, বলেছেন ‘সুগভীর জ্ঞান’। (He did not say ‘most knowledge’ but ‘deepest knowledge’.) এর কারণ হল তারা সরাসরি রাসূলুল্লাহ (স) এর কাছ থেকে শিখেছিলেন। যদিও একজন সাহাবী ইমাম বুখারী বা মুসলিমের মত এত বেশি হাদীস জানতেন না, তারা সেগুলো জীবন্ত রেখেছিলেন এবং কোন হাদীস কী প্রেক্ষাপটে উপস্থিত হয়েছে তার সাক্ষী ছিলেন। তারাই একমাত্র প্রজন্ম যারা প্রকৃতপক্ষে রাসূল (স) যা বলেছেন তা শুনেছিলেন এবং জানতেন কেন তিনি তা বলেছেন। কোরআন নাজিলের সময় তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁকে ওহী গ্রহণ করতে দেখেছেন। জিবরাঈল (আ) যখন মানুষের রূপে হাজির হয়েছেন তখন তারা তাকে দেখেছেন এবনভ তার কথা শুনেছেন। সাহাবীরা ছিলেন পরিচ্ছন্ন এবং তাদের জীবন ছিল সাধারণ এবং খাঁটি। তারা এমন একটি জাতি যা গ্রীক দর্শন বা রোমান ও পারস্য সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। তাই যখন ইসলাম এলো, তারা একে গ্রহণ করে নিল এবং কোন কিছু যোগ না কিরে এর বিশুদ্ধতম রূপে পালন করল।

এমনকি ইসলাম আগমনের পূর্বে, জাহিলিয়্যাতের যুগেও তারা ছিল মরুভূমির সাধারণ লোক। তাদের ভাষা কৃত্রিমতা এবং বাহুল্য বিবর্জিত ছিল। তাদের কবিতা ছিল সরল এবং বর্ণনাত্মক, রূপক এবং প্রতিকী নয়। হিন্দু বা গ্রীকদের মতো জটিল দর্শন, প্রতীকীবাদ এবং যুক্তিতে পরিপূর্ণ কোন পৌরাণিক কাহিনী তাদের ছিল না। এমনকি যখন তারা মূর্তিপূজা করতো, তারা কেবল তার সামনে মাথানত করতো এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোরবানী দিতো। এটুকুই। এর পেছনে কোন জটিল কাহিনী এবং দার্শনিক যৌক্তিকতা ছিল না। এর সাথে কোন পৌরাণিক কাহিনী সংযুক্ত ছিল না।

ইসলাম গ্রহণের সময় তারা তাদের এই স্পষ্টতা এবং সরলতা দ্বীনের কাছে নিয়ে এসেছে। তারা দর্শন এবং যুক্তিকে এর সাথে যুক্ত করে নি। তারা কুরআন এবং সুন্নাহকে যেভাবে পেয়েছে সেভাবেই গ্রহণ করেছে এবং আন্তরিকতার সাথে পালন করেছে ও জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা আয়াতের গভীর কোন অর্থ খোঁজ করেনি। তারা শুনেছে এবং মেনে নিয়েছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

রাসূল বিশ্বাস রাখেন ঐ সমস্ত বিষয় সম্পর্কে যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুসলমানরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমুহের প্রতি এবং তাঁর পয়গম্বরগণের প্রতি। তারা বলে আমরা তাঁর পয়গম্বরদের মধ্যে কোন তারতম্য করিনা। তারা বলে, আমরা শুনেছি এবং কবুল করেছি। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা। তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। (সূরা বাকারা ২ঃ২৮৫)

যারা আয়াতের গুপ্ত অর্থ সন্ধান এবং জটিল দার্শনিকতা তৈরি করে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ

তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট, সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে, তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেনঃ আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এই সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নেরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। (তাফসির আত-তাবারী) (সূরা আল ইমরান ৩ঃ৭)

সাহাবীরা যার উপর কোরআন নাজিল হয়েছে সেই মুহাম্মদ (স) এর কাছ থেকে সরাসরি কোরআন শিখেছেন। তারাই একমাত্র প্রজন্ম যারা প্রত্যেকটি ওহী, প্রত্যেকটি আয়াত নাজিলের পরিস্থিতির সাক্ষী। তারা কেবল শব্দের পারিভাষিক অর্থই নয়, এই শব্দগুলো নাজিলের কারণও অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এই কারণেই মুসলিম স্কলারগণ আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (স) এর সুন্নাহ সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে সাহাবীদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং কে কষ্টিপাথর বিবেচনা করেছেন। এমনকি ভাষাবিদ্যার ক্ষেত্রেও কোন বিশেষ শব্দের অর্থ কী হবে তা চূড়ান্ত হয় কোরআন হাদীসের আলোকে সাহাবীরা সেই শব্দটির অর্থ কি বুঝেছিলেন তার উপর।

এই কারণে রাসূল (স) তার বিখ্যাত হাদীসে তাদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, ‘The best generation is my generation and then those that come after them and those that come after them.’ হাদীস বিশারদগণ বলেন এই শ্রেষ্ঠত্ব ক্রম এবং আদর্শ উভয়ক্ষেত্রেই, যার মানে হল সর্বোত্তম মুসলমান হল তারাই যারা বিশ্বাস এবং কর্মের দিক থেকে রাসূল (স) এবং তার সাহাবীদের নিকটতম।

ইসলামে বিদয়াত মক্কা এবং মদীনায় শুরু হয়নি। বর্তমান সময়ের সকল দর্শন এবং জটিল তত্ত্বসমূহ যা নিয়ে অনেক বই-পুস্তক রচিত হয়েছে তার বেশিরভাগই সাহাবীদের সময়ের অনেক পরে যখন ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং কপ্টিক ক্রিস্টিয়ানিটি ও হিন্দুত্ববাদের সংস্পর্শে এসেছে তখন আবির্ভূত হয়েছে।

এই সময়ে ইসলামের মধ্যে দর্শন প্রবেশ করে৷ সাহাবীরা ছিলেন কর্মমুখী, আল্লাহর সাথে সংযুক্ত এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে সচেষ্ট। এমন আন্দাজ-অনুমান করা যা মূল্যহীন এবং কেবল সন্দেহ সৃষ্টি ও ঈমানকে দুর্বল করে, তার সময় বা আগ্রহ – কোনটিই তাদের ছিল না।

সাহাবীদের কাছে শিক্ষার চিহ্ন ছিল সরলতা এবং সুস্পষ্টতা, জটিলতা, প্যাঁচানো যুক্তি এবং দর্শন নয়। তারা কূটনৈতিক ছিলেন না। তারা ছিলেন স্পষ্টবাদী। তারা মানুষের মতামতের চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভয় করতেন। তারা মানুষের কাছে অপছন্দনীয় হওয়ার চেয়ে আল্লাহ এবং তার রাসূল (স) এর কাছে অপছন্দনীয় হওয়াকে ভয় করতেন। তাই তারা যা বলা দরকার তাই বলেছেন, সে সম্পর্কে লোকে যাই ভাবুক না কেন। শুধুমাত্র সাহাবীদের গল্প না শুনে তাদের মতো চরিত্র গঠন ইসলামে বেশ গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাদেরকে মানদন্ড বিবেচনায়ই আমাদের বিচার করা হবে।

আল ইহসান বক্তে সাহাবীরা এটাই বুঝেছিলেন এবং নিজেদের জীবনে তারা এরই পরিপালন করেছিলেন। সাহাবীদের জীবনে বহু ঘটনা রয়েছে যেগুলো আমি এখানে পুনরাবৃত্তি করতে চাই না। বর্তমান সময়ের যে কারও জন্য খুবই ভালো পরামর্শ হল তাদের জীবনী পাঠ করা এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর সময়ে বেঁচে থাকা কেমন হত তা অনুধাবনের চেষ্টা করা।

আমি বিশ্বাস করি কেউ যদি তার সহযোগীদের কল্যাণে আগ্রহী হয় তবে রাসূল (স) এর জীবনীপাঠ খুবই জরুরী এবং বর্তমানের পৃথিবীতে সেই সময়ের পুনঃসৃষ্টির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা উচিত। তবেই আমরা সুবিচার, সমবেদনা, সত্যবাদীতা এবং সহমর্মিতাপূর্ণ একটি পৃথিবী পেতে পারি। বর্তমান সময়ে এগুলোর অভাব প্রকট, ফলে আমরা এমন একটা পৃথিবীতে বাস করছি যার বৈশিষ্ট্য হলো নিষ্ঠুরতা, উদাসীনতা এবং বৈষম্য। কেমন পৃথিবী আমরা চাই সেটা আমাদেরই সিদ্ধান্ত।

হিজরত

মুহাম্মদ (স) এর মক্কা থেকে মদীনায় গমন বা হিজরতের ঘটনা স্মরণ করার জন্য কিছু সময় ব্যয় করা যেতে পারে।

ইসলামের ইতিহাসে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঘটনা এতই গুরুত্বপূর্ণ যে ওমর ইবনুল খাত্তাবের সময়ে যখন হিজরী সাল কোন তারিখ থেকে গণনা করা হবে তা নির্ধারণের প্রয়োজন হল, সাহাবীরা রাসুলুল্লাহ (স) এর জন্ম বা মৃত্যুদিবসকে বাছাই না করে পৌত্তলিকতার ভূমি থেকে সেই ভূমিতে, যেখানে ইসলামিক একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, অভিবাসনের দিনকে বেছে নিলেন। এর প্রতিকী অর্থ হল যখন কোন ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির উপরে আল্লাহর ইচ্ছাকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে চলার মধ্যেই কেবল মুক্তি এবং সফলতা নিহিত মেনে নিয়ে নিজেকে সমর্পন করল, সে যেন নতুন জীবন শুরু করল। হিজরত আরও একটি কারণে গুরুত্বপুর্ণ কারণ এই সময়েই রাসূলুল্লাহ (স) এর উম্মত প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়েই মুসলমানরা একক রাষ্ট্র হিসেবে – জাতীয়তা, গোত্র বা বর্ণের ভিত্তিতে নয়, বরং বিশ্বাসের ভিত্তিতে – প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়েই শতবর্ষের গোত্রীয় এবং জাতীয়তার বন্ধন মুছে গিয়ে বিশ্বাসের ভিত্তিতে নতুন বন্ধন স্থাপিত হয়। এমন এক মুহুর্ত যখন ভাতৃত্বের কারণ প্রতিষ্ঠিত হল। এক আল্লাহর ইবাদত এবং তার রাসূল (স) এর অনুসরণ করাই হল এখানে অন্তর্ভূক্তির একমাত্র শর্ত। খুবই দুঃখের বিষয়, মুসলমানরা বর্তমানে কেবল হিজরী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করাই বন্ধ করেনি, রাসূল (স) বন্ধনের যে সকল ভিত্তি মুছে ফেলেছিল সেগুলো পুনরায় আঁকড়ে ধরেছে। এর ফলাফল পরিষ্কার।

হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, একদিন দুপুরে আমরা একজন লোককে আমাদের বাড়ির দিকে আসতে দেখলাম, তার মুখ আবৃত ছিল। যখন তিনি সামনে এলেন, আমার পিতা তাকে চিনলেন। তিনি বললেন, জরুরী না হলে মুহাম্মদ (স) এসময় আসতেন না। তিনি বাড়িতে প্রবেশ করলেন এবং আমার পিতাকে বললেন, দয়া করে সবাইকে এই স্থান ত্যাগ করতে বলুন। আবু বকর (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (স), ‘এখানে আপনার পরিবার ভিন্ন কেহ উপস্থিত নেই।’

সীরাতের প্রত্যেকটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করা অপরিহার্য। বন্ধুত্বের কোন পর্যায়ে আপনার বন্ধু আপনার ঘরে প্রবেশ করতে পারে এবং বলতে পারে, দয়া কিরে সবাইকে এই স্থান ত্যাগ করতে বলুন’, এবং প্রতিউত্তরে ‘হে আল্লাহর রাসূল, এখানে আপনার পরিবার ভিন্ন কেহ নেই’ গ্রহণ করে। আবু বকর সিদ্দীক ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স) এর নিকটতম বন্ধু যারা একে অপরকে যে কারও চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাদের এই ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের শিকড় ছিল গভীর এবং আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।

আল্লাহর রাসূল (স) তারপর বললেন, আমাকে মক্কা ত্যাগ এবং হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবু বকর (রা) প্রশ্ন করলেন, ‘আমি কি আপনার সঙ্গী হতে পারি?’ রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, ‘হ্যাঁ।’আবু বকর (রা) আনন্দে কাঁদতে শুরু করলেন। আয়েশা (রা) বলেন ‘এই প্রথম আমি কাউকে আনন্দে কাঁদতে দেখলাম।’ এই অভিযাত্রা ছিল বিপদের কিন্তু আবু বকর (রা) রাসূল (স) এর সাথী হতে পেরে খুবই খুশী হলেন। রাসূল (স) আবু বকর (রা) কে দুটি উট প্রস্তুত করতে বললেন। আবু বকর (রা) তাকে বললেন, ‘আমি ইতোমধ্যেই তাদেরকে প্রস্তুত করে রেখেছি হে আল্লাহর রাসূল। আমার মনে হচ্ছিল যে আপনার রব আপনাকে মক্কা ত্যাগের অনুমতি দিবেন এবং তাই আমি উটগুলোকে প্রস্তুত করে রেখেছি।’ রাসূল (স) বললেন, ‘আমি ওগুলোর মূল্য পরিশোধ কিরবো।’

আবু বকর (রা) বললেন, ‘যা আপনাকে সন্তুষ্ট করে তাই আমার নিকট গ্রহণযোগ্য।’ এটা আতিথিয়তার মৌলিক নীতি – অতিথিকে যা সন্তুষ্ট করে তা করা এবং নিজের ইচ্ছাকে অতিথির উপর চাপিয়ে না দেয়া।’

রাসূল (স) হযরত আলী ইবনে তালিব (রা)কে তাঁর বিছানায় ঘুমানো এবং তাঁর কাছে রক্ষিত আমানত (নিরাপত্তার জন্য কিছু লোক যা তার কাছে রাখতে দিয়েছিল) প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। আলী (রা) নির্দ্বিধায় তা পালন করলেন। রাসূল (স) এর সাথী বা সাহাবীদের অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল তারা কখনোই নিজের এবং তাদের পরিবারের উর্ধ্বে রাসূল (স) এর স্বস্তি এবং নিরাপত্তার জন্য কিছু করতে দ্বুধা করতো না। তাদের নিকট আল্লাহর মনোনীত বার্তাবাহক ছিলেন যেকোন কিছুর চেয়ে প্রিয় এবং মূল্যবান, এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও।

গ্রেফতার এড়াতে দুই সঙ্গী, মুহাম্মদ (স) এবং আবু বকর (রা), ঘুরপথে মক্কা ত্যাগ করলেন। কখনো আবু বকর (রা) মুহাম্মদ (স) এর আগে থাকলেন, কখনো পিছনে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কেন তিনি এরূপ করলেন। তিনি বললেন, যখন আমি সামিনে থেকে বিপদের উপস্থিতি টের পেতাম তখন সামনে থাকতাম এবং যখন পেছন থেকে বিপদের আশংকা করতাম তখন পেছনে হাঁটতাম। আল্লাহর রাসূল (স) বললেন, তুমি কি নিজের ক্ষতি হতে দিতে নাকি আমার? তিনি বললেন, আমার, হে আল্লাহর রাসূল। তারা আল ঘার আত-থর এ পৌঁছলেন। আবু বকর (রা) গুহার ভেতরে গিয়ে দেখে এলেন গুহাটি আল্লাহর রাসূল (স) এর জন্য নিরাপদ কিনা। তারা সেখানে রাত্রিযাপন করলেন বটে, কিন্তু তারা তখনো নিরাপদ দূরত্ব থেকে অনেক দূরে।

মক্কার কুরাইশরা তাঁদের পলায়ন বুঝতে পারল এবং তাদের জীবিত ধরা বা হত্যার জন্য ছুটে এলো। আবু বকির (রা) এর ভৃত্য তাঁদের পদচিহ্নের উপর দিয়ে একপাল ভেড়া চড়িয়ে দিল যেন তাঁরা কোনদিকে গিয়েছে মরুভূমির বালুতে তার পরিষ্কার ছাপ না থাকে। কিন্তু আরবরা গজলা হরিন এবং খরগোস শিকার করে, সুতরাং তাদের খুব বেশি একটা চিহ্নের দরকার হলো না। ফলে তারা শেষপর্যন্ত গুহায় পৌছুলো এবং গুহার প্রবেশমুখে এমন জায়গায় দাঁড়ালো যে আবু বকর (রা) তাদের পা দেখতে পাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (স), তারা নিচের দিকে তাকালেই আমাদেরকে দেখে ফেলবে।’ রাসুলুল্লাহ (স) বললেন, ‘হে আবু বকর, তু দুইজনে ব্যাপারে কি বলছো যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা?’ রাসূলুল্লাহ (স) ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত এবং মোটেও ভীত নয়। বরং তিনি আবু বকর (রা) কে যা বললেন তা পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেনঃ

যদি তোমরা তাকে (রসূলকে) সাহায্য না কর, তবে মনে রেখো, আল্লাহ তার সাহায্য করেছিলেন, যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তার প্রতি স্বীয় সান্তনা নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা তওবা ৯ঃ৪০)

আবু বকর (রা) এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর মধ্যকার বিশেষ সম্পর্ক ছিল সবার কাছে ঈর্ষনীয়। আগুন যেমন লোহাকে গলিয়ে সম্পর্ককে দৃঢ় করে তোলে, তাদের বন্ধুত্বও তেমনি বিপদ আর কষ্টের মাধ্যমে মজবুত হয়েছে৷ ওমর ইবনুল খাত্তাব খলিফা থাকাজালীন একদিন শুনতে পেলেন লোকেরা আবু বকর (রা) এবং ওমর (রা) এর মধ্যে কে অধিকতর আলোচনা করছে। তিনি তাদের কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, আবু বকরের জীবনের একদিন ওমরের গোটা পরিবারের চেয়ে ভালো। সাহাবীদের মধ্যে আবু বকর (রা) এর মর্যাদার অনেক নিদর্শনের এটি একটি।

তিনি ছিলেন স্বভাবগত নেতা, বিদ্বান, রাসূলুল্লাহ (স) এর পরামর্শক এবং এমন ব্যক্তি যাকে তারা রাসূল (স) এর মৃত্যুর পর আমীর হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। তাকে বলা হতো খলিফাতুর রাসূলুল্লাহ। এই উপাধী কেবল তার জন্যই প্রযোজ্য ছিলা এবং আর কাউকে এই খেতাব দেয়া হয়নি। আবু বকর (রা) তাদের শাইখ ছিলেন কারণ রাসূল (স) তাকে সর্বাধিক ভালোবাসতেন।

তাঁরা গুহায় ছিলেন তিনদিন। আবদুল্লাহ বিন আবু বকর (রা) সারাদিন মক্কায় তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং রাতে গুহায় আবু বকর (রা) এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর সাথে কাটাতেন। তিনি সন্ধ্যায় যাবার সময় আবু বকর (রা) এর ভৃত্য আমের বিন ফুহাইরাকে দিয়ে দুধ সংগ্রহ এবং তার পদচিহ্ন মোছার জন্য একপাল ভেড়া চড়িয়ে নিয়ে যেতেন। আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকাত তাঁদেরকে ঘুরপথে মদীনা নিয়ে যাবার পথপ্রদর্শক ছিল। সে মুসলিম ছিল না, তবে রাসূলুল্লাহ (স) কে সহযোগিতা করতে রাজী ছিল।

কুরাইশরা হযরত মুহাম্মদ (স) এবং আবু বকর (রা) এর প্রতিজনের জীবিত অথবা মৃত মাথার মূল্য ১০০ উট পুরস্কার ঘোষনা করলো। আদিবাসী সমাজে উট হল আয় রোজগার এবং সামাজিক মর্যাদার উৎস, তাদের জন্য এটা ছিল বিশাল পুরস্কার। আল্লাহর রাসূলের শত্রুপক্ষের একজন, সুরাকা বিন মালিক, তার গোত্রের লোকদের সাথে বসে ছিল। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে জানালো সে ফুইজনকে দেখেছে এবং ধারণা করছে তারা মুহাম্মদ (স) এবং আবু বকর (রা)। সুরাকা ইচ্ছা করেই লোকটিকে উপহাস করলো দবকং বোঝালো তার ভুল হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে সে নিজেই পুরস্কারটি নিতে চাচ্ছিল। লোকটি চলে গেলে সুরাকা সন্তর্পনে সঙ্গীদের পরিত্যাগ করল এবং নিজের অস্ত্র ও বাহন প্রস্তুত করলো। কেউ যেন খেয়াল না করতে পারে এজন্য সে বির্শা নিচু করে নীরবে লোকটি নির্দেশিত পথের দিকে যাত্রা করলো।

আল্লাহর রাসূল (স) কোরআন তিলাওয়াত করতে করতে সামনে হাঁটছিলেন, আবু বকর (রা) পিছনে তাকিয়ে সুরাকাকে দেখতে পেলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (স) কে জানালেন এবং তিনি দোয়া করলেন। সুরাকার ঘোড়া বালিতে আটকে গেল এবং সে ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। সে খুবই অবাক হল। এমন কেউ যে ঘোড়ার পিঠেই বড় হয়েছে তার জব্য ঘোড়া থেকে পরে যাবার বিষয়টি স্বাভাবিক নয়। সে আবার ঘোড়ায় চড়ে বসে ছুটে চলল এবং রাসূল (স) আবারও দোয়া করলেন আর সুরাকার ঘোড়া বালিতে আটকা পড়ল এবং সে ঘোড়া থেকে পরে গেল। সুরাকা আরও একবার বাহনে উঠে বসে রওয়ানা হল কিন্তু এবার তার মুখে বালি পড়ল এবং সে পুনরায় ঘোড়া হতে পড়ে গেল। সুরাকা বুঝতে, বিষয়টি স্বাভাবিকের উর্ধ্বে এবং সে শান্তি প্রার্থনা করলো। রাসূলুল্লাহ (স) সম্মত হলেন। সুরাকা লিখিত দিতে অনুরোধ করলো। আল্লাহর রাসূল (স) আব্দুল্লাহ বিন উরাইকাতকে লিখে দিতে বললেন এবং সুরাকা একে নিরাপদে রাখলেন। বহু বছর পরে যখন রাসূল (স) তায়েফ অবরোধ করলেন তখন সুরাকা গ্রেফতার হলে সে এই দলিল প্রদর্শন করে নিজের জীবন বাঁচিয়েছিল। রাসূল (স) সুরাকাকে যারা তাঁকে ধরার জন্য স্থিরসংকল্প ছিল তাদের নিবৃত্ত করতে বলেছিলেন এবং সুরাকা কথা রেখেছিল। (Rasoolullah  told Suraaqa to weaken the resolve of anyone who wanted to pursue him and Suraaqa was true to his word.) সুরাকা কুরাইশদের নিকট ফিরে গিয়ে বলল তারা রাসূলুল্লাহকে খুঁজে পাবে বটে কিন্তু এর পরবর্তী তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।

মুহাম্মদ (স), আবু বকর (রা) এবং তাদের পথপ্রদর্শক চলতে লাগলেন। দৃশ্যটি কল্পনা করুন। মরুভূমিতে তিনজন মানুষ, গ্রীষ্মের উষ্ণতম সময়ে পায়ে হেঁটে বা উটের পিঠে চলছে, তাদেরকে তাড়া করে আসছে শত্রুরা যারা তাদেরকে হত্যা করতে চায়। আজ আমরা হিজরতকে এক বাক্যে উপস্থাপন করি – তিনি মক্কা থেকে মদীনায় মাইগ্রেট করলেন – যার মধ্যে সেই যাত্রার প্রকৃত কোন মর্যাদা বা উপলব্ধি অনুভূত হয় না। তাদের কষ্ট, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও নিরাপত্তাহীনতা এবং আল্লাহর রাসূল (স) এর ধৈর্য্য ও সাহস – সবই এর অন্তর্ভূক্ত ছিল। ব্যক্তিগত সাহস নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ এবং রাসূলুল্লাহ (স) এর চেয়ে সাহসী আর কেউ ছিল না। জীবনের পুরোটা সময়ে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন।

চলতে চলতে তারা একটি মেষপালকের শিবিরে এসে পৌঁছালেন। এ ধরণের ছাউনি বা শিবির আজও আরবদেশে দেখতে পাওয়া যায় যেখানে মেষপালক তার পরিবার এবং মেষগুলো নিয়ে বসবাস করে৷ মেষপালক মেষগুলোকে চড়াতে নিয়ে যেত এবং তার অবর্তমানে তার স্ত্রী ছাউনিতে থাকতো।

রাসূলুল্লাহ (স) এবং তার সাথীরা যখন ক্যাম্পে পৌঁছালেন তখন সেখনে ছিলেন উম্মু মা’বদ। রাসূল (স) তাকে বললেন, তুমি কি আমাদেরকে কিছু খেতে দিতে পারো?’ সে জবাব দিল, যদি খাবার মত কিছু থাকতো, তবে আপনাকে চাইতে হতো না।’ অতিথির আপ্যায়ন করা মরুভূমির আদিবাসী সমাজের গুরুত্বপূর্ণ একটি নীতি। রাসূল (স) উম্মু মা’বদের তাঁবুর কোনায় রোগামত একটি ভেড়া দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, তুমি কি আমাকে ওই ভেড়াটার দুধ দোহনের অনুমতি দিবে? সে বলল, যদি ওটা কোন কাজের হত তাহলে সেটা অন্যগুলোর সাথে ঘাস খেতে যেতো। এর দুধ নেই। এটা বন্ধ্যা এবং শুষ্ক। কিন্তু রাসূল (স) জোর করলেন, তাই সে তাঁকে ভেড়া থেকে দুধ দোহনের অনুমতি দিলেন। আল্লাহর রাসূল (স) তাকে ক্যাম্পের সবচেয়ে বড় পাত্রটি নিয়ে আসতে বললেন। উম্মু মা’বদ বিস্মিত হলেও সবচেয়ে বড় পাত্রটি নিয়ে এলেন। রাসুলুল্লাহ (স) ডান হাতে ছাগলটির পেছনে চাপড় দিয়ে দুধ দোয়াতে শুরু করলেন এবং পাত্রটির কানায় কানায় ভর্তি হওয়া পর্যন্ত দুধ প্রবাহিত হলো।

আলাহর রাসূল (স) উম্মু মা’বদের হাতে পাত্রটি দিয়ে পেট ভর্তি করে খেতে বললেন। তার শেষ হলে তিনি পাত্রটি আবু বকর (রা) কে দিলেন এবং তারপর পথপ্রদর্শক খেতে দিয়ে সবশেষে নিজে খেলেন। সবার খাওয়া শেষ হলেও দেখা গেল পাত্রে দুধ রয়ে গেছে। রাসূলুল্লাহ (স) এর স্পর্শে এমনই বরকত ছিল।

সেই রাত্রে স্বামী ফিরে এলে উম্মু মা’বদ সেই বিকেলে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে যে ভাষায় রাসূল (স) এর বর্ণনা করেছিলেন তা শত শত বছর ধরে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে।

She said, ‚I saw him to be a man of evident splendor. Fine in figure, his face handsome, slim in form, his head not too small, elegant and good looking, his eyes black, eyelashes long, his voice deep, very intelligent, his brows high and arched, his hair in plaits, his neck long and beard thick. He gave an impression of dignity when silent and of high intelligence when he spoke. His words were impressive and he was decisive, not trivial not trite, his ideas like pearls moving on their string. He seemed the most splendid and fine looking man from a distance and the very best of all from close by. Medium in height, the eye not finding him too tall nor too short. A tree branch as it were between two others but he was the finest looking of the three. The best proportioned. He was the center of his companions’ attention. When he spoke they listened well and if he ordered they hurried to obey. A man well helped well served, never sullen, never refuted.‛

Her husband said, ‚This man must be Muhammad  who Quraysh are pursuing. If I meet him I will pledge allegiance to him and become Muslim.‛ Ummu Ma’abad had already accepted Islam at the hands of the Messenger  of Allah  .

মুসলমানদের হৃদয়ে মদীনার প্রতি ভালোবাসা তৈরীর জন্য রাসূল (স) দোয়া করলেন, আল্লাহুম্মা হাব-বাব ইলাইনাল মাদীনা কা হুব্বনিা মক্কা আও আশদাদ। মদীনায় বরকত দানের জন্যও রাসূল (স) দোয়া করলেন, {হে আল্লাহ! মক্কায় যতটুকু বরকত রয়েছে, মদীনায় তার দ্বিগুণ বরকত দাও} (সূত্র)। মদীনা দাজ্জাল থেকে সুরক্ষিত। মদীনার দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য্যধারনের জন্য রয়েছে বিশেষ পুরস্কার।

মদীনা ছিল নিচু ভূমি। শীতের সময় এখানে প্রচন্ড ঠান্ডা পড়তো। মক্কা থেকে আগত সাহাবীরা অসুস্থ হয়ে পড়তো,সেখানে বসবাস করা তাদের জন্য খুব কঠিন হত। এ কারণে রাসূল (স) বললেন, যে ব্যক্তি মদীনার কষ্ট ও বালা-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে সাক্ষ্য দেব কিংবা তার জন্য শাফায়াত করব। (সূত্র) রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মদীনার কষ্ট ও বালা-মুসিবতে ধৈর্যধারণ করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি তার পক্ষে সাক্ষ্য দেব কিংবা তার জন্য শাফায়াত করব।’ (সূত্র)

যারা আন্তরিক তাদের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা) মদীনায় শাহাদাত বরণের জন্য দোয়া করতেন। তিনি যখন মসজিদে নববীতে ফজরের নামাজ পড়াচ্ছিলেন, তখন একজন খ্রীস্টান তাকে ছুরিকাঘাত করে এবং তিনি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহর রাসূল (স) বলেন, যারা মদীনাবাসীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, আল্লাহ তাদেরকে অদৃশ্য করে দেন যেভাবে লবন পানিতে অদৃশ্য হয়ে যায়। মদীনা পবিত্র, তাই এখানে গাছ কাটা, পশুহত্যা, লড়াই এবং অস্ত্রবহন নিষিদ্ধ।

আমার বিশ্বাস হিজরতের ঘটনা ইসলামে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ যে ইসলামিক ক্যালেন্ডার গণনা এখান থেকেই শুরু করা হয়ে এটা বোঝার জন্য এই ভ্রমণের কিছু বিষয় পাঠ করা অত্যাবশ্যক। আগেই বলেছি, এটা ছিল বহু-ঈশ্বরবাদ এবং দুর্নীতির ভূমি থেকে সেই ভূমিতে রাসূলুল্লাহ (স) এর পরিভ্রমণ যা তাঁকে মুক্তি এবং তার বাণী প্রচারের কাজে সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত ছিল। তার নিজের জন্ম বা মৃত্যু তারিখকে ক্যালেন্ডারের সূচনা তারিখ বিবেচনা করা হয়নি। ইসলাম যে কর্মের ধর্ম এবং সকল কর্মের সেরা হল আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণ করা অসম্ভব বা কঠিন এমন স্থান থেকে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা সম্ভব এমন স্থানে গমন করা – তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই ঘটনায়।

হিজরতের ধারণার মধ্যে এ কারণে প্রতিকী এবং আক্ষরিক উভয় অর্থই রয়েছে। প্রতীকী অর্থে আল্লাহ যা অপছন্দ করেন তা পরিত্যাগ করে যা পছন্দ করেন তা গ্রহণ করা হল হিজরত৷ হিজরত হল নিজের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আনা যা আল্লাহু সুবহানাহু তায়ালা এবং তার রাসূল (স) এর আনুগত্যকে প্রতিফলিত করে। হিজরত হল পাপ থেকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। এই ধরনের হিজরত – সচেতনভাবে সব ধরণের অবাধ্যতা থেকে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে – সকল মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক। আক্ষরিক অর্থে হিজরত হলো মন্দ স্থান থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া। নিখুঁত বলে কোন জায়গ নেই এমন চিন্তার মাধ্যমে শয়তান আমাদের থামিয়ে দিতে চায় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কিছু জায়গার এমন কতগুলো সহজাত সমস্যা রয়েছে যা ইসলামের যথাযথ পরিপালনকে অসম্ভব করে তোলে। আমাদের প্রত্যেকেরই কি করা উচিত সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

দাওয়াহ’র ইতিহাসে হিজরত একটি বাস্তবতা। বহু আম্বিয়াকে তাদের নিজ জনপদ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। কতককে হত্যা কর হয়েছে। আম্বিয়া ছিলেন না এমন বহু ব্যক্তি যারা সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে এবং সত্যের এই বিরোধিতা চলছে। ওয়ারাকা বিন নওফেল নবুয়্যতের ঘটনা শুনে এই বিরোধিতা সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন। এ কারণেই হিজরতের পুরস্কার এত বেশি।

কোরআনকে আল ফুরক্বান বলা হয় কারণ এটি সত্যকে মিথ্যা হতে পৃথক করে। বদরের যুদ্ধকে একই কারণে আল ফুরক্বানও বলা হয়। ইসলাম এসেছে সত্যকে প্রচার করতে এবং মিথ্যাকে নিষিদ্ধ করতে যেন সকল মানুষ একটি নৈতিক সমাজে শান্তিতে এবং মিলেমিশে বসবাস করতে পারে। শয়তান এবং তার অনুসারীরা এর বিরোধিতা করে এবং ভবিষ্যতেও করতে থাকবে। এই সংগ্রাম আদ্যিকালের। ইসলাম সবসময়ই তার অনুসারীদের সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে বাছাই করতে বলে, তাই আমাদের প্রস্তুত থাকা উচিত।

মুহাম্মদ (স) ই সেই ব্যক্তি যে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একক এবং একমাত্র স্রষ্টার কাছ থেকে সমগ্র মানবজাতির জন্য ভালোবাসা, দয়া এবং ক্ষমার বাণী নিয়ে এসেছে।

শহরের নিকটবর্তী হতেই আমরা রাসূলুল্লাহ (স) এর কবর মসজিদে নববীর মিনার দেখতে পেলাম। রাসূল (স) যে পথ ধরে মদীনায় হিজরত করেছিলেন সেই একই পথ ধরে আমরা চলছি। সৌদি আরবের বাদশা ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ মক্কা থেকে মদীনায় যাবার মহাসড়ক নির্মানের সময় রাসূলুল্লাহ (স) এর হিজরতের রাস্তা হুবহু অনুসরণ করার উপর জোর দিয়েছিলেন। রাস্তাটি সহজতম ছিল না এবং অনেকগুলো গিরিখাদ অতিক্রম করতে হয়েছিল ফলে বিশাল পরিমান ব্যায়ে এটি নির্মিত হয়। বর্তমানকালে মুসলমানরা সেই পথ অনুসরণ করতে পারে যা রাসূল (স) চৌদ্দশত বছর আগে করেছিলেন।

অবশ্য একালে আমরা এয়ার কন্ডিশনের আরামে ভ্রনণ করি আর রাসূলুল্লাহ (স) এবং তার সাথীরা সেই পথে পায়ে হেঁটেছেন, গিরিখাদের খাড়া প্রান্ত ধরে উঠেছেন এবং নেমেছেন। এ সকল গিরিখাদের উপর স্থাপিত কোন একটি সেতুর উপর দাঁড়িয়ে খাদগুলো কতটা গভীর তা অনুধাবন করার পরামর্শ থাকল। তার জীবন সহজ ছিল না, তিনি ছিলেন খুব কঠিন একজন মানুষ – একজন যোদ্ধা এবং একজন ব্যক্তি যে তার লক্ষ্যের প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আগেই বলেছি, তার সীরাতে (জীবনী) খুব সহজভাবে লেখা হয়: তিনি মক্কা থেকে মদীনায় স্থানান্তরিত হলেন। এই ক্ষুদ্র বাক্যটি স্থানান্তর (মাইগ্রেট) শব্দের অর্থ – শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক – সামান্যটুকুও প্রকাশ করে না। এর অর্থ মাতৃভূমিকে, নিজের শহরকে, পিতৃপুরুষের ভূমিকে ত্যাগ করা। গোষ্ঠীবদ্ধ কোন সমাজে নিজের জন্মভূমি থেকে উৎখাতের চেয়ে বড় কোন শাস্তি হতে পারে না। কোন উপজাতি তার সবচেয়ে খারাপ অপরাধীর ক্ষেত্রেও গোত্রের নিরাপত্তার বাহিরে রাখার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। অথচ তারা মুহাম্মদ (স) এর ক্ষেত্রে, যে কোন অপরাধ করেনি, এই কাজটিই করলো।

গোত্রের প্রতি আনুগত্য সর্বাগ্রে – এমনকি ন্যয়বিচার এবং নিরপেক্ষতার চেয়েও। সেযুগের গোত্রীয় সমাজে জ্ঞাতিজনকে সহযোগিতা করতে হতো – ভুল বা শুদ্ধ যাই হোক না কেন। বহু বছর পরে রাসূলুল্লাহ (স) এই ঐতিহ্যকে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োগ করেছিলেন।

তিনি বলেন: তোমার ভাইকে সহায়তা করো – সে ভুল বা সঠিক যাই হোক। তার সাথীরা জিজ্ঞেস করলো, সে যদি সঠিক হয় তবে তাকে সহায়তা করার ব্যাপারটি আমরা বুঝতে পেরেছি কিন্তু সে যদি ভুল হয় তাহলে কিভাবে সহায়তা করবো? তিনি জবাব দিলেন, তার ভুল কাজকে বন্ধ করার মাধ্যমে তাকে সহায়তা করবে। অন্যথায় আল্লাহ তায়ালা তাকে শাস্তি দিবেন। যদি তুমি তার মন্দ কাজ বন্ধ করো, তবে তুমি তাকে সহায়তা করলে। অথচ তার নিজের গোত্র সকল সহায়তা তুলে নিল, তিনি কোন ভুল করেছেন এ কারণে নয় বরং তিনি তাদের সহায়তা করতে চেষ্টা করছিলেন এই কারণে। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বর্তমানেও মানুষ সেই অজ্ঞতার যুগে ফেরত গিয়েছে যেখানে বর্ণ, জাতীয়তা এবং গোত্রবাদ সত্য এবং ন্যয়বিচারে আগে গুরুত্ব পায়। অবিচার এবং নির্যাতনের এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে মুহাম্মদ (স) এর শিক্ষা মানুষের পথ দেখানোর জন্য বাতিঘরের ন্যয়।

পৃথিবীর নিয়ম বড়ই অদ্ভুত এবং এর পরিবর্তন হয় না। যে বার্তাবাহক তোমার মুক্তির বার্তা বয়ে এনেছে তাকে হত্যা করো – এই নিয়ম আজও চলছে।

সুতরাং মাইগ্রেশন বা হিজরত সত্যিকার অর্থে অভিবাসন ছিল না, ছিল তাঁর সবচেয়ে ভালোবাসার জায়গা থেকে উচ্ছেদ হওয়া। যেখানে তার একটি পরিচিতি ছিল, যার প্রত্যেকটি জায়গা তিনি চিনতেন, প্রত্যেকটি ঘর, টিলা, উপত্যাকার সাথে তাঁর স্মৃতি জড়িত। এমন স্থান যেখানে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এবং জীবনের তেপ্পান্নটি বছর পার করেছেন। এখানে তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা) কে বিবাহ করেছিলেন যিনি তার সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এবং যখন তার সহায়তায় জনগণের মধ্য থেকে কেউ ছিল না তখন তার সাহায্যকারী ছিলেন। এখানেই তাঁর সহধর্মিণী সায়্যিদিনা খাদিজাতুল কুবরা (রা) এবং তাঁর গভীর সমর্থক চাচা আবু তালিবের মৃত্যুতে তিনি গভীর দুঃখ পেয়েছেন৷ মক্কা হল সেই স্থান যেখানে তার সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করেছে ও বড় হয়েছে, সেই জায়গা যেখানে ধনী ও দরিদ্র, সুখী ও দুঃখী ছিলেন। A place where he was loved, revered and then reviled –all in the course of conveying the message which intends only good for all mankind. সুতরাং তিনি মক্কা ত্যাগ করলেন। সেখানে তার কাজ কঠিনতম হয়ে উঠেছিল এবং নিকৃষ্ট বিরোধীদেরকে আকৃষ্ট করছিল। একারণেই রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, সকল নবীকেই বিরোধিতা ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং আমি সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত।

Allah himself mentioned this tendency of people to mindlessly fight that which is most beneficial to them – Hidaya (guidance) –when He said after narrating the incident of the man who was killed when he invited his people to follow the Messengers.

Ya-Seen 36:30. Alas for mankind! There never came a Messenger to them but they mocked him.

হিজরত বলতে নিজের পরিবারকে এমন স্থানে ফেলে আসাকেও বোঝায় যেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। এর মানে নিজের সহায় সম্পত্তি বলতে যা কিছু আছে তা ফেরত পাবার আশা না করে ফেলে আসা। এর মানে হলো বছরের উষ্ণতম সময়ে মরুভূমির উপর ৪৫০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে চলা, পেছনে তাড়া করে আসছে পুরস্কারলোভী শিকারীরা কারণ তার মাথার জন্য একশ উট পুরস্কার ঘোষনা করেছে তারই গোত্রের লোকেরা। এই পুরস্কারের পরিমান বিশাল, এ কারণে বহু মানুষ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত ছিল তার বিগত তের বছরের নবীত্বের, তার সংগ্রামের, পর্যালোচনা।

আমরা কেবল সমান্য কিছু সফলতা ছাড়া কেবল ব্যার্থতার পর ব্যার্থতা দেখতে পাই। এটি একজন নবীর জন্য খুবই হৃদয়বিদারক ব্যাপার। নবীদের হৃদয় তাদের রবের সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে মজবুত হয়। তাদের জীবন আমাদেরকে কষ্টসহিষ্ণু হতে শিক্ষা দেয়।

The ability to face the brutal facts, yet have absolute faith in eventual success, when there is no evidence to show that you can or will succeed.

মদীনার নিকটবর্তী হলে রাসূল (স) কি দেখতে পেয়েছিলেন আমি তা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। আমরা এখন যে বিশালাকৃতির উঁচু দালানগুলি দেখতে পাই তা তো অবশ্যই নয়। তিনি হয়তো কেবল বালি আর খেজুর গাছ দেখতে পেয়েছেন, গাঢ় সবুজ রঙ এর ফর্ণ জাতীয় গাছ বাতাসে দুলে দুলে তাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। দূরে, মাটির তৈরি ঘরের গ্রামটি দেখা যায় যা তার বাণী প্রচারের কেন্দ্রস্থল হতে যাচ্ছে। ছোট্ট সেই গ্রামটি এখন সম্পুর্ণই মসজিদে নববীর সুন্দর অবকাঠামোর অন্তর্ভূক্ত। মহান আল্লাহর বিজ্ঞতার কি অপূর্ব নিদর্শন, রাসূল (স) মদীনার যে মাটিকে বিশ্বাস করেছেন, হেঁটেছেন তার প্রতিটি ইঞ্চি এখন সিজদার স্থান। জায়গাটির এই গুরুত্বের কারণ হল এর অধিবাসীরা আল্লাহর রাসূল (স) এর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

ছোট্ট এই গ্রাম থেকে এমন এক আলো ছড়িয়ে পড়েছিল যা সেই সময়কার পুরো বিশ্বকেই আলোকিত করেছিল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরবর্তী প্রজন্মকে আলোকিত করে চলছে। এমন অভাবনীয় কাজ করতে বাতির বাহক কি এমন করেছিল? তার মহিমান্বিত জীবন থেকে নেতৃত্বের কি শিক্ষা আমরা গ্রহণ করতে পারি? রাসূল (স) এর সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা নিজে বলেছেন তার জীবন সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ। The life of Rasoolullah  is the one that Allah  quoted as the example for all mankind and so the lessons to be learnt from it are legion. Nobody can claim to do full justice to that and neither do I.

এই বইয়ে আমি তাঁর মহিমান্বিত জীবনের কিছু দিক তুলে ধরে নেতৃত্বের কি শিক্ষা গ্রহণ কর যায় তা দেখার এবং আপনাদের জানানোর চেষ্টা করেছি। আমাদের বর্তমান ক্রান্তিকালের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান ঘাটতি হল জবাবদিহিতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অনুভূতিসম্পন্ন আদর্শিক নেতৃত্ব। সারাবিশ্বে আদর্শিক নেতৃত্বের অভাব খুবই প্রকট।

আমরা বর্তমানে যে দুনিয়ায় বসবাস করছি এবং ভবিষ্যতের যে দুনিয়ার সম্মুখীন তা খুবই জটিল। এখন তথ্য পূর্বের যে কোন সময়ের তুলনায় সহজে পাওয়া যায়। ক্ষমতা অভিজাত শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। এই পৃথিবীর টিকে থাকা না থাকা যে বিষয়গুলোর উপর নির্ভরশীল তা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ যে এদের পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব। আমরা যে সমাজে বাস করি সেটা অর্থনৈতিক, জাতিগত, জাতীয়তা, ধর্ম এবং ক্ষমতার রেখায় বিভক্ত। এবং এই বিভক্তি ক্রমাগত বাড়ছে।

বস্তুগত দিক বিবেচনায়, যেমন গ্যাজেট, যন্ত্রপাতি, সম্পদ এবং অর্থ, আমরা সম্ভবত আগের যে কোন সময়ের তুলনায় প্রাচুর্যের মধ্যে আছি। আমাদের যা নেই তা হল নৈতিক ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের, যাদের কম রয়েছে তাদেরকেও অন্তর্ভূক্ত করে এমন মানদণ্ড। বস্তুগত সম্পদ জমা করার চেয়ে সততার উপর অধিক গুরুত্বারোপ করে, স্বল্পমেয়াদী কৌশলের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদী Criteria that place greater importance on integrity than on accumulating material wealth. Criteria that focus on the long term impact of short term strategies. Criteria where we hold ourselves accountable for our actions, even if nobody else does. Criteria where we stand by our word, live by our creed and act according to our values; concerned about leaving a legacy of honor for those who will come after us.

রাসূলুল্লাহ (স) এর সীরাত অধ্যয়নকালে আমরা অনুধাবন করতে পারি যে ট্রেণ্ড, ফোকাস এবং সমস্যার ক্ষেত্রে তাঁর সময়ের পৃথিবী এবং আমাদের বর্তমান পৃথবী হুবহু এক। এটা তাঁর জীবন থেকে নেতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণের জন্য আশাব্যঞ্জক কারণ সেই সময়ের সমস্যাগুলো যদি আমাদেরগুলোর মত হয় এবং সেগুলো তার পদ্ধতি অনুযায়ী সমাধান করা হয়, তাহলে আমাদের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে, সেই পদ্ধতিগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম করে আমাদের কাছে এসেছে যখন আমরা বিভিন্ন শক্তির নেতিবাচক প্রভাবে ঘূর্ণিপাক খাচ্ছি। নতুন এবং পরীক্ষামূলক কোন তত্ত্বের তুলনায় প্রয়োগকৃত ও পরীক্ষীত কোন উপায় শ্রেয়তর। বিশেষ করে যখন সেই উপায়টি ঐশ্বরিক এবং যিনি প্রয়োগ করেছেন তিনি ঐশ্বরিক সহযোগিতাপ্রাপ্ত। এ ধরনের উপায় কখনো ব্যর্থ হবার নয়।

আল হিজাজ এবং তৎকালীন সমাজ

ইসলাম পূর্ব যুগে আল হিজাজ নামে পরিচিত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উপাদান সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করছি। হিজারে প্রধান শহর ছিল মক্কা, আল্লাহর ঘর বা কা’বা শরীফের কারণেই এর গুরুত্ব বেশি ছিল। মুহাম্মদ (স) এর জন্মের সময় আরবের শহরাঞ্চলের অধিবাসীরা, বিশেষ করে মক্কার কুরাইশ এবং তায়েফের বনু তাকিফ গোত্র, উত্তরদিকে শ্যাম (সিরিয়া, জর্দান, ফিলিস্তিন, লেবানন) এবং দক্ষিণদিকে ইয়েমেনের সাথে সমৃদ্ধ ব্যবসার কারণে বেশ ধনী এবং ক্ষমতাবান ছিল। তাদের এই সমৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিককালের। আরব উপত্যাকার (জাজিরাতুল আরব) গোত্রগুলো এক প্রজন্ম আগেও যে দারিদ্র‍্য ছিল সেটা মনে রেখেছিল এবং তার সমৃদ্ধি নিয়ে খুব গর্বিত ছিল।

ধর্ম ছিল তাদের ব্যবসায়ের প্রসার, ক্ষমতা আর সম্পদ আহরনের একটা উপায় মাত্র, সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের উপায় নয়। দেব-দেবীদের কারণে কা’বায় তীর্থযাত্রীরা উপস্থিত হত এবং এদের সংখ্যা যত বেশি তাদের জন্য তত ভালো। ক্লক্রমে এদের সংখ্যা এত বেড়ে গেল যে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে হযরত ইব্রাহিম (আ) যে ঘর নির্মাণ করেছিলেন তার ভিতরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। মক্কা ছিল ব্যবসা এবং তীর্থকেন্দ্র, তাই মক্কার স্থানীয় সম্পদশালী ও ক্ষমতাবান বাণিজ্যপ্রধানদের সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস ছিল তীর্থযাত্রা ও এর আনুষঙ্গিক কার্যাবলী।

বস্তুগত সম্পদ ছিল প্রাথমিক এবং একমাত্র বিবেচ্য। এটি ছিল সামাজিক মান-মর্যাদার প্রতীক। কে কি পোষাক পড়ল, কি সুগন্ধী ব্যবহার করল, কার কতজন দাস ও ভৃত্য রয়েছে, কি ধরনের বাহন ব্যবহার করে ইত্যাদি বিষয় ছিল আলোচনার বস্তু এবং যারা তাদের মত হতে চায় তাদের কল্পনা এবং ভাবনার খোরাক। The phrase, ‘If you got it, flaunt it,’ may not have been known then but lifestyles certainly reflected this philosophy. ঔদ্ধত্য ছিল ক্ষমতাবানদের অধিকার এবং তাদের অবাধ শোষনের ক্ষমতা ছিল মর্যাদার প্রতীক। যারাই তাদের প্রতিবাদ করেছে তারাই তাদের ক্রোধানলে পতিত হয়েছে। Self-indulgence was the right of those who had wealth and no law regulated what they could or couldn’t do. মাত্র এক প্রজন্ম আগেই তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই ভিন্নরকম। তাই যারা সম্পদশালী হয়ে গেছে তাদের নিজেদের স্মৃতিতে অসুখী দিনগুলো রয়ে গিয়েছিল এবং তাই তাদের সম্পদের ব্যাপারে তারা খুবই স্পর্শকাতর ছিল। অর্থই ছিল একমাত্র বিবেচ্য এবং অর্থ অর্জিত হলে একমাত্র চিন্তা হতো কি উপায়ে এর ভোগ করা যায়। এই ভোগের কোন নির্দিষ্ট সীমানা ছিল না, সীমানা নির্ধারিত হতো কি পরিমান অর্থ রয়েছে তার উপর। দরিদ্ররা সম্পদশালোদের দ্বারা খুবই নির্মমভাবে নির্যাতিত হতো। দাস এবং নারীদেরকে পণ্যের ন্যায় ব্যবহার করা শেষে কোনরূপ চিন্তা বা মন্তব্য ছাড়াই ছুঁড়ে ফেলা হতো।

দাসপ্রথা ছিল বিস্তৃত। নারীদেরকে সম্পত্তির ন্যায় ক্রয়, বিক্রয় এবং উত্তরাধিকারসূত্রে অধিকার করা এবং ইচ্ছামত ত্যাগ করা যেতো। মুহাম্মদ (স) এর সময়কার সমাজ ছিল গোত্রভিত্তিক পুঁজিবাদী সমাজ যেখানে সফলতার একমাত্র মাপকাঠি ছিল ক্ষমতা এবং সম্পদের পুঞ্জিভূতকরন। নৈতিক মূল্যবোধের প্রকট অভাব ছিল। বেশ্যাবৃত্তি ছিল বিস্তৃত এবং সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। নারীদের কোন অধিকার ছিল না, তাদেরকে অস্থাবর সম্পত্তি হিসেবে গন্য করা হতো যার সবচেয়ে জঘন্যরূপ হল কন্যাশিশু হত্যা। যারা জীবিত কবরস্থ হওয়ার মত ভয়ংকর পরিণতি থেকে বেঁচে যেতো, তারা বড় হয়ে উঠতো পুরুষের ভোগ্যসামগ্রী হিসেবে ব্যবহার, নাহয় সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহারের জন্য। গোত্র এবং জাতীয়তা, বর্ণ এবং বংশ পরিচয়কে সব কিছুর চেয়ে গুরুত্ব দেয়া হতো। কিছু নারীর সমাজিক মর্যাদা এবং প্রতিপত্তি থাকলেও এগুলো ছিল নিয়মের ব্যতিক্রম। জীবন ছিল কদর্য, নিষ্ঠুর এবং সংক্ষিপ্ত।

অর্থ ছিল ক্ষমতা এবং যাদের তা কম তারা গোত্রীয় সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে দুর্বল ছিল। দাসরা ছিল কঠিন নিপীড়নের শিকার এবং ক্ষমতাসীন অভিজাত সম্প্রদায়ের করুণার বস্তু। মুহাম্মদ (স) যে গোত্রের অন্তর্গত ছিলেন সেই মক্কার কুরাইশরা ব্যবসায়ী ছিলেন, পাশাপাশি অতিরিক্ত এবং অন্যান্য গোত্রের সাথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে পার্থক্য ছিল তা হল তারা ছিল কা’বার তত্ত্বাবধায়ক। In today’s terms they were merchant priests who regulated worship at the Ka’aba and were revered as a result of their association with the chief house of worship in Arabia. কুরাইশদের মধ্যে মুহাম্মদ (স) এর পরিবার, বনু হাশিম, ছিল সবচেয়ে সম্মানিত এবং পবিত্র জমজম কূপের রক্ষক হিসেবে তারা তীর্থযাত্রীদের খাবার ও পানীয় সরবরাহের মাধ্যমে সেবা করার বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিল। This special position also gave Quraysh protection in a society which existed on the time honored principle of raiding each other.

কুরাইশদের বাণিজ্য কাফালা শীতকালে দক্ষিণে ইয়েমেন পর্যন্ত এবং গ্রীষ্মে উত্তরে শ্যাম পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতো। যে সকল গোত্রের পেশা ছিল এ ধরণের বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করা, তাদের থেকেও কুরাইশদের কাফেলা নিরাপদ ছিল, কারণ তারা হলো কা’র তত্ত্বাবধায়ক এবং প্রধাণ ধর্মযাজক। Makkan aristocracy was an aristocracy of rich merchants and not the usual hereditary aristocracy of land owners and royalty that we see elsewhere. It was a society where upward mobility was comparatively easy. If you made enough money you could rise in society and enjoy its benefits. So acquisition of material wealth was the single primary focus of all people. Religion was a means of getting rich.

আগেই বলেছি, আমরা যদি সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পারবো আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সাথে এর কত গভীর মিল। হিজাজের আরবদের ন্যায় এযুগে হয়তো সেই অর্থে দাসপ্রথা নেই কিন্তু আমাদের দাসপ্রথা আরও শক্তিশালী কারণ এটা প্রকৃতিতে মতাদর্শভিত্তিক (ideological) এবং সারা বিশ্বে বিস্তৃত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এর মূল্যবোধ প্রচারের মাধ্যমে একে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা মানুষকে এর ভিতরে বন্দী করে এবং স্বাধীনতা ও সমতার আদর্শের কারণে এটি যেন হুমকীর মুখে না পড়ে তা দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নিশ্চিত করে৷ (We may not have slaves in the same sense that the Arabs of Al-Hijaz had but our slavery is even more powerful because it is ideological in nature, has global reach, is enforced by an education system which promotes its values, an economic system which locks people into it and an executive which ensures that it is not threatened by misplaced ideals of freedom and equality.)

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, সেই সময়ের দুই পরাক্রমশালী হলো বাইজেন্টাইন (রোমান) সম্রাজ্য ও পারস্য সম্রাজ্য যারা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এবং কখনো এ পক্ষ কখনো ওই পক্ষ অপরের উপর জয়ী হতো। এদের কেউই আরব অঞ্চল শাসনের ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। এর কারণ মূলত ছিল আরবের শুষ্ক, চাষাবাদ অযোগ্য মরুভূমি আর কিছু মরুদ্যান শহর যেখানে যাযাবর কিছু গোত্র বসবাস করতো, আর ছিল দুইটি বাণিজ্যকেন্দ্র – মক্কা এবং তায়েফ। কর আদায় বা সৈন্য ও রসদ সংগ্রহ কিংবা প্রয়োজনে বিভিন্ন গোত্রকে বশে আনার জন্য অভিযান চালানো কোন কিছুর জন্যই আরব খুব ভালো কোন পছন্দ ছিল না। রোমান এবং পারসীয়রা এই অঞ্চলের আরবদের উপেক্ষা করায় তারা বিচ্ছিন্ন ছিল এবং কখনো অন্য কারও অধীন হয়নি।

আরবরা তাদের নিজস্ব গোত্রীয় আইন মেনে বাস করতো, তাদের নিজস্ব গোত্রপ্রধান দ্বারা পরিচালিত হতো এবং ঈর্ষনীয়ভাবে নিজের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতো। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে উল্লেখ করা উচিত, তারা হল এমন মানুষ যারা কখনই কারও অধীন ছিল না, ফলে কারও অধীন ছিল এমন লোকদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে ছিল না। তাদের এই অনমনীয়তা এবং আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা মনোভাব প্রকট হয়ে উঠত। তারা ছিল এমন লোক যারা নিজেদের আইন কঠোরভাবে মেনে চলতো কিন্তু অন্যদের নিয়মকানুন গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিল না।

তারা কখনোই কারও সামনে মাথা নত করেনি এবং এ নিয়ে তারা গর্বিত ছিল। ফলে যখন তারা আল্লাহর কাছে মাথা নত করল তখন তাদের মনে ছিল যে তারা কখনো মাথা নত করেনি, ফলে তাওহীদের সকল অর্থই তারা গ্রহণ করেছিল। মুহাম্মদ (স) এই বিশ্বজগতের স্রষ্টার কাছ থেকে যে মতবাদ গ্রহণ করেছিল তা ছিল মরুর বাতাসের মত বিশুদ্ধ, পরিষ্কার এবং সরল। ইসলাম যখন রাজাদের কাছে এলো এবং মুসলমানরা রাজ্য জয় করতে শুরু করল তখনই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক এবং দার্শনিক বিষয়গুলো আত্মভূত করতে শুরু করে যার সাথে মুহাম্মদ (স) এর ইসলামের কোন সম্পর্ক ছিল না।

আরবদের গোত্রভিত্তিক সমাজের প্রকৃতি এবং ইসলামের বাণীর বিরোধিতার ধরণ – এই উভয়ের বৈশিষ্ট্য মনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের বার্তাকে ধরা হয়েছিল এমন কিছু যা তাদের স্বাধীনতাকে কেড়ে নিতে এবং তাদের যাজকতন্ত্র ও ক্ষমতার ভিত্তিকে পুনর্বিন্যাস করতে চায়।

মুহাম্মদ (স) এর সমকালীন আরব সমাজের এই সংক্ষিপ্ত চিত্র থেকে এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে এর সাথে বর্তমানের প্রভাবশালী বৈশ্বিক সংস্কৃতির কত গভীর মিল। অর্থ-ক্ষমতার উপর অধিকতর গুরুত্ব, বিনোদন ও মুনাফার জন্য নারীদের অবজেক্টিফিকেশন (যদিও একে স্বাধীনতার নামে বিক্রি করা হচ্ছে), widespread promiscuity and license, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, বস্তুগত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা, সমাজকে বর্ণ/জাতীয়তা ইত্যাদি রেখায় বিভক্তিকরণ এবং ন্যায়বিচার, নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের লক্ষ্যে যে কোন পদক্ষেপ – যে কোন ধর্ম যা করতে চায় – ইত্যাদিকে অপ্রয়োজনীয়, অবাঞ্চিত জ্ঞান করা হয় এবং এর তীব্র বিরোধিতা করা হয়। দরিদ্র ও দুর্বলদের কোন স্বর, ক্ষমতা এমনকি পরিচিতিও নেই এবং ধনীদের আরও ধনী হবার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে, তাদের এই অবস্থার কারণে বাকী দুনিয়ার কি পরিণতি হচ্ছে তার কোন ভাবনা নেই। গোটা দুনিয়া নিপীড়নের যাতাকলে পিষ্ট অথচ এর কোন সমাধান দেখা যাচ্ছে না।

এমন একটি সমাজেই মুহাম্মদ (স) জম্মগ্রহণ করেছিলেন এবং নেড়ে উঠেছিলেন, এই সমাজেই তিনি তার বাণী প্রচার করেছেন – এমন বাণী যা বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক মর্যাদা নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চায়। এই বাণীতে রয়েছে ব্যক্তির জন্য মর্যাদা, মানুষের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং দুর্বলের জন্য সহানুভূতি। রয়েছে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং মানুষের স্রষ্টার আইন-কানুনের প্রতি নত হওয়ার বার্তা যা সকলের জন্য নিশ্চিত করে শান্তি, সুসম্পর্ক এবং নিরাপত্তা। বর্তমানে এই বাণীর চেয়ে অধিক আর কী প্রয়োজন?

এমন বার্তা আমাদের নিদারুণভাবে প্রয়োজন কারণ বর্তমানে পৃথিবী যে সমাধান খুঁজছে তা এখানে আছে। এই প্রেক্ষাপটে যে সকল নেতৃত্বের শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে আমি বিশ্বাস করি তা ঘেঁটে বের করেছি এবং একটি আধুনিক, প্রয়োগ উপযোগী ফরম্যাটে উপস্থাপন করেছি। আমি বিশ্বাস করি শিক্ষার উদ্দেশ্য হল সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা এবং এর অন্যথায় জ্ঞান আমাদের উপকার করতে পারে না। তাই আমি অনুরোধ করবো নেতৃত্বের শিক্ষাগুলো নিজের জীবনে বাস্তবায়নের অভিপ্রায় নিয়ে এই বইটি পড়ুন।

আল্লাহর রাসূলের (স) জীবন থেকে যে বিষয়গুলো শিক্ষা নেয়া যায়ঃ
1. (Complete certainty)
2. সমঝোতা না করা (No compromise)
3. (Putting himself on the line)
4. (Resilience: Face the facts + Absolute faith in success)
5. সবার প্রথমে লক্ষ্য – ব্যক্তিগত পছন্দেরও আগে (Goal comes first – before personal preferences)
6. (Living his message)
7. ঝুঁকি গ্রহণ (Risk taking)
8. দীর্ঘমেয়াদের স্বার্থে স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ ত্যাগ (Sacrificing short term for long term)
9. (Magnanimity and forgiveness)
10. ব্যক্তি-চালিত থেকে প্রক্রিয়া-চালিতে রূপান্তর (Transiting from Person – led to Process-driven)
11. উত্তরাধিকার পরিকল্পনা এবং নেতৃত্ব তৈরি (Succession planning & leadership development)

এই বইয়ের বাকী অংশে আমরা এগুলোর প্রত্যেকটি আলাদাভাবে কুরআন, সুন্নাহ এবং সীরাত থেকে প্রমাণসহ বর্ণনা করবো। আমি যতটুকু সম্ভব পরিষ্কারভাবে উপস্থাপনের জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের সাহায্য ও সহযোগিতা এবং আমার ভুল ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

আল্লাহ ও তার বাণীতে পূর্ণ আস্থা

আল্লাহর রাসূল (স) এর প্রথম যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হল তার বাণীতে পূর্ণ আস্থার বিষয়টি; আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং তিনি নিজে আল্লাহর রাসূল ও তাকে সমগ্র মানবজাতির কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রেরণ করা হয়েছে।

দৃশ্যটি নিজের ক্ষেত্রে কল্পনা করুন৷ রাসূলুল্লাহ (স) সাফা পাহাড়ের উপর আরোহন করলেন এবং চিৎকার করে ডাকলেন, ‘হে সাথীরা!’ লোকজন এর চতুর্দিকের হারাম শরীফ এবং বাজারথেকে তার কাছে ছুটে এল, শুধু একারণে নয় যে এই বিপদের ডাক সবাইকে সবকিছু ফেলে রেখে জরুরীভিত্তিতে উপস্থিত হতে বলছে, একারণেও যে এই ডাক এসেছে মুহাম্মদ, আস সাদিক আল আমীন (সত্যবাদী এবং বিশ্বাসী – কুরাইশরা তাকে এই নামে ডাকতো) থেকে। সে যদি ‘হে সাথীরা!’ বলে ডাকে তাহলে সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং তারা সাফা পাহাড়ের পাদদেশে তার চারিদিকে জমায়েত হল। বর্তমানকালে আমরা যখন উমরাহ পালন করতে যাই এবং তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর যখন সাফা পাহাড়ে সায়ী করতে যাই, আমাদের উচিত থেমে এই পাহাড় কি দেখেছে তা প্রতিফলিত করা। এটাই সেই স্থান যেখানে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহ (স) ইবরাহীম (আ) এর পরে প্রথমবার তাওহীদের বাণী ঘোষণা করলেন।

রাসূলুল্লাহ (স) তাদেরকে বললেন, হে লোকেরা, যদি আমি বলি যে একটি সৈন্যদল এই পাহাড়ের পেছনে অপেক্ষা করছে তাহলে কি তোমিরা আমাকে বিশ্বাস করবে?

তারা বলল, তুমি কখনো আমাদের সাথে মিথ্যা বলোনি এবং আমরা তোমাকে বিশ্বাস করবো। তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে (পরকালে) কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করতে এসেছি (যদি তোমরা বহুঈশ্বরবাদ ত্যাগ এবং আল্লাহর ইবাদত না করো)।

আবু লাহাব ছিলেন আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ (স) এর সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়, তার পিতার ভাই। তিনি তাদের অনেকের পক্ষে বললেন, তাব্বাল-লাকা সারাল ইয়াওমা-লি হাতা জামাত্না? (বাকী জীবনে তোমার অনিষ্ট হোক, তুমি কি এজন্যে আমাদেরকে জমায়েত করেছো?) আবু লাহাবের মতে আখিরাতের কথা বলা মানে সময়ের অপচয় এবং তাকে দোকান হতে ডেকে আনাকে ক্ষতি বলে বিবেচনা করলেন। এ ধরনের ব্যক্তি পৃথিবীর যে কোন বিষয়ে কথা বলতে আপত্তি করে না কিন্তু আখিরাতের মুক্তি নিয়ে যত আপত্তি। এই যুগেও আপনি যদি কিভাবে মিলিয়ন ডলার আয় করা যাবে তা নিয়ে কথা বলেন, তাহলে মানুষ যেভাবেই হোক সময়ে বের করে নিবে, এমনকি আপনার কথা শোনার জন্য অর্থও প্রদান করবে। কিন্তু আপনি যদি তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে প্রবেশের উপায় সম্পর্কে বলতে চান, তাহলে তারা তাদের সময় নষ্ট করার ব্যাপারে আপনাকে অভিযুক্ত করবে।

আবু লাহাব আখিরাত নিয়ে কিথা বলাকে সময়ের অপচয় এবং তকে দোকান থেকে ডেকে আনাকে ক্ষতি বলে মনে করলেন, তাই তিনি তার ভাতিজাকে অভিশাপ দিলেন। কিন্তু তার ভাতিজা ছিলেন আল্লাহর রাসূল (স) এবং যারা আল্লাহর রাসূলকে অভিশাপ দেয় আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন না। তাই আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেন,
Masad 111:1 -3. Perish the two hands of Abu Lahab and perish he! 2. His wealth and his children (etc.) will not benefit him! 3. He will be burnt in a Fire of blazing flames!

কুরআনের উৎস যে ঐশ্বরিক এই সূরাটি তার অনেক প্রমাণের একটি, যারা প্রমাণ খুঁজতে চায় তাদের জন্য, কারণ আবু লাহাব যে অমুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে এখানে সেই ভবিষ্যতবাণী করা হয়েছে।

কুরআনকে মিথ্যা ‘প্রমাণ’ করার জন্য আবু লাহাবের জন্য এটুকুই যথেষ্ট ছিল যে সে শুধুমাত্র ইসলাম গ্রহনের ভান করবে, তাহলেই এই ভবিষ্যতবাণী মিথ্যা প্রমাণিত হতো। কিন্তু সে তা করেনি এবং বহু বছর পরে সে ইসলাম গ্রহণ ব্যাতিরেকেই খুবই ভয়ংকর এক রোগে মৃত্যুবরণ করে এবং তার মৃতদেহে পচন ধরে কারণ মানুষ তাকে কবরস্ত করার জন্য ধরতেও চায়নি৷ তিনদিন পরে তার ছেলেরা লম্বা লাঠির সাহায্যে তার শবদেহটি একটি গর্তে ফেলে দেয় এবং পাথর ছুঁড়ে গর্তটি ভর্তি করে। অর্থ্যাৎ আবু লাহাবকে তার নিজের ছেলেরাই পাথর মারে এবং মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।

প্রথম যে নেতৃত্বের শিক্ষা আমরা পাই তা হল নেতার তার নিজের উপর পূর্ণ আস্থা থাকা জরুরী। নিজের ভিশন, কৌশল, পদ্ধতি এবং এই বিশ্বাস থাকা যে তাকে কেউ অনুসরণ করলে নিশ্চিতভাবে সে উপকৃত হবে। নেতা যদি এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহও প্রকাশ করে তার নেতৃত্বের ক্ষমতা খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। মানুষ তাদের নেতাকে বিভিন্ন কারণে অনুসরণ করে – কেউ করে কারণ তারা তার বাণী বিশ্বাস করেছে, কেউ করে কারণ নেতা ক্ষমতাবান বার কেউ নেতার বিভিন্নরকম সম্পর্কের কারণে অনুসরণ করে।

নেতা যদি তার পথে অটল থাকেন তবে ক্রমান্বয়ে তার অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং বিন্দু সিন্ধুতে পরিণত হয়। অটল অবিচল থাকা এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

নবীত্বের ২৩ বছরের কঠিনতম সময়েও একটি ঘটনার অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না যেখানে মুহাম্মদ (স) তার বাণী এবং দায়িত্ব থেকে বিন্দুমাত্র নড়াচড়া করেছেন। এটাও একটি অলৌকিক ব্যাপার এবং রাসূল (স) এর উপর প্রদত্ত ঐশ্বরিক মিশনের প্রমাণ। এই বিশ্বাস এবং এর সাথে মুহাম্মদ (স) এর মহৎ গুণাবলী, সত্যবাদী ও বিশ্বাসী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি, সুন্দর ব্যবহার, নিষ্কলংক চরিত্র, সুগভীর প্রজ্ঞা, অসাধারণ বিচক্ষণতা এবং সুবিশস্ল মহানুভবতা তাকে খুবই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, এ কারণে নয় যে তারা তার আহবানে ঈমান এনেছে, বরং তারা মুহাম্মদ (স) কে বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাস করে যদি তিনি কথা বলে থাকেন তবে অবশ্যই একথা সত্য। এ থেকে বার্তাবাহকের ব্যক্তিগত চরিত্রের গুরুত্ব স্পষ্ট এবং এর চেয়ে অন্য কিছু বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয় বা তার বার্তা প্রচারে সহায়ক হতে পারেনা। (চলবে)

(সর্বশেষ আপডেট: ২৮/০৮/২০১৮)

2 Comments on “রাসূলুল্লাহ (স) এর জীবন থেকে নেয়া নেতৃত্বের শিক্ষা”

    1. যা করতে পেরেছি তা এখানেই আছে, বাকীটুকু করা হয় নি। রোজার আগে শেষ কাজ করেছিলাম। আবার শুরু করার ইচ্ছা আছে, ইনশাআল্লাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *